• ই-পেপার

অফিসে কাজের মাঝে প্রতিদিন ঘুম পাচ্ছে? যা করবেন

বাবা দিবসে প্রিয় বাবাকে লেখা সন্তানদের চিঠি

অনলাইন ডেস্ক
বাবা দিবসে প্রিয় বাবাকে লেখা সন্তানদের চিঠি
সংগৃহীত ছবি

বাবা হলেন একজন বট বৃক্ষ, যার ছায়ায় বেড়ে ওঠে সন্তান। শত প্রতিকূলতায় সেই বৃক্ষ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, ভেঙে পড়েনা। সন্তানের জীবনে শক্তি, সাহস ও নির্ভরতার প্রতীক বাবাদের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা জানাতে পালিত হয় বাবা দিবস। বাবার  প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে প্রতি বছর জুন মাসের তৃতীয় রবিবার এ দিবসটি পালন করা হয়। বাবা দিবস নিয়ে কালের কণ্ঠে পাঠানো কিছু নির্বাচিত লেখা তুলে ধরা হলো।

 

আমার বাবা

আমি যখন হাই স্কুলে উঠলাম তখন বাবা আমাকে আর আমার ছোটবোনকে এক কিলোমিটার দূরে গার্লস স্কুলে ভর্তি করে দিলেন। আরো অনেকের সাথে আমরা দল বেধে হেঁটে যেতাম। যখন একা একা যেতাম তখন প্রায়ই বাবার কাছে রিক্সা ভাড়া চাইলে বাবা বলতেন, "আমি গ্রীষ্ম- বর্ষা সকল সময়ই পাঁচ মাইল হেঁটে সকালবেলা স্কুলে যেতাম- সেই সকাল বেলা ভাত খেয়ে যেতাম আবার সন্ধ্যায় এসে ভাত খেতাম আর তোমাদের তো প্রতিদিন টিফিনের টাকা দেওয়া হয় আমাদের কিন্তু তখন বই কেনার টাকাটাও অনেক কষ্ট করে জোগাড় করতে হতো। আমরা একটা পোশাক পরেই স্কুলে যেতাম, ঈদ ছাড়া আমাদের অতিরিক্ত কোনো জামাকাপড় তখন কিনে দেওয়া হতো না। বাবা বলতেন, "কষ্ট করে হে যাও শরীর ভালো থাকবে"। ছোট ছোট পাঁচ ভাইবোনকে রেখে আমাদের মা আল্লাহর কাছে চলে যান। আর সেজন্যই আমাদের স্কুল- কলেজ- ইউনিভার্সিটি সব জায়গায় বাবার হাত ধরেই যাওয়া- যা আমার বাবা দাদা- দাদীর কাছ থেকে কখনোই পাননি। 

আমার বাবা যখনই সময় পেতেন তখনই আমাদের নিয়ে ঘুরতে বের হতেন। দেশের বিভিন্ন প্রসিদ্ধ জায়গায় আমরা বাবার সাথেই গিয়েছি। বাবার সাথে বাইরে যাওয়া মানে একটু পর পর মজার মজার খাওয়া দাওয়া। কিন্তু আমরা তো এখন আমাদের ছেলেমেয়েদেরকে একদমই সময় দিতে পারি না; এতো ব্যস্ততা আমাদের! অথচ মা-বাবা'র হাত ধরেই সন্তান প্রথমে পৃথিবীটাকে চিনবে। গ্রীষ্মের এই সময়টাতে বাবা ও তার তিন বন্ধু মিলে আম, কাঁঠাল, লিচু কিনে আনতেন গাড়ি ভর্তি করে। আমরা সারাদিন পাকা আম হাতে ঘুরে বেড়াতাম আর খেতাম। আমের রস হাত বেয়ে পড়তো, মা বকা দিতেন কিন্তু বাবার মধ্যে কোনো বিরক্তি ছিলো না। বাবা নিজেই কাঁঠাল ভেঙে দিতেন, লিচুর খোসা ছাড়িয়ে দিতেন।

আমরা এখন বেশ বড়; পরিণত বয়স আমাদের। এই বয়সেও আমার বাবা আমাদের নিয়ে কতো ভাবেন! কিছুদিন তার সাথে দেখা না হলেই তিনি অভিমান করেন।  বাবার সাথে দেখা করতে যেতে দেরি হলে ফোন করে যেতে বলেন। বাবার সাথে খেতে বসলে এখনও মাছের মাথাটা নিজের প্লেট থেকে আমার পাতে তুলে দেন। অনেকগুলো ভাইবোনের সংসারে সবচেয়ে ছোট ছিলেন আমার বাবা এবং ভাইয়ের ছেলেমেয়েদের সাথেই বড়ো হয়েছেন। বাবা-মায়ের আদর ভালোবাসা তেমন পাননি। তাই বোধহয় আমাদের প্রতি তার অনেক টান। বাবার ভালোবাসা পরিমাপযোগ্য নয়। প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠেই সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করি- আমার বাবা যেনো সুস্থ থাকেন, ভালো থাকেন। 

জেসমিন জাহান জুঁই, মিরপুর, ঢাকা-১২১৬।

 

আলো-ছায়ার মঞ্চ থেকে জীবনের পাঠ

জীবনের সবচেয়ে বড় আশ্রয় যদি কাউকে বলতে হয়, তবে নিঃসন্দেহে তিনি আমার বাবা। ছোটবেলা থেকে আজ পর্যন্ত তাঁর স্নেহ, ত্যাগ ও আদর্শ আমাকে পথ দেখিয়েছে প্রতিটি মুহূর্তে।আমার বাবা শুধু একজন অভিভাবক নন, তিনি একজন সংস্কৃতিমনা মানুষ, একজন নাট্যনির্দেশক এবং একজন স্বপ্নদ্রষ্টা। মঞ্চে যেমন তিনি সমাজের নানা অসঙ্গতির বিরুদ্ধে কথা বলেন, তেমনি বাস্তব জীবনেও সত্য, ন্যায় ও মানবিকতার শিক্ষা দিয়ে গড়ে তুলেছেন আমাকে। তাঁর কাছ থেকেই শিখেছি মানুষের পাশে দাঁড়াতে, নিজের সংস্কৃতিকে ভালোবাসতে এবং প্রতিকূলতার মধ্যেও মাথা উঁচু করে বাঁচতে। আজ পড়াশোনার জন্য আমি দেশ থেকে বহুদূরে।নতুন শহর, নতুন জীবন আর হাজারো ব্যস্ততার মাঝেও বাবার কথাগুলো প্রতিদিন মনে পড়ে। যখন কোনো সিদ্ধান্ত নিতে দ্বিধায় পড়ি, তখন তাঁর শেখানো জীবনমন্ত্রই আমাকে সাহস দেয়। দূরত্ব আমাদের আলাদা করেছে, কিন্তু বাবার ভালোবাসা ও আশীর্বাদ সবসময় আমার সঙ্গে থেকেছে।

বাবা কখনো নিজের কষ্টের কথা বলেন না। সন্তানের হাসির জন্য তিনি নীরবে ত্যাগ স্বীকার করেন, স্বপ্ন দেখেন এবং সংগ্রাম করেন। সেই নিঃস্বার্থ ভালোবাসার ঋণ কোনোদিন শোধ করা সম্ভব নয়।বাবা, তোমার হাত ধরেই আমার পৃথিবীকে চেনা। তোমার আদর্শ, ভালোবাসা ও আশীর্বাদই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি। তুমি শুধু আমার বাবা নও, তুমি আমার অনুপ্রেরণা, আমার গর্ব।

শুভ বাবা দিবস। ভালোবাসি বাবা। ❤️

অভ্র বড়ুয়া, গণযোগাযোগ, সাংবাদিকতা ও চলচ্চিত্র পরিচালনা বিভাগ, গুজরাট বিশ্ববিদ্যালয়, ভারত।

 

প্রিয় বাবা

তুমি আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ উপহার, আমার অস্তিত্বের অন্যতম ভিত্তি এবং আমার চলার পথে সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা। পৃথিবীর অসংখ্য মানুষের ভিড়ে আমার বাবা জীবনের সবচেয়ে আপনজন, ভরসার স্থান।তার স্নেহময় ছায়া তলে আমি বেড়ে উঠেছি, স্বপ্ন দেখতে শিখেছি, জীবনের প্রতিটি বাধা অতিক্রম করার সাহস পেয়েছি। তার ভালোবাসা  নদীর স্রোতের মতো অবিরাম, তার স্নেহ আকাশের মতো বিশাল সীমাহীন।তার কাছে চেয়েছি কিন্তু পাইনি এমন কোন দিনও হয়নি। আমার বাবা শুধু আমার অভিভাবক নন তিনি আমার শ্রেষ্ঠ বন্ধু জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান মানুষ। 

হুমায়ূন আহমেদ বলেছেন,"পৃথিবীতে অসংখ্য খারাপ মানুষ আছে 

একজনও খারাপ বাবা নেই"। আমাদের মুখের এক টুকরো হাসি তার সহ্য করা সব কষ্ট  নিমিষেই  ভুলিয়ে দেয়। বাবাকে যত দেখি তত মুগ্ধ হয়। বাবার মত এত উদার, নিঃস্বার্থ ভালোবাসা আর কোথাও নেই। বট বৃক্ষের মতো ছায়া দিয়ে আগলে রাখেন সর্বক্ষণ। বাবা হলো নিরাপত্তার প্রতীক ,নিঃস্বার্থ ভালোবাসার শ্রেষ্ঠ উদাহরণ। আমার দেখা সেরা মহাকাব্যের শ্রেষ্ঠ নায়ক। হৃদয়ের গভীরতম স্থান জুড়ে রয়েছেন আমার প্রিয় বাবা যার প্রতি আমার ভালোবাসা ,শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা চিরকাল অম্লান থাকবে। পৃথিবীর সব বাবাকে জানাই হৃদয়ের অন্তস্থল থেকে অবিরাম ভালোবাসা ও সম্মান।

 

মেহেরিন আক্তার মাহি 

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা

বাবা

তোমাকে কী দিয়ে বিশেষায়িত করবো?আমি কিছু খোঁজে পাইনি। বাবার সামনে আর কোনো বিশেষণের প্রয়োজন আছে বলে আমার মনে হয়নি। 'বাবা' শব্দটিই সকল বিশেষণের ঊর্ধ্বে। 'বাবা' আমার কিছু অব্যক্ত কথা আজ তোমাকে জানাতে চাই। আমাদের অনেক কথায় আছে যে গুলো আমরা মুখে বলতে পারিনা কিংবা সহজে প্রকাশ করতে পারিনা। 'বাবা' শব্দটি তেমনি এক অনুভূতির নাম যাকে নিয়ে লিখে কয়েকখানা গদ্য, উপন্যাস, মহাকাব্য শেষ করা যাবে অথচ মুখফোটে সহজ কথাটাও বলতে পারিনা- বাবা তোমাকে অনেক ভালোবাসি।

শৈশবে বলা তোমার কথাগুলো, আদরের শাসন আজ খুব মনে পড়ে। মনে পড়ে তুমি বলেছিলে, কষ্ট করে অর্জিত ফল দীর্ঘস্থায়ী হয়, আনন্দ দেয় বেশি। চাকরি পারিপার্শ্বিক বিভিন্ন কারণে প্রতিদিন  তোমার সাথে দেখা হয়না, কথা হয়না; তুমি রাগ করো কিন্তু জেনে রেখো তুমি থাকো সারাক্ষণ আমার চিন্তায় চেতনায়। আমার পুরোটা জুড়ে তোমার যে অস্তিত্ব তা কখনও তোমাকে জানান দিতে পারিনি। আজ লিখায় শুধু বলতে চাই- ভালোবাসি বাবা, অকৃত্রিম ভালোবাসি।

ছোট ছেলে, এম. আর. সুমন

 

স্মৃতির জানালায় আমার বাবা

জুন মাসের তৃতীয় রোববার বিশ্ব বাবা দিবস। পৃথিবীর অসংখ্য মানুষ এ দিনে তাঁদের বাবার প্রতি ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। কিন্তু যাদের বাবা আর এই পৃথিবীতে নেই, তাদের কাছে দিনটি হয়ে ওঠে স্মৃতির পাতা উল্টে দেখার এক নিঃশব্দ উপলক্ষ। এবারের বাবা দিবস আমার জন্য অন্যরকম। গত ১৪ মে ২০২৬, রাত ১০টা ৩৫ মিনিটে আমার প্রিয় বাবা ইন্তেকাল করেন। সময়ের হিসাবে হয়তো খুব বেশি দিন পেরোয়নি, কিন্তু তাঁর অনুপস্থিতি প্রতিটি দিন, প্রতিটি মুহূর্তে নতুন করে অনুভব করি। মনে হয়, জীবনের এক বিশাল ছায়াদার বৃক্ষ যেন হঠাৎ করেই হারিয়ে গেছে। বাবা ছিলেন আমার সাহসের উৎস, নির্ভরতার ঠিকানা এবং নীরব প্রেরণা। তিনি খুব বেশি কথা বলতেন না, কিন্তু তাঁর প্রতিটি উপদেশ ছিল জীবনের জন্য মূল্যবান শিক্ষা। সুখে-দুঃখে, সফলতায় কিংবা ব্যর্থতায় তাঁর উপস্থিতি আমাকে শক্তি দিত। আজও কোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের সামনে দাঁড়ালে মনে হয়, যদি বাবা পাশে থাকতেন, কী পরামর্শ দিতেন!

একজন বাবার ভালোবাসা অনেক সময় প্রকাশ পায় না কথায়; প্রকাশ পায় দায়িত্বে, ত্যাগে এবং নিঃশব্দ সংগ্রামে। সন্তানের সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য তিনি নিজের অনেক স্বপ্ন বিসর্জন দেন। জীবনের প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করে পরিবারের জন্য নিরাপদ আশ্রয় গড়ে তোলেন। সেই অবদান কখনো মাপা যায় না, শুধু হৃদয়ে অনুভব করা যায়। বাবা আজ আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তাঁর শিক্ষা, সততা, পরিশ্রম এবং মানবিকতার আদর্শ আমার পথচলার সঙ্গী হয়ে আছে।

মানুষ চলে যায়, কিন্তু তার রেখে যাওয়া মূল্যবোধ বেঁচে থাকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম। তাই বাবাকে হারিয়েও আমি তাঁকে হারাইনি; তিনি আছেন আমার চিন্তায়, কর্মে এবং প্রতিটি প্রার্থনায়।ইসলাম আমাদের শেখায়, মৃত্যুর মাধ্যমে সম্পর্কের সমাপ্তি ঘটে না। সন্তানের দোয়া, নেক আমল এবং উত্তম চরিত্র মৃত পিতা-মাতার জন্য কল্যাণের কারণ হতে পারে। তাই বাবা দিবসে আমার সবচেয়ে বড় উপহার হলো তাঁর জন্য আন্তরিক দোয়া। বিশ্ব বাবা দিবসের এই দিনে আমার বাবাসহ পৃথিবীর সকল প্রয়াত বাবাকে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি। মহান আল্লাহ তাঁদের কবরকে জান্নাতের বাগিচাসমূহের একটি বাগিচায় পরিণত করুন, তাঁদের গুনাহসমূহ ক্ষমা করুন এবং জান্নাতুল ফিরদাউসের উচ্চ মর্যাদা দান করুন। বাবা, আপনি নেই—তবু আপনার স্মৃতি, শিক্ষা আর ভালোবাসা আমার জীবনের প্রতিটি পথে আজও আলো হয়ে জ্বলে আছে।আমিন।

 

.ডা. মু. মাহতাব হোসাইন মাজেদ

কলাম লেখক ও প্রবন্ধকার

আমার বটবৃক্ষ

বাবা সন্তানের নিরাপদ আশ্রয়স্থল। বাবা ছাড়া পৃথিবী অনেকটা জলশূন্য মরুভূমির মতো। সন্তান সমাজ থেকে কী পাবে, কীভাবে বেড়ে উঠবে—তা অনেকাংশে নির্ভর করে তার বাবার ওপর। বাবার ছায়ায় সন্তান নিরাপদ থাকে, রক্ষা পায় জীবনের নানা ঝড়-ঝঞ্ঝাট থেকে। তাই সন্তানের দৃষ্টিতে বাবা এক বটবৃক্ষ। প্রত্যেক বাবারই সন্তানদের নিয়ে স্বপ্ন থাকে—তার সন্তান বড় হয়ে ভালো অবস্থানে যাবে। আমার বাবাও এর ব্যতিক্রম নন। আমাদের নিয়ে তার ছিল অসংখ্য স্বপ্ন ও গভীর ভাবনা। আমার বাবা একজন রাজমিস্ত্রী ছিলেন। কর্মসূত্রে তিনি সমাজের উচ্চশিক্ষিত মানুষের সংস্পর্শে আসতেন। তাদের দেখে তিনি স্বপ্ন দেখতেন—তার সন্তানরাও একদিন উচ্চশিক্ষিত হয়ে ভালো অবস্থানে যাবে। তাই আমাদের পড়াশোনার খরচে তিনি কখনো কার্পণ্য করেননি। সবসময় আমাদের বড় হওয়ার জন্য অনুপ্রাণিত করতেন।

আমার বাবার আয় ছিল সীমিত। সেই সীমিত আয় দিয়েই তিনি ধৈর্যের সাথে পুরো পরিবার পরিচালনা করেছেন। তার ত্যাগ ও সহযোগিতার ফলেই আমি দেশের শীর্ষ মাদরাসা তা’মীরুল মিল্লাত কামিল মাদরাসায় পড়ার সুযোগ পেয়েছি। পরবর্তীতে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইসলামিক স্টাডিজ বিষয়ে অনার্স ও মাস্টার্স সম্পন্ন করেছি। বর্তমানে একটি কলেজে প্রভাষক হিসেবে কর্মরত আছি। আমার জন্য তিনি অসীম ত্যাগ স্বীকার করেছেন। আমার অসুস্থতার সময় তিনি আমাকে বিদেশে চিকিৎসা করিয়েছেন। চিকিৎসার জন্য তিনি প্রচুর অর্থ ব্যয় করেছেন। নিজ অসুস্থ শরীর নিয়েও তিনি আমার পাশে ছিলেন। আমার জন্য রান্না করেছেন। নিরলসভাবে আমার সেবা-যত্ন করেছেন। শুধু আমার ক্ষেত্রেই নয়, অন্য সন্তানদের জন্যও তিনি কখনো অর্থ বা ভালোবাসার ঘাটতি রাখেননি।

আমার বাবার মন অনেক বড়। তিনি অন্যকে দিতে জানেন, কিন্তু কারো কাছ থেকে কিছু নিতে জানেন না। তার কাছ থেকে কেউ কখনো খালি হাতে ফিরে যায়নি। তিনি তার ছোট ভাইয়ের পড়াশোনার দায়িত্বও বহন করেছিলেন। তার সহায়তায় তিনি আজ একজন আলেম এবং একটি মাদরাসার সহকারী সুপার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

পরিশেষে , সব সন্তানের চোখে তার বাবা-ই সেরা। আমার দৃষ্টিতেও তা-ই। আমার জীবন গঠনে আমার বাবার অবদান অসীম। একজন সন্তান হিসেবে তার এই অবদান আমি কখনোই ভুলতে পারব না। বাবা দিবসে আমার বাবার প্রতি রইল আন্তরিক শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা।

মো: রুহুল আমীন খান

 

বাবা, তুমি আমার শ্রেষ্ঠ সাহস

আমার বাবা একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা—অজিত রায়। তিনি কেবল আমার পিতা নন, তিনি আমার আত্মপরিচয়ের প্রথম স্তম্ভ, আমার জীবনের আলোকবর্তিকা। বাবা মানেই যে ছায়ার মতো আগলে রাখা ভালোবাসা, বাবার জীবন ছিল তার চেয়েও অনেক বেশি—তিনি ছিলেন দেশের জন্য নিবেদিত এক নির্ভীক প্রাণ। আমি দেখেছি, কী নিঃশব্দে তিনি দেশ ও পরিবারকে ভালোবেসে গেছেন। যুদ্ধ করেছিলেন অস্ত্র হাতে, অথচ জীবনের পরবর্তী লড়াইগুলো চালিয়েছেন কলম, গাছ আর মনন দিয়ে। গাছ লাগিয়ে পৃথিবীকে সবুজ করেছেন, দেহ দান করে মৃত্যুর পরেও আলোর দিশা হয়ে থেকেছেন। বাবার সারা জীবনটাই যেন ছিল এক আত্মত্যাগের কবিতা। তিনি রাগ করতেন, হাসতেন, শাসন করতেন, ভালোবাসতেন—কিন্তু কখনো নিজের কষ্ট আমাদের ওপর ফেলতেন না। তাঁর চোখে ছিল অনন্ত আস্থা, এবং হৃদয়ে ছিল এক গভীর সাহস—যা আজও আমাকে পথ দেখায়।

বাবা নেই ০৯ বছর হলো, তবু কোথাও মনে হয় না তিনি দূরে আছেন। আমি হাঁটি তাঁর লাগানো গাছতলার পথ ধরে, আমি দেখি তাঁর নামে নামকরণ হওয়া সেই সড়ক—“বীর মুক্তিযোদ্ধা অজিত রায় সড়ক”, আর প্রতিবার মনে হয়, আমি এখনও তাঁর ছায়াতলে আছি।

এই বাবা দিবসে একটাই কথা বলতে ইচ্ছা করে—

বাবা, তুমি কেবল একজন পিতা নও, তুমি আমার প্রেরণা, আমার অহংকার।

তোমার মতো হওয়ার সাধ, তোমার মতো জেগে ওঠার সাহস—আমার বুকে আজও বেঁচে আছে।

ভালোবাসি, বাবা। অনেক, অনেক ভালোবাসি।

অদিতি রায়

 

 

বাবার হাতে পথচলা

ছোটবেলায় যে মানুষটি প্রথম আমার হাত ধরে হাঁটতে শিখিয়েছেন আমার প্রথম শিক্ষক এবং পথপ্রদর্শক মায়ের পরে পরম যত্নে ছায়া দিয়ে আগলে রেখেছেন সে মানুষটি আমার বাবা। আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ভরসা তিনি।

বাবার হাতে মাথা না রাখলে ছোটবেলায় ঘুম আসত না। বাবার হাতের ওপর মাথা রেখে তাঁর কোলেই ঘুমিয়ে পড়তাম। স্কুলে যাওয়ার আগে রোজ সকালে বাবার হাত ধরে রাস্তা পার হওয়া সেই ছোট্ট অভ্যাসটাও তখন গুরুত্বহীন মনে হতো। বাবার ছোট ছোট উপদেশ, মিষ্টি শাসন, এ সবই আমাকে আজকের এতদূর নিয়ে এসেছে। বাবার সেই শাসনের আড়ালে যে মায়া আর ভালোবাসা লুকিয়ে থাকত তখন টের পাইনি এখন প্রতিদিন বুকের ভেতর অনুভব করি। তিন বছর ধরে বাড়ির বাইরে থেকে পড়াশোনা করছি। মেসের রাতগুলো দীর্ঘ হয় ঘুম আসে না। শুয়ে শুয়ে মনে পড়ে বাড়িতে বাবার পাশে গা ঘেঁষে শুলে চোখ আপনিই বুজে আসত। রাত বাড়লে ছাদের দিকে তাকিয়ে থাকি ভাবি বাবার পাশে থাকলে এই অন্ধকারও এত ভারী লাগত না। পরীক্ষার আগের রাতে মন অস্থির হয়ে উঠলে বাবার একটা ফোনকলই সব দুশ্চিন্তা সরিয়ে দেয়। একা খেতে বসলে মন চায় না। মনে পড়ে বাবার হাতে তুলে দেওয়া এক গ্রাস ভাত সেই ছোট ছোট আদর। আজ দূরে থাকতে থাকতে বুঝেছি বাবার উপস্থিতি কতটা অমূল্য ছিল। এখনো ফোনের এপাশ থেকে যখনই কোনো আবদার করি বাবা কখনো না বলেন না। বাবা সব সময় বলে তুমি এগিয়ে যাও, আমি তো আছি, এই কথাগুলো দূর থেকেও আমাকে সাহস দেয়। ছুটিতে বাড়ি গেলে বাবার আদরের কমতি থাকে না। দরজায় পা দিলেই মনে হয় অনেকদিন পর মনের মধ্যে ‌লুকিয়ে হাহাকার গুলো দূর হলো। মাঝে মাঝে ভাবি আল্লাহ তাঁকে আমাদের জন্য এত অফুরন্ত ভালোবাসা দিয়েই পাঠিয়েছেন।

বাবা, তোমার ভালোবাসা যে কতটা গভীর আজ প্রতিদিন নতুন করে অনুভব করি। ছোটবেলা থেকে আজ পর্যন্ত নিজে কষ্ট করে আমাকে যেভাবে গড়ে তুলেছ সেই ঋণ শোধ হওয়ার নয়। দূরে এসে বুঝলাম তুমি কাছে না থাকলে পৃথিবীটা অসম্পূর্ণ লাগে। ছোটবেলায় তোমার হাত ধরে যে পথচলা শুরু হয়েছিল সেই পথ আজও তোমাকে ছাড়া একা লাগে। কোনোদিন বলা হয়নি বাবা, তোমাকে আমি জীবনের চেয়েও বেশি ভালোবাসি। দূরে থাকলেও তোমার ভালোবাসা কখনো ভুলব না। আজ না-বলা অনেক কথার মধ্যে থেকে কিছু কথা লিখে জানালাম। বাবা, আমি তোমাকে ভালোবাসি।

 

মো: মাজহারুল ইসলাম 

শিক্ষার্থী, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় 

 

 

বাবা আমার বাবা


উত্তরপাড়ার ভোরগুলো ছিল অন্য রকম। পূর্ব আকাশে সূর্যের প্রথম আলো ফোটার আগেই গ্রামের সরু কাঁচা পথ ধরে মানুষজন কাজে বেরিয়ে পড়ত। শিশিরভেজা ঘাসের ওপর দিয়ে হাঁটলে পায়ে ঠান্ডা অনুভূতি লাগত, আর দূরের বাঁশঝাড়ে পাখিরা নতুন দিনের গান গাইত। সেই গ্রামেই থাকত সপ্তম শ্রেণির ছাত্র রাব্বি। রাব্বি ছিল প্রাণবন্ত একটি ছেলে। মাঠে ফুটবল খেলতে, বন্ধুদের সঙ্গে নদীর ধারে ঘুরতে কিংবা গাছের ছায়ায় বসে গল্প করতে তার খুব ভালো লাগত। কিন্তু পড়াশোনার প্রতি তার মনোযোগ ছিল কম। বই খুললেই তার মনে হতো, বাইরের পৃথিবী যেন তাকে ডাকছে। অন্যদিকে তার বাবা রেজা ছিলেন একজন পরিশ্রমী কৃষক। ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মাঠে কাজ করতেন। রোদ, বৃষ্টি কিংবা ঝড়—কোনো কিছুই তাকে দমাতে পারত না।


রাব্বি বাবাকে ভালোবাসত, কিন্তু বাবার কষ্টের গভীরতা সে কখনো বুঝতে পারেনি। তার কাছে বাবা যেন সংসারের একটি স্বাভাবিক অংশ—যিনি প্রতিদিন কাজ করেন, বাজার করেন, সংসারের খরচ চালান। কিন্তু সেই কাজের পেছনে যে কত ত্যাগ আর সংগ্রাম লুকিয়ে আছে, তা তার অজানা ছিল। একদিন স্কুলে অর্ধবার্ষিক পরীক্ষার ফল প্রকাশ হলো। রাব্বির ফল আশানুরূপ হলো না। শ্রেণিশিক্ষক তাকে কাছে ডেকে বললেন, রাব্বি, তোমার চোখে আমি স্বপ্ন দেখি, কিন্তু সেই স্বপ্নের জন্য প্রয়োজন পরিশ্রম। মনে রেখো, প্রতিভা মানুষকে পথ দেখায়, আর পরিশ্রম তাকে গন্তব্যে পৌঁছে দেয়।
শিক্ষকের কথা শুনে রাব্বি মাথা নত করল, কিন্তু কথাগুলো তার মনে স্থায়ী ছাপ ফেলল না। সে আবার আগের মতোই দিন কাটাতে লাগল।


কয়েকদিন পর এক ভোরে ঘুম ভাঙতেই সে দেখল, বাবা নীরবে মাঠে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। বাইরে তখনও অন্ধকার। কৌতূহলবশত রাব্বি বাবার পিছু নিলো, কিছু দূরে গিয়ে সে একটি তালগাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে রইল।মাঠে পৌঁছে সে যা দেখল, তা তার কিশোর মনকে নাড়া দিলো। রেজা কাদা ও পানির মধ্যে নেমে ধানের জমিতে কাজ করছেন। তার পায়ে কাদা লেগে আছে, শরীর ঘামে ভিজে গেছে। সূর্য একটু একটু করে ওপরে উঠছে, আর তার সঙ্গে বাড়ছে রোদের তাপ। কিন্তু বাবা থামছেন না। দুপুরের দিকে রেজা একটি কাঁঠালগাছের নিচে বসে বিশ্রাম নিলেন। গামছার ভাঁজ খুলে বের করলেন কয়েক টুকরো শুকনো রুটি আর একটি পেঁয়াজ। সেটুকুই তার দুপুরের খাবার। রাব্বি দূর থেকে তাকিয়ে রইল। হঠাৎ তার চোখ পড়ল বাবার হাতের দিকে। রুক্ষ হাত, ফেটে যাওয়া তালু, রোদে পোড়া চামড়া—যেন সময়ের কাছে হার না মানা এক সংগ্রামের ইতিহাস।


সেদিন প্রথমবারের মতো রাব্বির মনে হলো, তার নতুন বই, নতুন জামা আর স্কুলের ফি—সবকিছুর পেছনে রয়েছে বাবার ঘামঝরা শ্রম।
সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে সে চুপচাপ বসে রইল। আকাশে তখন লালচে আলো ছড়িয়ে পড়েছে। রেজা ঘরে ঢুকে ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন,
—কী হয়েছে বাবা? আজ তোমাকে এত চুপচাপ লাগছে কেন?
রাব্বির চোখ ভিজে উঠল। সে বাবার হাত দুটি নিজের হাতে নিয়ে বলল,
—বাবা, তোমার হাত এত শক্ত আর রুক্ষ কেন?
রেজা মৃদু হেসে বললেন,
—মাটির সঙ্গে লড়াই করতে গেলে হাত এমনই হয় বাবা।
—তুমি এত কষ্ট করো, অথচ কখনও কিছু বলো না কেন?
রেজা ছেলের মাথায় হাত রেখে বললেন,
—সব বাবারাই এমন। সন্তানের হাসি দেখলে কষ্টগুলো আর কষ্ট মনে হয় না। কিন্তু একটা কথা মনে রেখো, আমি তোমার জন্য জমি কিংবা ধন-সম্পদ রেখে যেতে পারব কিনা জানি না, তবে চাই তুমি যেন একজন ভালো মানুষ হও। শিক্ষা মানুষকে আলোকিত করে, আর চরিত্র তাকে সম্মানিত করে।
কথাগুলো যেন রাব্বির হৃদয়ের গভীরে গিয়ে বসে রইল। সেই রাতেই সে নিজের জীবনকে নতুনভাবে দেখার সিদ্ধান্ত নিল।
এরপর থেকে রাব্বি নিয়মিত পড়াশোনা করতে শুরু করল। ভোরে উঠে বই পড়ত, শিক্ষকদের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনত এবং সময়ের মূল্য বুঝতে শিখল। ধীরে ধীরে তার মধ্যে পরিবর্তন আসতে লাগল। শুধু পড়াশোনায় নয়, আচরণেও সে হয়ে উঠল আরও বিনয়ী ও দায়িত্বশীল।
বছর শেষে পরীক্ষার ফল প্রকাশের দিন এলো। পুরো বিদ্যালয়ে আনন্দের পরিবেশ। রাব্বি শ্রেণিতে প্রথম স্থান অর্জন করল। প্রধান শিক্ষক যখন তার হাতে পুরস্কার তুলে দিলেন, তখন তার চোখের সামনে ভেসে উঠল বাবার ঘামে ভেজা মুখ, ফেটে যাওয়া হাত আর কাঁঠালগাছের নিচে বসে শুকনো রুটি খাওয়ার দৃশ্য।
বাড়ি ফিরে সে পুরস্কারটি বাবার হাতে তুলে দিয়ে বলল,—বাবা, এই পুরস্কার আমার নয়, তোমার।
রেজার চোখে জল চিকচিক করে উঠল। তিনি ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরে বললেন,
—আজ মনে হচ্ছে, আমার জীবনের সব পরিশ্রম সার্থক হয়েছে।
রাব্বি সেদিন উপলব্ধি করল, পৃথিবীর সবচেয়ে বড়ো ছায়ার নাম বাবা। তিনি নিজে রোদে পুড়ে সন্তানের জন্য শীতল আশ্রয় তৈরি করেন। নিজের স্বপ্ন বিসর্জন দিয়ে সন্তানের স্বপ্নকে ডানা মেলতে সাহায্য করেন।
সেই থেকে রাব্বি যখনই বাবার দিকে তাকায়, তখন আর শুধু একজন কৃষককে দেখে না; সে দেখে একজন নীরব যোদ্ধাকে, যার ঘামে লেখা আছে ভালোবাসার সবচেয়ে নির্মল কবিতা।

বাবা-মায়ের ত্যাগ কখনও অবহেলা করা উচিত নয়। তাদের পরিশ্রমের মূল্য বুঝে অধ্যবসায়, সততা ও মানবিক গুণে নিজেকে গড়ে তোলাই একজন সন্তানের সবচেয়ে বড়ো দায়িত্ব।

এম আব্দুল হালীম বাচ্চু

কাচারীপাড়া, কদমতলা, পাবনা

 

বাবা' এক শব্দে অযুত গল্প

বাবা- এই একটি শব্দের অন্তরালে আছে হাজারো গল্প।বাবা মানেই নীরব নির্ভরতার প্রতীক,আশার আশ্রয়।যখন থেকে বাবাকে বুঝতে শিখেছি, তখন থেকেই আবিষ্কার করে চলেছি এক অনন্য মানুষকে। কোলে-পিঠে বেড়ে উঠা শৈশব। তারপর একদিন হাত ধরে স্কুলে নিয়ে যাওয়া।স্লেট পেনসিলের খসখস শব্দ আর বর্ণ-ভাষায় জীবনের এক মধুর শিখন অধ্যায়ের শুরু। তবে বাবা নামক বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠ শুরু হয় আমার জীবনের প্রথমদিন থেকেই। সকাল-সন্ধ্যা সময় বেঁধে পড়তে নিয়ে বসতেন বাবা। হারিকেনের টিমটিম আলোয় পড়া কালো অক্ষরগুলো আলো হয়েই জেগে রইল জীবনভর। স্কুলে পড়ার সময় টিফিনে আমার জন্য বরাদ্দ ছিল দুই টাকার দুটি নোট৷ আজ মনে হয় হাজার টাকার মধ্যেও সেই মলিন নোটগুলোর মূল্যই বেশি। প্রতি সন্ধ্যায় বাবা আমাদের নিয়ে বসতেন গানের আসরে৷ হারমোনিয়ামে পদাবলির সুর তুলতেন আর আমার হাতে মৃদঙ্গ দিয়ে বাজনার তালিম দিতেন। উল্টোপাল্টা চাটি মারতে মারতেই একদিন বাজানোর কায়দাটা রপ্ত করে ফেললাম। এখনো কোনো সন্ধ্যায় সেই প্রিয় সুরশ্রীর হারমোনিয়াম নিয়ে বসে পড়েন। কণ্ঠে ধরেন - প্রাণ সই সখি গো আমার প্রাণবন্ধু কই......

এসব গানে প্রাণ থাকে। বিভোর হয়ে শুনতে ইচ্ছে করে। স্মৃতির খাতায় জমে আছে এমনই কত মুগ্ধ সন্ধ্যার ঋণ। দাদাবাবুর সাথে পাড়ার গানের আসরে বাবাকে ঠাহর করতাম একজন দক্ষ বায়েন আর দরাজ দোহার হিসেবে। সেই আশির দশকের ফটোগ্রাফে বাবরি চুল আর বেলবটম প্যান্টে বাবা যেন সময়েরই নায়ক। রং-তুলির কাজেও তাঁর পারদর্শিতার পরিচয় মেলে ঘরে রাখা নজরুল আর শ্রীগৌরাঙ্গের চিত্রকর্মের মধ্যে। আজকের এই দায়িত্বশীল বাবার শৈশবটা ছিল কিন্তু  নির্ভার। দুরন্তপনায় মেতে থাকতেন সারাক্ষণ। ধুলোমাটি দিয়ে ঢুপির(ঘুঘু) ঘর বানাতে বানাতে কখন যে স্কুলের সময় চলে যেত টেরই পেতেন না। দাদীর বকুনি খেয়ে তবে ধুলো ঝেড়ে, কখনো বা বইখাতা ফেলে রেখেই স্কুলের দিকে ছুটতেন। তাঁর বোনদের মানে আমাদের পিসিদের সময়ে অসময়ে জ্বালাতন করতেন খুব। এসব কথা দাদীর মুখেই শোনা। পিসিরা বেড়াতে এলে কখনো সখনো অনুযোগের স্বরে বলেন, " তর বাপ যে দুষ্টা আছিল।"

কৃষক পরিবারে বাবার বেড়ে উঠা। চাকরির পাশাপাশি দাদার সাথে মাঠে নামতেন পুরোদস্তুর কৃষক হয়ে। ব্যাংকের চাকরি ছেড়ে একসময় গ্রামে ফিরে যুক্ত হলেন শিক্ষকতায়।স্কুল ছুটির পর টিউশনি করতেন। পাঁচটাকা ভাড়া বাঁচানোর জন্য পায়ে হাঁটতেন মাইলপথ। সকাল ৯টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত ১২ ঘণ্টা অবিশ্রাম খাটুনি।আমরা ভাবতাম, কী দরকার এত পরিশ্রম করার! তিন ভাইয়ের লেখাপড়া আর সংসার সামলাতে কতটা হিমশিম খেতে হয়েছিল বাবাকে, তা এখন নিজের কাঁধে দায়িত্বের জোয়াল পড়াতে বুঝতে পারি। আমাদের লেখাপড়ার খরচের বেলায় সেই পাঁচটাকা বাঁচানো বাবাকে দেখতাম গৌরী সেনের ভূমিকায়। দু'হাত ভরে দিয়েই গেছেন আমাদের, নেননি কখনো।  যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পেলাম, তখন বাবার চোখে দেখেছিলাম এক তৃপ্তির আলোর ঝিলিক।আমার আর ছোটভাই সৌরভের চাকরি হওয়ার পর সে আলো আরও উজ্জ্বল হয়ে ধরা পড়ে।

গণিতের নানা বিষয়ে বাবার গুণ-জ্ঞানের কদর আছে বেশ। হিসাব নিকাশ কষতে গ্রামের লোকজন তল্লাশ করেন প্রায়ই৷ বলা যায় সব বিষয়েই পাক্কা হিসাবি। কিন্তু জীবনের হিসাবে যখন একান্ত প্রিয় কিছু মানুষের কাছে ঠকে গেলেন এবং তার প্রতিবাদটুকু করলেন না, তখন মনে হলো আসলে বড্ড বোকা বাবা আমাদের।বাবাকে কখনো কোনো বিষয়ে কারো সাথে তর্কে জড়াতে দেখিনি,মায়ের সাথে তো না-ই। বছর দশ আগে যখন হঠাৎ মা চলে গেলেন না ফেরার দেশে,তখন নিদারুণ একাকীত্ব পেয়ে বসে বাবাকে। বোন নেই আমাদের। আমরা তিন ভাইয়ের মধ্যে দুই ভাই বাড়ির বাহিরে থাকতে হয়েছে লেখাপড়ার জন্য। ঘর-সংসার আর রান্নাবান্নার কাজ সামলাতে হয়েছে ছোটভাই শুভ্রকে,কখনো বাবাকে। সেই বিষণ্ণ বেলায় কথা বলার সঙ্গীও ছিল না কেউ।

