kalerkantho

শুক্রবার। ৩১ বৈশাখ ১৪২৮। ১৪ মে ২০২১। ০২ শাওয়াল ১৪৪২

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ : প্রথম সরকার গঠনের ইতিহাস

মাহবুব উদ্দিন আহমদ বীরবিক্রম   

১৮ এপ্রিল, ২০২১ ০৫:০১ | পড়া যাবে ২৬ মিনিটে



গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ : প্রথম সরকার গঠনের ইতিহাস

১৯৭১ সালের ২৯ মার্চ আমার সৌভাগ্য হয়েছিল একটা ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালনে। সেদিন প্রত্যুষে ঝিনাইদহ আওয়ামী লীগের সেক্রেটারি এবং স্থানীয় এমপি জে কে এম এ আজিজ আমার কাছ থেকে একটা গাড়ি সংগ্রহ করে মাগুরা চলে যান। আগের মধ্যরাতে পদব্রজে ভীষণ কষ্টকর দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়ে ঢাকা থেকে মাগুরায় পৌঁছেছিলেন আওয়ামী লীগের শীর্ষ দুই নেতা ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম ও তাজউদ্দীন আহমদ। তাজউদ্দীন আহমদ কাপাসিয়া থেকে নির্বাচিত এমএনএ এবং আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় হাইকমান্ডের প্রধান সহকারী এবং সাচিবিক দায়িত্ব পালনরত সদস্য। ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম কুষ্টিয়া আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং নির্বাচিত এমএনএ। তাঁরা মাগুরার এমপি সোহরাব হোসেনের বাড়িতে রাতের বিশ্রাম নিতে পেরেছিলেন। হাঁটতে হাঁটতে তাজউদ্দীন সাহেবের পা ফুলে গিয়েছিল। তাঁকে গভীর শ্রদ্ধায় সোহরাব হোসেন সাহেবের স্ত্রী গরম জল সেঁক দিয়েছেন। গরম পানিতে গোসলের ব্যবস্থা করেছিলেন দ্রুত সুস্থ করে তোলার আশায়। এরই মধ্যে মাগুরা-ঝিনাইদহ-চুয়াডাঙ্গা-মেহেরপুর সড়কটির সর্বত্র রাস্তার দুই পাশের বড় বড় বৃক্ষ কেটে ব্যারিকেড সৃষ্টি করা হয়েছে। যুদ্ধপিপাসু প্রতিরোধকারী বাঙালি জনগোষ্ঠী, পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রস্তুতি হিসেবে পথে ব্যারিকেড সৃষ্টি করে রেখেছিল। ফলে মাত্র ২০ মাইল পাড়ি দিতে সকাল ১১টা বেজে যায়। জে কে এম এ আজিজ সাহেব আমার সঙ্গে সাক্ষাতে নেতাদের গোপনে নিরাপদে ভারতে পৌঁছে দিতে অনুরোধ করেন। সে মোতাবেক আমি আমার বন্ধু তৌফিকের সহযোগিতায় পশ্চিমবঙ্গ বিএসএফ প্রধান গোলক মজুমদার, চব্বিশ পরগনার বিএসএফ প্রধান কর্নেল চক্রবর্তী এবং চ্যাংখালী বিএসএফ অফিসার ক্যাপ্টেন মহাপাত্রের মাধ্যমে তাঁদের প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা, সম্মান ও সৌহার্দ্যসহকারে কলকাতায় পাঠিয়ে দেওয়ার সুযোগ পেয়েছিলাম। গোপনীয়তা রক্ষার জন্য আমি আমার সরকারি হুডওয়ালা পুলিশ জিপটি ব্যবহার করেছিলাম। ড্রাইভার ছিলেন কনস্টেবল মান্নান।

কলকাতা থেকে ভারতীয় বিএসএফ প্রধান রুস্তমজীর মাধ্যমে তাজউদ্দীন সাহেব ৪ এপ্রিল ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে তাঁর সফদর জং রোডের সরকারি বাসভবনের স্টাডি রুমে সাক্ষাত্ করেন। এই সাক্ষাতের সময় তাঁদের কোনো সহযোগী ছিল না। সবার নজর এড়িয়ে দিল্লি পৌঁছার জন্য তাঁদের আসনবিহীন মালবাহী একটি বিমানে চড়ানো হয়। সে বিমানে চড়ে গরমে, ঘামে সিদ্ধ হতে হতে ১ এপ্রিল তাঁরা দিল্লি পৌঁছেন। তাঁর সঙ্গে আলাপচারিতার একপর্যায়ে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে জরুরি ভিত্তিতে যত শিগগির সম্ভব সত্তরের নির্বাচনে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার গঠনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। এ ছাড়া বিভিন্ন অঞ্চলে যুদ্ধরত মুক্তিযোদ্ধাদের তরফ থেকে, চট্টগ্রামের এম আর সিদ্দিকীর পক্ষ থেকে, সিলেটের হবিগঞ্জ মহকুমার মাধবপুর সীমান্তের চা বাগানে আচ্ছাদিত দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অস্থায়ী হেডকোয়ার্টার তেলিয়াপাড়ায় ৪ এপ্রিল মিলিত সামরিক অফিসারদের সভার পক্ষ থেকে সরকার গঠনের জন্য জোর দাবি উত্থাপিত হতে থাকে।

এ প্রসঙ্গে সিলেটের তেলিয়াপাড়ায় বাঙালি সামরিক অফিসারদের সভা বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য। ৪ এপ্রিল একাত্তর, তেলিয়াপাড়ায় মিলিত হয়েছিলেন ৩১ জন বাঙালি সামরিক কর্মকর্তা। তাঁদের মধ্যে ছিলেন তিনজন নির্বাচিত এমএনএ। কর্নেল ওসমানী, লে. কর্নেল এস এম রেজা এবং লেফটেন্যান্ট কর্নেল আব্দুর রব। তিনজনই সিলেট অঞ্চলের নির্বাচিত প্রতিনিধি। এ ছাড়া উপস্থিত ছিলেন ছয়জন এমপিএ।
 
এ সভায় সভাপতিত্ব করেন মেজর সফিউল্লাহ। আরো অনেকের সঙ্গে এ সভায় আরো উপস্থিত ছিলেন মেজর জিয়াউর রহমান, মেজর খালেদ মোশাররফ, ক্যাপ্টেন হায়দার, ক্যাপ্টেন মইনুল হোসেন চৌধুরী, মেজর শাফায়াত জামিল। এ সভা থেকে মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি হিসেবে কর্নেল ওসমানীর নাম সুপারিশ করা হয়। একই সঙ্গে অবিলম্বে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে সরকার গঠনের জন্য জোর দাবি জানানো হয়। 
ওই চা বাগানের ছায়ায় সরকার গঠনের স্থানও নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কাছে খবর পৌঁছে যায়। এবং তারা ওই স্থানে আক্রমণ চালায়। ফলে সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি।

