‘সারা জীবন আমি এই মুহূর্তের অপেক্ষায় ছিলাম, এই মুহূর্তেরই স্বপ্ন দেখেছিলাম’—ম্যাচ শেষে সাংবাদিকদের নিজের অনুভূতি জানাতে গিয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে বললেন ভোজিনিয়া।
কয়েক ঘণ্টা আগেও তিনি ফুটবল বিশ্বে ছিলেন অপরিচিত, নিজ দেশ কেপ ভার্দেতেও খুব বেশি মানুষ তাকে চিনতেন না।
কিন্তু এখন?
উত্তরটা দিলেন ব্রাজিলের সংবাদমাধ্যম কেজ টিভির এক নারী সাংবাদিক। ভোজিনিয়ার ইন্সটাগ্রাম পেজ ঘুরে ওই সাংবাদিক জানিয়ে দিলেন, স্পেনের বিপক্ষে ম্যাচ শুরুর আগে তার অনুসারী ছিল ৫০ হাজার, ম্যাচ শেষে অনুসারী সংখ্যা ১৬ লাখ এবং তা ঝড়ের বেগে বেড়ে চলেছে।
বলে রাখা ভালো, ভোজিনিয়ার ইন্সটাগ্রাম আইডির নাম জোসিমার দিয়াস। এটাই তার আসল নাম। পুরো নাম জোসিমার জোসে এভোরা দিয়াস। নামটা যত বড়ই হোক, এতক্ষণে অনেকে উইকিপিডিয়ায় সার্চ দিয়ে মুখস্ত করে ফেলেছেন।
এই যে ৪০ পেরোনো এক গোলকিপারকে নিয়ে হঠাৎ এত আলোচনা, অপরিচিত এক ব্যক্তি থেকে রাতারাতি ফুটবলপ্রেমীদের হৃদয়ে জায়গা করে নেওয়া, এটাই তো বিশ্বকাপের সৌন্দর্য!
তা বিশ্বকাপ অভিষেকেই কী এমন করেছেন ভোজিনিয়া? ‘বিশ্বকাপ শুরুর আগেই বিশ্বকাপ জিতে যাওয়ার’ হাইপ নিয়ে খেলতে নামা স্পেন গোলের উদ্দেশে শট নিয়েছিল ২৭টি। এর মধ্যে ৭টি ছিল লক্ষ্যে, যার সব কটি রুখে দিয়েছেন ভোজিনিয়া! শুধু বক্সের মধ্যেই সেভ ৬টি। এর মধ্যে ৩টি ঝাঁপিয়ে পড়ে, ৩টি লাফিয়ে উঠে।
ফেরান তোরেস, গাভি, পেদ্রি, মিকেল ওইয়ারজাবাল, ফাবিয়ান রুইজ, ব্যালন ডি’অর জয়ী রদ্রি এমনকি গোলের জন্য হন্যে হয়ে ওপরে উঠে খেলা মার্ক কুকেরেয়া—সবাই ভোজিনিয়ার সামনে ব্যর্থ।
বাধ্য হয়ে ‘আধা ফিট’ লামিনে ইয়ামালকে নামালেন স্প্যানিশ কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে। বেঞ্চ ছেড়ে নেমে পড়েছেন দানি ওলমো, নিকো উইলিয়ামস ও আর্সেনালের হয়ে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ জেতা মিকেল মেরিনোও। কিন্তু লাভ হয়নি।
স্প্যানিশদের সামনে একাই ঢাল হয়ে দাঁড়ালেন ভোজিনিয়া। অবিশ্বাস্যভাবে ম্যাচের ফল ০-০!
খুব অল্প শব্দে যদি তার পারফরম্যান্স নিয়ে কিছু বলতে চান, সেটি কী হতে পারে? ভোজিনিয়ার ভোজবাজি! কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম যে বিস্ময়ে ছেয়ে গেছে—গোলরক্ষক নাকি চীনের মহাপ্রাচীর?
ক্যারিয়ারের সায়াহ্নে অনেক আগেই পৌঁছে গেছেন ভোজিনিয়া। মানুষ যেহেতু আশায় বাঁচে, ভোজিনিয়াও বড় এক আশা নিয়ে ক্যারিয়ার টেনে নিয়ে যাচ্ছিলেন। বিশ্বকাপে খেলার আশা।
সেটা তো পূরণ হলোই। এখন তিনি সবচেয়ে বেশি বয়সী গোলকিপার হিসেবে বিশ্বকাপ অভিষেকেই ক্লিনশিটের রেকর্ড গড়লেন! সেটাও কি না সাবেক বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ও এবারের বিশ্বকাপে অন্যতম শিরোপাপ্রত্যাশী স্পেনের বিপক্ষে।
ভোজিনিয়া খেলছেন পর্তুগালের দ্বিতীয় বিভাগের ক্লাব শাভেসে। হয়তো এই ক্লাবের হয়েই গ্লাভস ও বুটজোড়া তুলে রাখবেন বলে মনস্থির করেছেন। দলবদলের বাজারেও তার তেমন দাম নেই। দলবদল বিশেষজ্ঞ ফাব্রিজিও রোমানো জানিয়ে দিলেন, ভোজিনিয়ার দাম সাকল্যে ৫০ হাজার ইউরো (৭১ লাখ ২৬ হাজার টাকা)।
কিন্তু স্পেনকে রুখে দেওয়ার পর ভোজিনিয়াকে নিয়ে অনেকে যেমন কৌতূহলী হয়ে উঠেছেন, তেমনি অখ্যাত ক্লাবের এই গোলকিপারকে নিয়ে নিশ্চয় বিখ্যাত ক্লাবগুলোরও আগ্রহ তৈরি হয়েছে! যদি ডাক পড়ে, নিজেকে মনে মনে কোথায় কল্পনা করবেন ভোজিনিয়া?
বড় ক্লাব থেকে যদি ডাক নাও পড়ে, তাহলেও কি কোনো ক্ষতির শঙ্কা আছে? আজ ম্যাচ শেষে সতীর্থ থেকে শুরু করে কোচিং স্টাফের সদস্যরা যেভাবে প্রটোকল দিয়ে তাকে মাঠের বাইরে নিয়ে গেলেন, তাতেই স্পষ্ট, তিনি এখন ভার্দের জাতীয় বীর।
ম্যাচ শেষে ভোজিনিয়া প্রথমবারের মতো আবেগতাড়িত হয়ে পড়েন কেপ ভার্দের কোচিং স্টাফের এক সদস্য তাকে জড়িয়ে ধরার পর। ম্যাচসেরার পুরস্কার নেওয়ার আগ পর্যন্তও তার দুই চোখ বেয়ে ঝরেছে আনন্দাশ্রু।
টিম হোটেলে ফেরার পর টিভিতে কিংবা নিজের মুঠোফোনে সেসব দুরন্ত-উড়ন্ত সেভের হাইলাইটস যদি দেখে থাকেন, তাহলে নিশ্চয় ভোজিনিয়া আবারো চোখে পানি ফেলেছেন! এই কান্না সুখের, এই কান্না গর্বের।




