• ই-পেপার

বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচেই কি খেলবেন নেইমার, জানাল গ্লোবো

১৯৭০ বিশ্বকাপে কোয়ালিফাই করতেই পারেনি আর্জেন্টিনা

ক্রীড়া ডেস্ক
১৯৭০ বিশ্বকাপে কোয়ালিফাই করতেই পারেনি আর্জেন্টিনা
সংগৃহীত ছবি

বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম সফল দল আর্জেন্টিনা। বিশ্বকাপের ইতিহাসে তিনবার শিরোপা জেতা আলবিসেলেস্তেরা নিয়মিতভাবেই টুর্নামেন্টের মূল পর্বে জায়গা করে নেয়। তবে অবাক করার মতো তথ্য হলো, মাঠের লড়াইয়ে বাছাইপর্ব থেকে বাদ পড়ে বিশ্বকাপ মিস করেছে মাত্র একবার।

সেটি ছিল ১৯৭০ মেক্সিকো বিশ্বকাপ। দক্ষিণ আমেরিকার বাছাইপর্বে হতাশাজনক পারফরম্যান্সের কারণে মূল আসরে জায়গা করে নিতে পারেনি আর্জেন্টিনা।

তৎকালীন বাছাইপর্বের কাঠামো ছিল খুবই সংক্ষিপ্ত। ফলে একটি বা দুটি ভুলই পুরো অভিযানে বড় প্রভাব ফেলত। ১৯৬৯ সালে বলিভিয়ার কাছে ৩-১ গোলে এবং পেরুর কাছে ১-০ গোলে হেরে যায় আর্জেন্টিনা। ফলে শেষ ম্যাচে পেরুর বিপক্ষে জয়ের বিকল্প ছিল না।

বুয়েনস এইরেসের ঐতিহাসিক লা বোম্বনেরা স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত সেই ম্যাচে পেরুর সঙ্গে ২-২ গোলে ড্র করে আর্জেন্টিনা। এর ফলে গোল ব্যবধানে পিছিয়ে গ্রুপের তলানিতে থেকে যায় তারা এবং ১৯৭০ বিশ্বকাপের টিকিট হারায়। সেটিই আজ পর্যন্ত একমাত্র বিশ্বকাপ, যেখানে আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপে খেরতে ব্যর্থ হয়েছিল তারা। 

তবে বিশ্বকাপ ইতিহাসে আর্জেন্টিনা আরো দুটি আসরে অনুপস্থিত ছিল। ১৯৩৮ ও ১৯৫০ সালের বিশ্বকাপে তারা অংশ নেয়নি, যদিও সেগুলো ছিল ভিন্ন কারণে।

১৯৩৮ সালে ফ্রান্সকে বিশ্বকাপের আয়োজক নির্বাচনের প্রতিবাদে নিজেদের নাম প্রত্যাহার করে নেয় আর্জেন্টিনা। আর ১৯৫০ সালে ব্রাজিল ফুটবল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বিরোধ এবং অভ্যন্তরীণ নানা কারণে বাছাইপর্বেই অংশ নেয়নি তারা।

অর্থাৎ বিশ্বকাপের ইতিহাসে আর্জেন্টিনা তিনটি আসরে অনুপস্থিত থাকলেও, মাঠের খেলায় হেরে বিশ্বকাপের মূল পর্বে উঠতে না পারার ঘটনা ঘটেছে মাত্র একবার—১৯৭০ সালে। এরপর আর কখনো এমন হতাশা দেখতে হয়নি আর্জেন্টিনাকে।  

পেলের যুগে আরো ‘কঠিন’ ছিল অফসাইড নিয়ম!

ক্রীড়া ডেস্ক
পেলের যুগে আরো ‘কঠিন’ ছিল অফসাইড নিয়ম!
সংগৃহীত ছবি

বর্তমান ফুটবল বিশ্বে ‘অফসাইড’ মানেই মিলিমিটারের হিসাব, ভিএআর-এর চুলচেরা বিশ্লেষণ আর কম্পিউটার প্রযুক্তির নিখুঁত সিদ্ধান্ত। কিন্তু ফুটবল সম্রাট পেলের সময়ে কেমন ছিল এই নিয়ম? পেলে যখন বিশ্ব ফুটবলে রাজত্ব করছেন, তখন কি আজকের মতো অফসাইড ছিল? সাধারণ ফুটবলপ্রেমীদের মনে প্রায়ই এই প্রশ্নটি উঁকি দেয়।

ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা তারকা পেলের ক্যারিয়ারের পুরোটাজুড়েই অফসাইড নিয়মটি বেশ কঠোরভাবে কার্যকর ছিল। তবে তৎকালীন নিয়ম ও ম্যাচ পরিচালনার ধরন আজকের ফুটবল থেকে অনেকটাই আলাদা ছিল।

