• ই-পেপার

স্কুলপড়ুয়া ছোট্ট মেয়ের জিমন্যাস্টিকসে মুগ্ধ গোটা বিশ্ব (ভিডিওসহ)

খুলনায় বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতির প্রাণীর সন্ধান

অনলাইন ডেস্ক
খুলনায় বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতির প্রাণীর সন্ধান

খুলনায় বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতির একটি প্রাণীর সন্ধান মিলেছে। এটি দেখতে অনকটা কাঠবিড়ালির মত হলেও কাঠবিড়ালি নয় বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। সস্প্রতি নগরীর দক্ষিণ টুটপাড়া ২নং ক্রস রোডস্থ একটি বাড়ির নারকেল গাছ থেকে প্রাণীটি নিচে পড়ে যায়। 

ফটো সাংবাদিক এমএম মিন্টুর স্ত্রী লাভলি বেগম প্রাণীটিকে উদ্ধার করে তার বাসায় হেফাজতে রেখেছেন। তিনি ওই বাসাতেই ভাড়া থাকেন। সেখানেই আদর-যত্নে রয়েছে প্রাণীটি। প্রাণীটি পানি পান করছে। ভাত খাচ্ছে। খাচ্ছে আম-কাঁঠাল ও কলাসহ নানা ফলমূল। প্রাণীটি হস্তান্তরের জন্য খুলনার বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগকে ইতিমধ্যে অবহিত করা হয়েছে। 

অনুসন্ধানে প্রাণীটির বিভিন্ন নাম পাওয়া গেছে। এগুলো হচ্ছে, দুর্লভ প্রজাতির সুগার গ্লাইডার (পেটাউরাস ব্রেভিসেপস), ইন্ডিয়ান পাম্প সিভেট ও গন্ধগোকুল (এশিয়ান প্লাম সিভেট)। 

সাংবাদিক এম এম মিন্টু জানান, গতকাল তার বাসার একটি নারকেল গাছ থেকে প্রাণীটি নিচে পড়ে যায়। এ সময় একটি বিড়াল প্রাণীটির ওপর আক্রমণ করার চেষ্টা করে। বিষয়টি দেখতে পেয়ে তাৎক্ষণিকভাবে তার স্ত্রী গৃহিণী লাভলি বেগম এ প্রাণী উদ্ধার করে ঘরে নিয়ে খেতে দেন এবং আদর-যত্ন করেন। তাকে আম, কাঁঠাল খেতে দেওয়া হচ্ছে। এটি পুনর্বাসনের জন্য বন বিভাগে খবর দেওয়া হয়েছে। দেখতে অনেকেই তার বাসায় ভিড় করছেন। 

প্রাণীবিদদের মতে, সুগার গ্লাইডার (পেটাউরাস ব্রেভিসেপস) একটি ছোট, নিশাচর মাসুপিয়াল। যা অস্ট্রেলিয়া, নিউ গিনি এবং ইন্দোনেশিয়ায় পাওয়া যায়। এরা প্যাটাগিয়াম নামক একটি ঝিল্লি ব্যবহার করে গাছ থেকে গাছে উড়ে বেড়ানোর ক্ষমতার জন্য পরিচিত। যা তাদের সামনের পা থেকে পেছনের পা পর্যন্ত বিস্তৃত। যদিও বন্য পরিবেশে গাছের রস এবং মধুর প্রতি তাদের বিশেষ আকর্ষণ রয়েছে, তবে বন্দী অবস্থায় তাদের জন্য একটি স্বাস্থ্যকর, সুষম খাদ্য তালিকা বজায় রাখা কঠিন। তাদের পুষ্টিজনিত রোগও সাধারণ। সুগার গ্লাইডাররা অত্যন্ত সামাজিক প্রাণী। এরা দলে বাস করে এবং তাদের বিশেষ যত্নের প্রয়োজন হয়, যা তাদের পোষা প্রাণী হিসেবে পালনকে বেশ কঠিন করে তোলে। 

সুগার গ্লাইডারের সামনের ও পেছনের পায়ের মাঝখানে একটি পাতলা চামড়ার পর্দা (প্যাটাজিয়াম) থাকে। এর সাহায্যে এরা এক গাছ থেকে অন্য গাছে প্রায় ১৫০ ফুট (৫০ মিটার) পর্যন্ত বাতাসে ভেসে বা গ্লাইড করে যেতে পারে। লেজসহ এদের দৈর্ঘ্য প্রায় ১০ থেকে ১২ ইঞ্চি হয় এবং ওজন মাত্র ৯৫ থেকে ১৬০ গ্রামের মতো হয়ে থাকে। এদের কপালে ও পিঠে একটি গাঢ় ডোরাকাটা দাগ থাকে। দিনের বেলা এরা ঘুমিয়ে কাটায় এবং রাতের আঁধারে খাবার ও শিকারের সন্ধানে সক্রিয় হয়ে ওঠে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, গ্লাইডাররা অত্যন্ত সামাজিক প্রাণী। বন্য পরিবেশে এরা ৫ থেকে ১২টি গ্লাইডারের দলে (কলোনিতে) বাস করে। একা রাখলে এরা চরম বিষণ্নতায় ভুগতে পারে। প্রকৃতিতে এরা মূলত গাছের রস, মিষ্টি ফুলের মধু, পরাগ এবং ছোট ছোট পোকামাকড় খেয়ে জীবনধারণ করে। এদের খাদ্যতালিকায় ক্যালোরি ও পুষ্টির ভারসাম্য বজায় রাখা খুব জরুরি। সঠিক পরিচর্যা ও নিয়মিত পশুচিকিৎসার মাধ্যমে এরা সাধারণত ১২ থেকে ১৫ বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকে। বাসায় পোষার জন্য এদের বড় খাঁচা, লুকানোর জায়গা, সঠিক ডায়েট এবং সবসময় সঙ্গ দেওয়ার জন্য অন্তত এক জোড়া সুগার গ্লাইডার প্রয়োজন হয়।

গন্ধগোকুল (এশিয়ান প্লাম সিভেট) বা সুগার গ্লাইডার হলো দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একটি নিশাচর স্তন্যপায়ী বন্যপ্রাণী। এটি বিড়ালের মতো দেখতে হলেও মূলত বিড়াল প্রজাতির নয়। এর শরীর থেকে পোলাও চালের মতো এক ধরনের মিষ্টি সুগন্ধ বের হওয়ার কারণে এটি বিশেষভাবে পরিচিত। এদের শরীর সাধারণত ৪৮-৫৯ সেন্টিমিটার এবং লেজ ৪৪-৫৩ সেন্টিমিটার লম্বা হয়। ওজন ২ থেকে ৫ কেজি পর্যন্ত হতে পারে।

বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এটি গাছখাটাশ, তালখাটাশ, ভোন্দর, নোঙর, সাইরেল, ল্যঞ্জা বা পোলাও প্রাণী নামে পরিচিত। তবে এটি গন্ধগোকুলও হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। গন্ধগোকুলের লেজের গোড়ায় একটি বিশেষ গ্রন্থি থাকে। চলাচলের সময় এই গ্রন্থি থেকে এক ধরনের রস নিঃসৃত হয়, যা থেকে কস্তুরী বা পোলাও চালের মতো তীব্র সুগন্ধ ছড়ায়। এই গন্ধের মাধ্যমে এরা মূলত নিজেদের এলাকা বা সীমানা চিহ্নিত করে।

খুলনার বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা নির্মল কুমার পাল বলেন, এ প্রাণীটি গন্ধগোকুলও হতে পারে। তবে, উদ্ধার করে দেখার পর বোঝা যাবে। প্রাণীটি এ অঞ্চলে বিলুপ্ত প্রায়। 

মা-বাবার ভরণপোষণের দায়িত্ব না নিলে ১ লাখ টাকা জরিমানা

অনলাইন ডেস্ক
মা-বাবার ভরণপোষণের দায়িত্ব না নিলে ১ লাখ টাকা জরিমানা

মা-বাবা সন্তানের জন্য সেরা আশীর্বাদ। কেননা সন্তানকে জন্মের পর থেকেই মা-বাবা তাদের বেড়ে উঠতে সার্বিক দেখাশোনা করে থাকেন। সন্তানদের উন্নত জীবনের জন্য এবং তাদের সুস্থ, সুন্দর ও ভালো রাখতেই চলে মা-বাবার যত সংগ্রাম। দুর্ভাগ্যবশত সন্তানরা মা-বাবার সহযোগিতার ক্ষেত্রে পুরোপুরি বিপরীতে অবস্থান করেন। সম্প্রতি রাজধানীর মিরপুরের একটি বাসা থেকে নূরজাহান বেগমের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা পুরো দেশকে নাড়িয়ে দিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিষয়টি ব্যাপক আলোড়ন তুলেছে। এরই মধ্যে আবার মা-বাবার ভরণপোষণের আইন প্রসঙ্গটি উঠে এসেছে।

পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন-২০১৩

প্রত্যেক সন্তানকে তাহার পিতা-মাতার ভরণপোষণ নিশ্চিত করিতে হইবে। কোন পিতা-মাতার একাধিক সন্তান থাকিলে সেই ক্ষেত্রে সন্তানগণ নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা করিয়া তাহাদের পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ নিশ্চিত করিবে। প্রত্যেক সন্তানকে পিতা-মাতার একইসঙ্গে একই স্থানে বসবাস নিশ্চিত করিতে হইবে। কোন সন্তান তাহার পিতা বা মাতাকে বা উভয়কে তাহার, বা ক্ষেত্রমত, তাহাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে, কোন বৃদ্ধ নিবাস কিংবা অন্য কোথাও একত্রে কিংবা আলাদা আলাদাভাবে বসবাস করিতে বাধ্য করিবে না। প্রত্যেক সন্তান তাহার পিতা এবং মাতার স্বাস্থ্য সম্পর্কে নিয়মিত খোঁজ খবর রাখিবে, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সেবা ও পরিচর্যা করিবে।

