পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি (ওয়াশ) খাতে আগামী অর্থবছরের উন্নয়ন বাজেট বেড়েছে। টানা তিন বছর নিম্নমুখী থাকার পর ২০২৬-২৭ অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ প্রায় ২৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ১৩ হাজার ৬১৮ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। তবে বরাদ্দ বৃদ্ধির এই ইতিবাচক চিত্রের মধ্যেও পুরোনো একটি প্রশ্ন নতুন করে সামনে এসেছে— যেখানে নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন সুবিধার ঘাটতি সবচেয়ে বেশি, সেই গ্রামীণ, হাওর, চর ও উপকূলীয় এলাকাগুলো কি পর্যাপ্ত গুরুত্ব পাচ্ছে?
পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) ও ওয়াটারএইড বাংলাদেশের যৌথ বাজেট বিশ্লেষণ বলছে, বাস্তবতা এখনো উল্টো। ওয়াশ খাতে মোট এডিপি বরাদ্দের প্রায় ৭২ শতাংশই যাচ্ছে শহরাঞ্চলে। এর বড় অংশ ব্যয় হবে ওয়াসাভিত্তিক বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্পে।
- বাড়লেও আগের শীর্ষ অবস্থান থেকে অনেক দূরে
২০২২-২৩ অর্থবছরে ওয়াশ খাতে সর্বোচ্চ ১৮ হাজার ২২৮ কোটি টাকা বরাদ্দ হয়েছিল। এরপর টানা তিন বছর বরাদ্দ কমেছে। সেই ধারা থেকে বেরিয়ে এবার বরাদ্দ বেড়ে ১৩ হাজার ৬১৮ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। গত অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ ছিল ১০ হাজার ৯০১ কোটি টাকা।
তবে গবেষণা সংস্থাগুলোর মতে, জাতীয় বাজেট ও মোট এডিপির তুলনায় ওয়াশ খাতের অংশীদারিত্ব খুব বেশি বাড়েনি। ফলে বরাদ্দ বৃদ্ধির সুফল প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে কতটা পৌঁছাবে, তা নিয়ে সংশয় রয়ে গেছে।
- ওয়াসার ঝুলিতে অর্ধেকের কাছাকাছি অর্থ
বিশ্লেষণে দেখা গেছে, চারটি ওয়াসা মিলে পেয়েছে ৬ হাজার ৬৭৩ কোটি টাকা, যা মোট ওয়াশ বরাদ্দের প্রায় অর্ধেক। শুধু ঢাকা ওয়াসার জন্যই বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৫ হাজার ১০ কোটি টাকা। অর্থাৎ পুরো ওয়াশ এডিপি বরাদ্দের প্রায় ৩৭ শতাংশ যাচ্ছে একটি সংস্থার কাছে।
গবেষকরা বলেন, এসব অর্থের বড় অংশ দীর্ঘদিন ধরে চলমান বৃহৎ প্রকল্পে ব্যয় হচ্ছে। ফলে প্রকল্প বাস্তবায়নের ধীরগতি, ব্যয় বৃদ্ধি এবং সেবার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে।
- গ্রামীণ সেবার প্রধান প্রতিষ্ঠানটির বরাদ্দ কমেছে
অন্যদিকে গ্রামীণ এলাকায় নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন সুবিধা সম্প্রসারণের দায়িত্বে থাকা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের (ডিপিএইচই) বরাদ্দ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে সংস্থাটির বরাদ্দ ছিল ৩ হাজার ৪২৮ কোটি টাকার বেশি। আগামী অর্থবছরে তা কমে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৪০৮ কোটি টাকায়। এক বছরের ব্যবধানে বরাদ্দ কমেছে প্রায় ১ হাজার ২০ কোটি টাকা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গ্রামীণ পানি সরবরাহ, জলবায়ু-সহনশীল অবকাঠামো এবং স্যানিটেশন ব্যবস্থার উন্নয়নে ডিপিএইচইর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। তাই বরাদ্দ কমে যাওয়া উদ্বেগের বিষয়।
- নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন থেকে বঞ্চিত লাখো মানুষ
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও ইউনিসেফের এমআইসিএস ২০২৫ জরিপ অনুযায়ী, দেশের ৪১ দশমিক ৮ শতাংশ মানুষ এখনো নিরাপদ খাবার পানির সুবিধা থেকে বঞ্চিত। একই সঙ্গে ৬০ দশমিক ৭ শতাংশ মানুষ নিরাপদভাবে ব্যবস্থাপিত স্যানিটেশন সুবিধার বাইরে রয়েছে।
এ অবস্থায় সবচেয়ে বেশি সেবা ঘাটতি থাকা এলাকাগুলোতে বিনিয়োগ বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথা বলছেন গবেষকেরা।
- পার্বত্য এলাকায় বরাদ্দ বেড়েছে, অদৃশ্য হাওর-চর
দুর্গম অঞ্চলের জন্য বরাদ্দ বিশ্লেষণে বৈপরীত্য দেখা গেছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের বরাদ্দ ২০৬ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ১ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে।
তবে হাওর অঞ্চলের জন্য কোনো পৃথক বরাদ্দ চোখে পড়েনি। একইভাবে চরাঞ্চলের জন্যও নির্দিষ্ট অর্থায়নের চিহ্ন নেই। উপকূলীয় এলাকার জন্য বরাদ্দও কমেছে, যদিও লবণাক্ততা ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সেখানে ক্রমেই বাড়ছে।
ফলে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীগুলোর জন্য লক্ষ্যভিত্তিক বিনিয়োগ এখনো নিশ্চিত হয়নি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
- কিছু ক্ষেত্রে ইতিবাচক অগ্রগতি
তবে পুরো চিত্রই নেতিবাচক নয়। জলবায়ু অভিযোজন ও দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাসে বরাদ্দ বেড়ে ৩ হাজার ১৪৩ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।
ফিক্যাল স্লাজ ম্যানেজমেন্ট (এফএসএম) খাতে বরাদ্দ ১ হাজার ৩৬৪ কোটি টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ১ হাজার ৯০৪ কোটি টাকা। সক্ষমতা উন্নয়ন খাতেও বরাদ্দ বেড়ে ১ হাজার ৩৩৬ কোটি টাকায় পৌঁছেছে।
গবেষণা সংস্থাগুলোর মতে, দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত এসব উপখাতে বিনিয়োগ বাড়ানো ইতিবাচক উদ্যোগ।
- হাইজিন খাত এখনো আড়ালে
ওয়াশের তিনটি প্রধান উপাদানের একটি হলো হাইজিন বা স্বাস্থ্যসম্মত আচরণ। কিন্তু বাজেটে এটি এখনো পৃথক খাত হিসেবে দৃশ্যমান নয়।
ফলে হাইজিন উন্নয়ন, আচরণ পরিবর্তন এবং জনসচেতনতামূলক কার্যক্রমে কত অর্থ ব্যয় হচ্ছে, তার স্পষ্ট হিসাব পাওয়া যায় না। এ কারণে পৃথক ও ট্র্যাকযোগ্য বাজেট লাইন চালুর সুপারিশ করা হয়েছে।
- চ্যালেঞ্জ এখন বাস্তবায়নে
ওয়াটারএইড বাংলাদেশের পলিসি অ্যাডভোকেসি প্রধান অ্যাডভোকেট ফাইয়াজউদ্দিন আহমদ বলেন, নিরাপদ পানি ও নিরাপদভাবে ব্যবস্থাপিত স্যানিটেশন থেকে এখনো প্রায় অর্ধেক জনগোষ্ঠী বঞ্চিত। এখন মূল চ্যালেঞ্জ নীতিমালা প্রণয়ন নয়, বরং সেগুলো কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করে মানুষের কাছে সেবা পৌঁছে দেওয়া।
পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, শুধু বরাদ্দ বাড়ালেই হবে না, সেই অর্থ কতটা কার্যকরভাবে ব্যয় হচ্ছে এবং তার জবাবদিহিতা কতটা নিশ্চিত করা যাচ্ছে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা প্রকল্প ও পরিচালনা-রক্ষণাবেক্ষণের দুর্বলতাও গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে।
- সমতাভিত্তিক বিনিয়োগের তাগিদ
নেটওয়ার্ক অব ওয়াশ নেটওয়ার্কসের সুপারিশের মধ্যে রয়েছে গ্রামীণ ওয়াশ অর্থায়ন বৃদ্ধি, জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার জন্য পৃথক অর্থায়ন ব্যবস্থা, বর্জ্য পানি ও ফিক্যাল স্লাজ ব্যবস্থাপনায় বিনিয়োগ বাড়ানো, দরিদ্র পরিবারের জন্য ওয়াশ ভাতা চালু এবং স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে আর্থিক ও আইনগতভাবে শক্তিশালী করা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বরাদ্দ বৃদ্ধি অবশ্যই ইতিবাচক। তবে সেবা বঞ্চনা, জলবায়ু ঝুঁকি ও আঞ্চলিক বৈষম্যের বাস্তবতা বিবেচনায় না নিলে বাড়তি অর্থও কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনতে পারবে না। ওয়াশ খাতের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে বরাদ্দের অঙ্কের চেয়ে সেই অর্থ কতটা ন্যায়সঙ্গত ও কার্যকরভাবে ব্যয় হচ্ছে, তার ওপর।




