দুঃখ ভারাক্রান্ত মন নিয়ে ধীর পায়ে হেঁটে গেলেন অগুস্তো বাতায়া। ট্রফিটা পাশেই রাখা ছিল। কিন্তু ব্রোঞ্জ ও রুপার মিশেলে বানানো ১১ কেজি ওজনের ট্রফিটার দিকে বাতায়া একটিবারও তাকানোর প্রয়োজন মনে করলেন না। তাকিয়েই বা কী হতো? ট্রফিটা যে ছোঁয়ার ‘অধিকার’ ছিল না!
দৃশ্যটা গতকাল রাতে জার্মানির লাইপজিগের রেল বুল অ্যারেনায় উয়েফা কনফারেন্স লিগ ফাইনাল শেষে পুরস্কার বিতরণীর মঞ্চের। আর্জেন্টাইন গোলরক্ষক বাতায়ার দল রায়ো ভায়েকানো দারুণ লড়াই করেও ১-০ গোলে হেরে গেছে ক্রিস্টাল প্যালেসের কাছে, যা লন্ডনের ক্লাবটিকে এনে দিয়েছে প্রথম মহাদেশীয় শিরোপার স্বাদ।
জয়সূচক একমাত্র গোল করায় স্বাভাবিকভাবেই বীরোচিত সংবর্ধনা পেতে চলেছেন প্যালেসের জ্যঁ-ফিলিপ মাতেতা। ২৮ বছর বয়সী এই স্ট্রাইকারকে বিশ্বকাপ স্কোয়াডেও রেখেছেন ফ্রান্সের কোচ দিদিয়ের দেশম।
কিন্তু সবাইকে ছাপিয়ে আলোচনায় ওই একটি নাম—অগুস্তো বাতায়া। ভায়েকানোর আর্জেন্টাইন এই গোলরক্ষক যে ফাইনালে হেরেও সবার মন জিতে নিয়েছেন!
কীভাবে?
সেটি জানতে ফাইনালের প্রথমার্ধে ফিরে যেতে হবে। ম্যাচের তখন ৩৫ মিনিট চলছিল। স্টেডিয়ামে চরম উত্তেজনাপূর্ণ মুহূর্তে বাতায়া হঠাৎ লক্ষ করলেন, গ্যালারিতে ভায়েকানোর এক সমর্থক গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। তার দ্রুত চিকিৎসা দরকার।
বাস্তবতা অনুধাবন করতে পেরে বাতায়া এক সেকেন্ডও নষ্ট করেননি। খেলা চলাকালীন তিনি মাঠে বসে পড়ে চোট পাওয়ার ভান করেন এবং ইতালিয়ান রেফারি মরিৎসিও মারিয়ানিকে খেলা থামাতে জোরালো সংকেত দিতে থাকেন।
বাতায়ার এই তাৎক্ষণিক ও মরিয়া সংকেত রেফারি মারিয়ানির নজরে এলে তিনি সঙ্গে সঙ্গে খেলা থামিয়ে দেন। এরপর বাতায়া তাকে জানান, গ্যালারিতে এক দর্শক গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। এ কারণেই তিনি খেলা থামাতে চোটে পড়ার ভান করেন।
খেলা থামতেই চিকিৎসক দল ও নিরাপত্তাকর্মীরা দ্রুত গ্যালারির সেই অংশে ছুটে যান। স্টেডিয়ামজুড়ে তখন নীরবতা ও উদ্বেগ নেমে আসে। দুই দলের খেলোয়াড় ও কোচরা সাইডলাইনে দাঁড়িয়ে সর্বশেষ পরিস্থিতি জানার চেষ্টা করেন।
শেষ পর্যন্ত চিকিৎসক দল ওই দর্শককে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যান। এ সময় স্টেডিয়ামে উপস্থিত সবাই করতালি দিয়ে চিকিৎসক দলকে অভিনন্দন জানান। পরে জানা যায়, সেই দর্শক গ্যালারিতে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন। বাতায়ার এই অসাধারণ ক্রীড়াসুলভ আচরণ ও উপস্থিত বুদ্ধিমত্তা তার জীবন বাঁচিয়েছে।
এই তো গত ২০ মে চিড় ধরা আঙুল নিয়ে ফাইনাল খেলে অ্যাস্টন ভিলাকে উয়েফা ইউরোপা লিগের শিরোপা জেতাতে বড় অবদান রেখেছেন আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ জয়ী গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্তিনেজ। কাল ভায়েকানো জিতলে এক সপ্তাহের ব্যবধানে দ্বিতীয় আর্জেন্টাইন গোলরক্ষক হিসেবে আরেকটি মহাদেশীয় ট্রফির স্বাদ পেতেন বাতায়া। কিন্তু গত রাতে ট্রফি অন্যের হাতে উঠলেও বাতায়া জিতে নিয়েছেন কোটি কোটি ফুটবল ভক্তের হৃদয়।
ফাইনালের লড়াই শেষে কেউ ট্রফি নিয়ে হাসে, কেউবা চোখের জল ফেলে। কিন্তু বাতায়া কাল যা করেছেন, তা ট্রফি জয়ের চেয়ে বড় প্রাপ্তি হতে পারে না। মানুষ মানুষের জন্য—এই পরম সত্যটাই আবার জিতে গেছে লাইপজিগের সবুজ গালিচায়।
৩০ বছর বয়সী বাতায়া কখনো আর্জেন্টিনা জাতীয় দলে খেলেননি। কোচ লিওনেল স্কালোনি হয়তো তাকে বিশ্বকাপ স্কোয়াডেও রাখবেন না। কিন্তু এই মুহূর্তে তিনি বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম আলোচিত নাম।




