• ই-পেপার

তিস্তা ও নদী ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ-চীন ঐকমত্য

ইউনূস, ইয়াজিদ ও হোসাইনি ব্রাহ্মণ

সুমন পালিত
ইউনূস, ইয়াজিদ ও হোসাইনি ব্রাহ্মণ

ড. মুহাম্মদ ইউনূসের ৮৬তম জন্মবার্ষিকী ছিল গত ২৮ জুন। তার আগের দিনটি ছিল ১০ মহররম। ইয়াজিদ বিন মুয়াবিয়ার লেলিয়ে দেওয়া বাহিনীর হাতে মহানবী (সা.)-এর প্রিয় নাতি হোসাইন (রা.) এবং তাঁর পরিবারপরিজন ও অনুসারীদের শাহাদতবরণের দিন। আহলে বায়াত বা নবী বংশ নিধন শুধু নয়, পবিত্র কাবাঘরে হামলা ও অগ্নিসংযোগও করে ইয়াজিদের শিষ্যরা। হজরত আলী (রা.)-এর বংশধর বা আহলে বায়াতের বিরুদ্ধে ৫৯ বছর ধরে জুমার খুতবায় অভিশাপ দেওয়ার বিধান জারি রাখে উমাইয়া শাসকরা। রসুল (সা.)-এর খেজুরবাগানও তাঁর পরিবারের কাছ থেকে কেড়ে নেওয়ার ধৃষ্টতা দেখায় তারা।

দুর্নীতির বিরুদ্ধে সারা দুনিয়ায় সক্রিয় সংগঠনের নাম ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল। যারা বাংলাদেশকে পাঁচবার বিশ্বসেরা দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এ সংগঠনের বাংলাদেশ শাখা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ। সংক্ষেপে টিআইবি। টিআইবি সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা নোবেল লরিয়েট ড. ইউনূসের ৮৬তম জন্মবার্ষিকীর প্রাক্কালে এক প্রতিবেদনে যে তথ্য হাজির করেছে তা হাটে হাঁড়ি ভেঙে দেওয়ার মতো। প্রতিবেদনে বলা হয়, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ঘুষের লেনদেন আগের চেয়ে প্রায় ১৬ শতাংশ বেড়েছে। ইউনূসী ‘সুশাসনে’ দেশে ঘুষ লেনদেন হয়েছে প্রায় সাড়ে ১৬ হাজার কোটি টাকা।

বলা হতো, আওয়ামী লীগ আর দুর্নীতি সমার্থক কথা। আওয়ামী আমলে দেশ দুর্নীতির স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়। কিন্তু ইউনূসের মতো সাধুসজ্জনের আমলে দুর্নীতি বাড়ে কীভাবে? ঘুষের লেনদেন বছর না ঘুরতেই ১৬ শতাংশ বৃদ্ধি পাওয়া তো কোনো চাট্টিখানি কথা নয়। সবারই জানা সংস্কারের ডুগডুগি বাজিয়ে ক্ষমতায় বসে ইউনূস সরকার। অথচ পুরোটা সময় নিজেদের আখের গোছাতেই ব্যস্ত ছিল তারা। আওয়ামী আমলে বছরে ঘুষের পরিমাণ ছিল ১০ হাজার ৯০২ কোটি টাকা। কিন্তু দুর্নীতির বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করা অন্তর্বর্তী আমলে তা বেড়ে ১২ হাজার ৬৩৩ কোটি টাকায় পৌঁছে।

ইউনূসী আমলে ‘এলোমেলো করে দে মা লুটেপুটে খাই’ বাংলা প্রবাদকে সর্বস্তরে নীতিবাক্য হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছিল। দুনিয়াজুড়ে ইহুদিদের পরিচিতি কুসিদজীবী হিসেবে। বাংলাদেশের নাগরিকদের মধ্যে খাতাকলমে একজনও ইহুদি নেই। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের কোনো আদমশুমারিতে কেউ নিজেকে ইহুদি বলে দাবি করেনি। তবে এ দেশে শত বছর আগেও ছিল অসংখ্য কুসিদজীবী। বাঙালি কৃষকের বেশির ভাগই ছিল মহাজন নামের নিষ্ঠুর শোষকদের জালে বাঁধা। শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক আমাদের পূর্বপুরুষদের সুদখোর নব্য ইহুদিদের হাত থেকে বাঁচাতে ঋণ সালিশি বোর্ড গঠন করেন। মহাজনদের গোলামি থেকে মুক্তি পায় লাখ লাখ মানুষ। যে মহান নেতার প্রতি আমাদের কৃতজ্ঞতার শেষ নেই।

জুলাই অভ্যুত্থানের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত হয় অন্তর্বর্তী প্রশাসন। আপদমস্তক সুশীল সরকার। নিজেদের সততার প্রতিবিম্ব প্রমাণে তারা ছিল সর্বদাই সোচ্চার। কিন্তু ওয়ান-ইলেভেনের মতো ইউনূসী আমলেও সুশীলদের আসল চেহারা স্পষ্ট হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে দেশে ঘুষের লেনদেন কমার বদলে হু হু করে বেড়ে যায়। ২০২৪ সালের জুলাই গণ অভ্যুত্থানের সুযোগে যে সজ্জনবেশি অন্তর্বর্তী সরকার জাতির ঘাড়ে চেপে বসে তারা আইয়ামে জাহেলিয়াতকেও হার মানায়। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় তারা মবতন্ত্রকে প্রশ্রয় দেয়। লুটপাটের মাত্রায় দেশের অর্থনীতি ভেঙে পড়ে। ইতোমধ্যে টিআইবির প্রতিবেদনের উদ্ধৃতি দিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সংসদে বলেছেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সর্বোচ্চ দুর্নীতি হয়েছে। যা তদন্ত হওয়া দরকার।’ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আওয়ামী সরকারের প্রাতিষ্ঠানিক লুটপাট ও অর্থ পাচারের তীব্র সমালোচনার পাশাপাশি অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসের যাবতীয় কর্মকাণ্ডের ওপর দুর্নীতি দমন কমিশনকে তদন্তের নির্দেশ দিতে প্রধানমন্ত্রীকে অনুরোধ করেছেন। বলেছেন, তদন্ত প্রতিবেদন জাতির সামনে প্রকাশ করাও উচিত।