ফুটবল ইতিহাসের একেবারে শুরুর দিকে (১৮৬৩ সাল) অফসাইডের নিয়ম অত্যন্ত কঠিন ছিল। তবে পেলের অভিষেকের অনেক আগেই, ১৯২৫ সালে আন্তর্জাতিক ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন বোর্ড অফসাইড নিয়মে একটি ঐতিহাসিক পরিবর্তন আনে। 

বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী, আক্রমণভাগের একজন খেলোয়াড় যখন বলের পাস পাবেন, তখন তার এবং প্রতিপক্ষের গোললাইনের মাঝখানে কমপক্ষে ২ জন প্রতিপক্ষ খেলোয়াড় (সাধারণত গোলরক্ষক এবং একজন ডিফেন্ডার) থাকতে হতো। পেলের পুরো ক্যারিয়ার এই ‘২ জন খেলোয়াড়ের’ নিয়মেই পরিচালিত হয়েছে।

বর্তমান ফুটবলে কোনো খেলোয়াড় অফসাইড পজিশনে থেকেও যদি খেলায় সরাসরি প্রভাব না ফেলেন বা বল স্পর্শ না করেন, তবে তাকে অফসাইড ধরা হয় না। কিন্তু পেলের যুগে নিয়মটি এতটা নমনীয় ছিল না। তখন আক্রমণভাগের কোনো খেলোয়াড় অফসাইড পজিশনে থাকলেই রেফারি বাঁশি বাজিয়ে দিতেন, তিনি খেলায় অংশ নিন বা না নিন।

তবে পেলের সময়ে অফসাইড নিয়ম কার্যকর থাকলেও আধুনিক ফুটবলের মতো কিছু সুযোগ-সুবিধা তখন ছিল না। পেলের সময়ে রেফারি বা লাইন্সম্যানদের সাহায্য করার জন্য কোনো ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (ভিএআর) বা সেমি-অটোমেটেড অফসাইড প্রযুক্তি ছিল না। রেফারিরা খালি চোখে যা দেখতেন, সেটাই ছিল চূড়ান্ত। ফলে অনেক স্পষ্ট অফসাইড যেমন চোখ এড়িয়ে যেত, তেমনি পেলের অনেক বৈধ গোলও অফসাইডের কারণে বাতিল হয়ে যেত। 

তৎকালীন সময়ে ডিফেন্ডারদের অন্যতম প্রধান অস্ত্র ছিল ‘অফসাইড ট্র্যাপ’। পেলেও সে ফাঁদে পড়তেন প্রায়ই। এ ছাড়া পেলের আগেই ১৯৫৪ ফুটবল বিশ্বকাপের ফাইনাল ম্যাচে অফসাইডের কারণে বাতিল হয়েছিল হাঙ্গেরির ফেরেঞ্চ পুসকাসের গোল। 

বসুন্ধরা ক্রিকেট নেটওয়ার্ক থেকে বিশ্বমঞ্চে জয়িতা

অনলাইন ডেস্ক
বসুন্ধরা ক্রিকেট নেটওয়ার্ক থেকে বিশ্বমঞ্চে জয়িতা

বাংলাদেশের নারী ক্রিকেটের অন্যতম বড় আসরকে সামনে রেখে দারুণ এক অর্জনের খবর দিয়েছে বসুন্ধরা ক্রিকেট নেটওয়ার্ক (বিসিএন)। আসন্ন নারী টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের বাংলাদেশ দলে জায়গা করে নিয়েছেন জুয়াইরিয়া ফেরদৌস জয়িতা।   

এক বিবৃতিতে বিসিএন জানায়, জয়েতার কঠোর পরিশ্রম, নিবেদন ও ক্রিকেটের প্রতি প্রবল আবেগ তাকে দেশের সর্বোচ্চ মঞ্চে পৌঁছে দিয়েছে। জাতীয় দলের জার্সিতে বিশ্বকাপ খেলতে যাওয়ায় তার প্রতি গর্ব প্রকাশ করেছে পুরো বিসিএন পরিবার।

বিবৃতিতে আরো বলা হয়, বিশ্বমঞ্চে দেশের প্রতিনিধিত্ব করতে যাওয়া জয়িতার পাশে রয়েছে পুরো বিসিএন পরিবার। ইতিহাস গড়ার পথে এগিয়ে যাও জয়িতা। 

একই সঙ্গে তরুণ ক্রিকেটারদের উদ্দেশে বিসিএন জানিয়েছে, যারা নিজেদের প্রতিভা বিকাশ করতে চায়, তাদের জন্য উন্মুক্ত রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির প্রশিক্ষণ কার্যক্রম।

রক্তাক্ত পতাকায় অমরত্ব

১৯৯৮ সালের ক্রোয়েশিয়া এবং ফুটবলের চেয়েও বড় এক সত্য

ফুয়াদ হাসান
১৯৯৮ সালের ক্রোয়েশিয়া এবং ফুটবলের চেয়েও বড় এক সত্য
ছবি : রয়টার্স

