kalerkantho

শনিবার । ৩১ আশ্বিন ১৪২৮। ১৬ অক্টোবর ২০২১। ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

মিলেমিশে ১০ হাজার কোটি টাকা লুট

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২০ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০৩:০৩ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



মিলেমিশে ১০ হাজার কোটি টাকা লুট

কথায় আছে চোরে চোরে মাসতুতো ভাই। ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেডের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রশান্ত কুমার (পি কে) হালদার ও তাঁর সহযোগীরা মিলেমিশে ১০ হাজার কোটি টাকা লুটপাটের ঘটনার তদন্তেও প্রবাদটি সত্যি হলো। দেশের ইতিহাসে বড় এই আর্থিক কেলেঙ্কারির তদন্তে বেরিয়ে আসছে খোদ ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তা, চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট, আইনজীবী, অডিটর, প্রশাসন ক্যাডারদের নাম। সব পক্ষ মিলেমিশেই চার আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বিপুল অঙ্কের টাকা বিভিন্ন কাগুজে প্রতিষ্ঠানের নামে হাতিয়েছে। দুদক সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

জানা গেছে, পি কে হালদারের ঋণ জালিয়াতি অনুসন্ধানে নেমে একের পর এক ভয়ংকর তথ্য পাচ্ছে দুদক। সর্বশেষ পি কের নেতৃত্বে ২০টি কাগুজে প্রতিষ্ঠানের নামে এফএএস ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড থেকে এক হাজার ৩০০ কোটি টাকা লুটপাটের তথ্য পেয়েছে দুদক। অস্তিত্বহীন এসব কাগুজে প্রতিষ্ঠান হলো—সুখাদা প্রপার্টিজ লিমিটেড, নেচার এন্টারপ্রাইজ লিমিটেড, উইনটেল ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড, বর্ণ, সদ্বীপ করপোরেশন, নিউটেক এন্টারপ্রাইজ, নিউট্রিক্যাল লিমিটেড, এসএ এন্টারপ্রাইজ, আনান কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, অ্যান্ডবি ট্রেডিং, আরবি এন্টারপ্রাইজ, দেয়া শিপিং লিমিটেড, ইমার এন্টারপ্রাইজ, জি অ্যান্ড জি এন্টারপ্রাইজ, হাল ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড, কণিকা এন্টারপ্রাইজ, মেরিনট্রাস্ট লিমিটেড, মুন এন্টারপ্রাইজ, এমটিবি মেরিন লিমিটেড এবং পি অ্যান্ড এল ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড।

ভয়াবহ এই লুটপাটের ঘটনায় ২০টি মামলা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দুদক। আর এসব মামলায় পি কে হালদারসহ অন্তত ৭৫ জনকে আসামি করা হবে। আসামির মধ্যে প্রতিষ্ঠান হিসেবে ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের ১০ জন পরিচালক, এফএএসের ১০ জন পরিচালক, পি কে হালদারের ঘনিষ্ঠ চার বান্ধবীসহ ১২ জন আত্মীয় রয়েছেন।

দুদক সূত্রে পাওয়া তথ্যানুযায়ী, আসামিদের নামের তালিকায় রয়েছেন এফএএসের চেয়ারম্যান সিদ্দিকুর রহমান, ভাইস প্রেসিডেন্ট মো. জাহাঙ্গীর আলম, মনিরুল ইসলাম, ব্যবস্থাপনা পরিচালক রাসেল শাহরিয়ার, পরিচালক মো. আবু শাহাজাদা, সোমা ঘোষ, অরুণ কুমার কুণ্ডু, প্রদীপ কুমার রায়, বীরেন্দ্র কুমার সোম ও আতারুল আলম এবং পিএনএল ইন্টারন্যাশনালের চেয়ারম্যান উদ্ভব মল্লিক, ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের ভাইস প্রেসিডেন্ট নাহিদ রুনাই, ব্যবস্থাপনা পরিচালক রাশেদুল হক, রাফসান চৌধুরী রিয়াজ, পরিচালক নুরুজ্জামান, নওশেরুল ইসলাম, বাসুদেব ব্যানার্জি, পাপিয়া ব্যানার্জি, নাসিম আনোয়ার, এম এ হাশেম প্রমুখ। পি কে হালদারের জালিয়াতির ঘটনায় এরই মধ্যে দায়ের হওয়া ১০ মামলার ৬৭ জন আসামির মধ্যেও তাঁদের নাম আছে।

দুদক সূত্র আরো জানায়, পি কে হালদারের এই ঋণ জালিয়াতির ঘটনায় ব্যাংকার, আর্থিক প্রতিষ্ঠান কর্মকর্তা, চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট, আইনজীবী, অডিটর ও প্রশাসন ক্যাডারের অনেকের প্রত্যক্ষভাবে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেছে তদন্তে। সম্প্রতি দুদকের তদন্তে দেখা গেছে, পি কে হালদারের বন্ধু মো. সিদ্দিকুর রহমান ছিলেন এফএএস ফাইন্যান্সের চেয়ারম্যান। এফএএস ফাইন্যান্সের ভাইস চেয়ারম্যান মো. জাহাঙ্গীর আলম ছিলেন পি কে হালদারের ব্যাবসায়িক অংশীদার। এ দুজনের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় পি কে হালদার এফএএস ফাইন্যান্স থেকে বিভিন্ন কাগুজে প্রতিষ্ঠানের নামে প্রায় এক হাজার ৩০০ কোটি টাকা সরিয়েছেন।