শুধু ঘুষ লেনদেন নয়, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ও উপদেষ্টারা দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতির যে রেকর্ড গড়েছেন তার কোনো তুলনা নেই। ১৮ মাসে ধর্ম উপদেষ্টা ৮২ লাখ টাকা উড়িয়েছেন চিকিৎসা খাতে। উপদেষ্টাদের অনেকেই এ ক্ষেত্রে পিছিয়ে ছিলেন না। প্রধান উপদেষ্টা নিজের ট্যাক্স মওকুফ ও ব্যবসা বাগানোর কাজে ব্যস্ত ছিলেন ১৮ মাস। যার তদন্ত এখন সময়ের দাবি।

॥ দুই ॥

ইসরায়েলের আপত্তি সত্ত্বেও ইরানের সঙ্গে মহররম মাসে চুক্তিতে আবদ্ধ হয়েছে আমেরিকা। ইরানিদের দাবি তারা প্রমাণ করেছে ইমানের জোর থাকলে কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা যায়। প্রশ্ন উঠেছে এ চুক্তি কি ইসরায়েলের পতনের আলামত? ধর যাক মোঙ্গলদের কথা। চীনের পাশের দেশ মোঙ্গলিয়া। ইতিহাসে যে দেশের অধিবাসীদের পরিচয় মোঙ্গল নামে । একসময় মোঙ্গলরা ছিল সারা দুনিয়ার ত্রাস। চেঙ্গিস খানের নেতৃত্বে দুনিয়ার এক বড় অংশ তাদের পদানত হয়। এশিয়া ও ইউরোপের ২ কোটি ৮০ লাখ বর্গকিলোমিটার এলাকা নিয়ে গড়ে ওঠে মোঙ্গল সাম্রাজ্য। চেঙ্গিস বাহিনীর পদানত হয় বিশাল চীনা সাম্রাজ্য। আব্বাসীয় খেলাফতের পতনও ঘটে মোঙ্গলদের হাতে। চেঙ্গিস খানের পৌত্র হালাকু খান আব্বাসীয়দের রাজধানী বাগদাদ অবরোধ করেন। দুই মাস পর খলিফা মুস্তাসিম নিজের ও পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তার আশ্বাসে আত্মসমর্পণে রাজি হন। হালাকু খান তার বাহিনী নিয়ে বাগদাদে প্রবেশ করেই রক্তের বন্যা বইয়ে দেন। লাখো মানুষ প্রাণ হারায় মোঙ্গলদের হাতে। রক্ষা পাননি খলিফা এবং তাঁর পরিবারপরিজনরা। হালাকু বাহিনীর হাতে বিধ্বস্ত হয় দুনিয়ার সবচেয়ে সমৃদ্ধ নগরী বাগদাদ। মোঙ্গলদের সে দাপটও চিরস্থায়ী হয়নি। একসময় তাদের পতন অনিবার্য হয়ে দাঁড়ায়। যে চীন ছিল মোঙ্গলদের পদানত, সে মোঙ্গলরা আজ নিজেরাই অসহায়।  

আধুনিক যুগে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিস্তার ঘটেছিল দুনিয়ার বিভিন্ন প্রান্তে। বলা হতো, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে সূর্য ডোবে না। আমেরিকাও ছিল মাত্র আড়াই শ বছর আগে ব্রিটিশ উপনিবেশ। চীনকে তারা দাবিয়ে রেখেছিল আফিমের নেশায়। নেপাল ও আফগানিস্তান বাদে পুরো দক্ষিণ এশিয়া ছিল ব্রিটিশদের অধীনে। ১৯৫৬ সালের সুয়েজ যুদ্ধের পর পরাশক্তি হিসেবে ব্রিটিশদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রশ্নবিদ্ধ হয়। সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তিতে এখন তারা অনেক সাবেক উপনিবেশের চেয়েও পিছিয়ে। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠে জার্মানি ও জাপান। হিটলারের জার্মানির দখলে চলে যায় ইউরোপের একের পর এক দেশ। ফ্রান্সসহ ইউরোপের এক বড় অংশ দখল করে তারা পা বাড়ায় রাশিয়ার দিকে। বিশাল রাশিয়ার বড় অংশও তারা দখল করতে সক্ষম হয়। কিন্তু জার্মানির শেষ রক্ষা হয়নি। রাশিয়ার শীতের কাছে হার মানতে বাধ্য হয় জার্মান বাহিনী। তাদের পতনও নিশ্চিত হয়।

দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে জাপান হয়ে উঠেছিল অপ্রতিরোধ্য শক্তি। চীন, কোরিয়া, মিয়ানমার দখল করে ভারতীয় উপমহাদেশের দিকেও হাত বাড়ায়। আমেরিকাও তটস্থ ছিল জাপানিদের ভয়ে। কিন্তু একদিকে জার্মানির পতন, অন্যদিকে হিরোশিমা ও নাগাসাকি নগরী আমেরিকার আণবিক বোমার আঘাতে ভস্মীভূত হওয়ার পর জাপান আত্মসমর্পণে বাধ্য হয়।