বাবা চাকরি থেকে অবসর নিয়েছেন দশ বছর হলো। অবসরের সঙ্গী হয়েছে এখন বাড়ির পাশের জমিজিরাত আর আমার একমাত্র মেয়ে সংস্কৃতি।ফুল-ফসলের পরিচর্যায় কাটে দিনের বেশিরভাগ সময়। সেসব কাজে সহযোগিতা করেন আমার স্ত্রী দিপা আর সৌরভের স্ত্রী প্রিয়াংকা।সেকারণে বাড়িটা যে ছোটখাটো একটা গার্ডেন হাউসে পরিণত হয়েছে, তা বললে অত্যুক্তি হবে না। ফুলের প্রতি বাবার একটা টান সবসময়ই ছিল। প্রিয় ফুল গন্ধরাজ তুলে এনে শিয়রের কাছের টেবিলে রাখাটা তাঁর পছন্দের। আশির দশকে ২ টাকা দামে কামিনী গাছের চারা এনে লাগিয়েছিলেন বাড়ির সম্মুখপথে। নিশিকুসুম এখনো আছে বন আলো করে। বাবা আছেন মহাবৃক্ষের ছায়া হয়ে। আর আমরা আছি কবিকথায় সেই 'শ্যামসৌম্যচ্ছায়াতলে তব'।

 

শিশির কুমার নাথ 

ঐতিহ্য-সংগ্রাহক, ফেঞ্চুগঞ্জ, সিলেট

 

আমি উছিলা মাত্র

স্কুল জীবনে একটা ছোট মফস্বল শহরে বাবার সাথে একা থাকতাম। বাবা একটা দোকানে কাজ করতেন। সেখানে আমাদের কোনও আত্মীয়-স্বজন ছিল না। কয়েকবছর হলো বাবা সেখানে থাকেন। মিশুক মানুষ।নম্র ব্যবহার। একটা পরিচিতি  তৈরি হয়েছিল তাঁর। প্রায়ই বাবার সাথে আমাকে দেখে লোকজন জিজ্ঞেস করতেন- কে বাবু, আপনার ছেলে?  তখন কেমন যেন উদাস হয়ে যেতেন বাবা।বলতেন- না আমার না,আমি উছিলা মাত্র।  বুঝতাম না কথাটার মানে।চেনা বাপকে অচেনা লাগতো। মনে মনে বলতাম আমি তো তারই ছেলে। কিন্তু ভদ্রলোক এই সাধারণ সত্যটা বলতে এমন আমতা আমতা করেন কেন?

বহুদিন এর কোনও উত্তর পাইনি। উত্তরটা পেয়েছিলাম প্রথম তারুণ্যে। টুকটাক বই কিনে পড়ার অভ্যাস।একদিন একটা পুরোনো বই কিনলাম। বিখ্যাত লেবানিজ লেখক ও কবি কাহলীল  জিবরানের 'দি প্রফেট'। বাংলা অনুবাদ। জীবনদর্শনের উপর অসামান্য বই। একজন কাল্পনিক মহাপুরুষ। মূল বইয়ে যার নাম আল মুস্তফা। সাধারণ মানুষরা তাকে নানা বিষয়ে প্রশ্ন করছেন।যেমন- শিক্ষা,বন্ধুত্ব,সুখ, প্রেম,বিবাহ ইত্যাদি। শেষ বিদায়ের আগে মহাপুরুষ তাদের প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছেন। এক পর্যায়ে একজন সন্তান বিষয়ে প্রশ্ন করলেন। উত্তরে মহাপুরুষ বললেন- তোমার সন্তানেরা তোমার সন্তান নয়। তারা হলো বহমান জীবনের পুত্র কন্যাগন। কেবল জীবনের ধারাবাহিকতা।সত্য তারা তোমার থেকে এসেছে কিন্তু তোমার হতে নয়।

পড়ে স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিলাম। মনে পড়ছিল শৈশব কৈশোরে নিজের সন্তান নিয়ে বাবার উত্তর।  আমার বাবার পড়ালেখা অতোদূর ছিল না।মাধ্যমিকের গন্ডি পেরুন নি।বইপত্র  তেমন পড়তে দেখিনি। জিবরান তাঁর পড়ার কথা না। তাই সন্তান নিয়ে জিবরানের প্রফেটের মতো তাঁর অমন নিরাসক্ত উচ্চ দর্শন আমাকে আজও যুগপৎ বিস্মিত ও মুগ্ধ করে।

 

প্রবীর চন্দ্র দাশ

নবীগঞ্জ, হবিগঞ্জ

 

 

আব্বা স্বপ্ন


আব্বা না‌মের বটবৃক্ষ আজও আমার সা‌মনে দাঁ‌ড়ি‌য়ে আছে। বটবৃ‌ক্ষের ছায়াত‌লে ছন্নছাড়া জীবন সাজাই। জীব‌নের গল্পটা আজ একেবা‌রে অন‌্যরকম। আব্বার বয়স সত্তর পে‌রি‌য়ে গে‌ছে। বয়‌সের ভা‌রে নানা জ‌টিলটায় ভুগ‌ছে। আব্বার জ‌ীব‌ন ক্রা‌ন্তিকালের দ্বারপ্রা‌ন্তে। এসময় তার পা‌শে থাক‌তে পার‌ছি না। চাক‌রির সুবা‌দে সুদূর মা‌নিকগ‌‌ঞ্জে কর্মরত। নি‌জে‌কে ব‌্যস্ততার ফ্রে‌মে ব‌ন্দি ক‌রে‌ ফে‌লে‌ছি। আব্বা এখন বিছ‌ানায় দিন অতিবা‌হিত কর‌ছে। সংসা‌রের ঘা‌নি টান‌তে টান‌তে ক‌য়েকবার ব্রেন স্ট্রোক ক‌রে আব্বা। ক‌য়েক মাস আগেও এক পা দু পা ক‌রে হাঁট‌তে পার‌তো। তারপর এক‌দিন হঠাৎ সকা‌লে পক্ষাঘা‌তে আব্বার শরী‌রের বাঁ পাশ অবশ হ‌য়ে যায়। অ‌নেক চি‌কিৎসা ক‌রে‌ও তার কোনো উন্ন‌তি হ‌লো না। তখন থে‌কে একা একা হাঁটাচলা অসম্ভব। তার শরী‌রের অবস্থা দিন দিন শোচনীয় হ‌য়ে যা‌চ্ছে।

এখন হাঁটাচলা বল‌তে কখ‌নো মা, কখ‌নো বড় ভাই ঘ‌রের বাইরে আনে। পুর‌নো কা‌ঠের চেয়া‌রে হেলান দি‌য়ে দিন কে‌টে যায়। মা আব্বা‌কে খাইয়ে দেয়। এমন‌কি তার যাবতীয় দেখভাল মা‌কেই সাম‌লে নি‌তে হয়। গত কুরবানী ঈদে ছু‌টি‌তে গ্রা‌মের বা‌ড়ি গেলাম। আব্বা‌কে অ‌নেক সময় দিলাম। দেখ‌তে দেখ‌তে কখন জা‌নি ঈদের ছু‌টি পে‌রি‌য়ে গেল! কর্মস্থ‌লে ফেরার আগে আব্বার ঘ‌রে গেলাম। বললাম, আজ তোমার কো‌নো দুঃখ নেই আব্বা। তোমার স্বপ্ন ছিল শিক্ষক হ‌বে। অভা‌বের কশাঘা‌তে জীবন যু‌দ্ধে হে‌রে গে‌লেও আমা‌কে একজন শিক্ষক বা‌নি‌য়েছ। এটাই বা কম কি‌সে! তোমার চেষ্টা ও দোয়ায় আজ আমি গ‌র্ব‌িত শিক্ষক। তোমার স্বপ্ন নি‌য়ে বাঁচ‌তে চাই। আব্বার চো‌খের কো‌ণে বিষাদ সিন্ধু। আমি বললাম, আর এক বছর পর নিজ জেলায় বদ‌লি হ‌য়ে আসব ইনশাআল্লাহ। আব্বা হা‌সিমু‌খে বলল, সু‌খে থা‌কো, স‌ু‌খে থা‌কো।

কথাটার মর্ম আজ হা‌ড়ে হা‌ড়ে টের পাচ্ছ‌ি। আব্বা‌কে না বলা কথাগু‌লো তি‌লে তি‌লে ক্ষত বিক্ষত ক‌রে হৃদয়। কর্মস্থল অ‌নেক দূ‌রে এটাই যন্ত্রণাময়। চাইলেও তাক‌ে আন‌তে পার‌ছি না। এ শূন‌্যতায় বুকটা হাহাকার ক‌রে ওঠে! জীব‌ন কিছু পূর্ণত‌া আর শূন‌্যতার সমীকরণ। এক চিমটি জীব‌নের এক চিল‌তে স্বপ্ন। যেখা‌নে নির্মম বাস্তবতার ছ‌বি আঁ‌ক‌তে আঁক‌তে দিন চ‌লে যায়। এখা‌নে অ‌বিরাম না পাওয়ার বির‌হ। যে বির‌হের অন‌লে পুড়ব জা‌নি না আর কতকাল! অ‌পেক্ষার প্রহরগু‌লো দীর্ঘ থে‌কে দীর্ঘতর হয়।

সহকারীশিক্ষক
কল্যাণপুর উচ্চ বিদ্যালয়
দৌলতপুর, মানিকগঞ্জ

 

যে কথা হয়নি বলা

জুবায়ের বিন মামুন 

আজও সেই দুপুরটার কথা ঢের মনে আছে। ঈদের ছুটি চলছিল। বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরতে যাওয়ার বায়না ধরেছিলাম আব্বুর কাছে।  কিন্তু তিনি এক কথায় আমার আবদার নাকচ করে দিলেন। আমিও নাছোড়বান্দা, গোঁ ধরে দাঁড়িয়ে ছিলাম। এক পর্যায়ে কথা না শোনায় তিনি আমার ওপর রেগে গেলেন। কচি মন তা সইতে পারল না। চোখে জল এসে গেল। কিছু না বলে অভিমান করে আব্বুর সামনে থেকে সরে গেলাম। মনে মনে ভাবছিলাম, বাবারা এমন হয় কেন?  সেদিন রাতে বাবার প্রতি এত অভিমান জমল যে, তিনি বাড়ি ফেরার আগেই খাওয়া সেরে শুয়ে পড়লাম। আম্মু বারণ করলেন, কিন্তু রাগের বশে তাঁর কথা কানে তুললাম না। কিছুক্ষণ পর আব্বু বাড়ি এলেন। তখন আমি ঘুমের ভান করে শুয়ে ছিলাম। তিনি মশারির বাইরে থেকে আমাকে একবার দেখে গেলেন।  আম্মুকে জিজ্ঞেস করলেন,  

-জুবায়ের খেয়েছে কি?

কিছুক্ষণ পর পাশের ঘর থেকে আব্বুর কণ্ঠ ভেসে এল।  কান খাড়া করে শুনতে লাগলাম। তাঁর কথাগুলো শুনে আমি পুরোপুরি স্তব্ধ হয়ে গেলাম। 

তিনি বললেন, জুবায়েরের এমন কান্না দেখে নিজেকে ঠিক রাখতে পারলাম না। এত কষ্ট তো ওদের জন্যই! একটু চোখের আড়াল হলেই ওদের জন্য মনটা ছটফট করতে থাকে। একা কোথাও যেতে দিতেও পারছি না। যদি কিছু হয়ে যায়! এজন্য ভাবছি, কালই ইলিয়াস আর জুবায়েরকে নিয়ে ঘুরতে যাব।

 ওপাশ থেকে কথাগুলো শুনে নিজের কানকেই যেন বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। সত্যিই কি আব্বুর মুখে এসব শুনছি, নাকি স্বপ্ন দেখছি! টেরই পাইনি কখন মশারি সরিয়ে বাবার সামনে দাঁড়িয়েছি। কাচুমাচু হয়ে বললাম, আব্বু, কাল সত্যিই ঘুরতে নিয়ে যাবা? আজ আর সেই দিনগুলো নেই। এখন বুঝি, সেদিনের সেই শাসনের আড়ালেও কতটা মমতা লুকিয়ে ছিল! জীবনের নানা ব্যস্ততার মাঝেও শৈশবের সেই দিনগুলোর কথা প্রায়ই মনে পড়ে। বাড়ি ফিরলেই তোমার সঙ্গে গল্পে মেতে উঠতাম। ঘুমানোর সময় তুমি যখন শুয়ে শুয়ে মাসিক সাময়িকী পড়তে, তখন আমিও চোখ বুলাতাম। কখনো তোমার স্নেহমাখা বুকে মাথা রেখে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়তাম। সেই দিনগুলো আর নেই, সেদিন পাশের ঘর থেকে ভেসে আসা কথাগুলো আজও কানে বাজে। ছোটবেলায় বুঝিনি, এখন বুঝি - তোমার শাসনও ছিল একধরনের ভালোবাসা, শুধু তার ভাষাটা ছিল আলাদা। শুধু একটা কথাই বলা হয়নি - তোমাকে ভীষণ ভালোবাসি। 

আজ বলছি, বাবা।  

 

নীরব ত্যাগের অলিখিত মহাকাব্যের নাম বাবা

"বাবা" শব্দটি বাংলা বর্ণমালায় আর পাঁচটি শব্দের মত শুধুমাত্র একটি সাধারণ শব্দ নয়। বরং বাবা শব্দের গভীরতা যদি শব্দে পরিমাপ করা যেত তবে তার মাহাত্ম্য হতো নিঃস্বার্থ ভালোবাসা, নিরাপত্তা ও সুরক্ষার একচ্ছত্র ছায়া, ত্যাগ , নিরলস পরিশ্রম ও অবদানের অতন্দ্র প্রহরী। সহজ ভাষায় সেই রূপকথার গল্পের সুপারম্যানের বাস্তব উদাহরণ। ডাবের মত বাইরে শক্ত আর ভিতরে নরম তুলার মত মানুষটা শুধুমাত্র আমাদের জীবনের বটবৃক্ষ কিংবা পরিবারের প্রধানই নন তিনি আমাদের জীবনের পথপ্রদর্শক। মা নামক মানুষটা আমাদেরকে গর্ভে ধারণ করেন আর বাবা সারা জীবন সন্তানকে মস্তিষ্কে ধারণ করেন। জীবনের প্রত্যেকটি খারাপ সময়, ভেঙে পড়া, হতাশা ,চাপ, অসহ্য নিরলস পরিশ্রমের পরেও সফলতা না পাওয়ার কষ্টের ভিড়ে যখন এই স্বার্থান্বেষী পৃথিবীতে সকলে দূরে চলে যায় তখন শুধুমাত্র এই মানুষটা দৃঢ় বিশ্বাসের সাথে কাঁধে হাত রেখে বলেন আমি জানি আমার সন্তান পারবে, আমার সন্তান হারতে পারে না। প্রত্যেকটা কষ্টকর রাস্তায় বাবা নিজে কাঁধে করে সন্তানকে পৌঁছে দেন সাফল্যের গন্তব্যে। নিজের জীবনের প্রত্যেকটা না পাওয়াকে নিজের ভিতরেই চেপে রেখে সন্তানের স্বার্থকে অক্ষুন্ন রেখে সন্তানকে সর্বোচ্চ উচ্চতায় পৌঁছে দিতে নিজের জীবনকে উৎসর্গ করতেও এই মানুষটা দুইবার ভাবেন না। এতকিছুর পরেও এই মানুষটা সন্তানের থেকে কিছুই চান না শুধুমাত্র চান তার সন্তান যেন থাকে দুধে-ভাতে। হয়তো বাবা বলেই সম্ভব এতটা নিঃস্বার্থভাবে ভালোবাসা। অনেক ভালোবাসি তোমায় বাবা। 

 

প্রজ্ঞা দাস 

শিক্ষার্থী, অর্থনীতি বিভাগ 

ইডেন মহিলা কলেজ 

 

 

প্রিয়  বাবা,

 আসসালামু আলাইকুম। কেমন আছো  তুমি? এই কথাটি কখনও  সামনাসামনি  জিজ্ঞেস করা হয়নি। বাবা তুমি কি জানো তুমি আমার শক্তি, সাহস,আনন্দ, খুশি। তুমি আমাকে শেখাচ্ছ  ভালো  কাজ করলে যে নিজে অনেক ভালো  থাকা যায়।মনে আছে বাবা একবার  তাপমাত্রা  অনেক  বেরে গেলো সবাই  কি অতিষ্ঠ  গরমে।সবাই  যার যার মতো সহযোগিতা করছে।তুমি  আমাকে বললো তুমি কিছু  করো তোমার  মতো করে।কিছু  করে দেখো অনেক আনন্দ  পাবে।অমি তখন বাবার কথামতো  আমার টিফিনের  কিছু  টাকা জমানো ছিলো  আর বাবা কিছু  দিলো সব মিলে  কিছু  ঠান্ডা  পানির বোতল কিনে রাস্তায়  রাস্তায়  ক্লান্ত  মানুষদের দিয়েছিলাম।সত্যি  বলছি বাবা  আমার যে কি ভালো  লেগেছে  তার তোমাকে বোঝাতে পারবো না। ভালো  কাজ করলে যে  আনন্দ  পাওয়া যায়  তা তুমি  শিখালে। এই শিক্ষা  আমার পথে চলাকে আরও  আনন্দময় করবে।প্রতিদিন  তোমার কাজ থেকে  কিছু  না কিছু  শিখছি। তুমি দোয়া করো বাবা আমি যেনো তোমার মতো  ভালো  মানুষ  হতে পারি।আমার কথা  কি বাবা জানো বছরে একটি দিন কেনো প্রতিদিন  তোমাকে বলি আমি তোমাকে  অনেক বেশি ভালোবাসি।

ইতি তোমার ছোট্ট 

রেজওয়ান  খান মজলিস। 

তোমার পৃথিবী

 

আমার বাবা, আমার ভালোবাসা

আমার বাবার নাম রতন কুমার ঘোষ। তিনি শুধু আমার বাবা নন, তিনি আমার জীবনের সবচেয়ে বড় আশ্রয়, সবচেয়ে বিশ্বস্ত বন্ধু এবং অনুপ্রেরণার উৎস। ছোটবেলা থেকে আজ পর্যন্ত বাবার ভালোবাসা, ত্যাগ ও পরিশ্রম আমাকে জীবনের পথে এগিয়ে যেতে সাহস জুগিয়েছে। আমি যখন ছোট ছিলাম, তখন বাবা প্রতিদিন খুব ভোরে কাজে বেরিয়ে যেতেন। সারাদিনের ক্লান্তি সত্ত্বেও বাড়ি ফিরে তিনি আমার পড়াশোনার খোঁজ নিতেন। আমি স্কুল থেকে ফিরে বাবার জন্য অপেক্ষা করতাম। বাবা বাড়ি ফিরলেই যেন পুরো বাড়ি আনন্দে ভরে উঠত। তিনি আমার জন্য কখনও গল্পের বই, কখনও প্রিয় খাবার নিয়ে আসতেন। কিন্তু এসব উপহারের চেয়েও বড় ছিল তাঁর স্নেহমাখা হাসি এবং ভালোবাসা।

একবার আমি স্কুলের পরীক্ষায় আশানুরূপ ফল করতে পারিনি। আমি খুব ভেঙে পড়েছিলাম এবং ভেবেছিলাম বাবা হয়তো রাগ করবেন। কিন্তু তিনি আমাকে বকাঝকা না করে পাশে বসিয়ে বলেছিলেন, “জীবনে হার-জিত থাকবেই। পরিশ্রম করলে একদিন অবশ্যই সফল হবে।” তাঁর এই কথাগুলো আমার মনে নতুন আত্মবিশ্বাস জাগিয়েছিল। এরপর আমি আরও মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করি এবং ভালো ফল করতে সক্ষম হই। বাবা সবসময় আমাকে সততা, পরিশ্রম এবং মানবিকতার শিক্ষা দিয়েছেন। তিনি বলতেন, মানুষের আসল পরিচয় তার চরিত্রে। তাই জীবনে যত বড়ই হও না কেন, ভালো মানুষ হওয়ার চেষ্টা করবে। বাবার এই শিক্ষাগুলো আমার জীবনের পাথেয় হয়ে আছে।

পরিবারের সুখের জন্য বাবা অনেক কষ্ট করেছেন। নিজের প্রয়োজনকে গুরুত্ব না দিয়ে তিনি সবসময় আমাদের চাহিদাকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। অনেক সময় দেখেছি, নিজের ইচ্ছা ত্যাগ করে তিনি আমার পড়াশোনা ও ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয় করেছেন। তাঁর এই নিঃস্বার্থ ভালোবাসা আমাকে গভীরভাবে স্পর্শ করে। আজ আমি যতটুকু এগিয়েছি, তার পেছনে বাবার অবদান অপরিসীম। তাঁর ত্যাগ, স্নেহ ও আদর্শ আমাকে প্রতিনিয়ত অনুপ্রাণিত করে। আমার জীবনের সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো আমার বাবার ভালোবাসা। আমি গর্বের সঙ্গে বলতে পারি, রতন কুমার ঘোষের মতো একজন স্নেহশীল, পরিশ্রমী ও আদর্শবান বাবার সন্তান হতে পেরে আমি ধন্য। তাঁর প্রতি আমার শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা চিরদিন অটুট থাকবে।

আব্বু আমার দেখা মতে তুমি অনেক বেশি কর্মঠ, সময়ানুবর্তী, অধ্যবসায়ী একজন মানুষ। তোমার পড়াশোনার প্রতি প্রবল আগ্রহ যা আমাকে অনেক অনুপ্রাণিত করে। এত ব্যস্ততার মাঝেও তুমি সময় করে নিয়মিত পত্রিকা, বই, চাকরির ম্যানুয়াল সব চমৎকার গুছিয়ে পড়।  বৃহত্তর প্রতিষ্ঠান "আশা" র আমার দেখা মতে তুমি একনিষ্ঠ একজন ব্যক্তি। এই পেশার প্রতি তোমার অধ্যবসায়, ত্যাগ, তিতিক্ষা আসলেই অনুকরণীয় এটাকে তুমি ধ্যান,জ্ঞান হিসেবেই মানো। 

আমাদের জন্মদিনের তারিখ স্মরণ না থাকলেও চাকরির কোন বিধি,গুরুত্বপূর্ণ  তারিখ, ম্যানুয়াল সকল কিছু তোমার নখদর্পনে। চাকরি জীবনের ৩৩ বছর পার করে এখনও পর্যন্ত সবসময়ই নিজেকে আরও বেশি শাণিত করো প্রতি মুহুর্তেই। আর আম্মার জন্যই এতদিন সফলভাবে সময় দিতে পেরেছো চাকরিজীবনে। চাকরির জন্য আমার কতগুলো স্কুলে পড়তে হয়েছে, এক ক্লাস দুই  স্কুলেও। আর বাংলাদেশের কত্তগুলো জেলায় থাকা হয়েছে চাকরির সুবাদে।

তবে এত ব্যস্ততার মাঝেও আমাদের প্রতি তোমার অগাধ স্নেহ আর ভালোবাসা। আমাদের  জীবনের অনেক কঠিন মুহূর্ত, অসুস্থতা অনেক বিষয়ই হইতো জানাই নি তোমার চাকরির কঠোরতার কারণে। আমরা বরাবরই এগুলো সহজভাবে মেনে নিয়েই চলেছি। তোমার এই কর্মময় জীবন আমরা উপভোগ করি আর তা নিয়ে গর্ববোধও করি। 

লাবনী সরকার 

কাপাসিয়া, গাজীপুর 

 

দূরত্বের আকাশ বাবার ছায়া

পৃথিবীর সমস্ত সম্পর্কের ব্যাকরণ হয়তো এক নয়, কিন্তু বাবার সাথে মেয়ের সম্পর্কের যে চিরায়ত মহিমা, তা যেকোনো সংজ্ঞার ঊর্ধ্বে। আজ দেশান্তরী হয়ে হাজার মাইল দূরে বসে যখন পৃথিবীর মানচিত্রের দিকে তাকাই, তখন আমার অস্তিত্বের কেন্দ্রে এক বিশাল মহীরুহকে অনুভব করি—তিনি আমার বাবা। নয় মাসের দীর্ঘ বিরতি, কেবল ভিডিও কলের পর্দায় সীমাবদ্ধ হয়ে আছে আমাদের দেখা হওয়া। প্রযুক্তির এই কৃত্রিম আলোয় বাবার মুখটা স্পষ্ট দেখা যায়, কিন্তু তার হাতের সেই উষ্ণতা, যা একসময় মাথায় হাত বুলিয়ে সব ভয় দূর করে দিত, তাকে কি আর ভার্চুয়াল জগতে পাওয়া যায়?

আমার বাবা বহুল আলোচিত ‘উগ্র মেজাজ’ বা কঠোর শাসনের এক মূর্ত প্রতীক। শৈশব থেকে কৈশোর পর্যন্ত তার সেই শাসনের ছায়ায় বেড়ে ওঠা আমার কাছে কখনো কখনো পাহাড়সম মনে হতো। কিন্তু পরিণত বয়সে এসে আজ বুঝি, সেই কড়া মেজাজের আড়ালে ছিল এক বিশাল সমুদ্রের মতো মমতা। পৃথিবীর সমস্ত প্রতিকূলতার বিপরীতে দাঁড়িয়ে আমাকে যিনি আজও অকুতোভয় করে তোলেন, তিনি আমার বাবা। আমি যখন ব্যর্থতার চোরাবালিতে হারিয়ে যাই, তিনি এক ধ্রুবতারার মতো জ্বলে ওঠেন আমার সমর্থনে।

আজ আমি বড় হয়েছি, নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে পৃথিবী দেখার সাহস অর্জন করেছি। কিন্তু অবাক হয়ে দেখি, আমার এই বেড়ে ওঠাকে তিনি শুধু দেখেননি, লালন করেছেন তার সমস্ত স্বপ্ন দিয়ে। তার একমাত্র অদম্য তৃষ্ণা—তার মেয়ে একজন ‘প্রতিষ্ঠিত নারী’ হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে। তিনি জানেন না, আমার এই পথচলার প্রতিটি ধাপে যে আত্মবিশ্বাস কাজ করে, তার জ্বালানি আমার বাবার দেওয়া সাহস। ভিডিও কলের ওপাশ থেকে যখন তিনি বলেন, “সামনে এগিয়ে যাও, কোনো কিছুতেই থেমো না,” তখন মনে হয়, আমার সাথে হাজার মাইলের দূরত্ব থাকলেও তিনি ঠিক আমার পাশেই দাঁড়িয়ে আছেন।

বাবার শাসন আর অনুপ্রেরণা—এই দুইয়ের সমন্বয়ে আমার সত্তা গঠিত। তিনি আমাকে শিখিয়েছেন, প্রতিষ্ঠা মানে কেবল ক্যারিয়ার নয়, বরং মেরুদণ্ড সোজা রেখে মাথা উঁচু করে বাঁচার নামই হলো প্রকৃত স্বাধীনতা। তার সেই কঠোরতা আজ আমার কাছে এক অনুশাসিত জীবনের পথনির্দেশক। প্রতিদিনের কথোপকথনে তিনি যে স্বপ্ন বুনে দেন, তা আমাকে ক্লান্ত হতে দেয় না।

সবশেষে এটাই সত্য, বাবা মানেই সেই আকাশ, যার সীমানা নেই। হাজার মাইল দূরে থেকেও আমি তার ছায়ার নিরাপত্তা অনুভব করি। সেই ছায়াতেই আমার বেড়ে ওঠা, আমার স্বপ্ন দেখা। বাবা, তুমি দূরে আছো ঠিকই, কিন্তু আমার প্রতিটি সাফল্যের প্রতিটি কোণায় তুমি মিশে আছো—আমার প্রথম শিক্ষক, আমার সবচেয়ে বড় সমর্থক।

মুমতাহহিনা খাতুন

তেহরান, ইরান

তবুও তোমায় ভালোবাসি বাবা"

বাবাকে প্রচণ্ড ভালোবাসি, কিন্তু কখনো সেই ভালোবাসা প্রকাশ করার সুযোগ দেয়নি নিয়তি। সন্তানদের জন্য বাবা হন একেকটি ছায়াবৃক্ষ। তবে পৃথিবীতে কিছু বাবা আছেন, যারা স্বার্থান্ধ। জীবনের সবচেয়ে বড় আক্ষেপগুলোর একটি, বাবাকে নিয়ে আমার কোনো সুখের স্মৃতি নেই। বরং বাবার স্মৃতিচারণে আজও ডুকরে ওঠে হৃদয়। জীবনের সব প্রাপ্তি যেন থমকে যায় বাবার স্নেহের অভাবে। তবুও ভালোবাসি বাবাকে। তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা আমার হৃদয়াঙ্গনে স্বর্ণালংকারের মতো গচ্ছিত।তবে বাবার প্রতি জমেছে প্রচণ্ড অভিমান। চার বছরের ছোট্ট আমিটাকে নিজের কাছ থেকে দূরে ঠেলে দিতে যখন তাঁর বিশাল হৃদয়ে কোনো আঘাত লাগেনি, তখন তাঁর অনুপস্থিতির অনুভবে আমার ছোট্ট হৃদয় বহুবার অশ্রু ঝরিয়েছে। ভেজা চোখে দূর থেকে অন্যদের বাবার ভালোবাসা দেখে তার আদরের লোভ জেগেছে হাজারো বার। 

তবুও তুমি আসোনি, বাবা। যার হৃদয়ে কখনো আমাকে দেখার তৃষ্ণা জাগেনি, অথচ তাঁর মুখটিই স্বপ্নে দেখে আমার ঘুম ভেঙেছে অসংখ্যবার।তবে আমি ভীষণ সুখী, বাবা। তোমার পরিবর্তে মহান আল্লাহ আমাকে আরেকজন বাবা দিয়েছেন। তিনি আমার মামা হলেও বাবার মতোই স্নেহের চাদরে জড়িয়ে রেখেছেন সবসময়। তোমার অভাবেও তিনি আমাকে তাঁর আহ্লাদে আশ্রয় দিয়েছেন। তিনি না থাকলে হয়তো জানতামই না, বাবার স্নেহের অনুভূতিটা কি! কিন্তু সমাজ আমাকে বাঁচতে দেয় না তোমার পরিচয় ছাড়া। সমাজের মানুষদের কারণেই তোমার অভাব আরও গভীরভাবে অনুভব করি। "বাবা! দশ বছর পর সেদিন তোমার মুখোমুখি হয়েছিলাম। সারা রাত ঘুম হয়নি এই ভেবে, বাবার প্রতি সঞ্চিত অনুভূতিগুলো কীভাবে প্রকাশ করব?

মুহূর্তের মধ্যেই যেন হৃদস্পন্দন থেমে গিয়েছিল। এতকাল পর বাবা কি আমাকে বুকে টেনে নেবেন? নাকি আমিই এগিয়ে যাব তাঁর দিকে? তাঁকে জড়িয়ে ধরে অশ্রুসজল চোখে জিজ্ঞেস করব, একবারও কেন আসোনি আমাকে দেখতে? লোকলজ্জায়, নাকি দায়িত্বের ভয়ে? দুইশো কিলোমিটারের পথ কি সত্যিই এত দীর্ঘ ছিল যে আমার খোঁজ নিতে আসা যায়নি?

কিন্তু আমার কোমল হৃদয়ের সব প্রত্যাশা ভেঙে দিলেন তিনি। দূরে দাঁড়িয়ে শুধু বললেন, "কেমন আছিস?"

এই একটি বাক্য শোনার জন্যই কি খোদা আমার প্রাণকে বাবার সম্মুখীন করেছিলেন?

খুব ইচ্ছে করছিল বাবাকে জড়িয়ে ধরে তাঁর ঘ্রাণের সঙ্গে পরিচিত হতে।

বাবার অনুপস্থিতি জীবনকে কতটা বিপন্ন, কতটা আশ্রয়হীন করে তোলে, তা তাকে জানাই। তবুও আমি সুখী। মা আর মামা কখনো জীবনের কোনো অভাব বুঝতে দেননি আমাকে। আমার সব আবদার, সব জেদ পূরণ করেছেন।

শুধু বাবাকে বসাতে পারেননি আমার জীবনের সেই শূন্যস্থানে।

পৃথিবীর সকল বাবা-মায়ের জানা উচিত, তাঁদের সম্পর্কচ্ছেদ সন্তানদের জীবনে কত গভীর প্রভাব ফেলে। যে সন্তানের পরিচয়পত্রেও বাবার নামের স্থানে, তারই নামসই একজন অচেনা মানুষের নাম লিখে দিতে হয়, তার কাছ থেকে সমাজ আর কী মূল্য প্রত্যাশা করে?

'আমার জীবনের দুঃখের অধ্যায়গুলোতেই কেবল বাবা স্থায়ী। আর কোথাও তাঁর কোনো খোঁজ নেই। তবুও ভালোবাসি তাঁকে। তাঁর প্রতি ঘৃণার দৃষ্টি যেন কখনো জন্ম না নেয়। দুঃখকে আপন করে নিয়ে, বাবার প্রতি জমিয়ে রাখা ভালোবাসা নিয়েই আমি সুখী।

হয়তো এই লেখাগুলো কখনো বাবা পড়বেন না। তবুও পৃথিবী জানুক,তাঁর অবহেলার মধ্যেও এই চারাগাছ আজও সতেজ, আজও দৃঢ়।

বাবার ভালো থাকায়, তাঁর বেঁচে থাকায় আমিও ভালো আছি।

ইহকাল ও পরকালের সকল ভালো বাবার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদিত থাকুক। আর পৃথিবীর প্রতিটি বাবা যেন তাঁর সন্তানের প্রতি দায়িত্বশীল হন।  

 

লেখা : ফারহানা ইয়াসমিন। 

নড়াইবাগ, ডেমরা, ঢাকা

 

প্রথম চুমু

আমি ছোট থেকেই হিংসুটে স্বভাবের। দু-একটা উদাহরণ দিলেই বুঝতে পারবেন। ভাইবোনদের মধ্যে আমি সবার ছোট। বয়সের হিসেবে শিশুকাল বাদ দিলে মানুষের জীবনকে যদি কৈশোর, যৌবন ও বার্ধক্য—এই তিন ভাগে ভাগ করা হয়, তাহলে আমি আমার বাবার বার্ধক্যের সাক্ষী। আমরা তিন ভাই ও তিন বোন সবাই বাবাকে ‘আব্বা’ ডাকতাম। বোধহয় আমাদের গ্রামের প্রায় সবাই তাদের বাবাকে এ নামেই ডাকত। কিন্তু আমার কাছে বাবা ছিলেন খুবই অপরিচিত একজন মানুষ। কেন বলছি? আব্বাকে শুধু আমরা ভাইবোনই নয়, আরও অনেক মানুষ ‘আব্বা’ বলে ডাকত। সত্যি বলতে, তখন আমার খুব হিংসা হতো। অন্যরা আমার বাবাকে ‘আব্বা’ ডাকবে কেন? অথচ বাবা এ ব্যাপারে কিছুই বলতেন না।

আমি কখনো পড়াশোনা বা অন্য কোনো প্রয়োজনে বাবার কাছে টাকা-পয়সা চাইনি। যে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে আমি পড়েছি, তার পাশেই ছিল উপজেলার সবচেয়ে বড় ও প্রাচীন বাজার। একদিন বাজারের লাইব্রেরি থেকে বই কিনে দাম দিতে যাব, এমন সময় দেখি দোকানদার বাকির খাতায় আমার বাবার নামের পাশে টাকার অঙ্ক লিখে রাখছেন। আমি খুব একটা অবাক হইনি। কারণ আব্বা প্রচুর বই পড়তেন। ভেবেছিলাম, হয়তো নিজের জন্য, না হয় আমার কোনো ভাইবোনের জন্য বাকিতে বই কিনেছেন।

কিছুদিন পর স্কুলের ড্রেস বানানোর জন্য বাজারের এক দর্জির দোকানে গেলাম। সেখানেও একই ঘটনা। আমি নগদ টাকা দিতে চাইলে দর্জি টাকাটা না নিয়ে বাকির খাতায় আব্বার নামের পাশে লিখে রাখলেন।এবার আমি হিংসা, রাগ আর ক্ষোভে একাকার। এত টাকা বাকি! আমাকে জামা না দিয়ে কাকে নতুন জামা কিনে দিলেন? অন্তত আমাদের ভাইবোনদের মধ্যে নতুন জামা পাওয়ার অধিকার তো আমারই সবচেয়ে বেশি!আমি জানতাম, আব্বা নিশ্চয়ই বাজারেই আছেন। হন্যে হয়ে তাঁকে খুঁজতে লাগলাম। অবশেষে দেখলাম, তিনি অনেক মানুষের সঙ্গে কথা বলছেন। এত মানুষের সামনে কিছু বলতে পারলাম না।বাড়িতে একসময় তাঁকে একা পেয়ে জিজ্ঞেস করলাম ব্যাপারটা কী।

আজও আমার স্পষ্ট মনে আছে, আব্বা বলেছিলেন—

“বাবা রে, আমি জানি তোর বই, স্কুল ড্রেস—সবই কেনা হয়ে যাবে। কিন্তু যাদের জন্য কিনে দিয়েছি, তাদের দেওয়ার কেউ নেই।”

আমি আর একটি শব্দও বলিনি।

আব্বা আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরে গালে একটি চুমু দিয়েছিলেন। আমিও তাঁকে জড়িয়ে ধরেছিলাম। আমার মনে হয়, সেটাই ছিল আব্বাকে দেওয়া আমার প্রথম চুমু, আর হয়তো আব্বারও আমাকে দেওয়া প্রথম চুমু।

আজও স্পষ্ট মনে আছে, সেই ঘটনার পর টানা চার দিন আমি মুখে পানি লাগাইনি। মনে হয়েছিল, আব্বার সেই চুমুর স্পর্শ যেন মুছে না যায়। সেদিনই আমি বুঝতে পেরেছিলাম, আমার বাবাকে আরও অনেক মানুষ কেন আব্বা বলে ডাকত।

ফাহাদ বিন হায়

 

বাবা তুমি কেমন আছো? ভালো আছো তো?ঐ আকাশে একা একা লাগে না তো?বাবা তোমাকে খুব মনে পড়ে।কেন তুমি চলে গেলে আমায় একা ফেলে? তোমাকে ছাড়া কিছু ভালো লাগে না। কতদিন তোমায় দেখি না! বাবা তুমি ছাড়া কেউ আমায় বোঝে না।সবার কাছে আমি বোঝা। সবাই আমাকে একঘরে করে রেখেছে। কেউ আমায় ভালোবাসে না। কারো কাছে আর আবদার করি না।কারো কাছে বায়না ধরি না। তুমি ছিলে আমার আশ্রয়স্থল। বাবা তুমি নাই তো কিছুই নাই। কতবার একা একা কাঁদি। আমার অশ্রু মুছে দেওয়ার কেউ নাই। কষ্টে বুক ফেটে যায়। আমাকে বোঝার কেউ নাই। ভেঙে নিয়ম কানুনের বাঁধ তুমি কি শুনতে পাও তোমার একমাত্র মেয়ের আর্তনাদ? কারণ আমার জীবন এখন অভিশপ্ত। বাবা ঐ আকাশের সবচেয়ে উজ্জ্বল তারা হয়ে থেকো। আমার জন্য প্রার্থনা করো যেন তোমার কাছে শীঘ্রই চলে আসতে পারি। অনেক ভালো থেকো।

 

কাশফিয়া নাহিয়ান

ঠিকানা- বাড়ি নং-১৬ রোড- ধানমন্ডি ঢাকা বাংলাদেশ

 

 

বাবার সাথে চাঁদনী রাতে

আমার বাবা সেরা বাবা নন, কিন্তু তিনি নিরেট স্নেহময় করে রেখেছেন আমাকে কৈশোরের পুরোটা সময়। ভালোবাসা-স্নেহ যে শুধু মানুষের মানুষের নয়; পশু পাখি. ফুল, গাছ, নদী, পাহাড়ের জন্য, আকাশের জন্য। তা তিনি শিখিয়েছেন নিপুন আদরে-স্নেহে। তিনিই হয়তো পৃথিবীর একমাত্র বাবা যিনি নীল আকাশের নিচে হাঁটতে হাঁটতে সন্তানকে বলেছেন- ‘নীলের মত উদার মন করতে পারে যারা, তারাই প্রকৃত মানুষ। সেই প্রকৃত মানুষ সবসময় শিক্ষা-সংস্কৃতি-ধর্ম-মানবতা আর সভ্যতাকে বুকে লালন করে।’

বাবা যেন এমনই হয়, যেই বাবা ভালোবেসে-স্নেহে মিলেমিশে একাকার হয়ে চাঁদনী রাতে হাঁটতে শেখায় আর বলতে শেখায়- সত্য বল, সুপথে চল ওরে আমার মন...। সেই বাবার জন্য নিমগ্ন শ্রদ্ধা জানিয়ে কেন যেন বলতে ইচ্ছে করছে- 

বাবা মানে নতুন আলো

নতুন করে আসা

বাবার আদর বাঁচতে শেখায়

সাহস ভালোবেসে...

লেখক: মোমিন মাহাদি

 

 

আমার বাবা আমার স্বপ্ননায়ক



আমার বাবা ললিত মোহন রায় পরলোকগমন করেন ১৯৭৯ সালে, আমি ৯ম শ্রেণিতে পড়াকালে। খুব মনে পড়ে শিক্ষক বাবার হাত ধরে তাঁরই মৃত্যুঅবধি কর্মস্থল ছাতারখাই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যেতাম ১৯৭১ এর প্রথম দিকে। মা আমাকে একবার বলেছিলেন, আমি যখন সাজগোজ করে বাবার স্কুলের পথে হাঁটা ধরতাম তখন নাকি বাবা একটু দূরে থেকে মা-কে বলেছিলেন, "দেখো আমাদের বাবুটা অনেক বড় হবে। আমাদের মুখ উজ্জ্বল করবে...।" চোখ ঝাপসা হয়ে আসছে। কষ্টে বুক ভেঙে যাচ্ছে।

তোমাকে খুব মনে পড়ে, বাবা। বিশেষ করে একাত্তরে ভারতে শরণার্থী ক্যাম্পে যাওয়া এবং সেখানে থাকাকালে তোমার মমতা আর আমাদের আগলে রাখার দৃশ্য ঝাপসা ঝাপসা মনে আসে।

বাবা, আমি মাধ্যমিকের নবম শ্রেণিতে পড়াকালে আমার মাথায় বাজ ভেঙে পড়ে, তোমার চলে যাওয়া আমাদেরকে সংসারসমুদ্রে ভাসায়। আমি তখন জীবনসমুদ্রে হাবুডুবু খেতে থাকি। এ সময়ই আমার পরম আত্মীয় শিক্ষক শ্রী দুর্যোধন বিশ্বাসসহ অনেকের সহায়তায় কোনোরকমে মাধ্যমিকের গণ্ডি ডিঙাতে সক্ষম হই। এই কঠিন সময়ে মাধ্যমিকের সাথে আরো দুজন শিক্ষকের নাম জড়িয়ে আছে। একজন শ্রী কৃতীরঞ্জন চক্রবর্তী এবং আরেকজন শ্রী নগেন্দ্র বিশ্বাস। দুজনেই সেন্ট্রাল জৈন্তা উচ্চ বিদ্যালয়ের স্বনামধন্য শিক্ষক। আমাদের এলাকার এই দুই কীর্তিমান শিক্ষক আমাকে ব্যাচে ফ্রি-তে প্রাইভেট পড়াতেন। কৃতী স্যার ইংরেজি ও বাংলা ব্যাকরণ এবং নগেন্দ্র স্যার অংক বিজ্ঞান এমনভাবে পড়াতেন সব যেন জলের মতো হয়ে যেত। তাঁরা যে তখন কতটা মহানুভবতা দেখিয়েছেন সেটা প্রকাশের ভাষা নেই। কেবল তাঁদের প্রতি অতল শ্রদ্ধা ভক্তি প্রদান করা ছাড়া আমি অভাগার আর কিছু করতে পারিনি। নগেন্দ্র স্যার এখন আর ইহলোকে নেই। স্মৃতির প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা। কৃতী স্যারের সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু কামনা করি।

বাবা,
১৯৮১ তে এসএসসি পাসের পর জীবনসংগ্রাম আর দারিদ্র্যের কারণে আমার পড়ালেখায় বিচ্ছেদ ঘটে। সংসাদের বড় ছেলে হওয়ায় মা, ছোট ছোট দুই ভাই ও এক বোন নিয়ে সংসার চালানোই হয় দায়। অনাহার অর্ধাহার তখন আমাদের নিত্যসঙ্গী। খাওয়ারই যেখানে উপায় নেই সেখানে পড়াশোনার তো আর কথাই নেই। অনেক শিক্ষক এবং শুভাকাঙ্ক্ষীরা আমাকে দেখে কেবল আফসোস করেন 'হায় লেখাপড়ায় এতো ভালো ছেলেটা এভাবে নষ্ট হয়ে গেলো। ওর ভাগ্যটাই খারাপ...।' এই সময়ে পড়াশোনার জন্য আমার মন ছটফট করলেও ছিলাম অসহায়। ফলে আমি আর কলেজে ভর্তি হতে পারিনি। এসএসসি পাস আমাকে জীবনে টিকে থাকতে করতে হয়েছে শ্রমজীবী অনেক কাজ। মানুষের ক্ষেতে কাজ করা থেকে শুরু করে মাছ ধরে তা বিক্রি করা, পলিথিন ব্যাগ সবজি এবং গলিতে বসে আটা-চাল ইত্যাদি বিক্রি করেছি। জলসা জলসায় পানসিগারেট ইত্যাদি নিয়ে দোকান দিয়েছি। গ্রামের বাড়ি বাড়ি থেকে মহাজনের টাকায় ধান কিনে এনে কমিশনে মহাজনের কাছে বিক্রি করেছি। একসময় বড় বোনের দেয়া দুশ টাকায় ভর করে লাকড়ির ক্ষুদ্র ব্যবসা শুরু করলে নতুন দিনের স্বপ্ন দেখি। এর মধ্যে ১৯৮৩ এর কোনো সময় আলাপ পরিচয় হয় তখনকার এমসি কলেজের বিএসএসসির শিক্ষার্থী শ্যামানন্দ সরকারের সাথে। তিনি যেন আমার জীবনে দেবদূতের মতো আবির্ভূত হন। তিনি সায়েন্সে ছিলেন। আর আমি আর্টসে এসএসসি পাস। উচ্চ মাধ্যমিকের বাংলা ও ইংরেজি দুটি মূল টেক্সট পাঠ্যবই এবং শ্রীকান্ত ও রক্তাক্ত প্রান্তর এই চারটি বই আমাকে দিয়েছিলেন। ব্যবসার ফাঁকে এই বইগুলো পড়তে পড়তে প্রায় মুখস্থ করে ফেলি। হয়তো-বা এরই ফলশ্রুতিতে একদিনও কলেজে গিয়ে ক্লাস না করে আমি তৎকালিন এমসি ইন্টারমিডিয়েট কলেজে (এখন যেটা সিলেট সরকারি কলেজ) গিয়ে প্রাইভেটে এইচএসসি পাস করে ফেলি ১৯৮৫ সালে। এরপর তোমাদের আশীর্বাদ এবং মায়ের অফুরান শুভার্শিবাদে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে বিএ (অনার্স) এবং মাস্টার্স করি। লেখালেখি ও সাহিত্য সংগঠনে নিজেকে নিয়োজিত করি। পাঁচ বছর দৈনিক সিলেটের ডাক-এর স্টাফ রিপোর্টার হিসাবে সাংবাদিকতা এবং শাহ খুররম কলেজে বাংলার শিক্ষক হওয়া ছিলো আমার জন্য পরম আনন্দের। এরপর ১৯৯৪ সালে সরকারের প্রথম শ্রেণির গেজেটেড কর্মকর্তা হিসাবে যোগদান আমার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। একসময় সংসার হয়। বর্তমানে স্ত্রী দুই পুত্র এবং একপুত্রবধু সহ নাতি নিয়ে আমাদের সংসার।

বাবা, তোমাদের শুভাশিসে আজ আমি এ পর্যায়ে এসেছি। দুঃখ একটাই বাবা, তুমি কিছুই দেখে যেতে পারলে না। ২০১৬ সালে চলে যাওয়ার আগে মা কিছু অবলোকন করেছেন। মা-কে যতটুকু পারি সেবা-যত্ন করার কিছুটা সুযোগ পেয়েছি। আমাদের জন্য আশীর্বাদ করো৷ বাবা। হায়, বাবার কোন ছবি সংগ্রহে নেই। বাবা চলে যাওয়ার পর মা-ই ছিলেন সব। ২০১৬ সালের ৬ জুলাই থেকে মা-ও আর নেই। তবে বাবা মা আছেন অনুভবে, হৃৎস্পন্দনে, প্রশ্বাসে। তাঁদের শুভাশিসেই আমাদের বেঁচে থাকা। যেখানেই থেকো ভালো থেকো বাবা, ভালো থেকো মা। আমার বাবা আমার স্বপ্ননায়ক। আমার হৃদিমন্দিরের তাঁর ঠাঁই চিরন্তন। তাঁর মুখ আমার মানসদর্পণে সতত জাজ্বল্যমান। সকল বাবা-মা'র প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।

পুলিন রায়
অবসরপ্রাপ্ত মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার
১০/ গোপালটিলা, টিলাগড়, সিলেট

 

বাবা, তুমি আজও আমার পথচলার আলো

বাবা দিবস এলেই বুকের ভেতর একটা শূন্যতা আরও গভীর হয়ে ওঠে। প্রায় দেড় বছর হলো বাবা আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। কিন্তু সময় যতই পেরিয়ে যাক, বাবার স্মৃতি যেন প্রতিদিন নতুন করে ফিরে আসে।ছোটবেলায় বাবার হাত ধরেই আমার পৃথিবীকে চেনা। স্কুলে নিয়ে যাওয়া, বাজার থেকে আমার পছন্দের খাবার কিনে আনা, কিংবা অসুস্থ হলে সারারাত জেগে পাশে বসে থাকা—এসব ছিল বাবার নিত্যদিনের ভালোবাসা। তখন বুঝিনি, একজন বাবা কতটা নিঃস্বার্থ হতে পারেন। আজ বুঝি, নিজের সব স্বপ্নকে সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য উৎসর্গ করার নামই বাবা। আমাদের পরিবারের সুখ-দুঃখের সবচেয়ে বড় আশ্রয় ছিলেন তিনি। সংসারের হাজারো দায়িত্ব কাঁধে নিয়েও কখনও ক্লান্তির কথা বলেননি। মুখে হয়তো হাসি ছিল, কিন্তু সেই হাসির আড়ালে কত ত্যাগ আর সংগ্রাম লুকিয়ে ছিল, তা আজ উপলব্ধি করি।

বাবার একটি কথা আজও আমার কানে বাজে—“সৎ থেকো, পরিশ্রম করো, সফলতা একদিন আসবেই।” জীবনের প্রতিটি কঠিন মুহূর্তে এই কথাগুলো আমাকে সাহস দেয়। যখন কোনো সিদ্ধান্ত নিতে দ্বিধায় পড়ি, তখন মনে হয় বাবা যেন এখনও পাশে দাঁড়িয়ে পথ দেখাচ্ছেন। বাবা চলে যাওয়ার পর বুঝেছি, পৃথিবীতে কিছু শূন্যতা কখনও পূরণ হয় না। ঘরের সেই পরিচিত কণ্ঠস্বর, সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরার অপেক্ষা, কিংবা মাথায় স্নেহের হাত—সবই এখন স্মৃতি। তবুও আমি বিশ্বাস করি, বাবা কোথাও থেকে আমাদের দেখছেন এবং তাঁর আশীর্বাদ এখনও আমাদের সঙ্গে আছে। এই বাবা দিবসে আমার একটাই প্রার্থনা-ঈশ্বর যেন আমার বাবাকে স্বর্গবাসী করেন। আর আমি যেন তাঁর আদর্শ, সততা ও মানবিকতাকে নিজের জীবনে ধারণ করতে পারি। বাবা, তুমি নেই, কিন্তু তোমার শিক্ষা, ভালোবাসা আর স্মৃতিগুলো আমার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। যতদিন বেঁচে থাকব, ততদিন তোমাকে হৃদয়ের গভীরে ধারণ করে রাখব।

 

তোমার সন্তানের ভালোবাসা শ্রদ্ধায়

ধ্রুব মহলানবীশ

আটপাড়ানেত্রকোনা

 

