বৈশ্বিক অর্থনীতির অনিশ্চয়তা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের পুনর্বিন্যাস এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে নতুন ধরনের অর্থনৈতিক অংশীদারির প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া সফর বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশ একদিকে প্রবৃদ্ধির ধারা বজায় রাখতে সক্ষম হলেও, অন্যদিকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, বিনিয়োগ ঘাটতি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং রপ্তানি বাজার বহুমুখীকরণের মতো চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে। এই বাস্তবতায় অর্থনৈতিক কূটনীতি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির একটি কেন্দ্রীয় উপাদান হয়ে উঠেছে।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম শক্তিশালী অর্থনীতি মালয়েশিয়া দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের জন্য শ্রমবাজার, বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং শিক্ষা সহযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। দেশটিতে বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশি কর্মরত রয়েছেন, যাদের পাঠানো রেমিট্যান্স জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। একই সঙ্গে মালয়েশিয়া আসিয়ান অঞ্চলে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সংযোগ সম্প্রসারণের একটি সম্ভাবনাময় প্রবেশদ্বার হিসেবে বিবেচিত। এই প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া সফরকে কেবল একটি আনুষ্ঠানিক বা সৌজন্যমূলক কূটনৈতিক সফর হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এটি দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার, নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণের, শ্রমবাজার সম্প্রসারণের এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত সহযোগিতার ভিত্তি শক্তিশালী করার একটি প্রচেষ্টা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। ফলে সফরটি প্রত্যাশা, অর্জন এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার আলোকে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত ঘটনা হিসেবে স্থান করে নেয়।
বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার সম্পর্কের ভিত্তি গড়ে উঠেছে ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক এবং অর্থনৈতিক বাস্তবতার ওপর। স্বাধীনতার পর থেকে মালয়েশিয়া বাংলাদেশকে একটি গুরুত্বপূর্ণ মুসলিম দেশ এবং সম্ভাবনাময় উন্নয়ন অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করে এসেছে। কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার পর ধীরে ধীরে বাণিজ্য, শিক্ষা, শ্রমবাজার এবং বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সহযোগিতা সম্প্রসারিত হয়।
বিশেষ করে ১৯৮০-এর দশক থেকে মালয়েশিয়ার দ্রুত শিল্পায়ন ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের ফলে বিপুল পরিমাণ বিদেশি শ্রমিকের চাহিদা তৈরি হয়। বাংলাদেশ এই শ্রমবাজারের অন্যতম প্রধান উৎসে পরিণত হয়। নির্মাণ, উৎপাদন, কৃষি ও সেবা খাতে বাংলাদেশি কর্মীদের অংশগ্রহণ মালয়েশিয়ার অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই সম্পর্ক কেবল শ্রমবাজারনির্ভর না থেকে শিক্ষা ও জ্ঞান বিনিময়েও বিস্তৃত হয়। বহু বাংলাদেশি শিক্ষার্থী মালয়েশিয়ার উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়ন করার সুযোগ পায়।
একই সঙ্গে মালয়েশিয়ার উন্নয়ন অভিজ্ঞতা, রপ্তানিমুখী শিল্পায়ন মডেল এবং অর্থনৈতিক কাঠামো বাংলাদেশের নীতিনির্ধারণে আগ্রহের বিষয় হয়ে ওঠে। ফলে দুই দেশের সম্পর্ক কেবল অতীতের সহযোগিতার ওপর নয়, বরং ভবিষ্যতের বহুমাত্রিক অর্থনৈতিক সম্ভাবনার ওপরও দাঁড়িয়ে আছে।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে অর্থনৈতিক কূটনীতির ধারণা শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে জিয়াউর রহমানের সময়কালকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায় হিসেবে দেখা হয়। তার সময়ে উন্নয়নশীল মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয় এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ বৃদ্ধি পায়। সেই ধারাবাহিকতায় মালয়েশিয়ার সঙ্গে সম্পর্কও বিকশিত হতে শুরু করে, যদিও তখন তা সীমিত পরিসরে ছিল। পরবর্তী সময়ে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন সরকারের সময় মালয়েশিয়ার সঙ্গে শ্রমবাজারভিত্তিক সম্পর্ক উল্লেখযোগ্যভাবে সম্প্রসারিত হয়। বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশি কর্মী মালয়েশিয়ায় কর্মসংস্থান লাভ করে, যা রেমিট্যান্স প্রবাহে বড় অবদান রাখে। একই সঙ্গে বাণিজ্যিক যোগাযোগও বৃদ্ধি পায়।