ইতিহাস প্রমাণ করে কোনো সাম্রাজ্য বা কোনো দেশের দাপট চিরস্থায়ী নয়। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে জাতিসংঘ ও পশ্চিমা দেশগুলোর মদতে ইসরায়েল প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৪৮ সালে ফিলিস্তিনে ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর আরব দেশগুলো তাদের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হয়। সে যুদ্ধে পরাজিত হয় আরব দেশগুলো। পরবর্তী সময়ে আরও তিনটি যুদ্ধে ইসরায়েল জয়ী হয়। একমাত্র ইরানের কাছেই তারা এ যাবৎ সবচেয়ে বেশি মার খেয়েছে। আমেরিকার সঙ্গে যৌথভাবে হামলা চালিয়েও তারা ইরানকে পরাস্ত করতে পারেনি। এটি ইসরায়েলের ইহুদিবাদী শাসকদের জন্য দুঃসংবাদ বলেও বিবেচিত হচ্ছে। ইসরায়েলি ইতিহাসবিদ ইলান পাপ্পে দাবি করেছেন, ইহুদিবাদী মতাদর্শ এখন তার অস্তিত্বের সংকটময় এক পর্যায়ে পৌঁছেছে এবং এটি পতনের ঠিক আগে শেষ ধাপে অবস্থান করছে। আলজাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, বিভিন্ন রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক বাস্তবতা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে ইহুদিবাদ ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে। তাঁর মতে, যুক্তরাষ্ট্রে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক পরিস্থিতি, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরায়েলের ক্রমবর্ধমান বিচ্ছিন্নতা এবং বৈশ্বিক জনমতের পরিবর্তন এসব বিষয় ইহুদিবাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করছে। ইলান পাপ্পে বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইসরায়েলের নীতির বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সমালোচনা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। একই সঙ্গে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ফিলিস্তিনপন্থি আন্দোলন ও সংহতি বৃদ্ধি পাওয়ায় ইহুদিবাদী প্রকল্পের গ্রহণযোগ্যতা আগের তুলনায় কমছে বলে তিনি মনে করেন।

তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এসব পরিবর্তন ইহুদিবাদের দীর্ঘমেয়াদি টিকে থাকার সক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। তাই তিনি বিশ্বাস করেন, মতাদর্শটি এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা শেষ পর্যন্ত এর পতনের দিকে নিয়ে যেতে পারে।

পাদটীকা : কারবালায় নবী বংশের ওপর নির্মম হত্যাকাণ্ড চালিয়েছিল যারা, তারাও নিজেদের মুসলমান বলেই দাবি করত। ইয়াজিদ বাহিনীর ভয়ে সেদিন নবী দৌহিত্র হোসাইন (রা.)-এর পাশে কুফা বা ধারেকাছের কেউ দাঁড়ায়নি। তবে হোসাইন (রা.)-এর সঙ্গে যোগ দিতে ছুটে গিয়েছিল একদল ব্রাহ্মণ। প্রচলিত এক কাহিনি অনুযায়ী বেলুচিস্তানের পার্বত্য অঞ্চলে রাহিব দত্ত নামের এক ব্রাহ্মণ সেনানায়ক ছিলেন। তিনি হোসাইন (রা.)-এর পক্ষে লড়াইয়ের জন্য নিজের সাত সন্তানকে নিয়ে ছুটে যান। পুত্ররা সবাই ইয়াজিদ বাহিনীর হাতে নিহত হন। রাহিব দত্ত বেঁচে ফিরে আসেন ভাগ্যগুণে। পরাজিত হোসাইন পরিবারের সঙ্গে যখন দেখা হয় রাহিব দত্তের, তখন হোসাইন (রা.)-এর বোন এই অমুসলিমের আত্মত্যাগে আপ্লুত হয়ে তাঁকে ‘হোসাইনি ব্রাহ্মণ’ বলে অভিহিত করেন। দ্বিতীয় কাহিনিতে বলা হয়, কারবালার যুদ্ধের সময় বাগদাদের দুর্গম পার্বত্য এলাকায় তখনো বেশ কিছু ব্রাহ্মণ বসবাস করতেন। রাহিব দত্ত তাঁদেরই একজন। ইমাম হোসাইন (রা.) কারবালার অসম যুদ্ধে খড়কুটো আঁকড়ে ধরার মতো করে যাঁকে পেয়েছেন দূত পাঠিয়ে সাহায্য চেয়েছেন। রাহিব দত্ত সেই ডাকে সাড়া দেন। এই কাহিনির বাস্তবতা কিছুটা মেনে নেওয়া যায়। রাহিব দত্ত বেলুচিস্তান থেকে সেই কারবালার ইমাম হোসাইনের কথা জানবেন ১৪০০ বছর আগের সেই যুগে, তা বিশ্বাসযোগ্য নয়। বরং বাগদাদে পৌত্তলিকদের সামান্য কিছু তখনো অবশিষ্ট ছিল সেটি মানা যায়। দ্বিতীয় প্রচলিত কাহিনি অনুযায়ী রাহিব দত্ত পরে বেলুচিস্তান বা পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিম অংশে পালিয়ে আসেন। বর্তমান হোসাইনি ব্রাহ্মণ আসলে তাঁর বংশধর। ভারতের পাঞ্জাবের অমৃতসরে এখনো হোসাইনি ব্রাহ্মণদের বসবাস রয়েছে। মহররমের সময় তাঁরা হোসাইনের জন্য শোকও পালন করেন। স্মর্তব্য ভারতের সাবেক মন্ত্রী খ্যাতনামা অভিনেতা সুনীল দত্ত ও তাঁর পুত্র অভিনেতা সঞ্জয় দত্ত-ও হোসাইনি ব্রাহ্মণ।

লেখক : সিনিয়র সহকারী সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন

ইমেইল : [email protected]

উদ্ভাবনের আনন্দ : শ্রেণিকক্ষ থেকে জাতীয় মঞ্চে

অনলাইন ডেস্ক
উদ্ভাবনের আনন্দ : শ্রেণিকক্ষ থেকে জাতীয় মঞ্চে
এম. আরিফুজ্জামান। ছবি: সংগৃহীত

শিক্ষক হিসেবে দীর্ঘ কর্মজীবনে অনেক অনুষ্ঠানের সাক্ষী হয়েছি। তবে গত ২৯ জুন বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলনকেন্দ্রে অনুষ্ঠিত ‘Startup, Science Project and Innovation Idea Showcasing’ প্রোগ্রামটি আমার হৃদয় ছুঁয়ে গেছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের আয়োজনে দেশব্যাপী যে সৃজনশীলতার স্ফুরণ ঘটেছে, তা আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন করেছে।