পরবর্তী সময়ে সরকার গঠনের স্থান হিসেবে চুয়াডাঙ্গাকে নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু চুয়াডাঙ্গার প্রধান বেসামরিক উপদেষ্টা ডক্টর আসহাবুল হক অসাবধানতাবশত এ খবরটা সাংবাদিকদের বলে ফেলেন। ফলে পাক আর্মি জেনে যায় এবং ১৫ এপ্রিল সকালে বিমান আক্রমণ চালায় চুয়াডাঙ্গা, কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহসহ দক্ষিণ-পশ্চিম রণাঙ্গনে। ফলে ওই পরিকল্পনা ভেস্তে যায়। সর্বশেষ মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলার আমবাগানে স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান হয় ১৭ এপ্রিল। ওই জায়গার ওই দিনই নামকরণ করা হয় মুজিবনগর।

এভাবে এসব ঘটনা ও চিন্তা থেকেই নির্বাচনোত্তর পূর্ব পাকিস্তানে ইয়াহিয়ার মার্শাল ল সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন-সংগ্রামে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য যে পাঁচজন নিয়ে বঙ্গবন্ধু হাইকমান্ড গঠন করেছিলেন সেই পাঁচজনকে নিয়ে সরকার গঠন করার সিদ্ধান্ত হয়। সে হাইকমান্ডের অন্যতম প্রধান সদস্য বঙ্গবন্ধুর সহকারী তাজউদ্দীন আহমদকে প্রধানমন্ত্রী এবং হাইকমান্ড প্রধান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নাম রাষ্ট্রপতি হিসেবে ঘোষণা করা হয়। সৈয়দ নজরুল ইসলামকে উপরাষ্ট্রপতি হিসেবে ঘোষণা করা হয়। দেশের নাম রাখা হয় গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ। এই দুটি শব্দ চয়নের মধ্য দিয়ে এই প্রথম বাংলাদেশ নামে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র পৃথিবীর ইতিহাসে জায়গা করে নিল। বাকি রইল আইনানুগ আনুষ্ঠানিকতা।

৪ এপ্রিল সরকার গঠনের ব্যাপারে প্রাথমিক আলাপ-আলোচনা হয় তাজউদ্দীন আহমদ ও ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলামের মধ্যে। বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করে দুজনই সিনিয়র নেতারা কে কোথায় আছেন, তাঁর খোঁজখবর নেওয়া জরুরি বলে অনুধাবন করেন। এ উদ্দেশ্যে ভারত সরকার তাদের দ্রুত পূর্ব বাংলার সীমান্তে যোগাযোগ স্থাপনের জন্য একটি ছোট বিমানের ব্যবস্থা করে দিলে সে বিমানে চড়ে তাঁরা সীমান্ত এলাকা চষে বেড়ান। তাঁরা শিলিগুড়ি, আগরতলা, বাগডোবড়া, ময়মনসিংহ, কুষ্টিয়া, কলকাতাসহ বিভিন্ন সীমান্তে ও অব্যবহূত পুরনো ছোট ছোট বিমানবন্দর ব্যবহার করেন। এই সময় দিল্লিতে চট্টগ্রামের এম আর সিদ্দিকী, কুমিল্লার সিরাজুল হক ও উত্তরবঙ্গের যুবনেতা আব্দুর রউফ ছিলেন। তাঁদের সবার সঙ্গেই বৈঠক করেন তাঁরা। ১০ এপ্রিলের পর উত্তরবঙ্গে যুদ্ধরত কর্নেল (অব.) নুরুজ্জামান ও তাঁদের সঙ্গে দেখা করে যুদ্ধের পরিস্থিতি নিয়ে আলাপ করেন। এভাবে বহু দুর্যোগ পেরিয়ে ১০ তারিখের মধ্যে বেশ কিছুসংখ্যক এমএনএ/এমপি/এম.সি.এদের আগরতলায় একত্র করতে সক্ষম হন তাঁরা। সেখানে একাধিক গ্রুপ সভা হয় এবং একসময় বিভিন্ন সীমান্ত থেকে আগত এবং সংগৃহীত উপস্থিত নির্বাচিত নেতাদের সভায় বহু বাগবিতণ্ডার পর বঙ্গবন্ধু কর্তৃক গঠিত হাইকমান্ডের সদস্যদের নিয়েই আগরতলায় সর্বসম্মতিক্রমে স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার গঠিত হয়। স্বাধীনতাসংগ্রামের ইতিহাসে আগরতলায় অনুষ্ঠিত এই বৈঠকটি আওয়ামী লীগের সংসদীয় দলের প্রথম বৈঠক বলে আমি মনে করি। তারিখটি ছিল ১০ এপ্রিল ১৯৭১। সরকার গঠনের চিন্তা-ভাবনার প্রথম দিকেই সংযুক্ত হতে পেরেছিলেন চট্টগ্রামের এম আর সিদ্দিকী, রাজশাহী-পাবনা সীমান্ত দিয়ে আগত এম মনসুর আলী ও কামারুজ্জামান। ঢাকা থেকে আগত যুব নেতৃবৃন্দ ইত্যাদি। সরকার গঠনের পক্ষে-বিপক্ষে যুবনেতাদের সঙ্গে প্রবীণ নেতৃবৃন্দের রীতিমতো তর্ক-বিতর্ক, দীর্ঘ-নাতিদীর্ঘ বক্তব্য আদান-প্রদান, মন-কষাকষি, মান, অভিমান হয়।