তবে এই পর্যায়ের সম্পর্ক মূলত শ্রমশক্তি রপ্তানিকেন্দ্রিক ছিল এবং উচ্চমূল্যের বিনিয়োগ, প্রযুক্তি স্থানান্তর বা শিল্পভিত্তিক সহযোগিতা তুলনামূলকভাবে সীমিত ছিল। তবুও এই সময়কালে গড়ে ওঠা মানবসম্পদ ও অর্থনৈতিক সংযোগ পরবর্তী সম্পর্কের ভিত্তি তৈরি করে। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ছিল বেশির ভাগ ভারত কেন্দ্রিক ফলে মালয়েশিয়ার মতো মুসলিম দেশগুলোর সাথে দেশের অর্থনৈতিক সংযোগে তেমন বড় ধরনের পরিবর্তন আসেনি। অথচ রোহিঙ্গা সংকটের সময় মালয়েশিয়া আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অবস্থানের প্রতি সমর্থন জানায়।
তবে বাণিজ্যে ভারসাম্যহীনতা অব্যাহত থাকে। একই সঙ্গে প্রত্যাশিত মাত্রায় মালয়েশীয় বিনিয়োগও দেশে প্রবাহিত হয়নি। বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, অবকাঠামো ও উৎপাদন খাতে সম্ভাবনা থাকলেও তা পূর্ণভাবে বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে সম্পর্কের রাজনৈতিক ও সামাজিক ভিত্তি শক্তিশালী হলেও অর্থনৈতিক গভীরতা এখনো সম্ভাবনার তুলনায় সীমিত রয়ে গেছে। এই বাস্তবতাই সাম্প্রতিক সফরকে নতুনভাবে গুরুত্ব দিয়েছে, যেখানে শ্রমবাজার নির্ভরতা থেকে বেরিয়ে এসে বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিনির্ভর অংশীদারি গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর প্রথম গুরুত্বপূর্ণ বিদেশ সফরের গন্তব্য হিসেবে মালয়েশিয়ার নির্বাচন কেবল কূটনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং একটি কৌশলগত অর্থনৈতিক বার্তা বহন করে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দিকে অর্থনৈতিক কূটনীতি সম্প্রসারণের ইঙ্গিত এর মাধ্যমে স্পষ্ট হয়েছে। বৈশ্বিক উৎপাদন ও বাণিজ্যের কেন্দ্র ধীরে ধীরে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে স্থানান্তরিত হওয়ায় আসিয়ানভুক্ত দেশগুলো এখন আন্তর্জাতিক অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।
এই প্রেক্ষাপটে মালয়েশিয়া বাংলাদেশের জন্য শুধু শ্রমবাজার নয়, বরং আঞ্চলিক অর্থনৈতিক প্রবেশদ্বার হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ। প্রযুক্তি, ডিজিটাল অর্থনীতি, হালাল শিল্প এবং উচ্চমূল্যের উৎপাদন খাতে মালয়েশিয়ার সক্ষমতা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক রূপান্তরের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা ও সহযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি করে। ফলে এই সফরকে কূটনৈতিক সৌজন্যের পাশাপাশি একটি অর্থনৈতিক বিনিয়োগ হিসেবেও দেখা যায়। একই সঙ্গে এই সফর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির বহুমুখীকরণের একটি স্পষ্ট বার্তা বহন করে। উন্নয়ন সহযোগিতা ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে নতুন অংশীদার খোঁজার যে বৈশ্বিক প্রবণতা রয়েছে, বাংলাদেশও সেই বাস্তবতার সঙ্গে নিজেকে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার চেষ্টা করছে। সফরকালে মালয়েশিয়ার উষ্ণ অভ্যর্থনা ও উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক অংশগ্রহণ দুই দেশের সম্পর্কের বর্তমান ইতিবাচক অবস্থানকে প্রতিফলিত করে।
বৈঠক ও আলোচনাগুলো থেকে স্পষ্ট হয় যে উভয় দেশই সম্পর্ককে আরো গভীর ও বিস্তৃত করতে আগ্রহী। অতীতে শ্রমবাজার, অভিবাসন নীতি ও প্রশাসনিক জটিলতার কারণে যে কিছু টানাপোড়েন সৃষ্টি হয়েছিল, এই সফর তা প্রশমিত করে নতুন করে আস্থার পরিবেশ তৈরি করেছে।
মালয়েশিয়া সফরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রত্যাশা ছিল বহুমাত্রিক। শ্রমবাজার, বিনিয়োগ, বাণিজ্য, প্রযুক্তি এবং মানবসম্পদ উন্নয়ন—সবকিছু মিলিয়ে একটি বাস্তবভিত্তিক অগ্রগতির লক্ষ্য স্পষ্ট ছিল। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার ছিল শ্রমবাজার। মালয়েশিয়ায় নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, নিয়োগ প্রক্রিয়া সহজীকরণ এবং ভিসা ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার মাধ্যমে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ানো বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিন ধরে বিদেশে কর্মসংস্থানই বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস হওয়ায় এই খাতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
একই সঙ্গে মালয়েশীয় বিনিয়োগ আকর্ষণের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। বাংলাদেশ চেয়েছে যে মালয়েশিয়ার বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলো দেশটিকে একটি উৎপাদন ও বিনিয়োগ কেন্দ্র হিসেবে বিবেচনা করুক। বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, অবকাঠামো, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, ডিজিটাল অর্থনীতি এবং শিল্প উৎপাদন খাতে বিনিয়োগের মাধ্যমে দেশের শিল্পায়ন ত্বরান্বিত করা সম্ভব বলে মনে করা হচ্ছে। এর পাশাপাশি বাণিজ্য সম্প্রসারণও একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য ছিল, যেখানে বাংলাদেশ মূলত তৈরি পোশাক, ওষুধ, চামড়া, কৃষিপণ্য এবং হালাল খাদ্যপণ্যের রপ্তানি বাড়াতে চায়, কারণ বর্তমান বাণিজ্য কাঠামো এখনো ভারসাম্যহীন।
শিক্ষা, প্রযুক্তি এবং দক্ষতা উন্নয়নের ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য প্রত্যাশা ছিল। কারিগরি প্রশিক্ষণ, উচ্চশিক্ষা সহযোগিতা এবং প্রযুক্তি স্থানান্তরের মাধ্যমে বাংলাদেশের মানবসম্পদকে আরও প্রতিযোগিতামূলক করার লক্ষ্য ছিল। একই সঙ্গে কৃষি, খাদ্য নিরাপত্তা এবং হালাল শিল্পে যৌথ উদ্যোগের মাধ্যমে নতুন অর্থনৈতিক ক্ষেত্র তৈরির সম্ভাবনাও আলোচনায় ছিল।
এই প্রত্যাশার বিপরীতে দুই দেশ শ্রমবাজার, বিনিয়োগ, বাণিজ্য এবং দক্ষতা উন্নয়নে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে ইতিবাচক অবস্থান ব্যক্ত করেছে। বিশেষ করে শ্রমবাজার সম্প্রসারণ এবং নিয়োগ প্রক্রিয়া সহজীকরণের বিষয়ে মালয়েশিয়ার মনোভাব বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। তবে তাৎক্ষণিক বড় পরিবর্তনের চেয়ে ভবিষ্যৎ সুযোগের দিকেই বেশি অগ্রগতি দেখা গেছে।
বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, উৎপাদন শিল্প, লজিস্টিকস, বন্দর ব্যবস্থাপনা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং ডিজিটাল অবকাঠামো খাতে মালয়েশীয় বিনিয়োগের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। যদিও এগুলো এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে, তবুও ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ কাঠামো তৈরিতে এটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। বাংলাদেশি পণ্যের বাজার সম্প্রসারণ এবং দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বৈচিত্র্য বৃদ্ধির বিষয়টি আলোচনায় এসেছে, যা দীর্ঘমেয়াদে বাণিজ্য ভারসাম্যহীনতা কমাতে সহায়ক হতে পারে। একই সঙ্গে শিক্ষা, প্রযুক্তি এবং দক্ষতা উন্নয়নে যৌথ কর্মসূচির সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে, বিশেষ করে চতুর্থ শিল্পবিপ্লব ও ডিজিটাল অর্থনীতির সঙ্গে সম্পর্কিত ক্ষেত্রে।
এই সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হলো তাৎক্ষণিক চুক্তির চেয়ে রাজনৈতিক আস্থা ও ভবিষ্যৎ সহযোগিতার ভিত্তি শক্তিশালী হওয়া। আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে অনেক সময় এই আস্থাই পরবর্তী বড় অর্থনৈতিক চুক্তির পথ তৈরি করে। এই ধারাবাহিকতায় ভবিষ্যতে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে বাংলাদেশি কর্মীদের অংশগ্রহণ আরও সম্প্রসারিত হওয়ার সম্ভাবনা; নির্মাণ, উৎপাদন, কৃষি, সেবা এবং প্রযুক্তিনির্ভর খাতে শ্রমশক্তির সরবরাহ এবং পাশাপাশি মালয়েশীয় বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে বিনিয়োগে আগ্রহ দেখানোর বিষয়টিও সামনে এসেছে। বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, শিল্প উৎপাদন, লজিস্টিকস, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং ডিজিটাল অবকাঠামো খাতে সম্ভাব্য বিনিয়োগ নিয়ে আলোচনা চলছে।
প্রযুক্তি, দক্ষতা উন্নয়ন এবং উচ্চশিক্ষা সহযোগিতার ক্ষেত্রেও নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। কারিগরি প্রশিক্ষণ, শিল্প দক্ষতা উন্নয়ন এবং হালাল শিল্পে সহযোগিতা দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন মাত্রা দিতে পারে। তবে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা অনুযায়ী এসব আশ্বাসের বাস্তব মূল্য নির্ধারিত হয় বাস্তবায়নের মাধ্যমে, ঘোষণার মাধ্যমে নয়।
