ফিফা বিশ্বকাপ শেষ হতেই ফুটবলের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ব্যক্তিগত পুরস্কার ব্যালন ডি’অর ঘিরে আবারো জোর আলোচনা শুরু হয়েছে। ২০২৫-২৬ মৌসুমে ক্লাব ও জাতীয় দলের পারফরম্যান্স বিবেচনায় কে জিততে পারেন এই সম্মাননা, তা নিয়ে চলছে নানা হিসাব-নিকাশ। ইতিহাস বলছে, বিশ্বকাপের বছরে ব্যালন ডি’অরের ভাগ্য অনেকটাই নির্ধারণ করে দেয় এই আসরের পারফরম্যান্স।
২০০৬ সালে ইতালিকে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন করে রক্ষণভাগের খেলোয়াড় হয়েও ব্যালন ডি’অর জিতেছিলেন ফাবিও কানাভারো। ২০১৮ সালে ক্রোয়েশিয়াকে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের ফাইনালে তুলে সেই খেতাব নিজের করে নিয়েছিলেন লুকা মদরিচ। আর ২০২২ সালে কাতার বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনাকে শিরোপা জেতানোর পর লিওনেল মেসির হাতে অষ্টম ব্যালন ডি’অর ওঠা যেন প্রত্যাশিতই ছিল।
কিন্তু ২০২৬ বিশ্বকাপের পর দৃশ্যপটটা একেবারেই আলাদা। স্পেন বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হলেও এবার এমন কোনো ফুটবলার নেই, যাকে নিঃসন্দেহে ব্যালন ডি’অরের একমাত্র দাবিদার বলা যায়। অনেকে ক্লাব ফুটবলে ছিলেন দুর্দান্ত, কিন্তু জাতীয় দলের হয়ে কাক্সিক্ষত সাফল্য পাননি। আবার কেউ বিশ্বকাপে আলো ছড়িয়েছেন, কিন্তু ক্লাবের পারফরম্যান্সে পিছিয়ে পড়েছেন।
এই অনিশ্চিত লড়াইয়ের মাঝেই ক্রীড়া বিষয়ক স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম ডিএজেডএন প্রকাশ করেছে ব্যালন ডি’অরের শীর্ষ পাঁচ প্রতিযোগীর পাওয়ার র্যাংকিং।
১. হ্যারি কেইন (বায়ার্ন মিউনিখ ও ইংল্যান্ড)
বিশ্বকাপ ট্রফি না জিতলেও পুরো মৌসুমে ধারাবাহিকতার প্রতীক ছিলেন হ্যারি কেইন। ইংল্যান্ডকে বিশ্বকাপে তৃতীয় সেরা দল বানানোর পথে করেছেন ৬ গোল। বায়ার্ন মিউনিখের হয়ে বুন্দেসলিগার শিরোপাও জিতেছেন কেইন। তার সবচেয়ে বড় শক্তি ক্লাব ও জাতীয় দল মিলিয়ে এক মৌসুমে করা অবিশ্বাস্য ৭০ গোল। ডিএজেডএনের তালিকায় সবার ওপরে জায়গা পেয়েছেন ইংলিশ অধিনায়ক।
২. লামিনে ইয়ামাল (বার্সেলোনা ও স্পেন)
হ্যামস্ট্রিং চোট কাটিয়ে বিশ্বকাপে খেলতে নেমেছিলেন লামিনে ইয়ামাল। হয়তো ১০০% ফিট ছিলেন না, তবু স্পেনের বিশ্বজয়ের অন্যতম নায়ক হয়ে উঠেছেন। বার্সেলোনাকে লা লিগা শিরোপা জেতানোর পথে তার ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স ছিল অসাধারণ। বিশ্বকাপেও খুব বেশি গোল ও অ্যাসিস্ট করতে না পারলেও দারুণ খেলেছেন। বিশ্লেষকদের মতে, যদি টুর্নামেন্টের শেষ দিকে ক্লাব ফুটবলের মতো ধারাবাহিক আধিপত্য দেখাতে পারতেন, তাহলে হয়তো তিনিই থাকতেন ব্যালন ডি’অরের দৌড়ে এক নম্বরে।

৩. রদ্রি (ম্যানচেস্টার সিটি ও স্পেন)
ক্লাব পর্যায়ে কিছুটা ছন্দ হারালেও জাতীয় দলের হয়ে আবারো নিজের গুরুত্ব প্রমাণ করেছেন রদ্রি। স্পেনের মাঝমাঠকে নিখুঁতভাবে নিয়ন্ত্রণ করে দলকে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন করার পাশাপাশি জিতেছেন গোল্ডেন বল। বিশ্বকাপের এই ব্যক্তিগত পুরস্কার ব্যালন ডি’অরের ভোটে সবসময়ই বড় প্রভাব ফেলে। তাই বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন স্পেনের অধিনায়ককে এখনো শক্তিশালী দাবিদার হিসেবে দেখা হচ্ছে।
৪. কিলিয়ান এমবাপ্পে (রিয়াল মাদ্রিদ ও ফ্রান্স)
বিশ্বকাপে ১০ গোল করে গোল্ডেন বুট জিতেছেন এমবাপ্পে। এছাড়া বিশ্বকাপ ইতিহাসে লিওনেল মেসিকে পেছনে ফেলে সর্বোচ্চ গোলদাতার নতুন রেকর্ডও গড়েছেন তিনি। তবে ব্যালন ডি’অরের লড়াইয়ে তাকে পিছিয়ে দিয়েছে দলীয় সাফল্যের অভাব। রিয়াল মাদ্রিদ লা লিগা বা চ্যাম্পিয়নস লিগ—কোনোটিই জিততে পারেনি। অন্যদিকে শক্তিশালী ফ্রান্সও বিদায় নিয়েছে সেমিফাইনাল থেকে। ব্যক্তিগত রেকর্ড অসাধারণ হলেও গত মৌসুমে ট্রফিশূন্যতাই এমবাপ্পেকে চার নম্বরে রেখেছে।
৫. লিওনেল মেসি (ইন্টার মায়ামি ও আর্জেন্টিনা)
৩৯ বছর বয়সেও বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় মঞ্চে আর্জেন্টিনার প্রাণভোমরা ছিলেন মেসি। পুরো টুর্নামেন্টে ৮ গোল ও ৪ অ্যাসিস্ট করে দলকে টানা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের ফাইনালে তুলেছেন তিনি। তবে ফাইনালে স্পেনের বিপক্ষে নিজের সেরা ছন্দে ছিলেন না আর্জেন্টাইন অধিনায়ক। এ ছাড়া ইন্টার মায়ামির হয়ে দুর্দান্ত খেললেও তা ইউরোপীয় ক্লাব না হওয়া ব্যালন ডি’অরের ভোটে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে আরেকটি স্মরণীয় বিশ্বকাপ উপহার দিলেও রেকর্ড নবম ব্যালন ডি’অর জেতার পথ এবার মেসির জন্য কঠিন বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।