একজন শিক্ষক হিসেবে জানি, শ্রেণিকক্ষে যখন কোনো শিক্ষার্থী পাঠ্যবইয়ের বাইরে গিয়ে কোনো প্রশ্ন করে বা নতুন কোনো আইডিয়া দেয়, তখনই তার ভেতরে সুপ্ত থাকা প্রতিভা জাগতে শুরু করে। এই প্রদর্শনীতে সারা দেশ থেকে নির্বাচিত সেরা ১০১টি প্রকল্পের উদ্ভাবনী দক্ষতা দেখে আমি অভিভূত। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং তার সহধর্মিণী, জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের ভাইস চেয়ারম্যান ডা. জুবাইদা রহমান। যখন প্রতিটি প্রজেক্ট ঘুরে দেখছিলেন এবং শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সরাসরি মতবিনিময় করছিলেন, তখন সেই দৃশ্যটি উপস্থিত প্রতিটি শিক্ষকের জন্য ছিল এক বিশাল অনুপ্রেরণার উৎস।

রাষ্ট্রপ্রধান ও বিশিষ্টজনদের এই সরাসরি সম্পৃক্ততা শিক্ষার্থীদের মনে গেঁথে দিয়েছে এক অনন্য আত্মবিশ্বাস—তাদের উদ্ভাবন দেশ গড়ার কাজে গুরুত্বপূর্ণ।

বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে মেধাবী শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের পৃষ্ঠপোষকতার যে প্রতিশ্রুতি ছিল, তা আজ বাস্তবে রূপ নিতে দেখছি। বিশেষ করে ‘সুশিক্ষায় মেধাবী শিক্ষক’ পুরস্কার প্রবর্তনের বিষয়টি আমাকে অত্যন্ত আশান্বিত করেছে। একজন শিক্ষক হিসেবে মনে করি, শিক্ষার্থীর উদ্ভাবনী মেধা বিকাশের নেপথ্যে একজন অনুপ্রেরণাদায়ী শিক্ষকের ভূমিকা অপরিসীম। এই স্বীকৃতি আমাদের মতো শিক্ষকদের আরো নিবেদিতপ্রাণ হয়ে কাজ করতে উৎসাহিত করবে।

তৃণমূল পর্যায় থেকে উঠে আসা এই খুদে উদ্ভাবকরা আমাদের দেশের সম্পদ। উপজেলা পর্যায়ের প্রতিযোগিতার মাধ্যমে গ্রাম ও শহরের মেধার যে সমন্বয় ঘটেছে, তা ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ বিনির্মাণের মূল চালিকাশক্তি হতে পারে। এই আইডিয়াগুলোকে যদি আমরা সঠিক মেন্টরশিপ ও গবেষণার সুযোগ দিয়ে এগিয়ে নিতে পারি, তবে অদূর ভবিষ্যতে এই শিক্ষার্থীরাই দেশের অর্থনীতিতে বড় পরিবর্তন আনবে।

এই আয়োজনের সবচেয়ে প্রাণবন্ত দিকটি ছিল শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ। সারা দেশ থেকে উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের বাছাই পর্ব পেরিয়ে জাতীয় পর্যায়ে উঠে আসা ১০১টি প্রকল্পের উদ্ভাবনী শৈলী দেখে আমি বিস্মিত হয়েছি।

তবে আমাদের লক্ষ্য এখানেই শেষ হওয়া উচিত নয়। এই উদ্ভাবনগুলোকে টিকিয়ে রাখতে হলে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদী মেন্টরশিপ ও গবেষণার পরিবেশ। বিদ্যালয়গুলো যেন কেবল সার্টিফিকেট অর্জনের জায়গা না হয়ে ওঠে, বরং গবেষণার ক্ষুদ্র গবেষণাগারে পরিণত হয়—সেটিই আমাদের প্রত্যাশা। প্রধানমন্ত্রীর এই সময়োপযোগী উদ্যোগকে আমরা শিক্ষকসমাজ স্বাগত জানাই। আজকের খুদে উদ্ভাবকদের অদম্য শক্তিই হোক আমাদের আগামীর প্রেরণা।

লেখক : এম. আরিফুজ্জামান, সিনিয়র শিক্ষক,
মেহেউদ্দিন মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয়,
জিয়ানগর, পিরোজপুর।

মনের ভিতর বনের কুহু

আবু তাহের

অনলাইন ডেস্ক
মনের ভিতর বনের কুহু

গৃহকর্তা জমিসংক্রান্ত মামলার বাদী। হাজিরা দেওয়ার জন্য শহরে রওনা হয়েছিলেন সকাল ৭টায়। যাত্রার সময় তিনি গৃহকর্ত্রীর হাতে দশ টাকার নোটের একটি তাড়ায় পাঁচ শ টাকা দিয়ে বলেছেন, পাশের গ্রাম থেকে পাওনাদার আসবে একজন। টাকাগুলো যেন ওই ব্যক্তিকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়। কারো নজরে যাতে না পড়ে, সেভাবে রান্নাঘরে হাঁড়িপাতিল রাখার তাকের এক কোণায় টাকাগুলো রাখা হয়। পাওনাদার এলো দুপুরে। গৃহকর্ত্রী তাক হাতড়ান টাকার তাড়ার জন্য। ওরে আল্লাহ! টাকা তো পাওয়া যাচ্ছে না। চুরি হয়ে গেছে।

বাড়িতে কাজের জন্য আছে দুই নারী, দুই পুরুষ। এরা রান্নাঘরে বারবার আসা-যাওয়া করে। চারজনকেই সন্দেহ করা হয়। চারজনই বলে, ‘চুরি করিনি আম্মা।’ গৃহকর্তার স্ত্রীর ভাই মনসাদ তার বোনজামাইর টাকায় পরে আর খায়। মওকা পেলেই খুব লাফায়। সে বলে, ‘চাইরডারেই ছ্যাঁচা দিমু। মাইর খাইয়া ফরফর কইরা চোট্টামির কথা স্বীকার যাবেই।’ বহিরাগতের এমন চোটপাট বাড়ির স্থায়ী পুরুষ সদস্যরা বরদাশত করল না। তারা বলে, পিটুনির দরকার নাই। স্বনামখ্যাত গুনিন জাকু পাটোয়ারিকে আনা হচ্ছে। উনি এসে ‘চাল পড়া খাইয়ে অপরাধী চিহ্নিত করবেন।

গৃহকর্তার ছোট ভাই নাসিমুল হক জানান, গুনিনের মন্ত্রপূত চাল চারজনকে নয়, খাওয়ানো হবে পাঁচজনকে। মানে কাজের চার লোক আর মনসাদকে। স্তম্ভিত মনসাদ জানতে চায়, কী কারণে তাকে চোর মনে করা হচ্ছে। নাসিমুল বলে, রান্নাঘরে তুমিও বারবার আসা-যাওয়া কর। কখনো চা বানাতে বলো। কখনো চুলার আগুনে সিগারেট ধরাও। কখনো ডাব কেটে পানি খাওয়ার জন্য দা সন্ধান কর। এসবের ফাঁকে দুলাভাইর টাকাকে নিজের টাকা মনে করে যে সরাওনি, তার নিশ্চয়তা মোরা পাব কোথা?

‘অপমানের একটা সীমা থাকা চাই। এ বাড়িতে আমি আর এক সেকেন্ডও থাকব না।’ মনসাদ ঘোষণা করে এবং তার মালসামানা গোছগাছ করতে কাজের এক লোককে নির্দেশ দেয়। লোকটা নির্দেশ পালনে উদ্যত হতেই নাসিমুল হাত ইশারায় তাকে থামিয়ে মনসাদকে বলে, তোমার মহান সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানাই। তবে সিদ্ধান্তটি কার্যকর করতে হবে ঘণ্টা খানেক পরে। আশা করি, ওই সময়ের মধ্যে জাকু পাটোয়ারি এসে পড়বেন।

জাকু এসে বিড়বিড় করে রহস্যময় আওয়াজ দিয়ে এক বাটি আতপ চালে ফুঁ দেন। সেই চাল মুঠো মুঠো করে পাঁচজনকে দিলেন। বললেন, চিবাও। চিবিয়ে মুখ থেকে বের করে ঘরের মেঝেতে ফেলবে। নির্দেশমতো ওরা চিবোয় এবং মেঝেতে ফেলে। দেখা যায়, চারজনের মুখ থেকে বেরিয়েছে ফিরনির মতো তরল। কাজের এক লোকেরটা ছিল শক্ত আটার দলার মতো। তার ডান হাতের কবজি পাকড়িয়ে গুনিন জাকু পাটোয়ারি বলেন, এ-ই-ই টাকা চুরি করেছে। সঙ্গে সঙ্গে লোকটা নাসিমুল হকের পায়ে পড়ে বলে, মাফ কইরা দেন গো কাগা। জীবনে আর এরকম করুম না। যদি করি ফাঁস দিয়া আমারে আল্লাহর কাছে সোপর্দ কইরা দিয়েন।

প্রত্যক্ষদর্শীর মুখে এ ঘটনা শুনে জাকু পাটোয়ারির গুণমুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। তাকে দেখার আগ্রহও হয় খুব। কিন্তু দেখার সুযোগ হয় না। বহু বছর পর, ১৯৭৮ সালের এক বাদলা দিনে ট্রেনে ঢাকা থেকে আমরা তিন বন্ধু বাড়ি ফিরছি। পথিমধ্যে এক স্টেশন থেকে পাঁচ ছয়জন যাত্রী উঠল আমাদের কম্পার্টমেন্টে। তাদের মধ্যে সাদা বাবরি চুল, সাদা লম্বা দাড়ি ঘন গোঁফধারী বিলকুল রবিঠাকুরের চেহারার ব্যক্তিকে দেখিয়ে বন্ধু রহমত বলে, ইনিই জাকু পাটোয়ারি।

আমরা আলাপ জমাই। একপর্যায়ে জানতে চাই, আতপ চালে কোন মন্ত্র পড়ে ফুঁ দেন। ৮২ বছর বয়সি গুনিন বলেন, মন্ত্রফন্ত্র কিছু না বাবা। মনের ভিতর বনের কুহু ঢুকিয়ে দিই। তাতেই কাম সারা। চোরার গলা শুকিয়ে যায়। তার চিবানো চাল হয়ে যায় আটার দলা।

২. মানসিকভাবে দুর্বল করে অপরাধীকে ধরা দেওয়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করা সোজা কাজ নয়। তবু কেউ কেউ মনে করেন, ওটা তেমন কঠিন নয়। চোপাবাজিতে লক্ষ্যার্জন সম্ভব। আমার স্কুলজীবনের সহপাঠী আজিজ আহমেদদের বাড়িতে অনেক নারকেল গাছ। ওই গাছের ডাব একটু পোক্ত হতেই চুরি হয়ে যেত। আরেক সহপাঠী মুন্সি ফারুক ঘোষণা করে যে রাতের আঁধারে একটি গাছের ডাব সমগ্র আত্মসাতের অধিকার তারও রয়েছে। আজিজ জানায়, ফারুক লেট করে ফেলেছে। কেননা আজিজের দাদি পানি পড়া ঢেলেছেন গাছের গোড়ায়। চোর ডগায় উঠলেই অন্ধ হয়ে যাবে। ডাব চুরি করা দূরের কথা, গাছ থেকে নামতেই পারবে না। এ অবস্থায় বিষ পিঁপড়ার কামড়ের পর কামড়। যন্ত্রণায় চোর হাউমাউ কাঁদতে থাকবে আর বাড়ির লোকজন এসে তাকে দিবে প্যাদানি।

গৃহকর্তা ‘হ্যাঁ, লেট হয়তো কিছুটা হয়েছে’ বলে মুন্সি ফারুক, ‘কিন্তু সময় তো ফুরিয়ে যায়নি। উপরের বস্তু করায়ত্ত করতে সংকল্প পোষণই যথেষ্ট—এরকম ভাবলে তো ভবিষ্যৎ হাওয়া। নিচ থেকে উপরে পৌঁছার যথোপযুক্ত সময় তৈরি করে নিতে হয়। কেন না ওটা কেউ কাউকে উপহার দেয় না।’ আমরা ভয় পেয়ে গেলাম। ফারুককে পরামর্শ দিই, অন্ধ হওয়ার ঝুঁকি নিস না বন্ধু। কিন্তু তার সাফ কথা : নো রিস্ক নো গেইন।

এক দুপুরে সাইকেল হাঁকিয়ে বন্ধুদের বাড়ি গিয়ে ফারুক বিকাল ৪টার মধ্যে তাদের বাড়িতে যেতে বলে। সে ম্যাজিক প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করেছে। জাদুকরের নাম কী, তার বাড়ি কোথায়? ফারুকের উত্তর : নাম নয়-কর্মই মানুষকে মহান বানায়। জাদুকরের বাড়ি দিয়ে কী হবে? তার দক্ষতায় খাদ আছে কি নেই সেটাই বিচার্য। বন্ধুরা সবাই জাদু দেখতে জড়ো হলো। আজিজও ছিল সেখানে। ফারুক সবাইকে বাড়ির বৈঠকখানার একটি কামরায় নেওয়ার পর সুর করে গায়—‘ডাবের আমি/ডাবের তুমি/ডাব দিয়ে যায় চেনা।’ আমরা দেখি, কামরায় রয়েছে দুই ডজনেরও বেশি ডাব, যেগুলো আজিজদের গাছে ছিল। ডাবগুলো যেন বলছে, ফারুকের মনের ভিতর বনের কুহু ঢুকিয়ে দেওয়ার আজিজি চেষ্টা ব্যর্থ।

৩. নীলফামারীর ডোমার থানা (বর্তমানে উপজেলা) সদরেও বিজন সর্বজ্ঞ নামের এক গুনিন ছিলেন, যিনি মনের ভিতর বনের কুহু না ঢুকিয়েই হারানো দ্রব্য বা মানুষ কোন অবস্থায় কোথায় বিদ্যমান সেই সন্ধান দানে ছিলেন পারঙ্গম। ভুক্তভোগী বহু লোক কানাকড়িও খরচ না করে গুনিনের হাতে উদ্ধার পেয়েছেন। বিজন সর্বজ্ঞর এক নাতি (ভ্রাতুষ্পুত্রের পুত্র) উৎপল সর্বজ্ঞ প্রতিবেদক পদে কাজ করতেন ঢাকায় এক দৈনিক পত্রিকায়। উৎপলের মুখেই শুনেছি পরোপকারের বিনিময়ে তার ওই দাদু উপনীত হয়েছিল ‘যার মাথায় ধরলাম ছাতি/সে মারল মাথায় কষিয়ে এক লাথি’ অবস্থায়।

পাকিস্তানি জমানায় শেষ প্রান্তে ডোমারে বদলি হয়ে এলেন এক সরকারি অফিসার নজর আলী শাহ (এটা কল্পিত নাম)। উৎপল তার বাবার কাছ থেকে শুনেছেন, অবাঙালি ওই অফিসার উঠতে-বসতে সর্বদা ক্ষমতার আস্ফালন করতেন। ছিলেন থানা পর্যায়ের হুজুর। ভাবভঙ্গি ছিল গোটা প্রদেশের হুজুরে আলার মতো। নতুন কর্মস্থলে যোগদানের তিন মাসের মাথায় নজর আলী হুজুরের স্ত্রীর গলার সোনার হার খোয়া যায়। বাসস্থানের আঙিনায় পাতকুয়ার পাড়ে গোসল করার আগে একটা পিঁড়ির ওপর সোনার হারটি রেখেছিলেন বেগম হুজুর। গোসল সারার পর তিনি আর হারটি খুঁজে পান না। রহস্যময় ঘটনা!

খোলা আকাশের নিচে বেগম হুজুরের গোসলের সময় নারী বা পুরুষ, সবারই উঠোনে আসা নিষিদ্ধ। তার মানে কেউই হারটা দেখেনি। দেখেনি অথচ চুরি হয়ে গেল, এ কীভাবে সম্ভব? প্রশ্নের জবাব মিলছিল না। ফলত বিরামহীন চলছে নজর আলী শাহের তর্জনগর্জন। থানা-পুলিশ আশ্বাস দেয়, ঘাবড়ানোর কিছু নেই স্যার। তদন্ত জারি আছে। নজর বলেন, পাঁচ দিন ধরেই শোনাচ্ছ জারি আছে জারি আছে। জারি দিয়ে আমার কী কাজ! আমি চাই নেকলেস। ওটা উদ্ধার করবে কখন? আমার ইন্তেকালের পরে?

নজর আলীর অস্থিরতা প্রশমনের উদ্দেশ্যে তার অফিসের সিনিয়র কেরানি চুরি-উত্তর বিভিন্ন ঘটনার ইতিবাচক উত্তরণের বর্ণনা দিয়ে জানালেন, তার মনে হচ্ছে গুনিন বিজন সর্বজ্ঞর সাহায্য নিলে সংকট মোচন সম্ভব। গুনিনের সাহায্য প্রার্থনার অনুমতি পান কেরানি। তার মুখে সব শোনার পর বিজন সর্বজ্ঞ চোখ বুজে ধ্যান করলেন মিনিট তিনেক। এরপর বললেন : চুরি যায়নি। হারখানা আছে কুয়ার ভিতরে। খুব সম্ভব কাক ঠোঁটে করে নিয়ে গিয়ে ওখানে ফেলেছে। কুয়া থেকে তোলা হয়েছিল সেই সোনার হার। গুনিনের গুণপনায় অতিশয় মুগ্ধ নজর শাহ নগদ দুই শ টাকা দেন বিজন সর্বজ্ঞকে। কিন্তু গুনিন দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, গুরুর হুকুম আছে উপকারের বিনিময়ে পুরস্কার নিও না। নিলে ঈশ্বর কুপিত হবেন।

ঘটনার পরদিন ভোরে পুলিশ এসে বিজন সর্বজ্ঞকে থানায় নিয়ে গেল। থানার ওসি বলেন, নজর আলী হুজুরের ধারণা, যে ব্যক্তি সোনার অলংকার কোথায় আছে ঠিকঠাক বলে দিতে পারে। সে ব্যক্তি তো চোর-ডাকাতের দলকেও বলে দিতে পারে গৃহস্থের অলংকার কোন কোন জায়গায় আছে। ওসি বলেন, এই যুক্তিতে, আপনাকে থানায় এনে জিজ্ঞাসাবাদ করার নির্দেশ দিয়েছেন নজর আলী শাহ। আপনি বসে চা-বিস্কুট খান। সেকেন্ড অফিসার কিছুক্ষণের মধ্যে আপনাকে জেরা শুরু করবেন।