৪ এপ্রিলের পর একাধিকবার ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম তাজউদ্দীন সাহেবকে সঙ্গে নিয়ে কুষ্টিয়া সীমান্তে মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে মিলিত হয়েছেন, চুয়াডাঙ্গায় মেজর ওসমানের সঙ্গে কথোপকথন করেছেন, আমার সঙ্গেও মতবিনিময় করেছেন। কুষ্টিয়ার যুদ্ধে বিজয়ের উদ্যম উল্লাস তাঁদের সরকার গঠনে ভীষণভাবে শক্তি জুগিয়েছে।
এই সরকার ঘোষণা প্রচারের ভাষণ তৈরি করেছিলেন ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম ও তাজউদ্দীন সাহেব পরসপর নিবিড় আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের প্রফেসর রেহমান সোবহানও এ রচনায় সাহায্য করেন। ভাষণটি তৈরি করতে দিন-রাত দীর্ঘ আলোচনা হয়। বাংলা, ইংরেজি দুটি ভার্সনই তৈরি হয়। এতে যথেষ্ট সময় লাগে। ভাষণটি রেকর্ড করা হয় দিল্লিতে বসে। রেকর্ড করার জন্য একটি টেপরেকর্ডার সংগ্রহ করে দেন সরদেন্দু চট্টোপাধ্যায় নামে একজন। রেকর্ডকৃত টেপটি সঙ্গে নিয়ে ৯ তারিখ তাঁরা শিলিগুড়ি পৌঁছেন। ১০ এপ্রিলের আগের দিন রাতে সেটা গোলক মজুমদারের কাছে প্রচারের জন্য হস্তান্তর করা হয়। তিনি শিলিগুড়ির জঙ্গলে একটি ক্লানডেস্টাইন ট্রান্সমিটারের মাধ্যমে ১০ এপ্রিল রাত সাড়ে ৯টায় ভাষণটি প্রচার করেন। বক্তব্য প্রচারের শুরুতে ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম তাজউদ্দীন আহমদকে স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেন। এ প্রচার আকাশবাণীতে ধরা পড়লে ১১ তারিখ রাতে আকাশবাণীর সাংবাদিক দেব দুলাল বন্দোপাধ্যায় সেটি পুন প্রচার করেন। এভাবেই সারা পৃথিবী বাংলাদেশের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দ্বারা আমাদের প্রথম স্বাধীন সরকার গঠনের কথা জানতে পারেন। তাজউদ্দীন সাহেবের সম্মতির অপেক্ষা না করেই রেকর্ডকৃত এই ভাষণটি প্রচারের হুকুম দিয়েছিলেন ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম। ট্রান্সমিটারটির ক্ষমতা ছিল সামান্যই। 

১৭ এপ্রিল শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে মুজিবনগরে প্রথম স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার পৃথিবীর কাছে আত্মপ্রকাশ করে।

তাজউদ্দীন সাহেবের ডায়েরি, ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলামের বই ও আমার সঙ্গে ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলামের বিভিন্ন সময় আলাপে এবং অন্যান্য ঐতিহাসিকদের তথ্য ও তত্ত্ব ঘেঁটে জানা যায় তাজউদ্দীন সাহেব ৪ এপ্রিল শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে প্রথম সাক্ষাত্ করেন। সাক্ষাত্ ছিল একান্ত। ৪ এপ্রিলের পরেও তাজউদ্দীন সাহেব অন্তত আরো একবার শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে দেখা করতে পেরেছিলেন। সরকার গঠনে তাঁর সঙ্গে আলাপ করেছিলেন।

সে সময়ে দেশের অভ্যন্তরে লড়াই চলছিল। লড়াইরত মুক্তিযোদ্ধাদের ভারতীয় সীমান্তের ভেতরে আশ্রয়, যুদ্ধের সাজসরঞ্জাম, গোলাবারুদ, অস্ত্র সরবরাহে প্রয়োজনীয় সাহায্যের আশ্বাস পাওয়া যায়। পাকিস্তানিদের অমানবিক অত্যাচারক্লিষ্ট, অসহায় জনস্রোত তখন জীবন রক্ষার্থে দেশের অভ্যন্তর থেকে পালিয়ে ভারতের বিভিন্ন সীমান্তে আশ্রয় নিচ্ছে। তাদের সাহায্য-সহযোগিতা ও আশ্রয়ের জন্য শ্রীমতী গান্ধী সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে প্রস্তুত ছিলেন। নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত একটি স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার প্রয়োজন ছিল এসব সাহায্য-সহযোগিতায় ভারত সরকারকে সম্পৃক্ত করার জন্য।

দুটি স্বাধীন সরকারের মাধ্যমে চুক্তি হলে এসব সাহায্য-সহযোগিতায় আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি মেলে। কোনো চুক্তি ছাড়া এই সহযোগিতা তখন পাকিস্তানি মিলিটারি জান্তা পাকিস্তানের ওপর ভারতের আগ্রাসী আক্রমণ বলে অভিহিত করার সুযোগ পেত। বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ তখন পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে ভারতের হস্তক্ষেপ হিসেবে গুরুত্ব হারিয়ে আন্তর্জাতিকীকরণের কর্দমাক্ত ঘোলাজলে পথ হারাতে বসত।

ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম ও তাজউদ্দীন সাহেব প্রাথমিকভাবে সরকার গঠনে সম্মত হলেও তৎকালীন আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের বিষয়ে অবগত ছিলেন। তাই তাঁরা বাংলাদেশের সব সীমান্তে নেতাদের খোঁজে বেরিয়ে পড়েন। এ ব্যাপারে একটি ছোট্ট বিমান তাঁরা ব্যবহার করার সুযোগ পান। বিমানটি ছয়জন যাত্রী ধারণক্ষমতাবিশিষ্ট। ওটা খুব নিচু দিয়ে উড়তে পারত। বিমানটি অনেক পুরনো ছিল। তাই জীবনের ঝুঁকি নিয়েই এই নেতারা বেরিয়ে পড়েন। প্রাথমিকভাবে এই বিমান ব্যবহার করেছিলেন তাজউদ্দীন আহমদ, ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম, তোফায়েল আহমেদ, এ এইচ এম কামারুজ্জামান ও এম মনসুর আলী।

আমাদের স্বাধীনতাযুদ্ধে সহায়তার জন্য ভারত সরকার একজন অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল নগেন্দ্র সিংকে নিয়োগ করে। ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলামের মতে, জেনারেল সিং বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রতি আন্তরিকভাবে শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। আমার ধারণা, মিসেস গান্ধী যেহেতু আমাদের স্বাধীনতার প্রতি গভীরভাবে সহানুভূতিশীল ছিলেন প্রথম থেকেই, তাই জেনারেল নগেন্দ্র সিংয়ের মতো একজনকে সংগ্রামে সহায়তার উদ্দেশ্যে নিয়োজিত করেন।

আমরা অনেকেই ২৫শে মার্চের মধ্যরাতের আগেই, বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের স্বাধীনতার ডাকে উদ্বুদ্ধ হয়ে রাজারবাগ, ইকবাল হল, ইপিআর হেডকোয়ার্টারসহ বিভিন্ন জায়গায় উত্তাল জনতার বিরুদ্ধে অপারেশন সার্চলাইটের ভয়ংকর গণহত্যারূপী দমন-পীড়ন দেখে যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করেছি। বিভিন্নভাবে পাকিস্তানি সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছি। ইয়াহিয়ার প্রণীত অপারেশন সার্চলাইটের বিরুদ্ধে জয়দেবপুর, ময়মনসিংহ, কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, রংপুর, ঝিনাইদহ, যশোর, কুষ্টিয়া, রাজশাহী, চট্টগ্রামসহ সারা দেশে জনতার সঙ্গে পুলিশ, ইপিআর আনসার, মুজাহিদ, সামরিক বাহিনীর সদস্যরা পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছে। সেই ক্রান্তিকালে বঙ্গবন্ধুর ২৬শে মার্চের প্রথম প্রহরে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার কথা সারা পৃথিবীর কাছে পৌঁছে গেছে। ৩১ মার্চ ভারতীয় পার্লামেন্টের সভায় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে তৎকালীন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী পার্লামেন্টে ভাষণ দিয়েছেন। সেই সিদ্ধান্তের প্রত্যেকটি কথা নিঃসন্দেহে আমাদের সংগ্রামের প্রতি পূর্ণ সহযোগিতার আশ্বাস বলে মনে হয়েছে। তিনি দ্বিধাহীন কণ্ঠে সাবলীল ভাষায় পাকিস্তান সামরিক জান্তাকে বাংলাদেশে গণহত্যা বন্ধ করার জন্য পৃথিবীর সমস্ত শক্তির কাছে উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে পরিষ্কার ভাষায় বলে দিয়েছেন, সাড়ে সাত কোটি বাঙালির ঐতিহাসিক গণজাগরণ অবশ্যই বিজয়ের স্বর্ণ দুয়ারে পৌঁছবে। ঐতিহাসিক ওই সংসদীয় সভা পূর্ব বাংলার জনগণের সংগ্রাম এবং আত্মত্যাগের সপক্ষে ভারতীয় জনগণের সামগ্রিক সহানুভূতি ও সহযোগিতা প্রদান করার নিশ্চয়তা দিয়েছে।

ভারতীয় জনগণের পক্ষে পার্লামেন্টে ওই সংহতি প্রকাশ আমাদের মতো যুদ্ধরত বাঙালিদের জন্য গভীর তাত্পর্য বহন করেছিল।

শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে সাক্ষাত্ এ কারণে নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের একটা বিশাল মাইলফলক। এ কথা আগেই বলেছি যে কুশল বিনিময়ের পর আলোচনায় শ্রীমতী গান্ধীর সঙ্গে তাজউদ্দীন সাহেব একান্তে মিলিত হন। এই প্রথম সাক্ষাত্কারে অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আলাপ-আলোচনা হয় এবং বাংলাদেশের মানুষের সংগ্রামের প্রতি ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর সহানুভূতিপূর্ণ মন-মানসিকতার প্রকাশ পায়। এই সাক্ষাতের ব্যাপারে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর প্রধান প্রথম থেকে অত্যন্ত গুরুত্বসহকারে গোপনীয়তা রক্ষা করেন। এই গোপনীয়তা রক্ষা করার কারণ তিনিই ভালো জানতেন। তিনি শ্রীমতী গান্ধীর পারিবারিক বন্ধু ছিলেন। একজন তরুণ কর্মকর্তা হিসেবে রুস্তমজী সাবেক প্রধানমন্ত্রী জওয়াহেরলাল নেহরুর নিরাপত্তা প্রধান ছিলেন। সেই হিসেবে মিসেস গান্ধীসহ গান্ধী পরিবারের সবার সঙ্গেই তাঁর আজীবন বন্ধুত্ব ছিল। এই বন্ধুত্বের সুবাদে রুস্তমজী ও শ্রীমতী গান্ধীর মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ ও বিশ্বস্ততা ছিল। এই কারণে অনেক বাধাবিপত্তি পেরিয়ে, বিশেষ করে ভারতীয় উচ্চ পর্যায়ের কূটনৈতিক, সামরিক এবং বেসামরিক ব্যুরোক্রেসিকে পাশ কাটিয়ে তাঁর পক্ষেই এই যোগাযোগ করা সম্ভব হয়েছিল। আজকাল মাঝেমধ্যে ভাবি যদি ভারতীয় ঝানু বেসামরিক ও সামরিক কর্তৃত্বের বেড়াজালে একেবারে ওই পর্যায়ে আমাদের নেতৃত্ব কোনো না কোনোভাবে জড়িয়ে পড়তেন, তাহলে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ পথ হারালেও হারাতে পারত। কেননা ২৫শে মার্চের পরে ওই সময় আমাদের তরুণ নেতৃত্বের মধ্যে অনেকেই ভারতে পৌঁছেছিলেন। এক পর্যায়ে তাঁরা ভারতীয় সামরিক নেতৃত্বের সঙ্গে সম্ভবত সংযুক্ত হতে পেরেছিলেন। সে কারণেই হোক অথবা অন্য যে কারণেই হোক সরকার গঠন হওয়ার আগে তাজউদ্দীন সাহেবের শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে সাক্ষাৎকার তরুণ নেতৃত্ব বাঁকা চোখে দেখেছেন। তাঁরা সব সময় বলেছেন, বঙ্গবন্ধু তাঁদের যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার হুকুম দিয়ে গেছেন। সুতরাং ওই পর্যায়ে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার জন্য বিপ্লবী কাউন্সিল গঠন করা প্রয়োজন। সরকার গঠনে তাঁদের কোনো আগ্রহ ছিল না। অপরদিকে যেসব প্রবীণ নেতা সরকার গঠনের পক্ষে ছিলেন তাঁদের মধ্যে কে কোন মন্ত্রিত্বের পদ নেবেন তা নিয়ে মতানৈক্য ছিল। খন্দকার মোশতাক প্রধানমন্ত্রী হতে চেয়েছিলেন এ ব্যাপারেও ইতিহাসে অনেক তথ্য আছে। শেষ পর্যন্ত তাঁকে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর পদ দিয়ে দফারফা হয়। কিন্তু মোশতাক শেষ পর্যন্ত ঘষেটি বেগমের পথে হাঁটেন। যে পাকিস্তান, যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় বাঙালিদের ওপর দমন-পীড়ন চালাচ্ছিল, যুক্তরাষ্ট্রের মাধ্যমে সেই পাকিস্তানের সঙ্গে মোশতাক কনফেডারেশন করতে রাজি ছিলেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর নিকটতম ঘনিষ্ঠ নেতারা কেউই কোনো অবস্থাতেই বঙ্গবন্ধুকে বাদ দিয়ে জাতীয় অথবা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কোনো সমঝোতায় রাজি ছিলেন না। ফলে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে আইনানুগ সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। 