বিশ্বকাপ ফুটবলের শতবর্ষী ইতিহাসে খুব কম গল্পই আছে যা ১৯৯৮ সালের ক্রোয়েশিয়ার মতো এতটা আবেগঘন এবং ভারী। সেই বিশ্বকাপে ব্রাজিলের ছিলেন রোনালদো। ফ্রান্সের ছিল জিনেদিন জিদান আর স্বাগতিক হিসেবে নিজেদের বিশ্বমঞ্চে চেনানোর এক তীব্র তাড়না। কিন্তু ক্রোয়েশিয়ার যা ছিল, তা কেবল ফুটবলীয় উচ্চাকাঙ্ক্ষা দিয়ে মাপা যাবে না। তাদের ছিল স্মৃতি, তাদের ছিল স্বজন হারানোর গভীর শোক। তাদের ছিল এক সদ্য স্বাধীন হওয়া লাল-সাদা চেকআউট পতাকা, যার গায়ে তখনও লেগে ছিল তাজা রক্তের দাগ। মাঠের এগারোজন খেলোয়াড় কেবল একটা মেডেলের পেছনে ছুটছিলেন না, তারা আসলে বয়ে বেড়াচ্ছিলেন যুদ্ধে প্রাণ হারানো হাজারো শহীদের স্মৃতি! 

১৯৯৮ সালে ফ্রান্সের মাটিতে যখন ক্রোয়েশিয়া বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে পৌঁছায়, ওটা কেবল কোনো ক্রীড়াজগতের রূপকথা বা মিরাকল ছিল না। ওটা ছিল যুদ্ধবিধ্বস্ত এক নতুন দেশের বিশ্বমঞ্চে সগর্বে দাঁড়িয়ে যাওয়ার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা। ক্রোয়েশিয়ার স্বাধীনতা যুদ্ধের শেষ কামানের গর্জন স্তব্ধ হওয়ার মাত্র তিন বছর পর, চল্লিশ লাখ মানুষের একটা দেশ বিশ্বকাপের ফাইনাল খেলার হাতছোঁয়া দূরত্বে এসে দাঁড়িয়েছিল।

ইগর স্তিমাচ, স্লাভেন বিলিচ, জভোনিমির বোবান, রবার্ট প্রোসিনেস্কি, আলিওসা আসানোভিচ আর ডেভর সুকারের কাছে ফুটবল তখন আর কেবল কোনো পেশা ছিল না। ওটা ছিল প্রতিরোধ আর বিশ্বকে চিৎকার করে বলার এক অকাট্য মাধ্যম যে, ক্রোয়েশিয়া টিকে আছে, ক্রোয়েশিয়া বেঁচে আছে এবং তারা বিশ্বের পরাশক্তিদের চোখের চোখ রেখে লড়াই করতে পারে।

রক্ষণভাগের প্রাচীর স্লাভেন বিলিচ পরবর্তীতে সেই আবেগ প্রকাশ করেছিলেন এক বিধ্বংসী সহজ সরল উক্তিতে, ‘আমরা কেবল নিজেদের জন্য বা ক্রোয়েশিয়ার জন্য খেলছিলাম না। আমরা খেলছিলাম সেই মানুষদের জন্য, যারা যুদ্ধে মারা গেছেন।’

একটি স্বাধীন ফুটবল জাতি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার আগে, এই সোনালী প্রজন্মের বেশিরভাগ খেলোয়াড়ই ছিলেন যুগোস্লাভিয়ার পরিচয়ে। বিলিচ আর স্তিমাচ বড় হয়েছেন স্প্লিট শহরে। এটি ছিল সমুদ্র, খেলাধুলা আর শ্রমিক শ্রেণীর আবেগে ঠাসা এক শহর। তাদের শৈশব কেটেছে গলির ফুটবল, গান আর এক নিরাপদ আবহে, যা রাজনীতি তখনও বিষিয়ে দিতে পারেনি।

কমিউনিস্ট একনায়ক জোসিপ ব্রোজ টিটোর আমলের যুগোস্লাভিয়া ছিল পূর্ব ইউরোপের অন্যান্য কঠোর সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোর চেয়ে আলাদা। এটি ছিল অনেক বেশি উন্মুক্ত, পশ্চিমা সংস্কৃতির দিকে ঝুঁকে থাকা এক দেশ। তরুণরা ইংলিশ ফুটবল দেখতে পারত, রক মিউজিক শুনতে পারত এবং ঘরোয়া লিগে খেলে বড় তারকা হওয়ার স্বপ্ন দেখত। কারণ, নিয়ম অনুযায়ী ২৮ বছর বয়সের আগে কোনো যুগোস্লাভ খেলোয়াড়ের বিদেশে যাওয়ার অনুমতি ছিল না।