মিনিট পাঁচেক পরেই থানার সেকেন্ড অফিসার এসে বলেন : সর্বজ্ঞ মশাই। আপনাকে তিন ঘণ্টা ধরে পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদ করেছে (আসলে কোনো প্রশ্নই তাকে করা হয়নি)। কাজ শেষ। আপনি বাড়ি যেতে পারেন।

৪. উপকার গ্রহণের পর কিছু কিছু লোক কী করে তার সরস কেচ্ছা শুনিয়েছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা মাহবুবুর রব সাদী।

অর্থকষ্টে জর্জরিত এক ব্যক্তি রোজার ঈদের আগে খামের উপরে লিখেছে—‘প্রাপক, আল্লাহ।’ ডাকঘরের লোকরা বিস্মিত। তারা খাম খুলে দেখেন চিঠিতে লেখা—‘ছেলেমেয়ে নিয়ে সম্মানের সঙ্গে ঈদ করার জন্য কিছু টাকা দেবেন দয়াময়।’

পোস্ট মাস্টারের উদ্যোগে ডাকঘরের কর্মীরা দয়াপরবশ হয়ে চাঁদা তুলে লোকটার ঠিকানায় দুই হাজার টাকা পৌঁছে দিয়ে জানায়—‘আল্লাহ পাঠিয়েছেন।’ ঈদুল আজহার আগে লোকটা আবার আল্লাহর ঠিকানায় চিঠি দেয়—‘রাব্বুল আলামিন, গত ঈদে আপনার টাকায় ঈদটা ভালোভাবেই করেছি। এবারও টাকা দরকার দয়াময়। তবে এবার ফেরেশতার হাতে পাঠানোর আবেদন করছি। কারণ আমার বিশ্বাস, গতবার আপনি চার হাজার টাকা দিয়েছিলেন। বেজন্মার বাচ্চা বেজন্মা পোস্ট মাস্টারটা দুই হাজার টাকা মেরে দিয়েছে।

লেখক : সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন

তারেক রহমান সরকারের জনকল্যাণমুখী বাজেট

সিরাজুল ইসলাম
তারেক রহমান সরকারের জনকল্যাণমুখী বাজেট
সংগৃহীত ছবি

একটি বাজেট শুধু আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়। একটি বাজেট আসলে একটি সরকারের রাজনৈতিক দর্শন, অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার এবং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রচিন্তার প্রতিফলন। সে কারণেই নতুন সরকারের প্রথম বাজেট সব সময়ই বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। কারণ জনগণ তখন শুধু বরাদ্দের অঙ্ক দেখে না; তারা খুঁজে দেখে সরকার কোন দিকে দেশকে নিয়ে যেতে চায়।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটও সেই অর্থে একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল। দীর্ঘ রাজনৈতিক বিরতির পর ক্ষমতায় আসা সরকারের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেট হিসেবে এটি দেশের অর্থনীতি, সমাজ এবং রাষ্ট্র পরিচালনা সম্পর্কে একটি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে। বাজেট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সরকার কেবল প্রবৃদ্ধির কথা বলেনি বরং মানবসম্পদ উন্নয়ন, সামাজিক নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা এবং জাতীয় নিরাপত্তার মতো মৌলিক বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিয়েছে। অনেক সময় আমরা উন্নয়ন বলতে শুধু বড় বড় সেতু, মহাসড়ক কিংবা অবকাঠামো প্রকল্পকে বুঝি। কিন্তু বাস্তবতা হলো উন্নয়নের প্রকৃত ভিত্তি মানুষ। দক্ষ, শিক্ষিত, সুস্থ এবং উৎপাদনশীল জনগোষ্ঠী ছাড়া কোনো দেশ দীর্ঘ মেয়াদে এগিয়ে যেতে পারে না। এবারের বাজেটে সেই বাস্তবতাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বলেই এটি অনেকের কাছে জনবান্ধব বাজেট হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

শিক্ষা খাতের দিকে তাকালে বিষয়টি আরো স্পষ্ট হয়। বিশ্বের যে দেশগুলো দ্রুত উন্নতি করেছে, তাদের প্রায় সবকটিই শিক্ষাকে জাতীয় অগ্রাধিকারে পরিণত করেছিল। দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর কিংবা মালয়েশিয়ার অভিজ্ঞতা দেখলে বোঝা যায়, মানবসম্পদে বিনিয়োগের বিকল্প নেই। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর তরুণ জনগোষ্ঠী। কিন্তু এই জনসংখ্যাকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করতে না পারলে সেটিই আবার বোঝায় পরিণত হতে পারে। সেই কারণে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি শুধু একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি ভবিষ্যৎ অর্থনীতিতে বিনিয়োগ। আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বে কেবল সনদ নয়, প্রয়োজন দক্ষতা। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, তথ্য-প্রযুক্তি, কারিগরি শিক্ষা এবং গবেষণার ওপর জোর না দিলে ভবিষ্যতের প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকবে। তাই শিক্ষা খাতে বাড়তি মনোযোগ নিঃসন্দেহে ইতিবাচক পদক্ষেপ।

একইভাবে স্বাস্থ্য খাতের গুরুত্বও নতুন করে ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন নেই। করোনা মহামারির পর পুরো বিশ্ব বুঝেছে, স্বাস্থ্য খাতকে অবহেলা করলে তার মূল্য অর্থনীতি, সমাজ এবং রাষ্ট্র—সবাইকে দিতে হয়। একজন অসুস্থ নাগরিক যেমন উৎপাদনশীল হতে পারেন না, তেমনি একটি দুর্বল স্বাস্থ্যব্যবস্থা জাতীয় উন্নয়নের গতি কমিয়ে দেয়।
বাংলাদেশের গ্রামীণ অঞ্চলে এখনো অনেক মানুষ মানসম্মত চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি, চিকিৎসক সংকট দূর করা, আধুনিক যন্ত্রপাতি সরবরাহ এবং স্বাস্থ্যসেবাকে মানুষের নাগালের মধ্যে আনা সময়ের দাবি। বাজেটে এই খাতকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বলেই সাধারণ মানুষ আশাবাদী হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে।

