ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) বরাতে দেশে ‘১০০ দিনে ৬০৫ খুন’ শিরোনামে শীর্ষস্থানীয় কয়েকটি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের ব্যাখ্যা দিয়েছে বাংলাদেশ পুলিশ। পুলিশ সদরদপ্তরের দাবি, হত্যাকাণ্ডের প্রকৃতি, কারণ ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ না করে কেবল সংখ্যাগত তথ্য উপস্থাপন করার মাধ্যমে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে উদ্বেগজনক হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
সোমবার (৮ জুন) গণমাধ্যমে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই দাবি করে পুলিশ সদর দপ্তর।
পুলিশ সদরদপ্তর জানায়, প্রকৃতপক্ষে মার্চ ও এপ্রিল—এই দুই মাসে দেশে মোট ৬০৫টি হত্যা মামলা নথিভুক্ত হয়েছে। তবে এসব হত্যাকাণ্ডের সিংহভাগই ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক বিরোধের জেরে সংঘটিত হয়েছে, যার সঙ্গে সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির সম্পর্ক নেই।
পুলিশের দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ৬০৫টি হত্যা মামলার মধ্যে ৩৩৬টি বা ৫৫ দশমিক ৫ শতাংশ ঘটেছে পূর্বশত্রুতার জেরে। এছাড়া পারিবারিক কলহের কারণে ১৪৬টি (২৪.১ শতাংশ), সম্পত্তি ও অর্থনৈতিক বিরোধে ৬৯টি (১১.৪ শতাংশ), আকস্মিক আঘাতে ১৯টি (৩.১ শতাংশ) এবং আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ৯টি (১.৫ শতাংশ) হত্যাকাণ্ড ঘটেছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, প্রেম বা পরকীয়াজনিত কারণে ৫টি, ছিনতাইকারীর হাতে ৬টি, দাঙ্গা-দস্যুতা-অপহরণসহ অন্যান্য ঘটনায় ১৫টি এবং রাজনৈতিক কারণে মাত্র ৩টি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে।
পুলিশ বলছে, গত এক দশকে দেশে বছরে গড়ে ৩ হাজার থেকে ৪ হাজার ৫০০টি হত্যা মামলা নথিভুক্ত হয়েছে। সেই হিসাবে দুই মাসের ৬০৫টি হত্যাকাণ্ডকে বার্ষিক হিসাবে রূপান্তর করলে সম্ভাব্য সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ৩ হাজার ৬৩০টি, যা ঐতিহাসিক গড়ের ভেতরেই অবস্থান করছে। ফলে বর্তমান সংখ্যাকে ‘অস্বাভাবিক বৃদ্ধি’ হিসেবে চিত্রিত করার কোনো সুযোগ নেই।
পুলিশের হিসাব অনুযায়ী, দেশের প্রায় ১৮ কোটি জনসংখ্যার বিপরীতে দুই মাসে প্রতি লাখে হত্যার হার মাত্র ০.৩৪। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে এটি কোনোভাবেই উচ্চমাত্রার অপরাধ হার নয়। জনসংখ্যা বিবেচনা না করে কেবল মোট সংখ্যা প্রকাশ করলে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে।
ব্যাখ্যায় পুলিশের সবচেয়ে জোরালো যুক্তিগুলোর একটি হলো হত্যাকাণ্ডের শ্রেণিবিন্যাস। তাদের দাবি, মোট ৬০৫টি হত্যার মধ্যে রাজনৈতিক কারণে ঘটেছে মাত্র ৩টি, যা মোট ঘটনার মাত্র ০.৫ শতাংশ। অর্থাৎ অধিকাংশ হত্যাই ব্যক্তি পর্যায়ের বিরোধ, পারিবারিক দ্বন্দ্ব অথবা সম্পত্তি ও অর্থনৈতিক সংঘাতের ফল। ফলে সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মূল্যায়নে এই শ্রেণিবিন্যাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
পুলিশের অভিযোগ, সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে আগের বছর বা পূর্ববর্তী সরকারগুলোর একই সময়ের হত্যার পরিসংখ্যান উপস্থাপন করা হয়নি। তুলনামূলক তথ্য ছাড়া কোনো সুনির্দিষ্ট সময়কে ‘উদ্বেগজনক’ হিসেবে চিহ্নিত করা গবেষণাগত ও পরিসংখ্যানগতভাবে অসম্পূর্ণ।
পাশাপাশি পুলিশ উল্লেখ করেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে অপরাধের মামলা নথিভুক্তকরণ আরও উন্মুক্ত ও সক্রিয় হয়েছে। ফলে বেশি মামলা রেকর্ড হওয়া আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি নয়, বরং পুলিশের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতারই প্রতিফলন।
পুলিশের মতে, অপরাধের প্রকৃত চিত্র জানতে শুধু সংখ্যার দিকে না তাকিয়ে অপরাধের ধরন, কারণ, জনসংখ্যাভিত্তিক হার এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতার দিকেও নজর দেওয়া প্রয়োজন। গবেষণা সংস্থাগুলোর উদ্দেশ্যে পুলিশ বলেছে, ‘শুধু সংখ্যা নয়, প্রেক্ষাপটও গুরুত্বপূর্ণ। পূর্ণাঙ্গ তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমেই জনগণের সামনে বাস্তব চিত্র তুলে ধরা সম্ভব।’




