প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সিগারেটের মূল্য সামান্য বৃদ্ধি করা হলেও তামাকপণ্য এখনো সহজলভ্যই থেকে যাচ্ছে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জনস্বাস্থ্য ও তামাক নিয়ন্ত্রণ বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, মূল্যস্ফীতির তুলনায় সিগারেটের দাম খুব কম বাড়ানো হয়েছে, ফলে তামাক ব্যবহার নিরুৎসাহিত হওয়ার বদলে তামাক কোম্পানিগুলো অতিরিক্ত মুনাফার সুযোগ পাবে।
আজ বুধবার রাজধানীর বিএমএ ভবনে ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ড্যাব) এবং ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন অব দ্য রুরাল পুওর (ডব়্প)-এর যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত ‘তামাকের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষাঃ প্রতিবন্ধকতা ও করণীয়’ শীর্ষক সেমিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্য বিষয়ক বিশেষ সহকারী ড. এস. এম. জিয়াউদ্দিন হায়দার বলেন, বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গীকার ছিল জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা ও তামাক নিয়ন্ত্রণ। বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শিশু-কিশোরসহ ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে তামাক ও নিকোটিনের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে সুরক্ষিত রাখার বিষয়ে সরকারের দৃঢ় অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেন, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের চূড়ান্ত বাজেট প্রণয়নের এই সময়টি জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ।
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন জেবা আফরোজা। তিনি বলেন, তামাক নিয়ন্ত্রণ বিশেষজ্ঞরা বাজারে বিদ্যমান চার স্তরের সিগারেটকে তিন স্তরে নামিয়ে আনার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। একই সঙ্গে নিম্ন ও মধ্যম স্তর একীভূত করে ১০ শলাকার প্যাকেটের দাম ১০০ টাকা নির্ধারণ এবং প্রতি প্যাকেটে ৪ টাকা সুনির্দিষ্ট কর আরোপের সুপারিশ করা হয়েছিল। এ প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে বিশেষ করে তরুণদের কাছে তামাকপণ্য কম সহজলভ্য হতো।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থ ইনস্টিটিউটের পরিচালক ড. শাফিউন নাহিন বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটে নিম্নস্তরের ১০ শলাকার সিগারেটের দাম মাত্র ২ টাকা বাড়িয়ে ৬২ টাকা করা হয়েছে। অথচ দেশে বিক্রি হওয়া প্রায় ৭৫ শতাংশ সিগারেটই এই স্তরের। মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের বেশি হওয়ায় এ ধরনের সামান্য মূল্য বৃদ্ধি তামাক ব্যবহার কমাতে কার্যকর হবে না।
তিনি বলেন, বর্তমানে বিভিন্ন স্থানে নিম্নস্তরের সিগারেট প্রতি শলাকা ৭ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ফলে নতুন মূল্য কাঠামোর কারণে তামাক কোম্পানিগুলো প্রতি শলাকায় প্রায় ৮০ পয়সা অতিরিক্ত মুনাফা অর্জনের সুযোগ পাবে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে নিম্নস্তরের সিগারেট বিক্রি হয়েছিল ৬৮.৮৯ বিলিয়ন শলাকা। এই হিসাবে কোম্পানিগুলোর অতিরিক্ত আয় দাঁড়াতে পারে প্রায় ৫ হাজার ৫১২ কোটি টাকা। একই সঙ্গে সরকার বিপুল সম্ভাব্য রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
প্রধান আলোচকের বক্তব্যে ড্যাবের মহাসচিব ডা. মো. জহিরুল ইসলাম বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটে নিকোটিন পাউচ, নিকোটিন গ্র্যানুলস এবং হিটেড টোব্যাকো প্রোডাক্টস (এইচটিপি)-এর ওপর কর আরোপ করা হয়েছে। এর ফলে এসব নতুন নিকোটিনজাত পণ্য কার্যত বৈধতা পাচ্ছে। এতে বাজার সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হবে এবং তরুণ ও কিশোরদের মধ্যে নিকোটিন আসক্তির ঝুঁকি বাড়তে পারে।
সভাপতির বক্তব্যে ড্যাবের সভাপতি অধ্যাপক ডা. হারুন আল রশিদ বলেন, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের প্রস্তাব অনুযায়ী নিম্নস্তরের সিগারেট ও ধোঁয়াবিহীন তামাকপণ্যের কর ও মূল্য কাঠামো পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন। তাঁর দাবি, এসব প্রস্তাব বাস্তবায়ন করা হলে সরকার অতিরিক্ত প্রায় ৪৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আয় করতে পারবে। একই সঙ্গে প্রায় পাঁচ লাখ প্রাপ্তবয়স্ক ধূমপায়ী ধূমপান ত্যাগে উৎসাহিত হবে, ৩ লাখ ৭২ হাজার তরুণ ধূমপান শুরু করা থেকে বিরত থাকবে এবং দীর্ঘমেয়াদে প্রায় চার লাখ অকালমৃত্যু প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে।
সেমিনারে বক্তারা তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন সংশোধনের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে আগামী প্রজন্মকে তামাক ও নিকোটিনের ক্ষতি থেকে সুরক্ষায় আরও কার্যকর করনীতি ও নিয়ন্ত্রণমূলক পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানান। তাদের মতে, তামাকপণ্য সহজলভ্য থাকলে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার লক্ষ্য অর্জন কঠিন হবে। তাই বাজেটের চূড়ান্ত অনুমোদনের আগে কর কাঠামো পুনর্বিবেচনার এখনই উপযুক্ত সময়।




