মহানবী (সা.) আমাদের উত্তম আদর্শ। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে উত্তম নির্দেশনা দিয়েছেন তিনি। খাবার গ্রহণের ক্ষেত্রেও উত্তম আদর্শ তিনি। নিচে রাসুল (সা.) কিভাবে খাবার খেতেন সে সম্পর্কে আলোকপাত করা হলো― এক. খাওয়ার শুরুতে বিসমিল্লাহ বলা রাসুল (সা.) খাবারের শুরুতে ‘বিসমিল্লাহ’ বলতেন এবং অন্যদেরও বলতে উৎসাহিত করতেন। রাসুল (সা.) বলেন, ‘আল্লাহর নাম নিয়ে ও ডান হাত দ্বারা খানা খাও। এবং তোমার দিক হতে খাও।’ (বুখারি, হাদিস : ৫১৬৭, তিরমিজি, হাদিস : ১৯১৩) আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, যখন তোমরা খানা খেতে শুরু করো তখন আল্লাহর নাম স্মরণ করো। আর যদি আল্লাহর নাম স্মরণ করতে ভুলে যাও, তাহলে বলো, ‘বিসমিল্লাহি আওয়ালাহু ওআখিরাহ।’ (রিয়াজুস সালেহিন : ৭২৯)। দুই. দস্তরখানা বিছিয়ে খাওয়া রাসুল (সা.) খাওয়ার সময় দস্তরখানা বিছিয়ে খেতেন। তিনি এ ব্যাপারে অনেক যত্নশীল ছিলেন। আনাস (রা.) বলেন, নবী (সা.) কখনো ‘সুকুর্জা’ অর্থাৎ ছোট ছোট পাত্রে আহার করেছেন, তার জন্য কখনো নরম রুটি বানানো হয়েছে কিংবা তিনি কখনো টেবিলের ওপর আহার করেছেন বলে আমি জানি না। ক্বাতাদাহকে জিজ্ঞেস করা হলো, তাহলে তাঁরা কিসের ওপর আহার করতেন। তিনি বললেন, দস্তরখানার ওপর। (বুখারি, হাদিস নম্বর : ৫৩৮৬) ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমার খালাম্মা একবার রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দরবারে গুইসাপ, কাঁধের গোশত ও দুধ হাদিয়া পাঠালেন। তিনি গুইসাপকে দস্তরখানার ওপর রাখলেন। তিনি তা খাননি। তিনি দুধ পান করলেন এবং ছাগলের গোশত খেলেন। এই হাদিস দ্বারা বুঝে আসে, রাসুল (সা.) দস্তরখানা বিছিয়ে খেতেন। অন্য এক হাদিসে আছে, তিনি খাবারগুলো দস্তরখানার ওপরে রাখলেন। (তুহফাতুল ক্বারি ১০/৩৫৬) তিন. ডান হাত দিয়ে খাবার খাওয়া রাসুল (সা.) আজীবন ডান হাত দ্বারা খাবার খেয়েছেন। এবং বাম হাত দ্বারা খাবার খেতে মানুষকে নিষেধ করেছেন। আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেন, ‘তোমরা বাম হাত দ্বারা খাবার খেয়ো না ও পান কোরো না। কেন না শয়তান বাম হাতে খায় ও পান করে।’ (তিরমিজি, হাদিস : ১৯১২) চার. হাত চেটে খাওয়া রাসুল (সা.) খাওয়ার সময় সর্বদা হাত চেটে খেতেন। না চাটা পর্যন্ত কখনো হাত মুছতেন না। ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেন, ‘তোমরা যখন খাবার গ্রহণ করবে, তখন হাত চাটা নাগাদ তোমরা হাতকে মুছবে না।’ (বুখারি, হাদিস : ৫২৪৫) অন্য হাদিসে রাসুল (সা.) বলেন, ‘তোমরা যখন খাবার গ্রহণ করো তখন আঙুল চেটে খাও। কেননা বরকত কোথায় রয়েছে তা তোমরা জানো না।’ (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ১৯১৪) পাঁচ. পড়ে যাওয়া লুকমা তুলে খাওয়া খাবার গ্রহণের সময় দেখা যায় অনেকের থালাবাসন থেকে খাবারের লুকমা বা এক-দুই টুকরা ভাত, রুটি কিংবা অন্য সব খাবার পড়ে যায়। তাহলে তা তুলে খেতে হবে। রাসুল (সা.)-এর খাবারকালে যদি কোনো খাবার পড়ে যেত, তাহলে তিনি তুলে খেতেন। জাবের (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেন, ‘তোমাদের খাবার আহারকালে যদি লুকমা পড়ে যায়, তাহলে ময়লা ফেলে তা ভক্ষণ করো। শয়তানের জন্য ফেলে রেখো না।’ (তিরমিজি : ১৯১৫, ইবনে মাজাহ : ৩৪০৩) ছয়. হেলান দিয়ে না খাওয়া মহানবী (সা.) কোনো কিছুর ওপর হেলান দিয়ে খাবার খেতে নিষেধ করেছেন। আবু হুজাইফা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসুল (সা.)-এর দরবারে ছিলাম। তিনি এক ব্যক্তিকে বলেন, আমি টেক লাগানো অবস্থায় কোনো কিছু ভক্ষণ করি না। (বুখারি, হাদিস ৫১৯০, তিরমিজি, হাদিস ১৯৮৬) সাত. দোষ-ত্রুটি না ধরা আমাদের অনেককে দেখা যায় খাবারের মধ্যে নানা রূপ দোষ-ত্রুটি ধরতে। এ নিয়ে আমাদের পরিবারে ঝগড়াঝাঁটি হচ্ছে দেদার। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদের মতো অপ্রীতিকর ঘটনাও ঘটছে। অথচ রাসুল (সা.)-এর পূর্ণ জিন্দেগিতে কখনো খাবারের দোষ ধরতেন না। আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, রাসুল (সা.) কখনো খাবারের দোষ-ত্রুটি ধরতেন না। তাঁর পছন্দ হলে খেতেন আর অপছন্দ হলে পরিত্যাগ করতেন। (বুখারি, হাদিস : ৫১৯৮, ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৩৩৮২) আট. খাবারে ফুঁ না দেওয়া খাবারের মধ্যে ফুঁক দেওয়া অনেক রোগ পয়দা হওয়ার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। রাসুল (সা.) খাবারে ফুঁ দিতে নিষেধ করেন। ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) কখনো খাবারে ফুঁ দিতেন না। ফুঁ দিতেন না কোনো কিছু পানকালেও। (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৩৪১৩) নয়. খাওয়া শেষে দোয়া পড়া খাবার খাওয়া শেষ হলে আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করা অপরিহার্য। রাসুল (সা.) খাওয়ার শেষে দোয়া পড়তেন। আবু উমামা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) খাবার শেষ করে বলতেন, ‘আলহামদুলিল্লাহি হামদান কাসিরান ত্বয়্যিবান মুবারাকান ফিহি, গায়রা মাকফিইন, ওলা মুয়াদ্দায়িন ওলা মুসতাগনা আনহু রাব্বানা।’ তিনি কখনো এই দোয়া পড়তেন : ‘আলহামদুলিল্লাহিল্লাজি আতআমানা ওয়াছাকানা ওয়াজাআলানা মিনাল মুসলিমিন।’ (বুখারি, হাদিস : ৫৪৫৮) দশ. তিন শ্বাসে পানি পান করা রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা এক চুমুকে উটের মতো পানি পান কোরো না; বরং দুই-তিনবার (শ্বাস নিয়ে) পান কোরো। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ১৮৮৫) তা ছাড়া পানির পাত্রে নিঃশ্বাস ফেলাও অনুচিত। নবীজি (সা.) বলেন, ‘তোমরা (পান করার সময়) পাত্রে নিঃশ্বাস ফেলো না।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১৫৪) আমরা যদি আমাদের জীবন চলার পথে রাসুল (সা.)-এর সুন্নাতগুলো পূর্ণতার সঙ্গে জীবনে প্রতিষ্ঠা করতে পারি, তাহলে আমাদের জীবন হবে সুন্দর থেকে সুন্দরতম। আমাদের শেষ পরিণাম হবে মধুময়। সুখ-শান্তির আভায় ভরপুর। আল্লাহ আমাদের তাওফিক দান করুন। আমিন!