<p style="text-align: justify;">রাজনীতিতে সত্যনিষ্ঠা এবং মিথ্যাচারের পাশাপাশি অবস্থান এক জটিল ও দীর্ঘ আচরিত বিষয়, যা ইতিহাসজুড়ে রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল এবং এখনো আছে। রাষ্ট্র পরিচালনায়, বিশেষ করে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর শাসন পরিচালনায় সত্যের চেয়ে মিথ্যাচারের আবশ্যকতা ও পরিণতি সম্পর্কে প্রশ্ন তুললেও ক্ষমতার রাজনীতির স্বাদ যাঁরা পান, তাঁরা ব্যক্তিগত ও দলীয়ভাবে বিশ্বাস করেন যে মিথ্যাচারের মধ্য দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় স্বার্থ রক্ষা পায় এবং কেবল তাঁদের দ্বারাই জাতীয় স্বার্থ সংরক্ষণ করা সম্ভব। কিন্তু সত্যনিষ্ঠ রাজনীতিবিদরা মনে করেন, ব্যক্তি ও দলীয় স্বার্থে এবং বিশেষ করে ক্ষমতা আঁকড়ে থাকার জন্য জনগণকে আকৃষ্ট করতে যাঁরা প্রলুব্ধকর মিথ্যাচার করেন, তাঁরা বাস্তবে গণতান্ত্রিক সততার ক্ষতি করেন এবং দেশে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেন এবং ব্যাপক অর্থে মিথ্যাচারকে সর্বজনীন করে তোলেন। শৈশবে আমরা সবাই মুখস্থ করি, ‘সদা সত্য কথা বলিবে, মিথ্য বলা মহাপাপ!’ কিন্তু বেড়ে ওঠার পর আমাদের বড় অংশই তা মানি না। আমরা মিথ্যাচারকে সাফল্যের চাবিকাঠি বিবেচনা করি। সম্ভবত সবচেয়ে বেশি মিথ্যাচার করেন রাজনীতিবিদরা। কারণ তাদের বিশ্লেষণবহুল প্রাঞ্জল ও মধুর বাকপটুতায় মিথ্যাচারকে এমন এক কলার পর্যায়ে উন্নীত করতে সক্ষম হন যে তাঁদের কথাগুলো যত পরস্পরবিরোধী হোক না কেন, তাঁদের আগে-পরের কথার মধ্যে কোনো সামঞ্জস্য না থাকুক, তাঁদের সমর্থকদের কাছে নেতার প্রতি শ্রদ্ধা ও বিশ্বাসে কোনো ভাঙন ধরে না। অতএব কোনো রাজনৈতিক দল যত বড়, দলটির নেতারা তত বেশি মিথ্যাচার করতে অভ্যস্ত। </p> <p style="text-align: justify;">বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির নিরিখে এ কথা বললে বোধ হয় বাড়িয়ে বলা হবে না যে ‘মিথ্যাই সাফল্যের চাবিকাঠি’। কিন্তু এ সাফল্য সব সময় স্থায়ী হয় না, চিরস্থায়ী হওয়া তো দূরের কথা। শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর সমগ্র রাজনৈতিক জীবনে সংসদীয় গণতন্ত্রের গুণগান করেছেন, সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য পাকিস্তানের সামরিক শাসকদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নেমে জীবনের ঝুঁকি নিয়েছেন।</p> <p style="text-align: justify;">কিন্তু যেই মাত্র শেখ মুজিব স্বয়ং একটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্রশাসনের সুযোগ লাভ করলেন, সঙ্গে সঙ্গে নিজের ক্ষমতাকে নিরঙ্কুশ করার লক্ষ্যে তিনি তাঁর মুখে লক্ষ-কোটিবার উচ্চারিত সংসদীয় গণতন্ত্রকে হত্যা করে হৃদয়ে লালিত একদলীয় শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করার মধ্যে কোনো অন্যায় দেখতে পাননি।