দীর্ঘ ২৪ বছরের অপেক্ষা ঘুচেছে। ২০০২ সালে জাপান-দক্ষিণ কোরিয়া বিশ্বকাপে চমক দেখিয়ে তৃতীয় হয়েছিল যে দলটি, সেই তুরস্ক দীর্ঘ বিরতির পর অবশেষে আবারও বিশ্বমঞ্চে। রোমানিয়া ও কসোভোকে প্লে-অফে হারিয়ে যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডার যৌথ আয়োজনের বিশ্বকাপে জায়গা করে নিয়েছে তারা।
ফুটবলপাড়ায় প্রতি বড় টুর্নামেন্টেই তুরস্কের গায়ে সেঁটে দেওয়া হয় ‘ডার্ক হর্স’ তকমা। তবে ইতালিয়ান কোচ ভিনসেনজো মন্তেল্লার অধীনে এবার তারা স্রেফ কালো ঘোড়া হয়ে থাকতে রাজি নয়। কারণ, তুর্কি ডাগআউটে এবার আছেন এমন দুই ‘তরুণ সিংহ’, যারা একাই প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগ চুরমার করে দিতে পারেন। তারা আর কেউ নন—আর্দা গুলের এবং কেনান ইলদিজ।
দুজনেরই বয়স ২১ বছর। ২০২৪ ইউরোতে টিনএজার হিসেবে কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার পেছনে ভূমিকা রাখলেও, এবারের ক্লাব মৌসুমে নিজেদের অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন এই দুই তারকা।
রিয়াল মাদ্রিদে প্রথম মৌসুমে বেঞ্চে বসে ধৈর্য ধরতে হয়েছিল গুলেরকে। তবে ২০২৫-২৬ মৌসুমে এসে তার সেই ধৈর্যের ফল মিলেছে হাতেনাতে। গত মৌসুমে যেখানে মাত্র ১৮ ম্যাচে শুরুর একাদশে ছিলেন, সেখানে এবার রিয়ালের হয়ে ৪০টি ম্যাচে স্টার্টার হিসেবে মাঠে নেমেছেন তিনি। মৌসুমের মাঝামাঝি সময়ে (জানুয়ারিতে) কোচ চাবি আলোনসো রিয়াল ছাড়লেও, নতুন কোচ আলভারো আরবেলোয়ার অধীনেও নিজের জায়গা ধরে রাখেন গুলের।
সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে এই মৌসুমে ৫১ ম্যাচে ২০টি গোল কন্ট্রিবিউশন (৬ গোল ও ১৪ অ্যাসিস্ট) করেছেন এই তুর্কি সেনসেশন। শুধু তাই নয়, গুলের দেখিয়েছেন দূরপাল্লার শটেও তিনি কতটা নিখুঁত। মার্চে এলচের বিপক্ষে মাঝমাঠের দূর থেকে অবিশ্বাস্য এক গোল করার পর, এপ্রিলে বায়ার্ন মিউনিখের বিপক্ষে চ্যাম্পিয়ন্স লিগের কোয়ার্টার ফাইনালের দ্বিতীয় লেগে মাত্র ৩৫ সেকেন্ডের মাথায় বক্সের বাইরে থেকে গোল করেন তিনি। পরে সেই ম্যাচেই কিংবদন্তি গোলরক্ষক ম্যানুয়েল ন্যুয়ারকে পরাস্ত করে এক দারুণ ফ্রি-কিক গোলও করেন তিনি।
লা লিগায় ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের সমান সর্বোচ্চ ৭০টি সুযোগ তৈরি করেছেন গুলের, আর ৯টি অ্যাসিস্ট নিয়ে তিনিই দলের সেরা জোগানদাতা। চ্যাম্পিয়ন্স লিগে ডিফেন্সিভ লাইন ভেঙে পাস দেওয়ার ক্ষেত্রে জোশুয়া কিমিচ (২২) ও লামিন ইয়ামালের (১৭) পরেই ছিল গুলেরের অবস্থান (১৬টি পাস)। তার বাঁ পায়ের জাদুতে এবার বুঁদ হতে পারে বিশ্বকাপ।
এদিকে তুরিনোর ‘তুর্কি স্টার’ কেনান ইলদিজ। নামের অর্থ ‘তারকা’, আর মাঠেও ঠিক তারকার মতোই দ্যুতি ছড়াচ্ছেন জুভেন্টাসের কেনান ইলদিজ। গুলের যেখানে বাঁ পায়ে অতিমাত্রায় নির্ভরশীল, ইলদিজ সেখানে দুই পায়েই সমান পারদর্শী।
২০২৫-২৬ মৌসুমে জুভেন্টাসের হয়ে সব মিলিয়ে ২০টি গোল কন্ট্রিবিউশন (১১ গোল ও ৯ অ্যাসিস্ট) করেছেন তিনি। ইতালিয়ান সিরি-আ’র প্রথম ১৫ ম্যাচে ৫ গোল করে জুভেন্টাসের হয়ে ইতিহাস গড়েছেন, যা গত ৫০ বছরে ক্লাবটির হয়ে ২১ বছর বয়সের আগে করতে পেরেছিলেন কেবল ইলদিজের শৈশবের নায়ক আলেসান্দ্রো দেল পিয়েরো।
এছাড়া প্রথম বিদেশি অনুর্ধ্ব-২১ খেলোয়াড় হিসেবে জুভেন্টাসের হয়ে এক মৌসুমে দুই অঙ্কের ঘরের গোল ছোঁয়ার অনন্য রেকর্ডও গড়েছেন তিনি।
ড্রিবলিং আর ওয়ান-অন-ওয়ান পজিশনে ইলদিজ কতটা ভয়ঙ্কর, তা নিয়ে কোচ মন্তেল্লা বলেন, ‘ওকে মাঠ থেকে তোলাই যায় না। ও সবার আগে অনুশীলনে আসে। ওয়ান-অন-ওয়ানে ও বিধ্বংসী, প্রতিপক্ষ ওর থেকে বল কাড়তেই পারে না।’
ইউরোপের শীর্ষ ৫ লিগের মধ্যে মাইকেল অলিসের (৭৯) পর ইলদিজই সবচেয়ে বেশি সুযোগ তৈরি করেছেন (৭৬টি)। উইং ধরে তার গতি এবং ড্রিবলিং (৭৮টি সফল ড্রিবল) প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারদের জন্য দুঃস্বপ্ন হতে বাধ্য।
বিশ্বকাপ বাছাইপর্বেও এই দুই তরুণের পারফরম্যান্স ছিল চোখে পড়ার মতো। ওপেন প্লে থেকে দলের হয়ে সর্বোচ্চ ১২টি সুযোগ তৈরি করেছেন ইলদিজ, আর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৯টি করেছেন গুলের। বাছাইপর্বে ইলদিজের পা থেকে এসেছে ৩টি গোল, আর গুলেরের ৪টি অ্যাসিস্ট ছিল দলের যৌথ সর্বোচ্চ।
তুরস্ক দলে হয়তো এই মুহূর্তে বিশ্বমানের কোনো স্ট্রাইকার বা ‘নাম্বার নাইন’ নেই। তবে মন্তেল্লার ৪-৩-৩ ফর্মেশনে দুই উইঙ্গে যখন আরদা গুলের এবং কেনান ইলদিজ থাকবেন, তখন স্ট্রাইকার পজিশনে যেই খেলুন না কেন, বলের জোগান নিয়ে ভাবতেই হবে না।
যদিও ইলদিজের সাম্প্রতিক ইনজুরি ও উত্তর মেসিডোনিয়ার বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচে না খেলা কিছুটা উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে, তবে কোচ মন্তেল্লা আশাবাদী বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচ থেকেই এই তারকাকে পাওয়া যাবে। গ্রুপ পর্বে তাদের প্রতিপক্ষ অস্ট্রেলিয়া, প্যারাগুয়ে এবং স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্র। শক্তির বিচারে এই গ্রুপ থেকে নক-আউট পর্বে যাওয়া তুরস্কের জন্য খুব একটা কঠিন হওয়ার কথা নয়।