তরুণ নেতৃত্ব বঙ্গবন্ধুর দোহাই দিয়ে বলেছে, সরকার গঠন করার দরকার নেই। যুদ্ধ পরিচালনার জন্য বিপ্লবী কাউন্সিল গঠন করতে হবে। এ ব্যাপারে ভারতীয় সেনাবাহিনীর একদল উত্সাহী কর্মকর্তা তাঁদের মাধ্যমে এবং নেতৃত্বে মুজিব বাহিনী তৈরি করেছিলেন। যুদ্ধ যদি প্রলম্বিত হয়, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষিত তরুণ এই ছাত্ররা ভবিষ্যত্ নেতৃত্বে আসবে এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ বামপন্থীদের হাত থেকে রেহাই পাবে। এই ছিল ভারতীয় সামরিক বাহিনীর ওই গোষ্ঠী ও তাদের সমর্থক ব্যুরোক্রেসির কামনা। তরুণ চার নেতা যথা শেখ ফজলুল হক মনি, আব্দুর রাজ্জাক, সিরাজুল আলম খান এবং তোফায়েল আহমেদ এই মুজিব বাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন। কোনো কোনো ঐতিহাসিকের মতে, এই চারজনকে ভারতীয় সেনাবাহিনী লেফটেন্যান্ট জেনারেলের মর্যাদা দিয়ে তাঁদের হাতে এই অভিজাত বাহিনীর নেতৃত্ব তুলে দিয়েছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের আরেকজন সামরিক অফিসার মেজর জিয়াউর রহমান ও তাঁদের মতের পথিক ছিলেন। কারণ তিনিও কোনো রাখঢাক না রেখেই বলেছিলেন, ‘নির্বাচিত রাজনৈতিক নেতৃত্বের চাইতে দক্ষ নেতৃত্ব দিতে পারবে বিপ্লবী ওয়ার কাউন্সিল।’ কিন্তু ওয়ার কাউন্সিলের এই ভাবনা নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে গ্রহণযোগ্য ছিল না। তাঁরা বলতেন, ওয়ার কাউন্সিলের নামে স্বাধীনভাবে বিভিন্ন জায়গায় ভিন্ন ভিন্ন নেতৃত্বে যদি যুদ্ধ পরিচালিত হয়, তাহলে কেন্দ্রীয়ভাবে কারো পক্ষে সেই যুদ্ধ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে না। অনির্বাচিত কোনো নেতৃত্বের প্রতি পৃথিবীর সমর্থনও পাওয়া যাবে না। সরকারও গঠন করা যাবে না। যদি করা হয়, তাহলে সবই বেআইনি বলে বিবেচিত হবে। আর যদি আইনানুগ সরকার গঠন করা না যায়, তাহলে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত ভারত সরকার ও ওই অগণতান্ত্রিক সরকারকে স্বীকৃতি দিতে পারবে না। শেষ পর্যন্ত মানসিক দ্বিধাদ্বন্দ্বে থাকলেও তরুণ নেতৃত্বের প্রধানরা নৈতিকতা ও আইনগত সুবিধার বিবেচনায় নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি কর্তৃক ঘোষিত সরকার মেনে নিয়েছিলেন। এবং এই চারজনই ১৭ এপ্রিল মুজিবনগরে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের আইনানুগ সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে যোগদান করে সরকারের সঙ্গে তাঁদের একাত্মতা প্রকাশ করেছিলেন। 

নিজেদের মধ্যে অভ্যন্তরীণ দলীয় কোন্দল যতই থাকুক না কেন, একটা ব্যাপারে আমাদের তরুণ প্রবীণ নেতৃত্বকে অবশ্যই ধন্যবাদ দিতে হয়। নিজেদের মধ্যে মনোমালিন্য, কথা-কাটাকাটি, বিভেদের কথা কখনোই ভারতীয় গোয়েন্দা বাহিনীর কাছে ফাঁস করেননি। ফলে মুক্তিযুদ্ধের গতি এবং প্রকৃতি ভারতীয়দের কাছে এক সূত্রে বাধা মনে হয়েছে। তাই মুক্তিযুদ্ধ এবং মুক্তিযোদ্ধাদের ব্যাপারে ভারত সরকারের মনোভাব সর্বদাই সহানুভূতিপূর্ণ এবং সহায়ক ছিল। একমাত্র কুলাঙ্গার মোশতাক। তাঁর দূরভিসন্ধিমূলক চক্রান্তের কথা ভারত সরকার আগেভাগে জেনে গিয়েছিল এবং এ ব্যাপারে বাংলাদেশ সরকারকে তারা বিভিন্ন সময়ে সজাগ থাকতে বলেছে। এ কারণে মোশতাকের বহু আকাঙ্ক্ষিত জাতিসংঘে গমনের ইচ্ছাটা বাংলাদেশ সরকারের বাধার কারণে পূর্ণ হয়নি। আর তাঁর পেয়ারের মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে ‘কনফেডারেশন নামীয়’ সাধের গাঁটছড়া বাধার কূটচালও দিনের আলো দেখেনি।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রাথমিক পর্যায় এভাবেই বিশাল দুর্যোগের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধ গতি লাভ করেছিল। বিজয় ছিনিয়ে এনেছিলাম আমরা। মুক্তিযুদ্ধ তার যৌক্তিক গন্তব্যে পৌঁছে ছিল। বঙ্গবন্ধু ফিরে এসেছিলেন তাঁর মুক্ত স্বাধীন বাংলাদেশে।

২৯ মার্চ সকাল ১১টার দিকে যখন নেতৃদ্বয়ের সঙ্গে আমার প্রথম সাক্ষাত্ হলো তখন তাজউদ্দীন সাহেবের কাছে আমার প্রথম প্রশ্ন ছিল, ‘বঙ্গবন্ধু কোথায় এবং কেমন আছেন?’
উত্তরে বলেছিলেন, ‘তিনি আমাদের সঙ্গেই আছেন।’

আমার মনে হয়েছিল, এ কথাটি ঠিক হয়নি। কিন্তু উচ্চবাচ্য করিনি। দৈবক্রমে মিসেস গান্ধীও তাজউদ্দীন সাহেবকে একই প্রশ্ন করেছিলেন। উত্তরে একটু খোলাসা করে বলেছিলেন, ‘তিনি তাঁর স্থান থেকে আমাদের নির্দেশ দিয়ে যাচ্ছেন, তিনি আমাদের নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছেন। ২৫শে মার্চের পর আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ হয়নি।’ এ প্রসঙ্গে তাজউদ্দীন সাহেব মিসেস গান্ধীকে আরো বলেন, ‘আমাদের স্বাধীনতাযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে এবং যেকোনো মূল্যে আমাদের এই স্বাধীনতা অর্জন করতে হবে।’ 

২৯ তারিখ দুপুর আনুমানিক ২টা থেকে বিকেল ৭টা পর্যন্ত দুই নেতা আমার গাড়িতে আমার সঙ্গে ছিলেন। ড্রাইভার মান্নান নীরবে গাড়ি চালাচ্ছে। আমরা তিনজন আলাপ সাগরে ডুবেছিলাম। হাজারও কথার ফুলঝুরি এক দুর্দান্ত ব্যঞ্জনায় আমাদের তিনজনকেই ‘ঘুমন্ত বাঙালি জাতির জেগে ওঠার দুরন্ত কাহিনীর এক বিচিত্র উল্লাসে বৃন্তবদ্ধ করেছিল। সে উল্লাসের মধ্যমণি ছিলেন বঙ্গবন্ধু। আর জাতিকে জাগিয়ে তোলার তাঁর কালজয়ী ভাষণ। কেন তাঁরা নেতাকে ঢাকায় ফেলে চলে আসতে বাধ্য হলেন সে গল্প বলতে বলতে দুজনেই চোখের জলে ভাসছিলেন। নেতাকে মৃত্যুর মুখোমুখি ফেলে চলে আসার বেদনা নীরবতার কাঁটা হয়ে তাঁদের হৃদয় বারবার দংশিত করছিল বলে আমার মনে হয়েছিল। একই সঙ্গে পথে পথে জনগণের অবিশ্বাস্য জাগরণ তাদের আর এক লড়াইয়ে দুর্গম পিচ্ছিল অজানা পথের হাতছানি দিচ্ছিল। ঝিনাইদহ থেকে আসার পথে পথে, বাসে, ট্রাকে হাজারও জনতার মিছিলে ‘ক্যান্টনমেন্ট দখল কর, বাংলাদেশ স্বাধীন কর’ স্লোগান তাঁদের কি ভীষণভাবে উদ্বেলিত করছে সে কথা বর্ণনা করতে করতে তাঁরা চরম আনন্দ বোধ করছিলেন। সে পথের দুজন সারথি পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল, নির্ভরশীল, কিন্তু অভিজ্ঞতার নিরিখে একেবারেই আনকোরা। যাচ্ছেন ভারতে, সেখানে চিত্ত সুতারের মাধ্যমে প্রাথমিক যোগাযোগ হয়েছে, এ ব্যাপারটি তাঁদের জানা, কিন্তু তা তো কোনো আন্তর্জাতিক দ্বি-রাষ্ট্রীয় চুক্তি নয়। সুতরাং জাতির শীর্ষ নেতৃত্বের সহকারী, সহকর্মী হিসেবে তাঁদের ভারত কিভাবে গ্রহণ করবে, কতখানি সম্মান এবং সৌহার্দ দেখাবে, রাষ্ট্রীয়ভাবে গ্রহণ করবে কি না—এসব নিয়ে তাঁদের মাথায় চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছিল। অবশ্য এরই মধ্যে মেহেরপুরের এসডিও তৌফিকের মাধ্যমে ভারতীয় সরকারি কর্মকর্তা এবং বিএসএফের সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছে—এ কথাটা আমি তাঁদের বলেছিলাম। তাঁরা কিছুটা আশ্বস্ত হলেন। আর চুয়াডাঙ্গার ইপিআর বাহিনীকে কেন্দ্র করে কুষ্টিয়া জেলার সর্বত্র সংগ্রাম কমিটি গঠিত হয়েছে জেনেও তাঁরা অবিমিশ্র আনন্দ প্রকাশ করছিলেন। এমএলএ, এমপি, এমসিএ, ছাত্র, যুবক, পুলিশ, আনসার, জজ, ম্যাজিস্ট্রেট, জনতা সবাই অস্ত্র ধরেছে। প্রশিক্ষণ নিচ্ছে। সবার মধ্যে জাগ্রত গভীর দেশপ্রেম, সহযোগিতা ও সহমর্মিতার কারণে জাতির মধ্যে যে উদ্দাম স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা প্রস্ফুটিত হয়েছে তা স্বচক্ষে দেখে তাঁরা অবাক হচ্ছিলেন। বঙ্গবন্ধুর ডাকে সবাই সাড়া দিয়েছে, যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য ঘুরে দাঁড়িয়েছে—এসব তো তাঁরা সরাসরি হৃদয়ঙ্গম করলেন। সুতরাং ঢাকা থেকে রওনা করার সময় মনের মধ্যে যে সন্দেহ ও অস্থিরতা ছিল তা ক্রমেই তাঁদের মন থেকে কেটে যাচ্ছিল। এখানে পৌঁছার আগে পর্যন্ত ঢাকা থেকে ফরিদপুর আগমন পথে, মৃত্যুর মিছিল, মানুষের হাহাকার, পাকিস্তানিদের নির্মম হত্যাকাণ্ডের কারণে পলায়নপর জনস্রোত, জনগণের মধ্যে নিদারুণ ভীতি ইত্যাদি অবলোকন করে দেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে তাঁদের ধারণা ক্রমেই ঝাপসা হয়ে আসছিল। কিন্তু মাগুরায় পা দিয়ে জনগণের মধ্যে উত্সাহ-উদ্দীপনা, প্রতিরোধের তেজ এবং ঝিনাইদহ, কুষ্টিয়ায় মানুষের প্রস্তুতি তাঁদের যারপরনাই আনন্দিত করে। বিদ্রোহের আগুন সারা দেশে জ্বলেছে এটা তাঁরা এই প্রথম হৃদয় দিয়ে উপলব্ধি করেন এবং প্রতিরোধ যুদ্ধ ও সার্বিক যুদ্ধ সংগঠিত করে পাকিস্তানিদের হটিয়ে দেওয়ার মানসিক প্রস্তুতি গ্রহণ করতে সক্ষম হলেন। এসব নিয়েই আমরা এই দীর্ঘ পথযাত্রায় একান্তে আলাপ করার সুযোগ পেয়েছিলাম। বাকি রইল নিরাপদে সসম্মানে সৌহার্দ সহকারে ভারত সরকারের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন। ২৯ তারিখ বিকেল ৫টার দিকে আমরা যখন চুয়াডাঙ্গায় স্থানীয় সার্কিট হাউস অপারেশন হেড কোয়ার্টারের সামনে পৌঁছাই, তখন গোপনীয়তার প্রয়োজনে তাঁরা কেউই গাড়ি থেকে বের হননি। আমি যথাশিগগির গাড়ি থেকে ছুটে সার্কিট হাউসের অভ্যন্তরে কর্মব্যস্ত মেজর ওসমানকে অফিস থেকে বের করে নিয়ে আসি। কানে কানে তাঁদের আগমনের কথা বলতেই তিনিও ছুটে বের হয়ে এলেন। এরই মধ্যে তৌফিক তাঁর সরকারি গাড়ি নিয়ে সার্কিট হাউসের সামনে উপস্থিত। দুজনকে আমি পরিচয় করিয়ে দিলাম। পরস্পর পরস্পরের সঙ্গে কুশল বিনিময় করলেন। মেজর ওসমান দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে আমাদের প্রস্তুতির কথা তাঁদের জানালেন। ইপিআরের ৪ নম্বর উইংয়ের  বিদ্রোহের কথা জানালেন, পাকিস্তানি অফিসার ও সেনা হত্যার কথা জানালেন। স্থানীয় এমপি ডক্টর আসহাবুল হকের নেতৃত্বে বেসামরিক প্রশাসন চালু করার কথা জানালেন এবং ঝিনাইদহে পুলিশের বিদ্রোহের কথাও জানালেন। ওয়ারলেস ও রেডিও মাধ্যমে খবর এসেছে—চট্টগ্রামসহ দেশের অনেক জায়গায় যুদ্ধ চলছে। বঙ্গবন্ধুর পক্ষে জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতা ঘোষণার খবর রেডিও থেকে বারবার প্রচারিত হচ্ছে—এ কথাও তাঁদের জানালেন।