এ দুজন ছাড়াও পি কে হালদারের বিভিন্ন জালিয়াতিতে জড়িত ছিলেন ঘনিষ্ঠ বন্ধু ব্যারিস্টার নুরুজ্জামান। তিনি ছিলেন প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা। সরকারি চাকরির পর বন্ধু পি কে হালদারের সঙ্গে পরামর্শ করে একটি ল ফার্ম দেন। এরপর পি কে হালদার নুরুজ্জামানকে বানান ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের পরিচালক। ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের আরেক পরিচালক নাসিম আনোয়ারও ছিলেন পি কের পরিচিত ও নিরীক্ষক। ইন্টারন্যাশনাল লিজিং লুটপাটে পি কে হালদারের পাশে ছিলেন এ দুজন সব সময়। দুদকের করা মামলায় দুজনই আসামি হচ্ছেন।

প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা পি কে হালদারের খালাতো ভাই অমিতাভ অধিকারী আইন নিয়ে পড়াশোনা করেছিলেন। তাই ঋণ জালিয়াতিতে অবৈধ কাগজপত্র যাতে বৈধের মতো দেখা যায়, সেই রকম ডকুমেন্টস তৈরি করতে তাঁকে দলে বেড়ান পি কে হালদার। জালিয়াতির মাধ্যমে কাড়ি কাড়ি টাকা আসায় চাকরি ছেড়ে স্থায়ী হন পি কে হালদারের জালিয়াতির পেশায়। বর্তমানে গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে থাকা অমিতাভও হচ্ছেন ৭৫ মামলার আসামি।

পি কে হালদারের লুটপাটের আরেক সহযোগী চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট উজ্জ্বল কুমার নন্দী। পি কে হালদার তাঁকে আনান কেমিক্যাল, নর্দান জুট মিলস, রাহমান কেমিক্যাল প্রভৃতি প্রতিষ্ঠানের বেতনভুক্ত নামমাত্র চেয়ারম্যান বানান। পরে তাঁকে পিপলস লিজিংয়েরও চেয়ারম্যান বানান পি কে। দুদকের করা মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে জেলে থাকা নন্দীকে নতুন মামলায়ও আসামি করা হচ্ছে।

পি কে হালদারের আয়কর ও জমিজমাসংক্রান্ত সব বিষয় দেখতেন সুকুমার মৃধা। নিজের আইনজীবী মেয়ে অনিন্দিতা মৃধাকে পি কে হালদার সিন্ডিকেটের সঙ্গে যুক্ত করে কাগুজে প্রতিষ্ঠান উইনটেল ইন্টারন্যাশনালের এমডি বানান। অনিন্দিতাও হচ্ছেন দুদকের নতুন মামলার আসামি।

দুদক সূত্র আরো জানায়, জালিয়াতি ও লুটপাট করে পার পেতে মাস্টার মাইন্ডার পি কে হালদার প্রায় ৩০ কোটি টাকা দিয়ে ল ফার্মের সঙ্গে আইনি সহায়তা পেতে চুক্তিও করেছিলেন। ল ফার্মের দায়িত্ব ছিল ঋণ কেলেঙ্কারিসংক্রান্ত আইনি ঝামেলা থেকে পি কে হালদারকে সুরক্ষা দেওয়া।

এ ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের রেগুলার ও বিশেষ নিরীক্ষায় পি কে হালদার সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে কোনো সমস্যায় যাতে পড়তে না হয় এ জন্যও নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর অডিটরদের কোটি কোটি টাকা ঘুষ দিতেন। এদিকে পি কে হালদারকে এসব জালিয়াতিতে অর্থের বিনিময়ে সহযোগিতা করার অভিযোগে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর এস কে সুর ও নির্বাহী পরিচালক শাহ আলমকে দুদকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তলব করা হতে পারে।

পি কের জালিয়াতি নিয়ে বিএফআইইউয়ের এক গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৫ সালে ন্যাচার এন্টারপ্রাইজ লিমিটেড, বি আর ইন্টারন্যাশনাল, নিউটেক এন্টারপ্রাইজ ও হাল ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড নামের প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস লি. অধিগ্রহণের পরবর্তী তিন-চার বছরে দুর্নীতি, জালিয়াতি ও নানাবিধ অনিয়মের মাধ্যমে নামসর্বস্ব ও কাগুজে প্রতিষ্ঠানের ঋণের নামে লেয়ারিংয়ের মাধ্যমে বিভিন্ন ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও ক্যাপিটাল মার্কেটে দুই হাজার ৪৬৭ কোটি টাকা সরিয়ে নিয়ে আত্মসাৎ করা হয়।

প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, সার্বিক পর্যালোচনায় ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের পরিচালনা পর্ষদ, শীর্ষ ব্যবস্থাপনা, অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা বিভাগ, চিফ ফাইন্যান্সিয়াল অফিসার, ক্রেডিট ডিভিশনের কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় পি কে হালদার ও তাঁর সহযোগীরা ৮৩ ব্যক্তির ঋণের আড়ালে নানাবিধ অনিয়ম, দুর্নীতি ও জালিয়াতির মাধ্যমে আর্থিক প্রতিষ্ঠানটির দুই-তৃতীয়াংশের বেশি অর্থ আত্মসাৎ করেছেন।

প্রসঙ্গত, চারটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে পি কে হালদার ও তাঁর সহযোগীরা প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করেন। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো—ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেড, এফএএস ফাইন্যান্স, পিপলস লিজিং ও রিলায়েন্স ফাইন্যান্স। পি কে হালদার বর্তমানে সেই টাকায় কানাডায় বিলাসী জীবন যাপন করছেন।



সাতদিনের সেরা