এই নিয়মটি কিছুটা শৃঙ্খল মনে হলেও, যুগোস্লাভিয়ার ফুটবলকে শক্তিশালী করতে তা দারুণ ভূমিকা রেখেছিল। দেশের সেরা প্রতিভারা লিগেই থেকে যেত। তাদের জাতীয় দলের খেলার মধ্যে ছিল এক সহজাত শৈল্পিক ছোঁয়া, সৃজনশীলতা আর চোখধাঁধানো সৌন্দর্য। ফুটবল বিশ্বে তাদের ডাকা হতো ‘ইউরোপের ব্রাজিল’ নামে।

১৯৮০ সালে টিটোর মৃত্যুর পর এক বিশাল রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি হয়। এত বছর যে জাতীয়তাবাদকে কঠোর হস্তে দমন করে রাখা হয়েছিল, তা আবার মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে। ক্রোয়েশিয়ায় যেসব গান, প্রতীক বা রাজনৈতিক স্মৃতি একসময় নিষিদ্ধ ছিল, তা হয়ে ওঠে নতুন জাতীয় চেতনার অংশ। ফুটবলাররা তখনও রাজনীতির সৈনিক হয়ে ওঠেননি, কিন্তু ইতিহাস দ্রুত গতিতে তাদের দিকেই এগিয়ে আসছিল।

ক্রোয়েশিয়া ভবিষ্যতে ফুটবলে কী করতে পারে, তার প্রথম ঝলক দেখা গিয়েছিল ১৯৮৭ সালে। সে বছর চিলিতে অনুষ্ঠিত ফিফা বিশ্ব যুব চ্যাম্পিয়নশিপ (অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপ) জিতেছিল যুগোস্লাভিয়া। স্তিমাচ ছিলেন সেই দলের অন্যতম সদস্য। বোবান আর প্রোসিনেস্কি ছিলেন টুর্নামেন্টের সবচেয়ে বড় তারকা। ফাইনালের শুরুর একাদশে ছয়জনই ছিলেন ক্রোয়াট ফুটবলার!

তারা চিলি, ব্রাজিল এবং ফাইনালে পশ্চিম জার্মানিকে হারিয়ে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। তবে ট্রফি জেতার চেয়েও বড় কথা, তারা নিজেদের মধ্যে এমন এক নিটোল বন্ধন তৈরি করেছিলেন, যা পরবর্তীতে আস্ত একটা দেশ ভেঙে যাওয়ার পরও টিকে ছিল।

চিলিতে থাকাকালীন এক রাতে স্তিমাচ আর বোবানের হোটেল থেকে লুকিয়ে দুই স্থানীয় মডেলের সঙ্গে দেখা করতে যাওয়ার গল্পটা আজ বেশ কৌতুককর শোনায়। কিন্তু এর ভেতরে লুকিয়ে ছিল এক গভীর সত্য। কোচ যখন জানতে পেরে এই দুজনকে দেশে ফেরত পাঠানোর হুমকি দেন, তখন পুরো দল এককাট্টা হয়ে কোচের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল। সবার এক কথা—স্তিমাচ আর বোবানকে বের করে দিলে আমরা কেউই এই টুর্নামেন্টে খেলব না, সবাই একসঙ্গে দেশে ফিরব!

এই যে একে অপরের জন্য মরতে পারার মানসিকতা, এটাই পরবর্তীতে ক্রোয়েশিয়ার ফুটবলের মূল চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছিল। তারা বড় মাপের খেলোয়াড় ছিলেন, অহংকারও কম ছিল না; কিন্তু তারা বন্ধুত্বের শক্তিটা বুঝতেন। ক্রোয়েশিয়া যখন বিশ্বমঞ্চে পা রাখল, এই একতাই তাদের প্রতিভার চেয়েও বড় শক্তি হয়ে দেখা দিল।

১৩ মে ১৯৯০, ডিনামো জাগ্রেব বনাম রেড স্টার বেলগ্রেড। ফুটবল ইতিহাসের এই ম্যাচটি যুগোস্লাভিয়া গৃহযুদ্ধের অন্যতম এক প্রতীকী ভূমিকা হিসেবে গণ্য করা হয়।

ডিনামো জাগ্রেব ছিল ক্রোয়াট জাতীয়তাবাদের প্রতীক, আর রেড স্টার বেলগ্রেড ছিল সার্বিয়ান শক্তির অহংকার। ম্যাচের শুরু থেকেই গ্যালারিতে শুরু হয় ভয়াবহ দাঙ্গা। রেড স্টারের উগ্র আল্ট্রাস সমর্থকেরা (যাদের অনেকের সঙ্গে সার্বিয়ান প্যারামিলিটারি বা আধা-সামরিক বাহিনীর যোগাযোগ ছিল) ক্রোয়াট সমর্থকদের ওপর চড়াও হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশের পক্ষপাতমূলক আচরণ ক্রোয়াটদের ক্ষোভ আরো বাড়িয়ে দেয়।

