kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৪ মাঘ ১৪২৭। ২৮ জানুয়ারি ২০২১। ১৪ জমাদিউস সানি ১৪৪২

সৎ ছেলের লোভের আগুনে এক মায়ের মৃত্যুর লোমহর্ষক ঘটনা

এস এম আজাদ   

১ ডিসেম্বর, ২০২০ ২০:৩৪ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



সৎ ছেলের লোভের আগুনে এক মায়ের মৃত্যুর লোমহর্ষক ঘটনা

সীমা আক্তার।

মায়ের মৃত্যুর পর বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করলেও সৎ মায়ের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক ছিল প্রথম পক্ষের ছেলের। কিন্তু স্ত্রী ও শ্বশুর-শাশুড়ির কথায় তৈরি হয় অবিশ্বাস ও সন্দেহ। ছেলের ধারণা, বাবার সম্পত্তি নিয়ে নিবে সৎ মা। পারিবারিক টানাপোড়েনে তিনি বাবার কাছ থেকে আলাদা থেকে প্রতি মাসে ৫০ হাজার টাকা দাবি করেন। পারিবারিক বৈঠকে বাবা তার ছেলেকে তার সঙ্গে থাকতে অনুরোধ করে মাসে ২০ হাজার টাকা দিতেও রাজি হন। তবে এতে সন্দেহ কাটেনি ছেলের। সেই সন্দেহে ঘি ঢালে শ্বশুর বাড়ির লোকজন। শুরু হয় বাকবিতণ্ড, ঝগড়া। একপর্যায় ‘পথের কাটা’ সৎ মাকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করে সেই পাষণ্ড ছেলে। ভয়ংকর ক্রোধে মৃত লাশে গাসের চুলা থেকে কাপড়দিয়ে আগুনও ধরিয়ে দেয়। সবাই মিলে ঘটনা ধামাচাপা দেওয়া চেষ্টা করে। তবে অপরাধবোধ আর অনুশোচনায় সেই ছেলে নিজের ঘরে ফ্যানের সঙ্গে কাপড় বেধে আত্মহত্যার চেষ্টা করে।

রাজধানীর কাফরুলের বাইশটেক ইমামনগর এলাকায় গত রবিবার গৃহবধূ সীমা আক্তার হত্যাকাণ্ড ঘটেছে এভাবেই। পুলিশের হাতে গ্রেপ্তারের পর সোমবার তাঁর দ্বিতীয়পক্ষের সৎ ছেলের এসএম আশিকুর রহমান নাহিদ সিকদার ঢাকা মহানগর হাকিম আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদেও মিলেছে একই রকম তথ্য। 

এই ঘটনায় গত রবিবার রাত থেকে গতকাল ভোর পর্যন্ত উত্তরখান, কাফরুলের ইমাননগর ও আশপাশের এলাকায় অভিযান চালিয়ে নাহিদসহ ছয়জনকে গ্রেপ্তার করেছে কাফরুল থানা পুলিশ। অপর গ্রেপ্তারকৃতরা হলো- নাহিদের স্ত্রী জাকিয়া সুলতানা আইরিন, শ্বশুর আসেক উল্লা, শাশুড়ি রোকেয়া বেগম, বাবা (সীমার স্বামী) শাহজাহান শিকদার এবং নাহিদের শ্যালক সাকিব। আদালতের নির্দেশে তাদের জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে। 

পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, বাবার টাকা নিয়ে বিরোধের জেরে নাহিদ ছুরিকাঘাতে তার সৎ মা সীমাকে হত্যা করে এবং নিথর শরীরে গ্যাসের চুলা থেকে আগুন এনে ধরিয়ে দেয়। এই ঘটনায় অপর আসামিরাও প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত ছিল বলে প্রাথমিক তথ্য মিলেছে। সীমার স্বজনরা বলছেন, সম্পতির লোভে নিরপরাধ সীমাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যার পর ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। এই ঘটনায় নাহিদসহ তার শ্বশুর বাড়ির লোকজন জড়িত।

কাফরুল থানার ওসি সেলিমুজ্জামান কালের কণ্ঠকে জানান, রবিবার দুপুরে পূর্ব বাইশটেক ইমাম নগরের ৫৫/৬/সি নম্বর বাড়ি থেকে সীমার লাশ উদ্ধার করা হয়। প্রাথমিকভাবেই ছুরিকাঘাতে হত্যার পর আগুন দেওয়ার আলামত মেলে। সীমার বড় ভাই শরীফ মোহাম্মদ হত্যা মামলা করেন। ভোরে উত্তরখান থানা এলাকা থেকে নাহিদকে এবং কাফরুলের ইমাননগর ও আশপাশের এলাকায় অভিযান চালিয়ে অপর পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। নাসির নামে তাদের আরেক আত্মীয় পলাতক আছে। 