</p> <p style="text-align: justify;">তাঁর সমর্থকরাও তাঁদের মহান নেতার সিদ্ধান্তের মাঝে কোনো অন্যায় দেখেননি। যেহেতু তিনি তাঁর কথামালায় জনগণকে প্রলুব্ধ করতে পারঙ্গম ছিলেন, তাঁর কথায়  সমর্থকরা নিজেদের জীবন দিতেও প্রস্তুত ছিল, অতএব তাঁর বাগাড়ম্বরের জাদুতে মোহাবিষ্ট সমর্থকরা এতটাই বুঁদ হয়ে গিয়েছিল যে তারা ‘সংসদীয় গণতন্ত্র’ এবং ‘ব্যক্তি ও দলীয় একনায়কতন্ত্রের’ মধ্যে কোনো পার্থক্য দেখতে পায়নি। যারা পার্থক্যটা বুঝত তারা কেউ মুখ খোলার সাহস পর্যন্ত পায়নি। যারা ভিতরে ভিতরে ক্ষুব্ধ ও ক্রুদ্ধ হয়েছিল, তারা গোপন পরিকল্পনায় তাঁকে হত্যা করার পর যখন অসংখ্য মানুষ উচ্ছ্বসিত হয়ে রাস্তায় নেমে আসে, তখন বোঝা যায়, তাঁর হঠকারী সিদ্ধান্তে জনগণের বিরাট একটি অংশ সন্তুষ্ট ছিল না। তাঁর মতো জনপ্রিয় নেতার ভ্রান্ত সিদ্ধান্ত ও এর পরিণতি হিসেবে তাঁর হত্যাকাণ্ডে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, ‘কথা ও কাজে মিল না থাকলে’ জনপ্রিয়তাও স্থায়ী হয় না। যা তিনি বিশ্বাস করতেন না, তা সত্যের মতো বলে যা কিছু অর্জন করেছিলেন, তা তাঁর জীবদ্দশাতেই আর বিশ্বাসযোগ্য ছিল না।</p> <p style="text-align: justify;">তা সত্ত্বেও এই ‘মহান’ নেতার জীবন ও কর্মের গুণগান করার জন্য একটি সমর্থক শ্রেণি দেশে আছে, যারা তাঁর মহত্ত্ব প্রচার করে, তাঁর মূর্তি স্থাপন করে, তাঁর গৌরবগাথায় ঠাসা থাকে পাঠ্যপুস্তক। তিনি যা ছিলেন না তাঁকে তা প্রমাণ করার এই স্তাবকতা টিকে ছিল সাড়ে পনেরো বছর। রাষ্ট্র পরিচালনায় মুখ্য নেতাদের বাগাড়ম্বর, মিথ্যাচার ও প্রতারণা কোনো না-কোনো পর্যায়ে জনগণের বিশ্বাস ও আস্থাভঙ্গের কারণ ঘটায়, যা তাদের অর্জিত সাফল্যগুলোকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দেয় এবং তাদের জীবন পর্যন্ত বিপন্ন করে তোলে, যার সর্বশেষ দৃষ্টান্ত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এসব দৃষ্টান্ত থাকা সত্ত্বেও আমাদের রাজনৈতিক নেতারা সততার শিক্ষা গ্রহণ করেন না কেন? মিথ্যাকেই কেন তাঁরা বারবার লক্ষ্যে পৌঁছার কৌশলগত হাতিয়ার বিবেচনা করেন। তাঁরা কি হাল জমানার রাষ্ট্রবিজ্ঞানী বা রাজনৈতিক দার্শনিক হয়ে গেছেন, না কি কেবল প্রাচীন রাজনৈতিক দার্শনিকদের কথামালা অনুসরণ করে ক্ষমতায় টিকে থাকার আশায় মিথ্যার ওপর ভর দিয়ে তাঁদের কল্পনার মহল গড়ার চেষ্টা করেন? দেখা যাক, এ সম্পর্কে বিশ্বে অনুসরণীয় রাজনৈতিক দার্শনিকরা কী বলেছেন। প্লেটো একটি আদর্শ নগর রাষ্ট্রে সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখার জন্য মিথ্যাচারকে ‘মহৎ মিথ্যা’ বলেছেন, যা রাষ্ট্র পরিচালনাকারীদের প্রতি ‘নাগরিকদের আনুগত্য, নাগরিক দায়িত্ববোধ জাগ্রত করা এবং সামাজিক ভূমিকা পালন করার জন্য উদ্বুদ্ধ করার অন্যতম উপায়’ বলে তিনি তাঁর গ্রন্থ ‘রিপাবলিক’-এ উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে, ‘এ ধরনের মিথ্যাচার ব্যক্তিগত লাভের জন্য নয়, বরং প্রতারণা না করে সমগ্র সমাজের কল্যাণ সাধনের জন্য। অবশ্য তিনি মিথ্যাচার ও প্রতারণা করার দক্ষতাকে পরিস্থিতির প্রয়োজনে প্রয়োগের পরামর্শ দিলেও এগুলোকে মানুষের নৈতিক গুণ বলেননি।</p> <p style="text-align: justify;">কিন্তু অষ্টাদশ শতাব্দীর জার্মান দার্শনিক ইমানুয়েল কান্ট রাজনীতিবিদসহ সমাজের সবার সত্য বলার নৈতিক বাধ্যবাধকতার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর মতে, ‘নৈতিকতার সর্বোচ্চ নীতিই যুক্তিনির্ভর নীতি, যা বস্তুনিষ্ঠ, যৌক্তিকভাবে অপরিহার্য ও শর্তহীন,’ অর্থাৎ সমাজে মিথ্যাচারের সুযোগ নেই। এমনকি তিনি কৌশলগত কোনো কারণেও মিথ্যা বলে সামাজিক নৈতিকতাবোধের আবহকে বিনষ্ট না করার পরামর্শ দিয়েছেন। তবে কিছু দার্শনিক রাজনীতিবিদ বা রাষ্ট্র পরিচালকদের মিথ্যা বলা নিয়ে এমনভাবে আলোচনা করেছেন, তাতে অনেকের মনে বিশ্বাস জন্মাতে পারে যে মিথ্যাকথন রাজনীতিতে সফলতার অন্যতম উপাদান এবং প্রতারণাকে প্রত্যক্ষভাবে সমর্থন করার শামিল। আমরা এমন এক দেশে, এমন এক সমাজে বাস করি, যেখানে সত্য ও মিথ্যা এবং প্রতারণাকে শনাক্ত করা কঠিন কোনো ব্যাপার নয়। কারণ আমাদের জনগণ বারবার মিথ্যার শিকার হয়েছে এবং বারবার প্রতারিত হয়েছে। রাজনীতিবিদদের তারা যত না বিশ্বাস করে, তার চেয়ে বেশি অবিশ্বাস করে। তবু তারা তাদের বিভিন্ন পর্যায়ের প্রতিনিধি নির্বাচন করতে রাজনীতিবিদদেরই ভোট দেয়। ভোট না দিলে তাদের পিঠের চামড়া তুলে নেওয়ার হুমকি থাকে। জনগণ জানে, নির্বাচনের আগে রাজনীতিবিদরা তাদের যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, নির্বাচিত হয়ে সে প্রতিশ্রুতি তাঁরা রাখবেন না। ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য থেকে শুরু করে জাতীয় সংসদ সদস্যরা দায়িত্ব গ্রহণের আগে তাঁদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব ‘আইন অনুযায়ী ও বিশ্বস্ততার সঙ্গে পালন ও ব্যক্তিগত স্বার্থ দ্বারা প্রভাবিত না হওয়ার’ শপথ গ্রহণ করা সত্ত্বেও দায়িত্বভার গ্রহণ করে তাঁদের সিংহভাগ শপথ ভুলে ক্ষমতার অপব্যবহার, স্বজনপ্রীতি, রাষ্ট্রীয় সম্পদ হাতিয়ে নেওয়ার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হন। রাজনীতিবিদরা অবলীলায় মিথ্যা বলেন, কারণ মিথ্যাচারে তাঁদের উদ্দেশ্য হাসিল হয়। তাঁদের কাজে স্বচ্ছতা থাকে না এবং তাঁদের জবাবদিহির মুখে পড়তে হয় না। রাজনৈতিক অসততা তাই লাগামহীনভাবে চলে। কিন্তু জনগণের দ্বারা নির্বাচিত একজন প্রতিনিধির ব্যক্তিগত মিথ্যাচার ও প্রতারণার সঙ্গে সরকারের একজন মন্ত্রীর মিথ্যাচারের মধ্যে অনেক পার্থক্য রয়েছে, বিশেষ করে তিনি যদি সরকারের নীতিনির্ধারণী বক্তব্য দেওয়ার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী হয়ে থাকেন। গত ৩০ এপ্রিল ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের সমাপনী দিবসে বক্তব্য দানকালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, ‘আমাদের একটা তাগাদা ছিল, সংস্কারের বাহানায় যেন নির্বাচন আটকে না যায়। সে কারণে আমরা অনেক বিষয়ে আপস করেছি, এমনকি জুলাই জাতীয় সনদেও স্বাক্ষর করেছি। নির্বাচনের স্বার্থে আমরা অনেক কথা বলি নাই।’ তাঁর কথায় স্পষ্ট হয়েছে, জুলাই গণ অভ্যুত্থানের প্রতি তাঁদের মৌখিক সমর্থন ছিল শুধু একটি রাজনৈতিক কৌশল।</p> <p style="text-align: justify;">জুলাই আন্দোলনের প্রধান সুবিধাভোগী হওয়া সত্ত্বেও সনদ বাস্তবায়নে ক্ষমতাসীন বিএনপির আন্তরিকতা কতটুকু, তা ইতোমধ্যে দলটির নেতাদের বক্তব্যের ধরনেই বোঝা যায়। সামনের দিনগুলোতে জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবিতে বিরোধী দল সংসদের ভিতরে-বাইরে আন্দোলন করবে এবং সরকার মাঝে মাঝে সনদ বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করে বিরোধী দলকে শান্ত, তুষ্ট রাখার কৌশল প্রয়োগ করবে। জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ৩০ এপ্রিলের বক্তব্য প্রমাণ করে, তিনি হৃদয়ে যা পোষণ করেন, মুখে তা বলেন কার্যসিদ্ধি হয়ে যাওয়ার পর। বাকচারিতায় সালাহউদ্দিন আহমদ বরাবর পটু। সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হওয়ার পর বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী (সালাহউদ্দিন আহমদ) সত্যকে মিথ্যা এবং মিথ্যাকে সত্য হিসেবে চমৎকারভাবে পরিবেশন করতে পারেন (২ এপ্রিল ২০২৬, দৈনিক ইত্তেফাক)।’ বাংলাদেশে মিথ্যা ও প্রতারণার রাজনীতি যেহেতু ফুলে-ফলে বিকশিত, জনগণও খুব একটা মাথা ঘামায় না যে রাজনৈতিক নেতারা কখন কোথায় কী বলছেন। গণতন্ত্রের সত্যিকার চর্চা হলে এ সুযোগ থাকত না। জুলাই সনদে আপত্তি ছিল বলে গণভোটের রায়কে মুখের কথায় উড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হতো না। আওয়ামী লীগ ২০০৮ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে ক্ষমতায় আসার পর থেকে ২০২৪ সালের জুলাই পর্যন্ত রাজনীতিতে যে ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি করেছিল, বিএনপি সরকার সে পথেই হাঁটছে বলে মনে হচ্ছে, যার ফলাফল খুব শুভ হবে না।</p> <p style="text-align: justify;">গণতন্ত্রবিহীন রাজনীতিতে সত্যের পথে বাধা শুধু রাজনীতিবিদরাই নন, বরং এই বাধা আরও জটিল হয়ে ওঠে গণমাধ্যম ও সাংবাদিকতার ভূমিকার কারণে, যাঁদের পথ খুঁজে নিতে হয় পক্ষপাত ও তথ্য প্রকাশের চাপের মধ্যে।  এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের উত্থান বিভ্রান্তিকর তথ্য ও রাজনৈতিক ন্যারেটিভের ক্ষেত্রকে আরও সম্প্রসারিত করে রাজনৈতিক বাদানুবাদকে উন্মুক্ত করেছে। গণতন্ত্রকে যখন এসব সমস্যায় জড়িত, তখন রাজনীতিবিদদের মিথ্যাচার ও প্রতারণা নিয়ে জবাবদিহির কথা কেউ ভাবছে না। সত্য যে গণতন্ত্রের মৌলিক মূল্যবোধ, যা সচেতন সিদ্ধান্ত গ্রহণ, জবাবদিহি এবং গণতন্ত্রের টিকে থাকার জন্য অপরিহার্য, তা নিয়ে মনে হয় কারও মাথাব্যথাও নেই।</p> <p style="text-align: justify;"><strong>লেখক : যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী সিনিয়র সাংবাদিক</strong></p>