ঠিক তখনই ক্যামেরায় ধরা পড়ে সেই দৃশ্য, যা ক্রোয়াট জাতির ইতিহাসে অমর হয়ে আছে।

ডিনামো জাগ্রেবের তরুণ অধিনায়ক জভোনিমির বোবান দেখলেন, এক পুলিশ কর্মকর্তা এক ক্রোয়াট সমর্থককে নির্মমভাবে পেটাচ্ছেন। বোবান ক্ষোভে ফেটে পড়ে এক দৌড়ে এসে উগ্র ফ্লাইং কিক বসিয়ে দিলেন সেই পুলিশ কর্মকর্তার বুকে! আইনের চোখে ওটা ছিল চরম শৃঙ্খলাভঙ্গ, কিন্তু ক্রোয়াটদের চোখে ওটা ছিল এক অত্যাচারী ব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রথম প্রকাশ্য বিদ্রোহ। বোবান রাতারাতি হয়ে উঠলেন এক পরাধীন জাতির মুক্তির প্রতীক।

এই ঘটনার জেরে বোবান নিষিদ্ধ হন এবং ১৯৯০ সালের বিশ্বকাপে যুগোস্লাভিয়ার হয়ে খেলতে পারেননি। সেই বিশ্বকাপটিই ছিল অখণ্ড যুগোস্লাভিয়ার শেষ বড় টুর্নামেন্ট। কোয়ার্টার ফাইনালে আর্জেন্টিনার কাছে পেনাল্টিতে তাদের হারটি ছিল আসলে একটি ফুটবলীয় সভ্যতার চিরতরে হারিয়ে যাওয়ার শেষ অধ্যায়। এর পরপরই দেশটা টুকরো টুকরো হয়ে যায়, শুরু হয় রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ।

ক্রোয়েশিয়ার স্বাধীনতা যুদ্ধে প্রায় ২০ হাজার মানুষ প্রাণ হারান। বলকান অঞ্চলের এই ভয়াবহ ক্যাটাস্ট্রফিতে লাখো পরিবার বাস্তুচ্যুত হয়, শহরগুলো ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। ১৯৯১ সালের ভুকোভার শহরের গণহত্যা ক্রোয়েশিয়ার বুকে সবচেয়ে গভীর ও রক্তাক্ত ক্ষত সৃষ্টি করেছিল।

এমন এক বিভীষিকাময় পরিস্থিতিতে ক্রোয়াট ফুটবলারদের বলা হয়েছিল—তোমাদের খেলা চালিয়ে যেতে হবে। তোমাদের রাইফেল হাতে সীমান্তে যুদ্ধ করতে হবে না, তোমাদের কাজ হলো বিশ্বমঞ্চে দেশের অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখা। একদিকে যখন গ্রেনেড আর বারুদের গন্ধ, অন্যদিকে মাঠের সবুজ ঘাসে তখন চলছিল আরেক যুদ্ধ।

ফুটবল হয়ে উঠল এক আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক ভাষা। প্রতিটি ম্যাচ ছিল এক একটি প্রকাশ্য বিবৃতি: ক্রোয়েশিয়া কোনো কাল্পনিক ধারণা নয়, কোনো সাময়িক বিদ্রোহ নয়, ক্রোয়েশিয়া একটি স্বাধীন রাষ্ট্র!

১৯৯১ সালের ৮ মে, অখণ্ড যুগোস্লাভিয়ার শেষ কাপ ফাইনাল। ইউরোপের তৎকালীন পরাশক্তি রেড স্টার বেলগ্রেডের মুখোমুখি হয়েছিল বিলিচ-স্তিমাচদের হাইদুক স্প্লিট।

ম্যাচের পরিবেশ ছিল পরাবাস্তব এবং চরম শত্রুতামূলক। মাঠে নামা প্রতিটি খেলোয়াড় জানতেন যুগোস্লাভিয়ার ফুটবল শেষ হয়ে গেছে, রাজনীতি ফুটন্ত লাভার মতো ফুটছে। তাও ম্যাচটি মাঠে গড়িয়েছিল। রেড স্টারকে হারিয়ে ট্রফি জিতে নেয় হাইদুক স্প্লিট।

বিলিচ আর স্তিমাচের কাছে ওটা স্রেফ কোনো ঘরোয়া কাপ ফাইনাল ছিল না। ওটা ছিল সার্বিয়ার বিরুদ্ধে ক্রোয়েশিয়ার এক প্রতীকী যুদ্ধ। স্তিমাচ পরবর্তীতে সেই ট্রফিটাকে বর্ণনা করেছিলেন যুদ্ধের ময়দান থেকে ছিনিয়ে আনা কোনো ‘যুদ্ধ ট্রফি’ হিসেবে!

নব্বইয়ের দশকের ক্রোয়েশিয়ার ফুটবলকে বুঝতে হলে এই মানসিকতা জানা জরুরি। কোনো ম্যাচই তখন স্রেফ ম্যাচ ছিল না, কোনো গোলই স্রেফ গোল ছিল না; প্রতিটি পারফরম্যান্সের পিঠে চেপে বসত একটা রক্তাক্ত ইতিহাসের চাপ।

যুদ্ধ শেষের পর, ক্রোয়েশিয়া তাদের প্রথম সোনালী প্রজন্মের জন্য খুঁজে পায় এক পারফেক্ট জাদুকর—কোচ মিরোস্লাভ ‘চিরো’ ব্লাজেভিচ।

চিরো ছিলেন নাটুকে, আবেগপ্রবণ এবং দারুণ ক্যারিশম্যাটিক। গলায় রেশমি স্কার্ফ জড়াতেন কোনো সেনাপতির মেডেলের মতো। তিনি খেলোয়াড়দের ট্যাকটিক্সের জটিল ছকে বন্দি করতেন না। তিনি জানতেন তার দলে বড় বড় তারকা, শিল্পী আর যোদ্ধারা আছেন। তার আসল জাদুটা ছিল মনস্তাত্ত্বিক।

তিনি ড্রেসিংরুমে গিয়ে খেলোয়াড়দের চোখে চোখ রেখে বলতেন—‘তোমরাই পৃথিবীর সেরা দল!’

প্রথমে খেলোয়াড়েরা হেসে উড়িয়ে দিতেন। কিন্তু ধীরে ধীরে এই বিশ্বাস তাদের মজ্জায় ঢুকে গেল। বোবানের নেতৃত্ব, প্রোসিনেস্কির নান্দনিক পাসিং, আসানোভিচের বাম পায়ের বুদ্ধিমত্তা, ডেভর সুকারের খুনে ফিনিশিং আর বিলিচ-স্তিমাচের রক্ষণভাগের দেয়াল, সব মিলিয়ে ক্রোয়েশিয়া আর কোনো করুণা পাওয়া আন্ডারডগ দল ছিল না। তারা ছিল এক রক্তাক্ত ইতিহাস থেকে উঠে আসা এক অপ্রতিরোধ্য শক্তি।

ক্রোয়েশিয়ার প্রথম বড় টুর্নামেন্ট ছিল ইংল্যান্ডের ইউরো ৯৬। ডেবিউতেই কোয়ার্টার ফাইনালে পৌঁছে তারা মুখোমুখি হয় জার্মানির।

সেই ম্যাচটি ক্রোয়াট ফুটবলে এক স্থায়ী ক্ষত হয়ে আছে। বেশ কিছু বিতর্কিত রেফারিংয়ের সিদ্ধান্তে ম্যাচটি ২-১ গোলে হেরে যায় ক্রোয়েশিয়া, লাল কার্ড দেখেন স্তিমাচ। বিলিচ পরবর্তীতে স্বীকার করেছিলেন, ম্যাচ শেষে তিনি শিশুর মতো কেঁদেছিলেন কারণ ক্রোয়েশিয়া সেদিন জার্মানির চেয়ে ভালো ফুটবল খেলেছিল।

বিদায়ের কষ্ট তো ছিলই, তবে তার চেয়ে বেশি কষ্ট ছিল এই ভাবনায় যে—তাদের হাত থেকে একটা নিশ্চিত জয় ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে। তবে ইউরো ৯৬ বিশ্বকে একটা বার্তা দিয়ে দিয়েছিল— এরা কোনো সাধারণ নবাগত দল নয়। এদের গর্ব আছে, টেকনিক আছে এবং ট্যাকটিক্যাল পরিপক্বতা আছে। ফুটবলের মানচিত্রে এক নতুন পরাশক্তির জন্ম হয়ে গেছে।

দুই বছর পর, ফ্রান্সের মাটিতে তারা ফিরেছিল সেই হারের প্রতিশোধের আগুন বুকে নিয়ে।

১৯৯৮ সালের বিশ্বকাপে ক্রোয়েশিয়া যখন পা রাখে, তারা খাতায়-কলমে নবাগত হলেও মানসিকভাবে ছিল ভীষণ পরিপক্ব।

জামাইকার বিপক্ষে প্রথম ম্যাচেই মারিও স্তানিচের গোলে এগিয়ে যায় ক্রোয়েশিয়া। জামাইকা সমতা ফেরালেও প্রোসিনেস্কি আর ডেভর সুকারের গোলে ৩-১ ব্যবধানের সহজ জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে ক্রোয়াটরা। জাপানের বিরুদ্ধে পরের ম্যাচেও সুকারের শিকারি সুলভ গোলে জয় নিশ্চিত করে এক ম্যাচ বাকি থাকতেই নকআউটের টিকিট কাটে তারা।

১৯৯৮ বিশ্বকাপের গোল্ডেন ব্লেড বা ধারালো তলোয়ার ছিলেন ডেভর সুকার। রোনালদোর মতো বিধ্বংসী গতি বা জিদানের মতো রাজকীয় ড্রিবলিং হয়তো তার ছিল না। তার ক্ষমতা ছিল অন্য জায়গায়। তিনি ছিলেন পেনাল্টি বক্সের এক চতুর শিকারি, যিনি প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডাররা বিপদ টের পাওয়ার আগেই ফাঁকা জায়গা খুঁজে নিতেন। তার বাম পা থেকে বের হওয়া শটগুলো ছিল শীতল অথচ নিখুঁত। 