এ ছাড়া পিতা বা মাতা কিংবা উভয়, সন্তান হইতে পৃথকভাবে বসবাস করিলে, সেই ক্ষেত্রে প্রত্যেক সন্তানকে নিয়মিতভাবে তাহার, বা ক্ষেত্রমত, তাহাদের সহিত সাক্ষাৎ করিতে হইবে। কোন পিতা বা মাতা কিংবা উভয়ে, সন্তানদের সহিত বসবাস না করিয়া পৃথকভাবে বসবাস করিলে, সেই ক্ষেত্রে উক্ত পিতা বা মাতার প্রত্যেক সন্তান তাহার দৈনন্দিন আয়-রোজগার, বা ক্ষেত্রমত, মাসিক আয় বা বাৎসরিক আয় হইতে যুক্তিসঙ্গত পরিমাণ অর্থ পিতা বা মাতা, বা ক্ষেত্রমত, উভয়কে নিয়মিত প্রদান করিবে।

এমনকি পিতা-মাতার দাদা-দাদী, অবর্তমানে নানা-নানীর ভরণ-পোষণের কথাও বলা হয়েছে। সেক্ষেত্রে পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ ধারা (৩) এ বর্ণিত ভরণ-পোষণ প্রদানে বাধ্য থাকিবে এবং এই ভরণ পোষণ পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ হিসাবে গণ্য হইবে।

শাস্তির বিধানে কী আছে?

কোন সন্তান ভরণ-পোষণের ধারা ও উপধারার কোনো বিধান লংঘন অপরাধ বলিয়া গণ্য হইবে এবং উক্ত অপরাধের জন্য অনূর্ধ্ব ১ লাখ টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হইবে; বা উক্ত অর্থদণ্ড অনাদায়ের ক্ষেত্রে অনূর্ধ্ব ৩ মাস কারাদণ্ডে দণ্ডিত হইবে।

অথবা কোন সন্তানের স্ত্রী, বা ক্ষেত্রমত, স্বামী কিংবা পুত্র-কন্যা বা অন্য কোন নিকট আত্নীয় ব্যক্তি- পিতা-মাতার বা দাদা-দাদীর বা নানা-নানীর ভরণ-পোষণ প্রদানে বাধা প্রদান করিলে; বা পিতা-মাতার বা দাদা-দাদীর বা নানা-নানীর ভরণ-পোষণ প্রদানে অসহযোগিতা করিলে- তিনি উক্তরূপ অপরাধ সংঘটনে সহায়তা করিয়াছে গণ্যে উপধারা (১) এ উল্লিখিত দণ্ডে দণ্ডিত হইবে।

এই আইনের অধীন অপরাধ আমলযোগ্য, জামিনযোগ্য ও আপোষযোগ্য হবে বলেও বলা হয়েছে।

গণমাধ্যমের ওপর দমন-পীড়নের চক্র ভাঙতে সিপিজের ১০ সুপারিশ

অনলাইন ডেস্ক
গণমাধ্যমের ওপর দমন-পীড়নের চক্র ভাঙতে সিপিজের ১০ সুপারিশ

সাংবাদিকদের ওপর দমন-পীড়নের চক্র ভেঙে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস (সিপিজে)। মঙ্গলবার (২ জুন) সিপিজের ওয়েবসাইটে এ সংক্রান্ত প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয়।

এতে বলা হয়েছে, দুই বছরে বাংলাদেশ তিনটি সরকার পেয়েছে। দীর্ঘদিন টিকে থাকা শেখ হাসিনার সরকার ২০২৪ সালের আগস্টে ক্ষমতাচ্যুত হয়। এরপর নোবেলজয়ী অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসে। আর সর্বশেষ ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জিতে ক্ষমতায় বসে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) সরকার। প্রধানমন্ত্রী হন তারেক রহমান।

সিপিজে বলেছে, প্রতিটি পালাবদলের সময় সাংবাদিকেরা আটক, বিচার, নজরদারি, আক্রমণ ও অপবাদের শিকার হয়েছেন। বিশেষ করে আগের সরকারের সঙ্গে তাদের কথিত আনুগত্যের কারণ দেখিয়ে এসব করা হয়েছে। সম্প্রতি ডেইলি স্টার একটি উদ্বেগজনক প্রতিবেদনে প্রকাশ করেছে, পুলিশ দেশজুড়ে সাংবাদিকদের অতীত রেকর্ড যাচাই করছে, তাদের প্রোফাইল তৈরি করছে।