ওসি বলেন, ‘বিজ্ঞ আদালতে নাহিদ জবানবন্দী দিয়েছে। টাকা পয়সা নিয়ে পারিবারিক বিরোধের জেরে হত্যা করা হয়। এরপর রান্নাঘরের গ্যাসের চুলা থেকে কাপড় ও কাগজে আগুন ধরিয়ে সীমার গায়ে দেওয়া হয়। ঘটনার পরই অনুশোচনায় গলায় দড়ি দিতে যায় নাহিদ। গ্রেপ্তারের পর সে সব স্বীকার করেছে।’ জানতে চাইলে সেলিমুজ্জামান বলেন, ‘অপর আসামিদের সম্পৃক্ততার প্রাথমিক তথ্য মিলেছে। তদন্তে তাদের ভূমিকা কতটুকু তা দেখা হবে।’ 

গতকাল ঢাকা মহানগর হাকিম নিভানা খায়ের জেসীর আদালত নাহিদের জবানবন্দী রেকর্ড করেন। একইসঙ্গে অপর পাঁচ আসামিকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দিয়েছেন আদালত। 

এদিকে, গতকাল দুপুরে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ মর্গে সীমা আক্তারের ময়নাতদন্ত শেষে মৃতদেহটি গ্রামের বাড়ি গোপালগঞ্জ মোকসেদপুর উপজেলার ডাংগা দূর্গাপুর গ্রামে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে লাশ দাফন করা হয়েছে। 

স্বজনরা জানান, প্রথম স্বামী ওবায়দুর রহমানের সঙ্গে সীমার বিবাহবিচ্ছেদ হয় প্রায় নয় বছর আগে। সেই সংসারে সীমার হোসাইন আহমেদ (১৫) ও মাহিয়া (৭) নামে দুই সন্তান রয়েছে। মেয়েটি গ্রামে দাদা-দাদির কাছে ও ছেলেটি মিরপুরে থাকে। সীমা কয়েক বছর একটি হাসপাতালে ফার্মেসিতে কাজ করেন। প্রথম স্ত্রীর মৃত্যুর পর প্রায় মাস আগে শাহজাহান সিকদার বিয়ে করেন সীমাকে। বিয়ের পর থেকে শাহজাহান, তার ছেলে নাহিদ সিকদার ও নাহিদের স্ত্রী আইরিনকে নিয়েই থাকতেন সীমা। 

নিহত সীমার বাবা আইয়ুব আলী সরদার বলেন, নাহিদের সঙ্গে সৎ মা সীমার সম্পর্ক বেশ ভালোই ছিল। তবে কিছুদিন আগে নাহিদ শ্বশুর বাড়ি থেকে আসার পর থেকে পরিবারে ঝামেলা শুরু করে। তার বাবা মায়ের সঙ্গে সে (নাহিদ) আর একসাথ থাকবে না বলে জানায়। এ নিয়ে ঝামেলা হলে শনিবার রাতে নাহিদের শ্বশুর, শাশুড়ি, স্ত্রী, নাহিদের বাবা ও সীমাসহ সবাই বসে মীমাংসার চেষ্টা করেছিল। মেয়ের কাছে ফোনে শোনা কথার বরাতে আইয়ুব আলী বলেন, নাহিদ স্ত্রী নিয়ে আলাদা থাকতে মাসে ৫০ হাজার টাকা হাত খরচ দাবি করে। তার বাবা তাকে আলাদা হয়ে যেতে রাজি না হয়ে তাদের সঙ্গে থাকলে মাসে ২০ হাজার টাকা হাত খরচ দিবে বলে জানায়। তবুও ছেলে নাহিদ তা মানছিল না। তার বাবার দুটি ফ্লাট, কার্টুনের ব্যবসাসহ আরো সম্পদ আছে। নাহিদ ভাবতো তার বাবা দ্বিতীয় স্ত্রী সীমাকে সব লিখে দিবে। এ নিয়ে সে ঝগড়াও করে। এরপর শ্বশুর, শাশুড়ি ও স্ত্রী মিলে পরিকল্পিতভাবে সীমাকে হত্যা করে বলে দাবি করেন নিহতের বাবা। 

সীমার প্রথম পক্ষের ছেলে হোসাইন আহমেদ জানান, তিনি মিরপুর ১ নম্বর সেকশনে থাকেন। একটি ওয়েশ ফ্যাক্টরিতে কাজ করেন। মায়ের মৃত্যুর খবর সহ্য করতে পারবে না বলে রবিবার দুপুরেই তাকে খবর দেওয়া হয় তার দাদা মারা গেছেন। পরবর্তিতে মায়ের খুন হওয়ার খবর শুনতে পান তিনি। গতকাল মর্গে এসে মৃত মায়ের মুখ দেখেন হোসাইন।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা