জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা, আমদানিনির্ভরতা এবং বিশ্ববাজারে জ্বালানি মূল্যের অস্থিরতার মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে একগুচ্ছ কর ও শুল্কসুবিধা দেওয়ার পরিকল্পনা করছে সরকার। আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে পরিবেশবান্ধব, সাশ্রয়ী ও টেকসই সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনকে উৎসাহিত করতে ২০৩৫ সাল পর্যন্ত সৌরবিদ্যুৎ খাতে শূন্য শতাংশ করহার প্রস্তাব করা হচ্ছে। একই সঙ্গে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারকারীদের সৌরবিদ্যুৎ বিল পরিশোধের বিপরীতে ৫ শতাংশ কর রেয়াত সুবিধা দেওয়া হচ্ছে।
সব ধরনের বৈদ্যুতিক যানবাহন (ইভি) রেজিস্টেশন ও নবায়নের ক্ষেত্রে বিদ্যমান অগ্রিম আয়করের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে কমানো হয়েছে। জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর পরিবহনের বিকল্প হিসেবে দেশে পরিবেশবান্ধব ইলেকট্রিক গাড়ি উৎপাদনে এবং ইলেকট্রিক গাড়ির যন্ত্রাংশ স্থানীয়ভাবে উৎপাদনের লক্ষ্যে শুল্ককর রেয়াতি সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও ইলেকট্রিক গাড়ি খাতে বিশেষ প্রণোদনা অন্তর্ভুক্ত হতে পারে বলে জানিয়েছে অর্থমন্ত্রণালয় ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্র।
সংশ্লিষ্ট্ররা জানিয়েছেন, বর্তমানে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত সোলার প্যানেল, ইনভার্টার, ব্যাটারি, ডিসি কেবলসহ বিভিন্ন যন্ত্রাংশ আমদানিতে ২৫ থেকে ৮৯ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ককর দিতে হয়। নতুন বাজেটে এসব পণ্যের করহার কমিয়ে ১৫ শতাংশে নামিয়ে আনার প্রস্তাব বিবেচনায় রয়েছে। এ ছাড়া সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন ও পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য আয়কর অব্যাহতির সুযোগ রাখা হতে পারে। প্রস্তাব অনুযায়ী, সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে প্রকল্প স্থাপন, নেট মিটারিং অনুমোদন এবং বিদ্যুৎ বিক্রির ক্ষেত্রে পাওয়ার পারচেজ অ্যাগ্রিমেন্ট (পিপিএ) থাকলে করসুবিধা পাওয়া যাবে। এ সুবিধা ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে কার্যকর হতে পারে।
সৌরবিদ্যুৎশিল্পের বিকাশে রেয়াতি সুবিধা : নবায়নযোগ্য ও টেকসই জ্বালানির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও নিরাপদ উৎস, সৌর বিদ্যুৎ খাতের প্রসারে এই খাতের গুরুত্বপূর্ণ উপকরণসমূহ আমদানিতে প্রযোজ্য আমদানি শুল্ক, রেগুলেটরি শুল্ক, সম্পূরক শুল্ক এবং আগাম কর শূন্য শতাংশ করা হচ্ছে। এই খাতের ধারাবাহিক ও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নে আগামী নতুন অর্থবছরের শুরু থেকে ২০৩১ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত রেয়াতি সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। তবে দেশে এই খাতসংশ্লিষ্ট পণ্যের উৎপাদনকে উৎসাহ দিতে এবং দেশীয় শিল্পের বিকাশে মাউন্টিং স্ট্রাকচার, লিথিয়াম সেল, ব্যাটারি প্যাক, ব্যাটারি এনার্জি স্টোরেজ সিস্টেমসহ পণ্যসমূহের রেয়াতি সুবিধা ২০২৮ সালের ৩০ জুনের পর প্রত্যাহার করা হচ্ছে।
এনবিআরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলেছেন, জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার, আমদানিনির্ভরতা কমানো এবং কার্বন নিঃসরণ হ্রাসের লক্ষ্যে এ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এতে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের ব্যয় কমবে এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদনে আরো উৎসাহিত হবে।
বাংলাদেশ প্রতিবছর এলএনজি, কয়লা, ডিজেল ও ফার্নেস অয়েল আমদানিতে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করছে। একই সঙ্গে শিল্পায়ন, নগরায়ণ ও ডিজিটাল অর্থনীতির সম্প্রসারণের ফলে বিদ্যুতের চাহিদাও দ্রুত বাড়ছে। এ প্রেক্ষাপটে বিশেষজ্ঞরা নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে দীর্ঘমেয়াদি ও পরিবেশবান্ধব সমাধান হিসেবে দেখছেন।
সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। তবে উদ্যোক্তারা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন, উচ্চ শুল্ক ও করহার নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের অন্যতম প্রধান বাধা। অতিরিক্ত ব্যয়ের কারণে নতুন বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হচ্ছে। দেশে বৈদ্যুতিক যানবাহনের ব্যবহার বাড়াতে ইভি আমদানির ওপর বিদ্যমান প্রায় ৯০ শতাংশ করহার কমানোর চিন্তাও করছে সরকার। পাশাপাশি দেশে ইভি উৎপাদন উৎসাহিত করতে কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক ছাড়, ভ্যাট রেয়াত এবং আয়কর সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাব বিবেচনায় রয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফিন্যানশিয়াল অ্যানালাইসিসের (আইইইএফএ) প্রধান জ্বালানি বিশ্লেষক শফিকুল আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের বিকাশে সরকার যে কর ও শুল্ক ছাড় দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে, তা অত্যন্ত যুক্তিসংগত এবং সময়োপযোগী। এসব সুবিধা খাতটির সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। একইসঙ্গে জ্বালানি তেলের ওপর চাপ কমাতে বৈদ্যুতিক যানবাহনের (ইভি) জন্য প্রণোদনা দেওয়ার সিদ্ধান্তও তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ বিশেষ করে দূরপাল্লার বাস ও ট্রাক পরিচালনায় ব্যবহৃত আমদানিনির্ভর জ্বালানি তেলের ব্যবহার কমাতে এবং বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ে এটি ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।’
তিনি বলেন, ‘অপেক্স মডেলে নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে যে আর্থিক সুবিধা ও সাশ্রয়ের বিষয়গুলো বিবেচনা করা হচ্ছে, সেগুলোও খাতটির অগ্রগতিতে সহায়ক হবে। কর ও শুল্ক ছাড়ের পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে সরাসরি প্রণোদনা দেওয়ার বিষয়টিও ইতিবাচক উদ্যোগ। বিশেষ করে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতে সৌরবিদ্যুৎ খাতে প্রণোদনার চিন্তা-ভাবনা ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।’
রুফটপ সোলার প্রকল্পের মান নিয়ন্ত্রণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে শফিকুল আলম বলেন, ‘অতীতে অনেক স্থানে স্থাপিত ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থায় মানগত সমস্যা দেখা গেছে। তাই ভবিষ্যতে এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে গুণগত মান নিশ্চিত করতে কার্যকর তদারকি ও মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা জোরদার করা প্রয়োজন।’
এ বিষয়ে বাংলাদেশ সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউএবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোস্তাফা আল মাহমুদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতে সৌরবিদ্যুতের বিকল্প নেই। কর ও শুল্কসুবিধা দেওয়া হলে শিল্প খাতে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার দ্রুত বাড়বে, বিদ্যুৎ ব্যয় কমবে এবং কার্বন নিঃসরণও হ্রাস পাবে। বড় আকারের সৌর প্রকল্পে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়লেও পেমেন্ট সিকিউরিটি, নীতিগত স্থিতিশীলতা, প্রকল্প বাস্তবায়নের অনিশ্চয়তা এবং অর্থায়ন ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ এখনো রয়েছে।’
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ‘বাংলাদেশের জ্বালানি খাত ঐতিহাসিকভাবে জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর। আগামী বাজেটে ‘সবুজ রাজস্বনীতি’ প্রণয়ন করা প্রয়োজন, যাতে পরিবেশবান্ধব জ্বালানি ও প্রযুক্তির প্রসার ত্বরান্বিত হয়।’
তিনি বলেন, ‘সৌরবিদ্যুতের কিছু উপাদানে শুল্ক কমানো ইতিবাচক পদক্ষেপ হলেও ব্যাটারি, বৈদ্যুতিক যানবাহন এবং গ্রিড অবকাঠামোর বিভিন্ন যন্ত্রপাতির ওপর এখনো উচ্চ করহার বহাল রয়েছে। অন্যদিকে এলএনজি আমদানিতে তুলনামূলক কম শুল্ক বিদ্যমান থাকায় নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাত সমান প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ পাচ্ছে না।’
গোলাম মোয়াজ্জেম আরো বলেন, ‘প্রস্তাবিত কর ও শুল্কসুবিধা বাস্তবায়িত হলে দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি, আমদানিনির্ভরতা হ্রাস এবং পরিবেশবান্ধব পরিবহনব্যবস্থার সম্প্র্রসারণে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।’