সিপিজের এশিয়া-প্যাসিফিক প্রোগ্রামের সমন্বয়কারী কুনাল মজুমদার বলেন, ‘বাংলাদেশের প্রতিটি নতুন সরকার গণমাধ্যমের স্বাধীনতাকে পূর্ববর্তী সরকারের সঙ্গে যুক্ত সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগের একটি সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করেছে।’ 

তিনি আরো বলেন, ‘তারেক রহমানের সরকার পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু ১০০ দিন পেরোলেও অর্থপূর্ণ অগ্রগতি খুব সামান্য দেখা গেছে।’

বর্তমান সরকার কারারুদ্ধ সাংবাদিকদের মুক্তি দিয়ে, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যমূলক মামলা প্রত্যাহার করে, গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বন্ধ করে, সাংবাদিকদের গণসহিংসতা থেকে সুরক্ষা দিয়ে, কুৎসা রটানোর অভিযানে লাগাম টেনে এবং এসব সম্ভব করে এমন সব আইন সংশোধনের মাধ্যমে পদক্ষেপ নেওয়া শুরু করতে পারে। এমন পরামর্শ দিয়েছে সিপিজে। এর ফলে প্রত্যেক সাংবাদিকের ক্ষেত্রে একই মানদণ্ড প্রয়োগ করা যাবে। আর এভাবে বিদ্যমান চক্রটি ভেঙে ফেলা যাবে।

সিপিজের মতে, ১০টি পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা যাবে। এ পদক্ষেপগুলো হলো—

এক. সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা পর্যালোচনা, গণহারে এফআইআর ও একাধিক মামলা দেওয়ার চর্চা বন্ধ এবং সাংবাদিকতার কারণে করা মামলায় জামিনে বাধা না দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে একাত্তর টিভির ফারজানা রুপা, শাকিল আহমেদ ও মোজাম্মেল বাবু এবং ভোরের কাগজের শ্যামল দত্তের বিরুদ্ধে মামলাগুলো। তাদের ২০২৪ সালের আগস্ট বা সেপ্টেম্বর থেকে আটক রাখা হয়েছে। চলতি বছরের ১১ মে বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ ফারজানা রুপা ও শাকিল আহমেদকে তাদের বিরুদ্ধে থাকা অধিকাংশ মামলায় জামিন দেন, তবে বাকি মামলাগুলোর কারণে তারা এখনো কারাগারে রয়েছেন।

দুই. সাংবাদিকতার কাজকে গণহত্যা বা মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গে যুক্ত করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে (আইসিটি) মামলা না করা এবং চলমান মামলাগুলো স্বাধীনভাবে পর্যালোচনা করতে হবে।

তিন. যে সরকারের আমলেই ঘটনা ঘটুক না কেন, সাংবাদিক হত্যা, হামলা, নজরদারি ও হয়রানির ঘটনার স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে এবং সেখানে মৃত্যুদণ্ডের ব্যবহার থাকবে না। স্বচ্ছ, স্বাধীন তদন্ত এবং ভুক্তভোগীদের জন্য অর্থবহ প্রতিকার নিশ্চিত করার মাধ্যমে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অবসান ঘটাতে হবে।

চার. বাংলাদেশে সাংবাদিক ও গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলো সংগঠিত গোষ্ঠী এবং রাজনৈতিক দলের সমর্থকদের সহিংসতা ও ভয়ভীতির মুখোমুখি হচ্ছে। গত বছরের ডিসেম্বরে দুটি বৃহত্তম সংবাদপত্র—প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টারের কার্যালয়ে হামলা ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। আগুনে জ্বলতে থাকা নিউজরুমে সাংবাদিকেরা সাময়িকভাবে আটকা পড়েন এবং উভয় প্রতিষ্ঠানই মুদ্রিত ও অনলাইন প্রকাশনা বন্ধ করতে বাধ্য হয়।

২০২৫ সালে সিপিজে রাজনৈতিক কর্মসূচির সংবাদ সংগ্রহের সময় সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে অন্তত ১০টি সহিংসতা ও হয়রানির ঘটনা নথিভুক্ত করেছে, যার অধিকাংশই বিএনপি এবং তাদের ছাত্রসংগঠন ছাত্রদলের সদস্য বা সহযোগীদের দ্বারা সংঘটিত হয়েছে। সরকারকে এই সহিংসতার নিন্দা জানাতে হবে এবং সংবাদমাধ্যমের ওপর হামলার ঘটনাগুলোর দ্রুত, নিরপেক্ষ তদন্ত ও অপরাধীদের রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে জবাবদিহির আওতায় আনতে কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিতে হবে।