রাউন্ড অব ১৬-এ রোমানিয়ার বিরুদ্ধে পেনাল্টি থেকে গোল করেন সুকার। কিন্তু বোবান আগেই ডি-বক্সে ঢুকে পড়ায় রেফারি আবার পেনাল্টি নেওয়ার নির্দেশ দেন। একই চাপ, একই পরিস্থিতি—কিন্তু সুকারের স্নায়ু ইস্পাতের মতো শক্ত। দ্বিতীয়বারও একই ঠাণ্ডা মাথায় বল জালে জড়িয়ে ক্রোয়েশিয়াকে নিয়ে যান কোয়ার্টার ফাইনালে।

সুকার তখন কেবল গোল্ডেন বুটের পেছনে ছুটছিলেন না, তিনি আসলে বিশ্বমঞ্চে ক্রোয়েশিয়ার অস্তিত্বের সিলমোহর এঁকে দিচ্ছিলেন প্রতিটা গোলে।

কোয়ার্টার ফাইনালের মঞ্চটা ছিল এক আবেগঘন প্রতিশোধের মঞ্চ। প্রতিপক্ষ সেই জার্মানি, যারা দুই বছর আগে ইউরো থেকে তাদের বিদায় করেছিল। স্তিমাচ পরবর্তীতে বলেছিলেন, ম্যাচের আগে তিনি জানতেন ক্রোয়েশিয়া কোনোভাবেই হারবে না, কারণ ইউরোর সেই হারের কষ্টটা তাদের ভেতরে বারুদের মতো জ্বলছিল।

সুকারকে ফাউল করে ক্রিশ্চিয়ান ওয়ার্নস লাল কার্ড দেখলে ১০ জনের দলে পরিণত হয় জার্মানি। এরপর শুরু হয় ক্রোয়াটদের তাণ্ডব। রবার্ট জার্নির বুলেট গতির শটে প্রথম গোল, এরপর গোরান ভ্লাওভিচের দূরপাল্লার শটে আরেক গোল। আর ম্যাচের শেষলগ্নে ডিফেন্ডারদের নাচিয়ে নিজের দুর্বল ডান পা দিয়ে সুকার যখন জার্মানির কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকলেন, স্কোরবোর্ড বলছিল— ক্রোয়েশিয়া ৩ - ০ জার্মানি।

বিশ্বকাপের ইতিহাসের অন্যতম স্তব্ধ করে দেওয়া এক ফলাফল! ইউরোপের অন্যতম সেরা পরাশক্তিকে স্রেফ খড়কুটোর মতো উড়িয়ে দিল এক নবাগত দেশ! সুকার পরবর্তীতে একে তার ক্যারিয়ারের সেরা গোল বলে আখ্যা দেন। কিছু গোল কেবল ম্যাচের ভাগ্য বদলায়, আর কিছু গোল বদলে দেয় একটা দেশের প্রতি পুরো পৃথিবীর দেখার দৃষ্টিভঙ্গি। সেই রাতে ক্রোয়েশিয়াকে অবজ্ঞা করার ক্ষমতা আর কারো ছিল না।
সেমিফাইনালে স্তাদ দে ফ্রান্সে স্বাগতিক ফ্রান্সের মুখোমুখি ক্রোয়েশিয়া। দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই ফরাসি ডিফেন্স ভেঙে ফ্যাবিয়ান বার্থেজকে পরাস্ত করে বল জালে জড়ান ডেভর সুকার। ক্রোয়েশিয়া ১-০ গোলে এগিয়ে! পুরো প্যারিস শহর এক মুহূর্তের জন্য যেন কবরস্থানের মতো স্তব্ধ হয়ে গেল। জিদান, দেশমদের ফ্রান্স তখন ঘরের মাঠে বিদায়ের শঙ্কায়। ক্রোয়েশিয়া তখন বিশ্বকাপের ফাইনাল থেকে মাত্র ৪৫ মিনিট দূরে!

বিলিচ পরবর্তীতে সেই নীরবতার কথা স্মরণ করে বলেছিলেন, তারা যদি আর ১০টা মিনিট ফ্রান্সকে আটকে রাখতে পারতেন, তবে সুকার কাউন্টার অ্যাটাকে আরেকটা গোল করে ম্যাচটা ওখানেই শেষ করে দিতে পারতেন। কিন্তু ফুটবল বড় নিষ্ঠুর।

গোলের মাত্র এক মিনিটের মাথায় ফরাসি রাইট-ব্যাক লিলিঁ থুরাম সমতা ফেরান। আর ম্যাচের শেষ দিকে সেই থুরামই দূরপাল্লার এক বাঁকানো শটে ফ্রান্সকে ২-১ গোলে এগিয়ে নেন—যা ছিল তার পুরো আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের একমাত্র জোড়া গোলের রেকর্ড! এক ডিফেন্ডারের অবিশ্বাস্য জাদুতে ভেঙে চূর্ণ হয়ে গেল ক্রোয়েশিয়ার রূপকথা।