বর্তমান সফরে বাংলাদেশ নিজেদেরকে শুধু শ্রমশক্তির উৎস নয়, বরং একটি সম্ভাবনাময় উৎপাদন ও বিনিয়োগ গন্তব্য হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেছে। দক্ষ জনশক্তি সরবরাহ, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি এবং যৌথ শিল্প উদ্যোগের প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে দেশটি একটি দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বের দিকে অগ্রসর হতে চায়। এই প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়িত হলে সম্পর্ক শ্রমবাজারনির্ভর কাঠামো থেকে বহুমাত্রিক অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বে রূপান্তরিত হতে পারে।
বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া সম্পর্ক দীর্ঘমেয়াদে সম্ভাবনাময় হলেও এর স্থায়িত্ব ও গভীরতা নিশ্চিত করতে কিছু কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ রয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হলো শ্রমবাজার ব্যবস্থাপনা ও নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতার অভাব, যেখানে অতীতে মধ্যস্বত্বভোগী, উচ্চ খরচ এবং প্রশাসনিক জটিলতা সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। একই সঙ্গে বিদেশি বিনিয়োগের জন্য অনুকূল পরিবেশ না থাকা—যেমন ভূমি ব্যবস্থাপনা জটিলতা, দীর্ঘ অনুমোদন প্রক্রিয়া ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা—মালয়েশিয়ার মতো বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করার পথে বড় বাধা হিসেবে কাজ করছে। বাণিজ্য ভারসাম্যহীনতাও একটি দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা, কারণ বাংলাদেশ আমদানি বেশি করলেও রপ্তানি তুলনামূলকভাবে কম। এর পাশাপাশি আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা এবং নীতিগত ধারাবাহিকতার অভাবও সম্পর্কের স্থিতিশীল অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।
এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় দুই দেশের সম্পর্ককে আরও প্রাতিষ্ঠানিক ও ফলাফলভিত্তিক কাঠামোয় নিয়ে আসা প্রয়োজন। একটি সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তির মাধ্যমে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও সেবা খাতকে একক কাঠামোয় আনা যেতে পারে। পাশাপাশি কারিগরি ও পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিলে বাংলাদেশি কর্মীদের উৎপাদনশীলতা ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা বাড়বে। যৌথ বিনিয়োগ তহবিল গঠন করে অবকাঠামো, জ্বালানি ও উৎপাদন খাতে বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন সহজ করা যেতে পারে। কৃষি, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও হালাল শিল্পে যৌথ উদ্যোগ নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে, বিশেষ করে প্রযুক্তি স্থানান্তরের মাধ্যমে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি সম্ভব। একই সঙ্গে পরিবহন ও লজিস্টিকস ব্যবস্থার উন্নয়ন—যেমন সরাসরি বিমান ও সমুদ্রপথ সংযোগ—ব্যবসায়িক কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করবে। বেসরকারি খাতের সক্রিয় অংশগ্রহণও এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ প্রকৃত অর্থনৈতিক অগ্রগতি নির্ভর করে উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীদের ভূমিকার ওপর।
সব মিলিয়ে, বাংলাদেশ–মালয়েশিয়া সম্পর্ক এখন একটি নতুন অর্থনৈতিক পর্বের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। তাৎক্ষণিক বড় অর্জনের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো আস্থা ও নীতিগত ভিত্তি তৈরি হওয়া, যার ওপর ভবিষ্যৎ সহযোগিতা দাঁড়াতে পারে। তবে এই সম্ভাবনাকে বাস্তব রূপ দিতে হলে প্রয়োজন ধারাবাহিক নীতি, কাঠামোগত সংস্কার এবং কার্যকর বাস্তবায়ন সক্ষমতা। সঠিকভাবে এগোতে পারলে এই অংশীদারিত্ব শ্রমবাজার, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও বাণিজ্যের সমন্বয়ে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সেতুবন্ধনে পরিণত হতে পারে।
লেখক : অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও কলামিস্ট