আলাপ-আলোচনার পর অতিথি দুজন যথাশিগগির সম্ভব ভারত সীমান্তে পৌঁছার ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। আমি তৈরিই ছিলাম। তৌফিকও মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে এসেছিলেন এবং মেহেরপুর থেকে রওনা করার আগেই সীমান্তে ভারতীয় কর্মকর্তাদের দু-একজনের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন।

আমি আর তৌফিক চললাম। তাঁরা দুজনই আমার গাড়িতে। গাড়িতে ড্রাইভার আর দেহরক্ষী নিয়ে তৌফিক পথ প্রদর্শন করতে করতে চলল সীমান্তের দিকে।

সীমান্তে পৌঁছতে ভারতীয় সীমান্ত চৌকির কার কার মাধ্যমে কী কী সাহায্য-সহযোগিতা পেয়েছিলাম তার নাতিদীর্ঘ গল্প গত ৫০ বছরে বাংলাদেশের বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়, সাময়িকী এবং পুলিশ ডিপার্টমেন্টে প্রকাশিত ডিটেকটিভ নামক সাময়িকীতে প্রকাশ করেছি।

সে রাতেই ভারতীয় সীমান্ত চৌকির ক্যাপ্টেন মহাপাত্র ও কর্নেল মজুমদারের সহায়তায় এবং গোলক মজুমদারের নির্দেশনায় মুক্তিযুদ্ধে ভারতের প্রথম গোলাগুলির চালান লাভ করেছিলাম, সে গল্পেও এখন যাব না।

সীমান্ত রেখার কালভার্টের ওপর বিশাল বটবৃক্ষের নিচে রাতের অন্ধকারে রাতের পাখিদের কুহকিনী ডাক, সরীসৃপের ত্রস্ত বিচরণ, জোনাকির আলো আর ঝিঁঝি পোকার গানে আন্দোলিত শ্লথ গতিতে চলমান মুহূর্তগুলোয় দুজন ক্লান্ত পথিক কোন স্বপ্ন, কোন সূর্যালোক, কোন আনন্দ-বেদনা, কোন আশা-নিরাশার পেঁচক সম্ভাসন, দেশপ্রেমের কোন ভৈরবী সুরে অগ্নিপরীক্ষায় অবতীর্ণ হওয়ার গম্ভীরায় মনপ্রাণ যাচনা কামনা করেছিলেন, কোন বীণার তারে রণ জয়ের তুর্য নিনাদ আবদ্ধ করেছিলেন, তার পুঙ্খানুপুঙ্খ আলোচনা করার জন্য আজকে এই পুরনো কাসুন্দি ঘাঁটতে বসিনি।

তবে ২৯শে মার্চ রাত আনুমানিক ৯-১০টার সময় তাঁরা নির্ভয়ে নিরাপদে সানন্দচিত্তে কলকাতা রওনা হয়ে যান, এ কথা সেদিনের মতো আজও ধ্রুব সত্য। আগেই বলেছি তাঁদের গমনাগমনের ব্যাপারটি বিএসএফের উচ্চতম পর্যায়ের নীতিনির্ধারকরা চরম গোপনীয়তায় রক্ষা করতে চেষ্টা করেছেন। নেতা দুজন ও তাঁদের ব্যক্তিগত এবং সামগ্রিক নিরাপত্তার কথা ভেবে মোহাম্মদ আলী ও রহমত আলী ছদ্ম নামেই চলতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেছিলেন। এ জন্য ভারতীয় ব্যুরোক্রেসি ও সেনাবাহিনী তাঁদের সঠিকভাবে চিনতে যথেষ্ট সময় নিয়েছিল। ব্যারিস্টার আমির-উল-ইসলামের ভাষায়, ‘সেদিন আমি আর তৌফিক স্বাধীন বাংলাদেশের পক্ষে প্রথম কূটনৈতিক দায়িত্ব পালন করেছিলাম।’