পরাজয়ে কোনো লজ্জা ছিল না, কিন্তু বুকে ছিল তীব্র কষ্ট। ট্রফিটা এত কাছে ছিল যে, ছোঁয়া যাচ্ছিল প্রায়! ফ্রান্স পরবর্তীতে ব্রাজিলকে ফাইনালে গুঁড়িয়ে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়, কিন্তু ফুটবলপ্রেমীদের মনের মণিকোঠায় জমা ছিল ক্রোয়াটদের বীরত্বগাথা। 

ক্রোয়েশিয়ার তখনও একটা ম্যাচ বাকি ছিল—নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচ।

অনেক দলই এই ম্যাচটিকে স্রেফ একটা আনুষ্ঠানিকতা মনে করে গা-ছাড়া ভাব দেখায়। কিন্তু ক্রোয়েশিয়ার কাছে এই ম্যাচের গুরুত্ব ছিল ফাইনালের মতোই। প্রথম বিশ্বকাপেই পোডিয়ামে দাঁড়িয়ে মেডেল নেওয়াটা তাদের দেশের ইতিহাসের জন্য ছিল ভীষণ জরুরি।

প্রোসিনেস্কির গোলে ক্রোয়েশিয়া এগিয়ে যাওয়ার পর জেন্দেন ডাচদের সমতায় ফেরান। কিন্তু প্রথমার্ধ শেষ হওয়ার আগেই সুকারের সেই ট্রেডমার্ক ফিনিশিংয়ে ২-১ গোলের জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে ক্রোয়েশিয়া।

এই এক গোল ক্রোয়েশিয়াকে এনে দেয় বিশ্বকাপের তৃতীয় স্থান (ব্রোঞ্জ মেডেল) আর সুকার জেতেন টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতার পুরস্কার ‘গোল্ডেন বুট’ (৬ গোল)। সেই সঙ্গে সিলভার বল জিতে আসরের অন্যতম সেরা তারকা হিসেবে নিজের নাম অমর করে রাখেন তিনি। যুদ্ধবিধ্বস্ত, সদ্য স্বাধীন আর গর্বিত একটা দেশের জন্য এই ব্রোঞ্জ মেডেলটাই ছিল আস্ত একটা ইতিহাস!

১৯৯৮ সালের ক্রোয়েশিয়ার লিগ্যাসি কেবল সুকারের গোল কিংবা বোবানের লিডারশিপেই শেষ হয়ে যায়নি। ওটা ছিল আসলে এক মজবুত ভিত্তিপ্রস্তর।

দীর্ঘ ২০ বছর পর, ২০১৮ সালে রাশিয়া বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠেছিল ক্রোয়েশিয়া। লুকা মদ্রিচ, ইভান রাকিটিচ, মারিও মানজুকিচরা ছিলেন এক নতুন ক্রোয়েশিয়ার প্রতিনিধি, যারা আধুনিক ফুটবলের গতি আর গ্ল্যামারে বেড়ে উঠেছেন। কিন্তু প্রতিটি ম্যাচ জয়ের পর মদ্রিচরা বারবার ফিরে যেতেন ১৯৯৬ আর ১৯৯৮ সালের সেই অগ্রজদের কাছে। 

মদ্রিচ-রাকিটিচদের হাঁটার জন্য সেই রাজপথটা তৈরি করে দিয়েছিলেন সুকার-বোবানরাই।

পরবর্তীতে স্তিমাচ আর বিলিচ দুজনেই ক্রোয়েশিয়ার কোচের দায়িত্ব পালন করেছেন এবং মদ্রিচদের গড়ে তুলেছেন। তরুণদের চোখে তারা সেই প্রথম প্রজন্মের বীরদের জন্য গভীর শ্রদ্ধা দেখতেন। লুকা মদ্রিচ যখন ২০১৮ সালে ব্যালন ডি’অর জেতেন, তিনি মঞ্চে দাঁড়িয়ে তার এই পুরস্কার উৎসর্গ করেছিলেন ১৯৯৮ সালের সেই নায়কদের প্রতি।

একটি ফুটবল জাতি এভাবেই গড়ে ওঠে। কেবল একাডেমি আর আধুনিক ট্যাকটিক্স দিয়ে নয়, বরং স্মৃতির কোলাজ দিয়ে। এক প্রজন্ম রক্ত ঝরায়, কষ্ট সহ্য করে দরোজাটা খুলে দেয়; আর পরের প্রজন্ম সেই দরোজা দিয়ে রাজকীয় ভঙ্গিতে ভেতরে প্রবেশ করে।

১৯৯৮ সালে ফ্রান্স হয়তো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছিল, কিন্তু ফুটবল রোমান্টিকতার ইতিহাসে ক্রোয়েশিয়া হয়ে গিয়েছিল চিরকালের জন্য ‘অমর’!