পাঁচ. বর্তমান ও আগের সাইবার আইনগুলো গণমাধ্যম দমনের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। এই আইনগুলো আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী সংশোধন এবং এসব আইনে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে করা মামলাগুলো পর্যালোচনা করে প্রত্যাহার করতে হবে।


ছয়. সন্ত্রাসবিরোধী আইন, ২০০৯ এবং বিশেষ ক্ষমতা আইন, ১৯৭৪ ও অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট, ১৯২৩-এর মতো আইন সাংবাদিকদের আটক ও বিচারের জন্য ব্যবহার করা হয়েছে। গত বছরের ডিসেম্বরে সাংবাদিক আনিস আলমগীরকে তার টেলিভিশন মন্তব্য ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টের কারণে এই আইনে গ্রেপ্তার করা হয়, যদিও পরে তিনি জামিন পান। ২০২১ সালের মে মাসে রোজিনা ইসলামকে গোপন সরকারি নথি চুরি ও গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্টের আওতায় গ্রেপ্তার ও আটক করা হয়। সরকারকে এসব আইন বাতিল বা মৌলিকভাবে সংশোধন করে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে, সন্ত্রাসবাদের সংজ্ঞা সংকুচিত করতে হবে এবং বৈধ সাংবাদিকতার জন্য স্পষ্ট আইনি সুরক্ষা অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

সাত. জাতীয় সম্প্রচার কমিশন ও জাতীয় গণমাধ্যম কমিশনসংক্রান্ত খসড়া অধ্যাদেশ ২০২৬ এমন নিয়ন্ত্রক সংস্থা তৈরির ঝুঁকি তৈরি করছে, যেগুলো শেখ হাসিনার সময়কার ব্যবস্থার মতো সম্প্রচার ও মুদ্রিত গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণে ব্যবহার করা যেতে পারে। অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার স্বাধীনতা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ দিয়েছিল, কিন্তু সেগুলো এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। সরকারের উচিত বর্তমান আকারে এসব অধ্যাদেশ গ্রহণ না করা এবং এর পরিবর্তে স্বচ্ছ, বহুপক্ষীয় প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন করা, যাতে যেকোনো গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রক সংস্থার স্বাধীনতা নিশ্চিত হয়।

আট. সরকারের উচিত অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট, ১৯২৩ বাতিল বা মৌলিকভাবে সংশোধন করা; দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর মানহানির বিধান বাতিল করা এবং বিশেষ ক্ষমতা আইন, ১৯৭৪ সংশোধন করা, যাতে এটি সাংবাদিকদের খামখেয়ালিভাবে আটক করার জন্য ব্যবহার করা না যায়। এ ছাড়া বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০০১-এর নজরদারি ও আড়ি পাতার বিধানগুলো সংস্কার করতে হবে, যাতে স্বাধীন বিচারিক তদারকি বাধ্যতামূলক হয় এবং নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর পরোয়ানাবিহীন আড়ি পাতা বন্ধ হয়।

নয়. সাংবাদিকদের অ্যাক্রেডিটেশন বাতিলের বর্তমান পদ্ধতি সংস্কার এবং হয়রানিমূলক মামলা (স্ট্র্যাটেজিক ল’সুটস এগেইনস্ট পাবলিক পার্টিসিপেশন—এসএলএপিপি) ঠেকাতে আইনি সুরক্ষা চালু করতে হবে।

দশ. সাংবাদিকদের ‘ভারতপন্থী’, ‘ইসলামবিরোধী’, ‘দেশদ্রোহী’ বা সাবেক সরকারের এজেন্ট আখ্যা দিয়ে অপপ্রচার বন্ধ এবং স্বাধীন সাংবাদিকতার সাংবিধানিক সুরক্ষার বিষয়ে সরকারকে স্পষ্ট অবস্থান নিতে হবে। এ ধরনের অপপ্রচার শুধু সাংবাদিকদের কাজকে প্রশ্নবিদ্ধ করে না বরং তাদের নিরাপত্তাকেও ঝুঁকির মুখে ফেলে এবং তথ্যসূত্রদের ভীত করে তোলে। এই হেয়প্রতিপন্ন করার সংস্কৃতির কারণে অনেক সাংবাদিক দেশত্যাগে বাধ্য হয়েছেন এবং অন্যরা নানা ধরনের হুমকির মুখে পড়েছেন।

সরকারকে স্পষ্ট ও বারবার জনসমক্ষে ঘোষণা দিতে হবে, স্বাধীন সাংবাদিকতা একটি সাংবিধানিক অধিকার এবং গণতন্ত্রের জন্য অপরিহার্য। একই সঙ্গে সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে অপপ্রচারের মাধ্যমে সহিংসতায় উসকানি দেওয়া ব্যক্তিদের জবাবদিহির আওতায় আনা হবে—তা-ও স্পষ্টভাবে জানাতে হবে।

যুক্তরাষ্ট্রে বাঙালিদের গোরাপত্তনের গল্প

ড. রশিদ উল আহসান চৌধুরী, বিশেষ লেখক, কালের কণ্ঠ, যুক্তরাষ্ট্র
যুক্তরাষ্ট্রে বাঙালিদের গোরাপত্তনের গল্প
ড. রশিদ উল আহসান চৌধুরী। ছবি: সংগৃহীত

আমাদের অনেকের ধারণা বাঙ্গালিদের সঙ্গে মার্কিনীদের যোগসূত্র সর্ব প্রথম স্থাপিত হয় পাকিস্তান আমলে। তখন খাদ্য, কৃষি, ত্রাণ এবং অবকাঠামো উন্নয়ন খাতে ইউএসএইডের আওতায় পূর্ব পাকিস্তানে ব্যাপক আকারে মার্কিন সাহায্য পাঠানো হতো। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল কাপ্তাই ড্যাম ও কতিপয় অবকাঠামো উন্নয়ন প্রজেক্ট, পিএল ৪৮০ এর আওতায় খাদ্য সাহায্য এবং বিভিন্ন সময় দুর্যোগ ও মহামারীতে মার্কিন ত্রাণ সহায়তা। তবে সত্যিকার অর্থে সুবেহ বাংলার সঙ্গে মার্কিনীদের পরোক্ষ রাজনৈতিক যোগাযোগ স্থাপিত হয় এরও অনেক অনেক আগে, অষ্টাদশ শতাব্দীর মধ্যভাগ থেকে। এই রাজনৈতিক যোগাযোগের সৃষ্টি হয় ব্রিটিশ রাজের সামরিক ও রাজনৈতিক কিছু পদক্ষেপ গ্রহণের কারণে। তবে সুবেহ বাংলার সঙ্গে মার্কিনীদের অর্থনৈতিক সম্পর্ক স্থাপিত হয় তারও একশত বছর আগে, যখন ইংরেজ বণিকদের বাণিজ্য জাহাজগুলো বাংলা হতে মসৃণ কাপড়, মসল্লা, সুগন্ধি  ইত্যাদি আমেরিকার তেরোটি কলোনিতে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে রপ্তানি শুরু করে।

১৭৫৭ সনে ব্রিটিশরা উন্নত রণকৌশল এবং রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে বাংলার নবাব সিরাজ উদ দৌল্লাকে পরাজিত করে তাদেরই আজ্ঞাবহ মিরজাফরকে বাংলার মসনদে নবাব হিসেবে অধিষ্ঠিত করে সুবেহ বাংলার পরোক্ষ কর্তৃত্ব নিয়ে নেয় এর ঠিক সাত বছর পর ইংরেজরা আবারো বক্সারের যুদ্ধে নবাব মিরকাসিমকে পরাজিত করে মুঘাল সম্রাট শাহ আলামের কাছে হতে বাংলা, বিহার এবং উড়িষ্যার খাজনা আদায় এবং প্রশাসনিক কার্যকলাপ পরিচালনার জন্য একছত্র ক্ষমতা আদায় কর নেয়। আর তখন থেকেই সুবেহ বাংলায় শুরু হয়ে যায় ইংরেজদের উপনিবেশিক শাসন আর উন্মুক্ত হয়ে যায় তৎকালীন ভারতের সবচেয়ে সমৃদ্ধশালী প্রদেশ শোষণের সুবর্ণ সুযোগ। ঠিক এই দশকেই আবার চলছিল ব্রিটিশ শাসিত উত্তর আমেরিকার তেরটি কলোনিতে রাজনৈতিক গোলযোগ এবং অচলাবস্থা। ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে আগত ব্রিটিশদের স্বজাতি, আমেরিকার তেরটি উপনিবেশের ককেসিয়ান কলোনিস্টরা, নিজেদের ভাগ্য নিয়ন্ত্রণের জন্য স্বাধীনতা চাইছিল। এর ফলে ব্রিটিশ রাজতন্ত্রের সঙ্গে ১৭৭৫ সাল থেকে কলোনিস্টদের যুদ্ধ শুরু হয় এবং এর সমাপ্তি ঘটে ১৭৮১ সনে, যখন ব্রিটিশ জেনারেল লর্ড কর্নওয়ালিস কলোনিস্টদের কাছে পরাজিত হয়ে আত্মসমর্পণ করেন। 
 
