ফুটবল ইতিহাসে এমন কিছু তারকা আছেন, যাদের নাম শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে জাদুকরী মুহূর্ত, অবিশ্বাস্য দক্ষতা আর কোটি ভক্তের আবেগ। নেইমার ঠিক তেমনই এক নাম। যার নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে অসাধারণ প্রতিভা, জাদুকরী ড্রিবল আর অসংখ্য স্মরণীয় মুহূর্ত। ক্লাব ফুটবলে অসংখ্য সাফল্য, দুর্দান্ত গোল, রঙিন ক্যারিয়ার—সবই আছে তার ঝুলিতে। কিন্তু বিশ্বকাপের মঞ্চ যেন বারবার নিষ্ঠুর হয়েছে এই ব্রাজিলিয়ান সুপারস্টারের প্রতি।
কখনো চোট, কখনো সমালোচনা, কখনো বা হৃদয়ভাঙা বিদায়। বিশ্বকাপ মঞ্চে নেইমারের গল্প যেন এক অসমাপ্ত নাটক। তাই ২০২৬ বিশ্বকাপকে ঘিরে নেইমার ভক্তদের প্রশ্ন একটাই, এবার কি অবশেষে নিজের অপূর্ণ স্বপ্ন পূরণ করতে পারবেন ব্রাজিলের পোস্টার বয়?
২০১০ : বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার আগেই হতাশা
তখনো কৈশোর পেরোনো তরুণ নেইমার। সান্তোসের জার্সিতে তার পায়ের জাদুতে মুগ্ধ পুরো ফুটবল বিশ্ব। ব্রাজিলজুড়ে শুরু হয়েছিল দাবি, বিশ্বকাপ দলে নিতে হবে নতুন এই বিস্ময়বালককে।
কিন্তু তৎকালীন কোচ দুঙ্গা সেই ঝুঁকি নেননি। ২০১০ বিশ্বকাপের চূড়ান্ত দলে জায়গা হয়নি নেইমারের। সিদ্ধান্তটি ব্রাজিলে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি করে। অনেকেই মনে করেন, সেখান থেকেই বিশ্বকাপের সঙ্গে নেইমারের বেদনাময় সম্পর্কের শুরু।
২০১৪ : স্বপ্নের মঞ্চেই দুঃস্বপ্ন
নিজেদের মাটিতে বিশ্বকাপ। কোটি ব্রাজিলিয়ান চোখে তখন একটাই স্বপ্ন, নেইমারের হাত ধরে হেক্সা জিতবে সেলেসাওরা। গ্রুপ পর্বে দুর্দান্ত ফুটবল খেলে সে ইঙ্গিত দিচ্ছিলেন তিনি।
ক্রোয়েশিয়া ও ক্যামেরুনের বিপক্ষে গোল করে দলকে টেনে নিচ্ছিলেন তিনি। কিন্তু কোয়ার্টার ফাইনালে কলম্বিয়ার বিপক্ষে আসে সেই ভয়াবহ মুহূর্ত।
ক্যামিলো জুনিগার হাঁটুর আঘাতে মেরুদণ্ডে গুরুতর চোট পান নেইমার। মুহূর্তেই শেষ হয়ে যায় তার বিশ্বকাপ। পরে নিজেই জানান, কয়েক সেন্টিমিটারের জন্য প্যারালাইসড হওয়া থেকে বেঁচে গিয়েছিলেন।
নেইমারহীন ব্রাজিল এরপর সেমিফাইনালে জার্মানির কাছে ৭-১ গোলের লজ্জাজনক হার দেখে। সেই রাত এখনো ব্রাজিল ফুটবলের সবচেয়ে বেদনাদায়ক স্মৃতিগুলোর একটি।
২০১৮ : মাঠের লড়াই থেকে ‘মিম’ হওয়া
রাশিয়া বিশ্বকাপে নেইমার ছিলেন বিশ্বের সবচেয়ে দামি ফুটবলার। পিএসজিতে যোগ দিয়ে তখন তিনি ক্যারিয়ারের শীর্ষে।
কিন্তু মাঠে প্রতিপক্ষের কঠিন ট্যাকল যেমন ছিল, তেমনি ছিল সমালোচনার ঝড়ও। বিশেষ করে মেক্সিকো ম্যাচে ফাউলের পর তার নাটকীয় প্রতিক্রিয়া সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যায়।
ফুটবল ছাড়িয়ে তিনি হয়ে ওঠেন ‘মিম কালচার’-এর অংশ। অথচ সেই বিশ্বকাপেও গোল করেছিলেন, দলকে এগিয়ে নিয়েছিলেন। কিন্তু কোয়ার্টার ফাইনালে বেলজিয়ামের বিপক্ষে হারের পর আবারও অপূর্ণ থেকে যায় ব্রাজিলিয়ানদের স্বপ্ন।
২০২২ : কান্না, নীরবতা আর অসমাপ্ত প্রতিশোধ
কাতার বিশ্বকাপ ছিল হয়তো নেইমারের সবচেয়ে আবেগঘন বিশ্বকাপ। প্রথম ম্যাচেই সার্বিয়ার বিপক্ষে একের পর এক ট্যাকলের শিকার হয়ে গোড়ালিতে চোট পান তিনি।
গ্রুপ পর্বের বাকি ম্যাচ মিস করলেও নকআউটে ফিরে দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে গোল করেন। পুরো ব্রাজিল তখন আবার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে।
কোয়ার্টার ফাইনালে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে অতিরিক্ত সময়ে দুর্দান্ত এক গোল করে দলকে এগিয়ে দিয়েছিলেন নেইমার। মনে হচ্ছিল, এবার বুঝি সব বদলে যাবে।
কিন্তু শেষ মুহূর্তে গোল হজম করে ম্যাচ গড়ায় টাইব্রেকারে। সেখানে ব্রাজিল হেরে যায় নেইমারের শট নেওয়ার আগেই। মাঠে বসে কান্নায় ভেঙে পড়া নেইমারের ছবি হয়ে ওঠে পুরো টুর্নামেন্টের সবচেয়ে আবেগী দৃশ্যগুলোর একটি।
২০২৬ : মুক্তির শেষ মঞ্চ?
এবারের বিশ্বকাপ হয়তো নেইমারের শেষ সুযোগ। বয়স বেড়েছে, চোটের ইতিহাস দীর্ঘ হয়েছে, ফর্ম নিয়েও প্রশ্ন আছে। তবু কোচ কার্লো আনচেলত্তি এখনো বিশ্বাস করেন, বড় মঞ্চে পার্থক্য গড়ে দিতে পারেন নেইমারই।
যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোতে হতে যাওয়া এই বিশ্বকাপ তাই শুধু আরেকটি টুর্নামেন্ট নয়। এটি নেইমারের জন্য নিজের গল্প নতুন করে লেখার শেষ সুযোগ।
হয়তো ২০২৬-এই শেষবারের মতো বিশ্বকাপ ট্রফির দিকে তাকিয়ে হাসবেন নেইমার। আর যদি সেটি সত্যি হয়, তবে এত বছরের সব কান্না, সব ব্যর্থতা আর সব আক্ষেপ হয়তো এক মুহূর্তেই ইতিহাস হয়ে যাবে।