যা হোক ২৯ মার্চ রাতে রওনা হয়ে পথের প্রয়োজনীয় গোপনীয়তা রক্ষা করে দিল্লি পৌঁছতে অনেক কষ্ট করেছেন তাঁরা, বিশেষ করে কলকাতা-দিল্লি মালবাহী উড়োজাহাজে চড়ে যাওয়ার সময় সারা রাত গরমে আর ঘামে সিদ্ধ হয়েছেন। ওই জাহাজে বসার কোনো ব্যবস্থাই ছিল না। সারা রাত প্লেনের দেয়ালের সঙ্গে ধাক্কা আর ঝাঁকুনি খেতে খেতে এবং জাহাজের ইঞ্জিনের বিকট শব্দে প্রাণ ওষ্ঠাগত। তারপর শ্রীমতী গান্ধীর সঙ্গে সাক্ষাতের প্রচেষ্টার মানসিক চাপ—সব মিলিয়ে অসাধ্য সাধনের প্রচেষ্টা। সাক্ষাতের পর সরকার গঠনের প্রচেষ্টায় শিলিগুড়ি-আগরতলা-কলকাতা-চব্বিশ পরগনা—একটা পুরনো উড়োজাহাজে চড়ে ভ্রমণ। দেশের চারদিকে বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা নেতাদের আস্তানা খুঁজে বের করা, তাঁদের নিরাপদে কলকাতা-দিল্লি-আগরতলা-শিলিগুড়িতে নিয়ে আসা। সরকার গঠনের আলাপ-আলোচনার বিভিন্ন স্তরে পদে পদে বাধা-বিপত্তির সম্মুখীন হওয়া, বিশেষ করে তরুণ নেতৃত্বের বাধা ও সার্বিক চাপ ডিঙিয়ে শেষ পর্যন্ত স্বাধীন সরকার হিসেবে আত্মপ্রকাশ। এরই মধ্যে কুষ্টিয়ায় পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে বাঙালি জনতার অসম প্রতিরোধ লড়াইয়ে জনগণের অভাবিত অনির্বচনীয় নিরঙ্কুশ বিজয় সারা বিশ্বে আলোড়ন তুলেছে। এই বিজয়কে পুঁজি করে বহির্বিশ্বে, বিশেষ করে ভারতে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিসংগ্রামের প্রতি ভারতীয় জনগণ, সরকার এবং রাষ্ট্রের সহানুভূতি আদায়ের সম্ভাবনা উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতিকে শাণিত করার ব্যবস্থায় বিশাল অগ্রগতির সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। অন্যদিকে তারা বারেবারে ছুটে আসছেন কুষ্টিয়া চুয়াডাঙ্গা সীমান্তে। আমাদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে সরকার গঠনের সম্ভাব্য পরিকল্পনা তৈরি করতে। নির্বাচিত সব নেতাকে একত্র করার জন্য তাঁরা ময়মনসিংহ যাচ্ছেন সৈয়দ নজরুল ইসলামের খোঁজে, আলোচনা করছেন চট্টগ্রামের এম আর সিদ্দিকীর সঙ্গে, খুঁজে বের করছেন মনসুর আলী, কামারুজ্জামান সাহেবদের, আলোচনা চালাচ্ছেন ডক্টর আনিসুর রহমান, রেহমান সোবহানের সঙ্গে, কথা বলছেন বিশ্বের ডাকসাইটে সাংবাদিকদের সঙ্গে, কথা বলছেন বিভিন্ন স্তরে ভারতীয় জনসাধারণ, রাজনীতিবিদ, সরকার, ব্যুরোক্রেসি, সামরিক বাহিনী, আধা সামরিক বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে। সহানুভূতি খুঁজে বেড়াচ্ছেন বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক এনজিও, দুর্দশাগ্রস্ত মানুষের সহায়তাকারী সংস্থা। খুঁজে বেড়াচ্ছেন কী করে হাজার হাজার উদ্বাস্তু মানুষের বাঁচার ব্যবস্থা করা যায়, সহানুভূতিশীল মানুষের সন্ধান পাওয়া যায়—সেসব কি শুধুই কতগুলো শব্দ চয়ন, নাকি আরো কিছু। এ প্রশ্নের উত্তর কে দেবে? সে সময়কার মানসিক, দৈহিক ভাষা—এগুলো কি কেউ কোনোভাবে সঠিক চিত্রায়িত করতে পারে?

আপাতত এই লেখার উপসংহারে বলতে চাই সশস্ত্র যোদ্ধা হিসেবে আমার উপলব্ধির কথা।

ইদানীং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পঞ্চাশ বছর পূর্তিতে বিশ্বখ্যাত ইলেকট্রনিকস চ্যানেল বিবিসি বলছে, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নাকি ভারতের কলকাতাকেন্দ্রিক ছিল।

সবার জ্ঞাতার্থে বলছি, বঙ্গবন্ধুর ২৩ বছরের প্রস্তুতি, ৭ই মার্চের ডাক না জন্ম নিলে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ আলোর মুখ কখনোই দেখত কি না তা নিয়ে পৃথিবীর সবারই সন্দেহ আছে। আর ২৫শে মার্চ রাতের অন্ধকারে পাকিস্তানি খুন, ধর্ষণ ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে যদি বাংলার জনগণ সর্বত্র ফুঁসে না উঠত, যদি বাংলার অকুতোভয় বীর সেনানীরা স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের অজান্তেও দীর্ঘ ৯ মাস ছোট-বড়, জানা-অজানা খণ্ড খণ্ড অসংখ্য যুদ্ধ পরিচালিত না করত, নির্দ্বিধায় জীবন উত্সর্গ না করত, তাহলে কলকাতাকেন্দ্রিক ওই কর্মকাণ্ড মধ্যপ্রাচ্যের ফিলিস্তিনি সংগ্রামে পর্যবসিত হতেও পারত। কলকাতার বাইরে, দিল্লি, আগরতলাসহ পৃথিবীব্যাপী লন্ডন, ওয়াশিংটন, প্যারিস, নিউ ইয়র্কে অবস্থানরত বাঙালি এবং বাংলাপ্রেমী জনগোষ্ঠী যদি বাংলাদেশের পক্ষে পৃথিবীর জনমত সৃষ্টি করতে ব্যর্থ হতো, সোভিয়েত ইউনিয়ন ও ভারত মৈত্রী চুক্তি যদি না হতো, তাহলেও মুক্তিযুদ্ধ পথ হারাতে পারত। কাজেই  বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের মতো একটি বিশাল কর্মকাণ্ডে বঙ্গবন্ধু ছাড়া অন্য কোনো ব্যক্তি অথবা সংগঠন কিংবা স্থান কোনোটাই খাটো করে দেখার কোনো সুযোগ নেই। এখন সময় এসেছে ইতিহাস রচনার। ইতিহাস ইতিহাসের গতিতেই চলবে। কোনো বিশেষ পণ্ডিত কিংবা পাণ্ডিত্যই এই ধারাকে বিবর্ণ করতে পারবে না। 

জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু। বাংলাদেশ চিরজীবী হোক।

লেখক : ১৯৭১ সালে ঝিনাইদহের এসডিপিও। ১৭ এপ্রিল তাঁর নেতৃত্বে বাংলাদেশের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতিকে গার্ড অব অনার দেওয়া হয়



সাতদিনের সেরা