সাত সমুদ্র তের নদীর একচ্ছত্র অধিপতি ব্রিটিশদের কাছে এ পরাজয় আহামরি কিছুই ছিল না। তারা আবার নতুন করে শক্তিশালী সেনাবাহিনী পাঠিয়ে সামরিকভাবে দুর্বল কলোনিস্টদের কোণঠাসা করে ফেলতে পারত। কিন্তু তিনটি কারণে ব্রিটিশ সরকার সে পথ অনুসরণে বিরত থাকে। প্রথমত, ব্রিটিশ জনগণের বেশিরভাগ স্বজাতি কলোনিস্টদের স্বাধীনতা দেওয়ার পক্ষে ছিল। দ্বিতীয়ত, নতুন করে কলোনিস্টদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করলে তা অলাভজনক এবং ব্রিটিশ কোষাগারের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করতো। আর তৃতীয়ত, ঠিক একই সময়ে ভারতে তাদের নতুন উপনিবেশ স্থাপনের সুবর্ণ সুযোগ সৃষ্টি হয়েছিল, যেখানে স্বজাতির পরিবর্তে গুণগত ভাবে দুর্বল ভারতীয়দের সহজে পরাজিত করে তাদের অফুরন্ত ধনভাণ্ডার আর সম্পদ বাধা বিপত্তি ছাড়া শোষণ করা যেত। এছাড়া ধমনিতে বয়ে যাওয়া রাজ রক্তের অধিকারী লর্ড কর্নওয়ালিসকে যুদ্ধে পরাজয়ের মর্যাদাহানি থেকে উদ্ধার এবং পুনর্বাসন করার জরুরি প্রয়োজন ছিল। এই প্রয়োজনটা ছিল ব্রিটিশ রাজতন্ত্রের ধারাবাহিক সুনাম রক্ষার্থে। 

1

এ কারণে ব্রিটিশরা ১৭৮৩ সনে প্যারিস চুক্তির আওতায় উত্তর আমেরিকায় অবস্থিত তেরটি কলোনিকে দ্রুত স্বাধীনতা দিয়ে অনেকটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। ব্রিটিশ রাজতন্ত্র রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক সংকটের ভয়াবহ ফাঁদ থেকেও মুক্তিলাভ করে। উত্তর আমেরিকা ব্রিটেন থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার ফলে ব্রিটেনের জন্য ভারতে নতুন উপনিবেশ সৃষ্টির চমৎকার একটা সুযোগও তৈরি হয়। তাই এখন হতে ব্রিটিশ সরকার তার সামরিক আর অর্থনৈতিক শক্তি একিভুত করে ভারতে নতুন উপনিবেশ বিস্তারের লক্ষ্যে সর্ব শক্তি নিয়োগ করে। আর এই উদ্দেশ্য পরিপালনের জন্য কলোনিস্টদের কাছে পরাজিত লর্ড কর্নওয়ালিসকে পুনরায় একটা সুযোগ দিয়ে ভারতে ব্রিটিশ রাজের দ্বিতীয় গভর্নর জেনারেল হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। তৃতীয় অ্যাংলো মাইশর যুদ্ধে শেষ প্রতিপক্ষ টিপু সুলতানকে পরাজিত করে লর্ড কর্নওয়ালিস ভারতে ব্রিটিশ রাজের উদ্দেশ্য সফল করেন এবং একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেন। ঐতিহাসিক এ সকল ঘটনাবলি থেকে সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় মার্কিনীদের স্বাধিনতা যুদ্ধ এবং ভারতে ব্রিটিশ রাজের উপনিবেশ স্থাপনের মধ্যেপরোক্ষ ভাবে একটা যোগসূত্র ছিল।  

আঠারো শতাব্দির শেষ দিকে সুবেহ বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে; বিশেষ করে চট্টগ্রাম ও সিলেট অঞ্চলে, বন্যা, খরা এবং অতিরিক্ত করের বোঝায় দরিদ্র মুসলিম পরিবারগুলো দিশেহারা হয়ে পরেছিল। এসময় বাংলার সমুদ্র ও নদী পথের ব্যবসা ও বাণিজ্যে ছিল ইংরেজ বণিকদের হাতে। দরিদ্র মুসলিম পরিবারগুলোর যুবক সমপ্রদায়ের কানে এল ইংরেজ বণিকদের বাষ্পচালিত সমুদ্রগামী জাহাজে লস্কর, সুকানি ও পরিচারক হিসেবে কাজ করার বিস্তর সুযোগ আছে। এই লস্কর ও সুকানিদের কাজ হলো জাহাজ পরিচালনায় সাহায্য করা, জাহাজ পরিষ্কার-পরিছন্ন রাখা, ইঞ্জিনের আগুনে কয়লা সরবরাহ করা এবং নাবিকদের খাবার তৈরি এবং পরিবেশনে সাহায্য করা। সাধারণ ইংরেজরা এ ধরনের নিচু মানের কাজ করতে চাইত না। তাই  ইংরেজ বণিকরা স্বল্প বেতন দিয়ে পূর্ব বাংলার এই দরিদ্র মুসলিম যুবকদের সারা পৃথিবী দাপিয়ে বেড়ানো তাদের বাণিজ্যিক জাহাজে চাকরি দিতে  ইচ্ছুক ছিল। চরম দারিদ্র্যের কষাঘাতে জর্জরিত বহু বাঙালি মুসলিম যুবক এ সুযোগ লুফে নেয় এবং চিন্তা ভাবনা বা বাছবিচার না করেই জাহাজের চাকরিতে যোগদান করে। জাহাজগুলোতে তাদের প্রচুর পরিশ্রম করতে হতো। জীবনযাপন ছিল অমানবিক, কষ্টসাধ্য। ইংরেজ নাবিকরা তাদের উপনিবেশিক ক্রীতদাস বিবেচনা করে অমানবিক আচরণ করতো। অপুষ্টিকর খাদ্য, বিভিন্ন  রোগ এবং নানা ধরনের শারীরিক জখমের কারণেও বাঙালি নাবিকরা জাহাজে বেশি দিন কাজ করতে চাইত না।
 
আঠারো শতকের শেষ ভাগে এবং উনিশ শতকের প্রথম ভাগে বিভিন্ন বণিক জাহাজে কর্মরত এই বাঙালি নাবিকরা কানাঘুষার মাধ্যমে জেনে গেলো উত্তর আমেরিকায় ইউএসএ নামে এক দেশ আছে যেখানেও পালিয়ে যেয়ে আশ্রয় গ্রহণ করা যায়। সে দেশে আছে উন্নত জীবনের সুব্যবস্থা। তাই বহু বাঙালি নাবিক কয়েক দশক ধরে এ সুযোগের সদব্যবহার করে। ব্রুকলিন এবং ম্যানহাটনে নোঙর করা বাণিজ্যিক জাহাজ হতে গভীর রাতে বা কুয়াশাছন্ন ভোরে ভারী দড়ি ধরে বন্দরে নেমে তারা হারলেম, ম্যানহাটন এবং ব্রুকলিনের পুর্তরিকান বা আফ্রিকান আমেরিকান অধ্যুষিত এলাকাগুলোর অলিগলিতে হারিয়ে যায়। মার্কিনীদের ভাষায় তারা একেবারেই পারদর্শী ছিল না। তাই জীবিকার সন্ধানে জনাকীর্ণ ফুটপাথ এবং রেল স্টেশনে বসে তারা স্বল্প পুঁজির ব্যবসা শুরু করে। তাদেরকে ‘সিকান্দার’ হিসেবে অভিহিত করা হতো আর এই স্বল্প পুঁজির ব্যবসায়ীরা হেঁটে হেঁটে সিল্কের কাপড়, স্কার্ফ, সুগন্ধি এবং অল্পস্বল্প বিলাসী পণ্য পথচারীদের কাছে কাছে বিক্রি করতো। পরবর্তীতে তাদের মধ্যে অনেকে ফ্যাক্টরি, রেঁস্তোরা এবং বন্দরে নিম্নমানের কাজ জুটিয়ে নেয়।
 
যুক্তরাষ্ট্রে কঠোর এশিয়াবিরোধী অভিবাসন আইন থাকার কারণে এ ধরনের বাঙালি যুবকের পক্ষে দেশ থেকে বউ বা পরিবার পরিজন নিয়ে আসার কোনো সুযোগ ছিল না। তাই তারা পুর্তরিকান, লাতিন এবং আফ্রিকান আমেরিকান মেয়ে বিয়ে করে এ দেশে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বহু সংস্কৃতির সমাজ সৃষ্টির পেছনে এই বাঙালি মুসলিম যুবকদের স্বীকৃতিহীন গুরুত্বপূর্ণ অবদান আছে। পরবর্তীতে এদের মধ্য অনেকে নিজ উদ্যোগে রেঁস্তোরা এবং গ্রোসারি দোকান খুলে ব্যাপক সফলতার মুখ দেখে। তবে কালের অমোঘ নিয়মে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই বাঙালি যুবকরা আফ্রিকান আমেরিকান এবং লাতিন জনস্রোতে একেবারে মিশে যায়। 

মার্কিনীদের সেনসাসে তাদের প্রায়ই ভুলবশত হিন্দু, আরব বা কালো মানুষ হিসেবে উল্লেখ করা হতো। কিন্তু প্রকৃত অর্থে তারা ছিল পূর্ববঙ্গ হতে আমেরিকায় আগত বাঙালি মুসলিম এবং প্রথম যুগের বাঙালি অভিবাসী।  

লেখক: ড. রশিদ উল আহসান চৌধুরী, বারন্সভিল, মিনেসোটা, যুক্তরাষ্ট্র
 

স্কুলপড়ুয়া ছোট্ট মেয়ের জিমন্যাস্টিকসে মুগ্ধ গোটা বিশ্ব (ভিডিওসহ) | কালের কণ্ঠ