কক্সবাজারে আশ্রয় নেওয়া প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী এবং আশ্রয়দাতা জনগোষ্ঠীর জন্য অতিরিক্ত ১ কোটি ৪০ লাখ ইউরো (প্রায় ২০০ কোটি টাকা) সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)।
বৃহস্পতিবার এক যৌথ সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর এ সহায়তার ঘোষণা দেয়।
সংস্থাগুলো জানায়, ইইউর মানবিক সহায়তা এবং আগের উন্নয়ন সহায়তার পাশাপাশি এই অর্থায়নের মাধ্যমে রোহিঙ্গা শরণার্থী ও প্রায় ৭০ হাজার বাংলাদেশি আশ্রয়দাতা জনগোষ্ঠীর সদস্য উপকৃত হবেন। এর আওতায় দক্ষতা উন্নয়ন কার্যক্রম এবং পরিচ্ছন্ন রান্নার জ্বালানি (এলপিজি) ব্যবহারের সুযোগ বাড়ানো হবে।
বাংলাদেশে ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত ও প্রতিনিধি দলের প্রধান মাইকেল মিলার বলেন, বাংলাদেশে রোহিঙ্গা শরণার্থী ও আশ্রয়দাতা জনগোষ্ঠীর পাশে থাকতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এই সংকট দীর্ঘদিন ধরে চলছে। তাই এখন শুধু জরুরি সহায়তা নয়, শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন ও আয়ের সুযোগ তৈরির দিকেও নজর দিতে হবে।
তিনি বলেন, আজকের এই ১.৪ কোটি ইউরো সহায়তা কক্সবাজারের স্থানীয় মানুষকে সহায়তা করবে, আর রোহিঙ্গাদের জন্য শিক্ষা ও কাজের দক্ষতা শেখার সুযোগ বাড়াবে। এতে তাদের জীবনযাত্রার মানও উন্নত হবে। এই উদ্যোগের লক্ষ্য রোহিঙ্গাদের মর্যাদা রক্ষা করা, তাদের সক্ষম করে তোলা এবং সুযোগ এলে স্বেচ্ছায়, নিরাপদে ও সম্মানের সঙ্গে মিয়ানমারে ফেরার জন্য প্রস্তুত করা।
বাংলাদেশে ইউএনএইচসিআরের রিপ্রেজেনটেটিভ ইভো ফ্রেইসেন বলেন, গত নয় বছর ধরে চরম দুর্ভোগের মধ্যে থাকা রোহিঙ্গা পরিবারগুলোর জন্য নিরবচ্ছিন্ন সহায়তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রোহিঙ্গাদের পাশে থাকার জন্য আমরা ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতি কৃতজ্ঞ। এই সহায়তা তাদের প্রয়োজনীয় সুরক্ষা সেবা পাওয়া, মৌলিক চাহিদা পূরণ এবং একটি নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ ভবিষ্যতের আশা ধরে রাখতে সাহায্য করবে।
ঘনবসতিপূর্ণ ক্যাম্প, সীমিত সম্পদ এবং দীর্ঘদিনের বাস্তুচ্যুত জীবনের কারণে রোহিঙ্গারা অনেক ঝুঁকিতে আছেন। ক্যাম্পে নিরাপদ আশ্রয়, পর্যাপ্ত আলো, কমিউনিটিভিত্তিক সুরক্ষা ব্যবস্থা এবং সহজে অভিযোগ জানানোর সুযোগ থাকা জরুরি, যাতে শরণার্থীদের অধিকার ও মর্যাদা রক্ষা পায়। বিশেষ করে নারী ও শিশুরা জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা, মানব পাচার এবং শোষণের ঝুঁকিতে বেশি থাকেন।
তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) ব্যবহারের ফলে নারী ও শিশুদের জ্বালানি কাঠ সংগ্রহে বাইরে যেতে হয় না, ফলে তাদের নিরাপত্তা বাড়ে। একই সঙ্গে এটি স্বাস্থ্যঝুঁকি ও বন উজাড়ের চাপ কমায়। পাশাপাশি, জীবিকা ও দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ বাড়ানো জরুরি, যাতে শরণার্থীরা সাহায্যের ওপর কম নির্ভর করেন এবং নিজের জীবনে নিজের ভূমিকা ও লক্ষ্য খুঁজে পান।
এতে বলা হয়, আগামী ২০ জুন বিশ্ব শরণার্থী দিবসের ঠিক আগে এই সহায়তা ঘোষণা করা হলো। এ দিবসটি সহিংসতা ও নির্যাতনের কারণে নিজ ঘরবাড়ি ছাড়তে বাধ্য হওয়া মানুষের দৃঢ়তা ও শক্তিকে সম্মান জানানোর সুযোগ করে দেয়। পাশাপাশি বাস্তুচ্যুত মানুষের প্রতি সংহতি পুনর্ব্যক্ত এবং আশ্রয়দাতা জনগোষ্ঠীর অবদানকে স্বীকৃতি দেওয়ারও একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ। ইউরোপীয় ইউনিয়ন মানবিক ও উন্নয়নমূলক কর্মসূচির অন্যতম প্রধান বৈশ্বিক সহায়তাকারী, যারা মানুষের সক্ষমতা বাড়ানো ও টেকসই সমাধানে জোর দেয়। জরুরি সেবা চালু রাখতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উদার সহায়তা এখনও অনেক প্রয়োজন।
এতে আরও বলা হয়, রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় ২০২৫-২০২৬ সালের যৌথ সাড়াদান পরিকল্পনা (জেআরপি) বাস্তবায়নে ইউএনএইচসিআর বাংলাদেশ সরকার, মানবিক সংস্থা এবং দাতাদের সঙ্গে কাজ করছে। চলতি বছরে এই পরিকল্পনার জন্য ৭১ কোটি মার্কিন ডলার প্রয়োজন, যাতে নতুন আগতসহ ১২ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীর জরুরি চাহিদা পূরণ করা যায় এবং তারা নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের সুযোগ না পাওয়া পর্যন্ত সম্মানের সঙ্গে জীবনযাপন করতে পারেন।