তবে আমার দৃষ্টিতে এবারের বাজেটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হলো রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রশ্ন। একটি রাষ্ট্র কেবল অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী হলেই চলে না; তাকে নিরাপদও হতে হয়। বর্তমান বিশ্বে নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের ধরন দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। সাইবার হামলা, প্রযুক্তিনির্ভর যুদ্ধ, আঞ্চলিক উত্তেজনা এবং ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে।

এ অবস্থায় প্রতিরক্ষা খাতে বিনিয়োগকে শুধু ব্যয় হিসেবে দেখা উচিত নয়। এটি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব রক্ষার একটি অপরিহার্য উপাদান। একটি আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর এবং দক্ষ সশস্ত্র বাহিনী শুধু যুদ্ধের জন্য নয়; দুর্যোগ মোকাবেলা, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশন এবং জাতীয় সংকট মোকাবেলাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই সামরিক খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধিকে জাতীয় সক্ষমতা বৃদ্ধির অংশ হিসেবেই দেখা প্রয়োজন।

এবারের বাজেটের আরেকটি ইতিবাচক দিক হলো সামাজিক নিরাপত্তা নিয়ে গুরুত্বারোপ। একটি উন্নয়নশীল দেশের জন্য অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি যতটা গুরুত্বপূর্ণ, ততটাই গুরুত্বপূর্ণ প্রবৃদ্ধির সুফল সবার কাছে পৌঁছে দেওয়া। সমাজের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে সঙ্গে না নিয়ে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। দরিদ্র, প্রবীণ, বিধবা, প্রতিবন্ধী এবং নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি তাই রাষ্ট্রের মানবিক দায়িত্বের অংশ।

এ ছাড়া কৃষি খাতের বিষয়টিও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশের অর্থনীতি যতই শিল্প ও সেবাখাতনির্ভর হোক, কৃষির গুরুত্ব কখনো কমবে না। খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে সচল রাখতে কৃষির বিকল্প নেই। কৃষক যদি ন্যায্য মূল্য না পান, তাহলে পুরো অর্থনীতিই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই কৃষি উৎপাদন, সংরক্ষণ এবং বাজার ব্যবস্থাপনার উন্নয়নও বাজেট বাস্তবায়নের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হওয়া উচিত।

বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের প্রশ্নটিও এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি। প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে। তাদের জন্য যথেষ্ট কর্মসংস্থান তৈরি না হলে সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাপ বাড়বে। ফলে বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধির পরিবেশ সৃষ্টি, ব্যবসা সহজীকরণ এবং উদ্যোক্তাদের জন্য সহায়ক নীতি গ্রহণ অত্যন্ত জরুরি। এছাড়া, যথেষ্ট পরিমাণে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা না হলে এই শিক্ষিত তরুণ সমাজ সমাজের বোঝা হয়ে উঠবে। তাতে সামাজিক অস্থিরতা বাড়বে, নানা রকম অপরাধমুলক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধিরও আশঙ্কা থাকে।

বাজেটে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। সাধারণ মানুষের কাছে এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি। গত কয়েক বছরে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বৃদ্ধি মানুষের জীবনকে কঠিন করে তুলেছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল তখনই অর্থবহ হবে, যখন সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণে থাকবে। তাই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের পদক্ষেপ কতটা কার্যকর হয়, সেটিই হবে এই বাজেটের অন্যতম বড় পরীক্ষার ক্ষেত্র।

তবে বাজেট যত ভালোই হোক, বাস্তবায়নই শেষ কথা। বাংলাদেশের ইতিহাসে অনেক সময় দেখা গেছে, উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা কাগজে থাকলেও মাঠপর্যায়ে তার প্রতিফলন ঘটেনি। এখানেই সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

প্রথমত, রাজস্ব আদায় বাড়াতে হবে। উন্নয়ন ব্যয় পরিচালনার জন্য সরকারের আয় বাড়ানো ছাড়া বিকল্প নেই। দ্বিতীয়ত, দুর্নীতি ও অপচয় কমাতে হবে। উন্নয়ন প্রকল্পে অস্বাভাবিক ব্যয় বৃদ্ধি এবং সময়ক্ষেপণ দীর্ঘদিনের সমস্যা। তৃতীয়ত, প্রশাসনিক দক্ষতা বাড়াতে হবে। বরাদ্দ ঘোষণা করলেই হবে না; তা সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে কি না, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।

সবচেয়ে বড় কথা হলো, জনগণ এখন শুধু প্রতিশ্রুতি শুনতে চায় না; তারা ফলাফল দেখতে চায়। তারা জানতে চায়- শিক্ষা খাতে বরাদ্দের ফলে বিদ্যালয়ের মান কতটা বাড়ল, স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দের ফলে চিকিৎসাসেবা কতটা উন্নত হলো, আর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল তাদের জীবনে কতটা পৌঁছালো।

সুতরাং ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটকে শুধু একটি অর্থনৈতিক দলিল হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি একটি রাজনৈতিক অঙ্গীকার, একটি উন্নয়ন দর্শন এবং একটি ভবিষ্যৎ রূপরেখা। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা এবং রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার ওপর জোর দিয়ে সরকার যে বার্তা দিয়েছে, তা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক।

এখন অপেক্ষা একটাই—ঘোষণার সঙ্গে বাস্তবতার ব্যবধান কতটা কমানো যায়। কারণ ইতিহাস শেষ পর্যন্ত বাজেটের অঙ্ককে নয় বরং তার ফলাফলকেই মনে রাখে। যদি এই বাজেটের লক্ষ্যসমূহ সফলভাবে বাস্তবায়িত হয়, তাহলে এটি শুধু একটি অর্থবছরের পরিকল্পনা হয়ে থাকবে না; বরং বাংলাদেশের উন্নয়নযাত্রায় একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে।

লেখক : সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক