ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর ক্যারিয়ারে চোখ বুলালে কি পাবেন না, বিশ্বকাপ ট্রফিটা ছাড়া। বাকি সব খানেই তারার মতো জ্বলজ্বল করা তারকার জীবনের সবচেয়ে বড় আক্ষেপ সোনালি ট্রফিটাই। যার সংস্পর্শ পেতে ছুটে চলছেন নিরন্তর।
অন্যথা, ৪১ বছর বয়সী কিংবদন্তির ঠিকানা অন্য কোথাও হওয়ার কথা ছিল। খেলোয়াড়ী ক্যারিয়ারের ইতি টেনে কি করবেন সেটা স্পষ্ট করে কখনো বলেননি তিনি। তবে বুটজোড়া তুলে রাখলে এতদিনে পরিবারের সঙ্গে যে স্মৃতির ঝাঁপি খুলতেন সেটা না বললেও চলে।
তবে অন্য ধাতুতে গড়া রোনালদো স্মৃতিরোমন্থনের পথ বেছে নেননি। আজন্ম স্বপ্নটা পূরণ করেই যেন অবসর নেওয়র পণ করেছেন তিনি। লক্ষ্য পূরণের শেষ সুযোগ এবারই। আগের ৫ বিশ্বকাপ যে শুধু হতাশাই উপহার দিয়েছে তাকে। অথচ, শুরুটা কি দুর্দান্ত না হয়েছিল তার। ২০০৬ সালে তার অভিষেক বিশ্বকাপে শেষ চারে খেলেছিল পর্তুগাল। কিন্তু বাকিগুলো যত দ্রুত ভুলে যাওয়া যায় ততই যেন মঙ্গল।
বিশেষ করে কাতার বিশ্বকাপ। সেবার মরক্কোর কাছে কোয়ার্টার ফাইনালে হারার পর সে কি কান্নাই না জুড়ে দিলেন তিনি। তাতে অনেকেই ধরে নিয়েছিলেন বিশ্বমঞ্চে হয়তো আর দেখা যাবে না তাকে। তবে আহত বাঘ আরও জোড়ে গর্জন দিয়ে ফিরলেন।
৪ বছর পর আরেকটি বিশ্বকাপে নামছেন। শুধু নামছেন না, নতুন অধ্যায় শুরুর ডাক দিয়েছেন রোনালদো। আজ ডিআর কঙ্গোর বিপক্ষে বিশ্বকাপ অভিযান শুরু করার আগে ৫ বারের ব্যালন ডি’অর জয়ী নিজের ফেসবুকে লিখেছেন, ‘যতবার এই জার্সি পরি, ঠিক ততবার প্রথম দিনের মতো গর্ব, আবেগ এবং দায়িত্ববোধ অনুভব করি। আগামীকাল (আজ) নতুন অধ্যায় শুরু হচ্ছে।’
নতুন অধ্যায়টা সফল করতে সতীর্থদের সর্বস্ব নিংড়ে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন রোনালদো। পর্তুগালের অধিনায়ক লিখেছেন, ‘এই পর্যায়ে পৌঁছানোর জন্য আমরা কঠোর পরিশ্রম করেছি। সময় এসেছে দেশে এবং বিশ্বজুড়ে থাকা আমাদের সমর্থকদের জন্য সর্বস্ব নিংড়ে দেওয়ার। আমাদের মতো আপনারাও বিশ্বাস রাখুন।’
রোনালদোর সতীর্থরা ইতিমধ্যে বিশ্বাস করা শুরু করেছেন এবার তার জন্যই চ্যাম্পিয়ন হতে চান তারা। ঠিক যেমনটা ২০২২ বিশ্বকাপে লিওনেল মেসির জন্য খেলেছে তার সতীর্থরা। ব্রুনো ফার্নান্দেজ-দিয়েগো দালোতদের চাওয়া, রোনালদোর জন্যই বিশ্বকাপে লড়বে তারা। তেমনটাই মনে করেন জার্মানির কিংবদন্তি স্ট্রাইকার ইয়ুর্গেন ক্লিন্সমানও।
শুধু মুখের কথাই নয়, পরিসংখ্যান এবার ভালো কিছুর ইঙ্গিত দিচ্ছে পর্তুগালের পক্ষে। এই যেমন ৬ সংখ্যাকে তাদের ‘লাকি সিক্স’ বলা যেতে পারে। এই সংখ্যাতে তাদের সাফল্য লুকিয়ে রয়েছে। ১৯৬৬ বিশ্বকাপে নিজেদের সেরা সাফল্য শেষ চারে খেলেছিল তারা। ইউসেবিওর সে সময়কার দল তৃতীয় হয়েছিল। ৪০ বছর পর যখন আবার সেমিফাইনাল খেলে পর্তুগাল, সেবার ২০০৬ বিশ্বকাপ ছিল। মাঝে আরেকটি ‘৬’ ছিল। ২০১৬ সালে তো প্রথমবার ইউরো চ্যাম্পিয়নই হয় তারা। এবারের ২০২৬ বিশ্বকাপেও সেই ‘৬’ সংখ্যাটিই আছে। তাই এবার ভাগ্যেকে হয়তো পাশেই পাবে তারা।
বিপরীতে কঠিন সময়েই নিজের সেরাটা দিতে জানেন রোনালদো। একটা সময় তার চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী মেসি ৪-১ ব্যবধানে ব্যালন ডি’অর জেতায় এগিয়েছিলেন। ২০১৭ সালে ক্যারিয়ারের পঞ্চম ও শেষ ব্যালন ডি’অর জিতে আর্জেন্টাইন কিংবদন্তিকে ছুঁয়ে ফেলেন। পরে অবশ্য নামের পাশে আরও ৩টি যোগ করে ব্যবধান বাড়িয়ে নেন মেসি।
ময়দানের লড়াইয়ে হাল না ছাড়ার মনোভাবটা তাই জন্মগতই রোনালদোর। আল নাসরের হয়েই যেমন চ্যাম্পিয়ন হওয়ার স্বাদ পেলেন তিনি। এশিয়ার ক্লাবটিতে যোগ দেওয়ার পর থেকেই দলটির হয়ে মেজর কোনো শিরোপা ধরা দিচ্ছিল না, সেই আক্ষেপ সর্বশেষ সৌদি প্রো লিগে ঘুচিয়েছেন। ক্যারিয়ারের গোধূলিলগ্নে এসে তাই এবার বিশ্বকাপ স্বপ্ন পূরণ হওয়ার পালা।
স্বপ্ন পূরণের নেতৃত্ব রোনালদোকেই দিতে হবে। দীর্ঘ দুই যুগের ক্যারিয়ারে যা করে আসছেন তিনি। এবারও সেটাই করতে হবে। তার রসদও জুগাচ্ছেন মেসি-কিলিয়ান এমবাপ্পে-আর্লিং হালান্ডরা। গতকাল রাতে নিজেদের ম্যাচে জোড়া গোল পান এমবাপ্পে-হালান্ড। সকালে তাদের ছাড়িয়ে যান মেসি। বিশ্বকাপ ক্যারিয়ারে প্রথম হ্যাটট্রিক করে। এবার তাই রোনালদোর পালা। চ্যালেঞ্জটায় জিততে পারবেন তো ‘সিআর সেভেন’? নিজের ডাকা ‘নতুন অধ্যায়ের’ শেষটা সুন্দরের জন্য তাই মরণ কামড় দিতেই হবে কিংবদন্তিকে।




