kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৭ শ্রাবণ ১৪২৭। ১১ আগস্ট ২০২০ । ২০ জিলহজ ১৪৪১

'আমাগে মারলো না তার চেয়ে বেশি কিছু করলো'

অনলাইন ডেস্ক   

৩১ জুলাই, ২০২০ ১৪:২২ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



'আমাগে মারলো না তার চেয়ে বেশি কিছু করলো'

'ভাবছিলাম গোসলের পর মাইরা ফেলাইবে। আমাগে মারলো না তার চেয়ে বেশি কিছু করলো। একই ঘরে আমারে আর আমার মাইয়ারে এক সাথে নির্যাতন শুরু করলো। ওই দিন সারা রাত একের পর এক কুকুরের মতো নির্যতন চালায়।'

২০১৩ সালে কালের কণ্ঠের গোপালগঞ্জের প্রতিনিধি প্রসূন মণ্ডলের কাছে কথাগুলো বলছিলেন কাশিয়ানী উপজেলার বীরাঙ্গনা রওশন আরা বেগম। 

দীর্ঘদিন বার্ধক্যজনিত সমস্যায় ভুগে গতকাল বৃহস্পতিবার বিকাল চারটায় পশ্চিম মাঝিগাতি গ্রামে নিজ বাড়িতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন তিনি। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিলো ৮৫ বছর।

স্মৃতিচারণ করে ওই সময়ে বীরাঙ্গনা রওশন আরা বেগম কালের কণ্ঠকে যা বলছিলেন তা পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো। তিনি বলছিলেন, 'পাকিস্তানি মিলিটারিরা আমাগে ঘরের দরজা ভাঙিয়া ঢোয়ে। আইসা আমার স্বামীকে খুঁজে আর বকাবকি করে। আমি ভয়ে মাইয়াডারে বুহে জড়াই ধরি। তহন ঘরে আর কেউ ছেলো না। এক হারামজাদা মিলিটারি আমার বুয়েরথে মাইডারে টাই না নিয়ে চোখ বান্ধিয়া ফেলে। আর একজন বন্ধুক বুকে ঠেহাইয়া বলে চেচামেছি করলি ফায়ার কইরা দেবো। পরে আমারে ও মাইয়া মরিয়মকে চোখ বান্দিয়া ক্যাম্পে নিয়া যায়।'

তিনি বলছিলেন, 'ক্যাম্পে নিয়ে আমাগে সাবান দিয়ে গোসল করতে বলে। শীতের সময় ভয়ে ভয়ে গোসল করি। ভাবছিলাম গোসলের পর মাইরা ফেলাইবে। আমাগে মারলো না তার চেয়ে বেশি কিছু করলো। একই ঘরে আমারে আর আমার মাইয়ারে এক সাথে নির্যাতন শুরু করলো। নির্যতনের সময় আমার মেয়ে অসুস্তু হয়ে পড়লো। একটু সুস্থ হওয়ার পর আবারো তাকে নির্যাতন শুরু করে। ওই দিন সারা রাত একের পর এক কুকুরের মতো নির্যতন চালায়। 

তিনি স্মৃতি চারণ করে বলছিলেন, 'ফজরের আযান দেয়ার পর থামে। তখন একটু ঘোমাই। দিনের বেলা ঘরে আটকায় রাখে। কোনমতে খাবার দিত। নির্যাতনে আমাগে দুইজনের জ্বর শুরু হলো। তাতেও তারা রেহাই দিলো না। রাত হলে শুরু করতো নির্যাতন। কত হাতে পায় ধরছি কোন কাজ হয়নাই। চিৎকার করতাম। ভাবতাম চিৎকার করলে গ্রামের মানুষ টের পাবে। আমরা মুক্তি পাবো। তাতে কোন কাজ হলো না।'

তিনি বলছিলেন, 'তিন দিন চার রাত এভাবে নির্যাতন করার পর মারাত্বক অসুস্থ অবস্থায় ছাইড়া দেয়। কোনমতে বাড়ি ফিরি। আইসা দেখি বাড়িতে কেউ নাই। খাবারও নাই। শুধু পানি খাইয়া দুইদিন কাটাই। তিন দিনের দিন আমার স্বামী মেলা রাতে বাড়ি ফেরে। ওই রাতে কোহানথেইকা যে সের খানেক আটা দিয়ে আবার চইলা যায়। এর ১৭ দিন পর দেশ স্বাধীনের আগেই আমার মরিয়ম মইরা যায়। তারে কোন ডাক্তার দেহাতে পারিনাই। বিনা চেষ্টায় মাইডা মইরা গেলো।'

বীরাঙ্গনা রওশন আরা আরো বলেছিলেন, 'দেশ স্বাধীনের পর তিনি ও তাঁর স্বামী মাঠে-ঘাটে, পরের জমিতে কাজ করে কোনমতে নতুন করে সংসার শুরু করেন। যে আয় হতো তা দিয়ে কোনমতে সংসার চলত। এর মধ্যে তাঁদের দুই ছেলে , এক মেয়ে হয়। এরপর স্বামী ভ্যান চালানো ধরে। ১৯৯০ সালের দিকে স্বামী মারা যায়। ছেলেরা বিয়ে করে আলাদা খায়। আমার খোঁজ খবর নেয়না। মেয়েটারও স্বামী মারা যায়। এরপর পরের বাড়ি ও রাস্তা ঘাটে দাড়িয়ে ভিক্ষা করা শুরু করি, আর মাইডা পরের বাড়ি কাজ করে। এইভাবে আমাদের সংসার চলতো।'

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা