<p style="text-align: justify;">চরম হতাশায় ব্যবসায়ীরা। অন্তর্বর্তী সরকারের ভয়াবহ বৈরী অবস্থার পর নতুন সরকারের কাছে পাহাড় পরিমাণ প্রত্যাশা ছিল; কিন্তু কোনো প্রত্যাশাই পূরণ হচ্ছে না। সরকারি বন্ধ কারখানাগুলো চালু করার বিষয়ে মন্ত্রীরা কথা বললেও বেসরকারি কলকারখানা একের পর এক বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা ভুয়া মামলা প্রত্যাহার হচ্ছে না। ব্যবসার কাজে অনেক ব্যবসায়ী বিদেশ যেতে পারছেন না। এমনকি চিকিৎসার জন্যও বিদেশ যাওয়ার অনুমতি মিলছে না।</p> <p style="text-align: justify;">সংশ্লিষ্টরা জানান, পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে একজন শীর্ষ ব্যবসায়ী বলতে বাধ্য হয়েছেন, ব্যবসায়ীদের করের টাকা কোন খাতে ব্যবহার হচ্ছে, তা জানাতে হবে। বস্ত্রকল মালিকদের সংগঠন বিটিএমএ সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল সরকারের কাছে প্রশ্ন তুলে সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে বলেন, ‘আপনি যেভাবে আমাকে ধরপাকড় করে কর আদায় করেন, আমার করের টাকা আপনি কীভাবে খরচ করেন, সেটার জবাবদিহি দরকার।’</p> <p style="text-align: justify;">প্রয়াত অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমান দেশের শিল্পায়নের জন্য বিভিন্নভাবে নীতিসহায়তা দিয়ে সহায়তা করেছিলেন উল্লেখ করে বিটিএমএ সভাপতি আরও বলেন, ‘আমরা কি ওই পথে আছি এখন? আমার মনে হয়, না। এখন আমাদের ব্যবসায় ধস নামছে। শিল্পকারখানা বন্ধ হচ্ছে। ব্যবসার জন্য যে সুযোগ বা পরিবেশ দরকার, সেটা সরকার নিশ্চিত করতে পারছে না। নীতি সংস্কার হচ্ছে না।’</p> <p style="text-align: justify;">অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করার পর একের পর এক শিল্পকারখানা বন্ধ হয়েছে। বিভিন্ন তথ্যানুযায়ী, ওই সময়ে ৪০০টির মতো শিল্পকারখানা বন্ধ হয়েছে। যার মধ্যে গার্মেন্ট, টেক্সটাইল, স্পিনিং মিলের মতো প্রতিষ্ঠান ছাড়াও রয়েছে শতভাগ রপ্তানিমুখী কারখানা। এর ফলে চাকরি হারিয়েছেন প্রায় দেড় লাখ শ্রমিক। বন্ধ শিল্পকারখানার মালিকদের প্রত্যাশা ছিল নির্বাচিত সরকার এসে এসব শিল্পকারখানা চালুর উদ্যোগ নেবে। বেকার শ্রমিকরা আবারও কাজে ফেরার সুযোগ পাবেন। তবে বাস্তবতা হচ্ছে সরকারি বন্ধ কারখানা চালুর বিষয়ে মন্ত্রীরা বক্তব্য দিলেও বেসরকারি খাতের বন্ধ শিল্পকারখানার বিষয়ে কী ধরনের নীতিসহায়তা দেওয়া হবে, সেটি এখনো জানা যায়নি। ফলে এসব শিল্পকারখানার মালিকদের মধ্যে চরম হতাশা বিরাজ করছে।</p> <p style="text-align: justify;">সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় এসে বন্ধ কারখানা চালুর নীতি ঘোষণা করলেও পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে নানান সংকটে চালু কারখানাই এখন বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। গত দুই মাসে সরকার এমন কোনো কর্মকাণ্ড দেখাতে পারেনি যা ব্যবসায়ীদের মধ্যে আস্থার পরিবেশ তৈরি করবে। নিট তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিকেএমইএর সাবেক সভাপতি ফজলুল হক বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘দীর্ঘদিনের অযত্ন-অবহেলার কারণে ব্যবসাবাণিজ্যে যে হতাশার সৃষ্টি হয়েছে, তা কাটানোর জন্য অনেক বেশি মনোযোগ দরকার ছিল। সেটি পাওয়া যায়নি।’</p> <p style="text-align: justify;">তৈরি পোশাক খাতের এই ব্যবসায়ী নেতা বলেন, ‘যদিও নির্বাচিত সরকারের বয়স দুই মাস। এ সরকারের হয়তো অনেক অগ্রাধিকার আছে। তার মধ্যেও বেসরকারি খাত আরও বেশি মনোযোগ প্রত্যাশা করে। বিশেষ করে যেসব শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে গেছে, সেগুলো চালুর ব্যাপারে সরকারের নীতিসহায়তা ঘোষণা করা উচিত।’ ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলার বিষয়টিও বর্তমানে দেশের অর্থনীতির জন্য একটি গুরুতর উদ্বেগ হিসেবে দেখা দিয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে এ ধরনের মামলা কেবল ব্যক্তিগত হয়রানি নয়, বরং শিল্প খাত ধ্বংস এবং ব্যবসায়িক পরিবেশ অস্থিতিশীল করার গভীর ষড়যন্ত্র হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।</p> <p style="text-align: justify;">২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে শীর্ষ ব্যবসায়ীদের আসামি করে অজস্র ‘গায়েবি’ বা সাজানো মামলা দায়ের করা হয়েছে। এই ঢালাও মামলার কারণে ব্যবসায়ীরা আতঙ্কে আছেন, যার ফলে শিল্পোৎপাদন ও বিনিয়োগ ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এসব মামলার কারণে ব্যবসা বা চিকিৎসার প্রয়োজনে জরুরি ভিত্তিতে বিদেশ ভ্রমণের প্রয়োজন হলেও মিথ্যা মামলায় নাম থাকার কারণে অনেক ব্যবসায়ী বিদেশ যেতে পারছেন না। অনেককে ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে বিমানবন্দর থেকে। মামলার আতঙ্ক থেকে স্বাভাবিক ব্যবসাবাণিজ্যে মনোযোগ দিতে পারছেন না ব্যবসায়ীরা। উপরন্তু হয়রানির কারণে নতুন বিনিয়োগেও যেতে পারছেন না।</p> <p style="text-align: justify;">সংশ্লিষ্টরা জানান, জুলাই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনামলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি একেবারেই ভেঙে পড়েছিল। মব-ভায়োল্যান্স, চাঁদাবাজি, মিথ্যা মামলাসহ নানানভাবে ব্যবসায়ীদের হয়রানি করা হয়। বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিতে ব্যবসাবাণিজ্যের স্বাভাবিক কাঠামো ভেঙে পড়ে। বন্ধ হয়ে যায় একের পর এক কারখানা। বেকার হন লাখ লাখ শ্রমিক। এ পরিস্থিতিতে দেশের ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তাদের প্রত্যাশা ছিল নির্বাচিত সরকার এলে আস্থা ফিরে পাবেন ব্যবসায়ীরা। তবে গত দুই মাসে সে প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। ব্যবসায়ীদের হতাশাও কাটেনি। ব্যবসায়ীদের হতাশা রয়েছে অর্থনৈতিক সংকট নিয়েও। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ঋণের উচ্চ সুদ, ডলারসংকট এবং আমদানিতে কড়াকড়ি কোনো কিছুরই সমাধান হচ্ছে না। উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, বিনিয়োগে স্থবিরতা, সরকারি নীতির দুর্বলতায় রপ্তানি ও অভ্যন্তরীণ বাজারে বড় ধস নেমেছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতিও স্বাভাবিক হচ্ছে না। বহির্বাণিজ্যে কাটছে না অনিশ্চয়তা। নির্বাচিত সরকার আসার পর ব্যবসাবাণিজ্যে যে আস্থার পরিবেশ প্রত্যাশা করা হচ্ছিল, সেটিও নিশ্চিত হয়নি। এ পরিস্থিতিতে যেখানে ব্যবসায়ীদের উন্মুক্ত পরিসরে ব্যবসাবাণিজ্য করার সুযোগ আর নীতিসহায়তা দরকার, সেখানে নির্বাচিত সরকারের আমলে নতুন করে হয়রানির আশঙ্কায় চরম হতাশায় আছেন ব্যবসায়ীরা।</p> <p style="text-align: justify;">বাংলাদেশ গার্মেন্ট বায়িং হাউস অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিবিএ) উপদেষ্টা মোহাম্মদ মফিজ উল্লাহ বাবলু বলেন, ‘মানুষ নতুন সরকারের কাছে অনেক আশা নিয়ে তাকিয়ে ছিল। দ্রব্যমূল্যের নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান, দুর্নীতি ও হয়রানিমুক্ত প্রশাসন। কিছু ক্ষেত্রে উদ্যোগ দেখা গেলেও সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা অনুযায়ী বাস্তব পরিবর্তন এখনো পুরোপুরি চোখে পড়েনি। বন্ধ কলকারখানা চালু করা এবং শিল্পাঞ্চলে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস, পানি ও বিদ্যুৎ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সরকারের পদক্ষেপ প্রত্যাশিত গতিতে এগোয়নি। উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় অনেক প্রতিষ্ঠান লোকসানের মুখে পড়েছে, শ্রমিকদের চাকরি অনিশ্চয়তায় পড়েছে এবং নতুন বিনিয়োগেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।’</p> <p style="text-align: justify;"><strong>সূত্র : বাংলাদেশ প্রতিদিন</strong></p>