আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) তথ্যমতে, বিশ্বজুড়ে এখনো প্রায় ১৩ কোটি ৩৮ লাখ শিশু শিশুশ্রমের শিকার হচ্ছে। এই ভয়াবহ পরিস্থিতি মোকাবেলায় এবং শিশুশ্রমের বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী আন্দোলনকে ত্বরান্বিত করতে প্রতি বছর ১২ জুন শিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবস পালন করা হয়।
গবেষণা বলছে, বাংলাদেশেও কর্মজীবী রয়েছে ৩৫ লাখ ৩৬ হাজার ৯২৭ জন শিশু, যাদের বয়স ১৭ বছরের কম। ১৩ বছরের কম শিশুশ্রমিক রয়েছে ১৭ লাখ ৭৬ হাজার ৯৭ জন। ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিযুক্ত শিশুশ্রমিক ১০ লাখ ৬৮ হাজার ২১২ জন।
বাংলাদেশ সরকার ২০২৫ সালের মধ্যে দেশে শিশুশ্রম শূন্যের কোটায় আনার লক্ষ্যমাত্রা ঘোষণা করলেও সেটি বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। বরং প্রতিবছরই প্রাতিষ্ঠানিক-অপ্রাতিষ্ঠানিক শিশুশ্রমের পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রমে যুক্ত হচ্ছে হাজার হাজার কচি হাত। পরিবারের সঠিক পরিচর্যার অভাবে শিশুরা জড়াচ্ছে অপরাধে।
শিশুশ্রম প্রতিরোধে সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে ৪৩ ধরনের কাজকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। যার মধ্যে উপকূলীয় এলাকায় গড়ে ওঠা শুঁটকি খাতের মোট কর্মশক্তির প্রায় ২০ শতাংশ শিশু। শিশুশ্রমিকদের মধ্যে আবার ৭৪ শতাংশ হলো মেয়ে শিশুশ্রমিক। অন্যদিকে ধাতু কারখানা খাতেও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিশু একইভাবে উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিযুক্ত। কারখানা খাতে ৮০ শতাংশ ছেলে শিশু।
সরকারের কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের উপ-মহাপরিদর্শক মাহবুবুল হাসান কালের কণ্ঠকে বলেন, জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদের আলোকে প্রতিটি শিশুর ৬টি মৌলিক অধিকার রয়েছে। শিশুদের বিকাশের জন্য এই মৌলিক অধিকারগুলো অপরিহার্য। সুষম ও পুষ্টিকর খাবার পাওয়ার অধিকার। লজ্জা নিবারণ ও শরীর ঢাকতে পর্যাপ্ত পোশাক পাওয়ার অধিকার। নিরাপদ আশ্রয় বা থাকার জায়গা পাওয়ার অধিকার। নিজের মেধা ও দক্ষতা বিকাশের জন্য স্কুলে পড়াশোনা করার সুযোগ পাওয়ার অধিকার। অসুস্থ হলে প্রয়োজনীয় ওষুধ, চিকিৎসা এবং স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার অধিকার। যে কোনো ধরনের নির্যাতন, অবহেলা ও ক্ষতি থেকে সুরক্ষিত থাকার অধিকার। শিশুশ্রম শিশুদের মৌলিক অধিকারগুলো কেড়ে নেয় এবং একটি দেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করে। আগের ৩৮টি কাজকে শিশুদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করেছি। নতুনকরে আরো ৫টি কাজকে অন্তর্ভুক্ত করে শিশুশ্রম প্রতিরোধে কাজ করছে।
তিনি আরো বলেন, আমরা আইন প্রয়োগ করে শিশুদের ঝুঁকিপূর্ণ কাজ থেকে বিরত রাখতে কাজ করি। কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতা হলো দরিদ্র পরিবারের পিতা-মাতা তখন এগিয়ে এসে বলেন, সন্তান আয় না করলে খাবে কী? অর্থাৎ পরিবারের কর্তাদের আয়ে যখন সংসার চলে না তখন বাধ্য হয়ে অ্যালুমিনিয়াম, ভারী লৌহজাত শিল্প, শুঁটকি শিল্পে নিজেদের সন্তানদের নিযুক্ত করেন। তবু সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে আমরা নিয়মিত আইনের ভেতর থেকে শিশুশ্রম নিরসনে কাজ করছি।
বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ইপসার (ইয়ং পাওয়ার ইন সোশ্যাল অ্যাকশন) হেড অব অ্যাডভোকেসি মোহাম্মদ আলী শাহীন বলেন, দরিদ্র পরিবারের পাশাপাশি বাস্তুচ্যুত পরিবারের শিশুরা ঝুঁকিপূর্ণ পেশায় জড়ায়। এক প্রকার বাধ্য হয়েই শিশুরা স্কুল, বই, খাতা, কলম ছেড়ে ধাতু-ভিত্তিক কারখানা, রাসায়নিক কারখানা, জাহাজ-পুনর্ব্যবহার কেন্দ্র এবং শুঁটকি মাছ প্রক্রিয়াকরণ প্রতিষ্ঠানে শ্রমিক হিসেবে কাজ করে। শুধু আইন প্রয়োগ নয়, পরিবারের জীবনমান উন্নয়ন করে শিশুদের শ্রমের আয়ের ওপর পরিবারের নির্ভরতা কমালে শিশুশ্রম কমে আসবে। শিশুদের আজ শ্রমে না খাটিয়ে সুশিক্ষিত করলে ভবিষ্যতে তারা দেশের বড় অর্থনৈতিক সম্পদে পরিণত হবে। দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন দক্ষ জনশক্তি ছাড়া কোনো দেশ উন্নত হতে পারে না।
এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, চট্টগ্রাম নগরে ভাসমান প্রায় ১০ হাজার শিশু রয়েছে যাদের বড় একটা অংশ গাম বা ডান্ডি সেবন করে। নগরজুড়ে তারা ছিনতাই, চুরির পাশাপাশি খোলা ট্রাক, মিনিট্রাকের পণ্য চুরিতে হাতেখড়ির মাধ্যমে অপরাধ জগতে প্রবেশ করছে।
একটি গোয়েন্দা সংস্থার তথ্য মতে, বড় বড় সন্ত্রাসীদের সোর্স হিসেবেও কাজ করছে বেশ কিছু ভাসমান শিশু। তাদেরকে সমাজের মূলধারায় ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি ভাসমান শিশুদের পরিবারগুলো পুনর্বাসন করার সুপারিশ করা হয়েছে।