পেপসিকোলা

আমি তখন তৃতীয় ম্রেণীতে পড়ি।বাজারের সাথেই আমার স্কুল।আমার আব্বু ব্যবসা করতেন, সেজন্য বাজারেই বেশীভাগ সময় থাকতেন।আমার বিদ্যালয়ের নাম বসুনিয়ার হাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আর বাজারের নাম বসুনিয়ার হাট।কিন্তু সকলে বলে কালির হাট বাজার,কালির হাট স্কুল।এমন গরমের দিনে স্কুলের মাঠে খেলছিলাম।হঠাৎ আব্বু এসে ডেকে নিয়ে গেল বাজারের চায়ের দোকানে।দোকানের টেবিলের উপর একটা পেপসিকোলা রাখা।আব্বু আমার জন্য এই পেপসিকোলা টা রেখেছে।এর আগে আমি কখনো পেপসিকোলা খাইনি। শুধু কাঁচের একটা বড় বাক্স এ সাজানো দেখতাম।আব্বুর বন্ধু তাকে ট্রিট দিছিলো।আর আব্বু একচুমুক খেয়ে আমাকে দিয়েছিল।সেদিন আমি উপভোগ করেছিলাম পেপসিকোলার ঝাঁঝ, গন্ধ,স্বাদ।কিন্তু আব্বুর ভালোবাসার গভীরতা বুঝতে পারিনি। পরে আব্বুর ভালোবাসা খুব গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিলাম।এখন আব্বু আর পৃথিবীতে নেই। আমি পড়াশুনা শেষ করে সংসার করছি।এখনো যদি সেই বাজারে যাই সব স্মৃতিগুলো এসে হাজির হয়।কলিজাটা হু হু করে কাঁদে। খুব আফসোস হয কেন আব্বুকে সেদিন জড়িয়ে ধরে বললাম না “আব্বু তোমাকে খুব ভালোবাসি।

 

লেখক: কামরুন নাহার কলি

 

কঠোরতার আড়ালে কোমল হৃদয়

আমার কাছে বাবা প্রথমে একজন শিক্ষক। তিনি আমার মেন্টর, আমার পথপ্রদর্শক। ছোটবেলা থেকেই বাবাকে অতিরিক্ত ভয় পাওয়া আমি, এখন সময় পেরিয়ে বয়স বেড়ে বাবার সবচেয়ে কাছের বন্ধুতে রূপান্তরিত হয়েছি। ছোট্ট এ জীবনে  বাবাকে প্রায়ই বলি, তাকে আমি ভালোবাসি। আমার বাবা জানেন, তার বড় মেয়ে তাকে কতটা ভালোবাসে। শুধু হয়তো জানেন না, তাকে আমি দুর্বল হতে দেখতে পারি না, তাকে চুপচাপ বসে থাকতে দেখতে পারি না। ছোটবেলা থেকেই বাবার কড়া শাসনে বড় হওয়ার গল্প কমবেশি সবাই জানে। জানে না আমার বাবার শাসনের আড়ালে থাকা অদৃশ্য ভালোবাসার কথা। বাবা আমার চোখের পানি সহ্য করতে পারে না। শৈশবে বাবাকে সব সময় দেখেছি রাগী, গম্ভীর এবং কঠোর একজন মানুষ হিসেবে। কিন্তু সেই বাবাকে যখন জীবনের প্রথম বার কাঁদতে দেখেছি, তখন নিস্তেজ হয়ে গিয়েছিল আমার পুরো পৃথিবী। তখন উপলব্ধি করেছিলাম সবচেয়ে শক্ত মানুষ হিসেবে আমার বাবাও কাঁদতে জানে এবং আমার সেটা সহ্য হচ্ছে না। আমি কখনো সেদিনকে ভুলতে পারবো না। এই স্মৃতি আমার মানসপটে আজও গেঁথে রয়েছে।  সত্য কথা বলার সাহস, অন্যায়ের সঙ্গে আপস না করার শিক্ষা এবং নিজের বিবেকের কাছে সৎ থাকার মূল্য এসব বোঝার ভিত্তি তৈরি করেছেন আমার বাবা। জীবনে যদি আমার দায়িত্ববোধ, সততা কিংবা ন্যায়ের পথে চলার মানসিকতা থেকে থাকে তার বড় অংশের কৃতিত্ব আমার বাবার। তার অভিজ্ঞতা থেকে তিনি শিখিয়েছেন জীবনে সত্যের পথ সহজ না হলেও সম্মানজনক। আমার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পত্তি হলো আমার বাবা। বাবার দৃঢ়তা, কঠোর চোখের ভাষা আর আচরণের শৃঙ্খলা শৈশবে মনঃপুত না হলেও এখন এর গুরুত্ব বুঝি। ছোটবেলায় অনেকটা সময় কেটে গেছে শুধু বাবাকে ভয় পেয়ে। বাবার প্রতিটি নিষেধাজ্ঞা আমাকে এই যুগের অনেক বিপদের হাত থেকে রক্ষা করেছে এক অদৃশ্য রক্ষাকবচের মতো। আমি বাবার জীবন থেকে শিখেছি পরিশ্রমের গুরুত্ব আর দায়িত্ববোধের মূল্যবোধ। আমার বাবা সহজে অনুভূতি প্রকাশ করেন না। তিনি কখনো প্রকাশের প্রয়োজনই বোধ করেন না। কিন্তু তার প্রতিটি ত্যাগ, দুশ্চিন্তাই তার ভালোবাসারই প্রতীক। বাবা দিবস তাই শুধু ভালোবাসা প্রকাশের দিবস নয়, এটি আমার কাছে কৃতজ্ঞতা জানানোর জন্য একটি বিশেষ দিন। আগে যেই বাবার এক ডাকে ভয়ে কথা গোছানো শুরু করতাম, আর আজ সেই বাবার সাথে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বকবক করতে থাকি।

পৃথিবীর সকল সম্পর্কই জানে স্বার্থের হিসাব, কিন্তু বাবার যত্ন আর স্নেহ জানে না কোনো হিসাব। আমার জীবনে এক ও অদ্বিতীয় স্বপ্ন বাবাকে সম্মানিত  করা। এক সময় যে বাবার গম্ভীর মুখটাই যথেষ্ট ছিল আমাকে সতর্ক করে দেয়ার জন্য। কিন্তু আজ জীবনে এতটা পথ এসে বাবাকে উপলব্ধি করেছি নতুনভাবে। আমার জীবনের প্রথম শিক্ষক, প্রথম সমালোচক আর আজকের দিনে দাঁড়িয়ে আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধু বাবা। বাবাদের ত্যাগের গল্পগুলো অনেক সময় বলা হয় না। কিন্তু সেই গল্পের উপরে দাঁড়িয়ে থাকে সন্তানের স্বপ্ন। ভালো থাকুক পৃথিবীর সকল বাবারা।

 

সাবিহা তারান্নুম মিম 

শিক্ষার্থী, ইডেন মহিলা কলেজ 

 

বাবা মানে তপ্ত মরুর পাথর খোলসে বটবৃক্ষের ছায়া,বাবা মানে অগ্নিস্থলে জ্যোতিস্কতলে হিম শীতল এক মায়া

'বাবা' দুই অক্ষরের এই শব্দটা কতোটা কঠিন কোমল মায়াময় এবং ভারি তা প্রতিটি সন্তান জীবনের কোনো না কোনো সময় গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পারে। এটি জীবনে সবচেয়ে নির্ভরতার একটি নাম। যিনি জীবনের সব ঝড় ঝঞ্ঝা শত প্রতিকূলতা রুখে দিতে নীরবে কঠিন ছায়ামূর্তির মতো আমাদের পাশে দাঁড়িয়ে থাকেন। ছোট্টবেলার নির্ভরতার সেই কঠিন হাতটি আমাদের দুর্গম সময়ে সাহসের ছায়া প্রদান করে।বাবারা নিজের সমস্ত স্বপ্ন বির্সজন দিয়ে আমাদের স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখেন। তিন একজন সাধারণ মানুষ নয় তিনি সন্তানের জীবন ইতিহাসের মহানায়ক, হার না মানা এক অকুতোভয়– নীরব যোদ্ধা। তার ঘাম, ত্যাগ, শ্রম আমাদের ভবিষ্যতের ভিত্তি। বাবাকে নিয়ে অনুভূতি লিখে শেষ করা সম্ভব নয়। বাবা থাকলে পুরো পৃথিবীটা নিরাপদ লাগে। বাবা তোমার কাছে সবচেয়ে বেশি কৃতজ্ঞ। তুমি আমাকে পরিচয় দিয়েছো– একটা নাম, একটা অস্তিত্ব, একটি জায়গা এ পৃথিবীতে দাঁড়ানোর। বাবা তুমি আমাকে একটি জীবন দিয়েছো– এটাই সবচেয়ে বড় দান। বাবার ঋণ জীবনের বিনিময়েও কখনো শোধ করা সম্ভব হবে নাহ।

সজিব হোসেন 

বাংলা বিভাগ, ঢাকা কলেজ

 

বটবৃক্ষের ছায়া

শৈশবের রোদ-ঝড়-বৃষ্টিতে যে মানুষটি সবসময় মাথার ওপর এক বিশাল বটবৃক্ষের মতো ছায়া দিয়ে গেছেন, তিনি আমার বাবা। বাইরে থেকে বাবার রূপটা হয়তো কঠিন, শাসনের চাদরে ঢাকা; কিন্তু সেই চাদরের নিচে যে কতটা কোমল আর অবারিত মায়া লুকিয়ে থাকে, তা বড় না হলে সহজে বোঝা যায় না। জীবনের প্রথম ধাপে ভালো-মন্দের তফাত বুঝতে শেখা, কিংবা শত বিপত্তির মাঝেও সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকার যে শিক্ষা, তা আমি বাবার নীরব শাসন  আর আদর্শ থেকেই পেয়েছি।

সব বাবারাই বোধহয় একটু এমনই হন। নিজেদের জীবনের সবটুকু ক্লান্তি ও কষ্ট লুকিয়ে রেখে সন্তানের মুখে এক চিলতে হাসি ফোটানোতেই তাঁদের পরম তৃপ্তি। সমাজের হাজারো ঝঞ্ঝা আর দায়িত্বের চাপ একাই সামলান, অথচ ঘরে ফিরে সন্তানের মাথায় হাত রাখার সময় তাঁদের চোখে-মুখে খেলা করে এক স্বর্গীয় প্রশান্তি। আমাদের সমাজে বাবারা সচরাচর মুখে প্রকাশ করে ভালোবাসার কথা বলেন না। আর তাই হয়তো নিজের মনে জমে থাকা কথাগুলো কখনো মুখ ফুটে বাবাকে গুছিয়ে বলা হয়নি। বলা হয়নি, “বাবা, তোমাকে খুব ভালোবাসি।” কিংবা ব্যস্ততার অন্তহীন ভিড়ে কখনো থমকে দাঁড়িয়ে স্বীকার করা হয়নি, “আমার এই ছোট্ট জীবনে তোমার অবদান কতটা জুড়ে আছে।”

মাঝরাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেলে দেখতাম, বাবা নিভৃতে জেগে আছেন আমাদের ভবিষ্যতের চিন্তায়। নিজের শত ইচ্ছা-আকাঙ্ক্ষাকে বিসর্জন দিয়ে আমাদের ছোট ছোট আবদারগুলো যেভাবে তিনি সবার আগে পূরণ করতেন, তা আজ ভাবলে চোখে জল চলে আসে। বাবার সেই মলিন ছেঁড়া জুতো কিংবা পুরোনো শার্টটাই ছিল আমাদের রাজকীয় জীবনের ভিত্তিপ্রস্তর। বাবার কঠোর শাসনের আড়ালে যে গভীর উদ্বেগ আর অন্তহীন মায়া লুকিয়ে ছিল, আজ জীবনের এই পরিণত বয়সে এসে প্রতিটি পদক্ষেপে তা অনুভব করি। শৈশবে বাবার আঙুল ধরে মেঠো পথ কিংবা শহরের ব্যস্ত রাস্তায় হাঁটতে শেখা সেই ছোট আমি আজ হয়তো নিজের পায়ে দাঁড়াতে শিখেছি, জীবনের অনেক কঠিন পথ পাড়ি দিচ্ছি। কিন্তু আজও কোনো বড় সংকটে কিংবা টানাপোড়েনে বাবার সেই চেনা অভয়বাণী আর আশ্বস্ত করা চাহনিই আমার মনের সবচেয়ে বড় শক্তি হয়ে কাজ করে।

বাবা মানে কেবল একজন অভিভাবক নন; বাবা মানে এক পরম ভরসার নাম, এক নিঃস্বার্থ ত্যাগের মহাকাব্য। পৃথিবীর সমস্ত কাঠিন্য থেকে সন্তানকে আগলে রাখার এক দুর্ভেদ্য দুর্গ হলেন বাবা। বাবার এই নীরব, নিঃশর্ত এবং অতন্দ্র ভালোবাসার প্রতি জানাই আমার জীবনের গভীরতম কৃতজ্ঞতা ও বিনম্র শ্রদ্ধা। পৃথিবীর সব বাবা ভালো থাকুক, সুস্থ থাকুক।

মুহাম্মদ আমিনুল ইসলাম, সহকারী অধ্যাপক বাংলাবিঘা আহমদিয়া ফাজিল ডিগ্রী মাদ্রাসাকাঞ্চনপুর, রামগঞ্জ, লক্ষ্মীপুর

 

বাবাকাহন

  সুচেতা ঘোষ

 'আমার একটা যদি কোনো গুণ থাকে যা দিয়ে বাবাকে খুশি করতে পারি, জীবনটাই ফালতু। এমন জীবন থাকার চেয়ে না থাকা ভালো।' সামনের মানুষটার এমন মন্তব্য যেন পঁচিশ বছর পিছিয়ে নিয়ে গেল বিখ্যাত মনোরোগবিশেষজ্ঞ ডঃ অনীশ ত্রিদেবীকে। একসময় সেও এরকম ভাবতো, তার ছেলেবেলায়। হেন মানুষ নেই,যার সাথে ওর বাবা ওকে তুলনা করেনি। ওর কোনো কিছুই বাবার পছন্দ হতোনা। এমনকী কতবার সে নিজেকে শেষ করে দেওয়ার কথাও ভেবেছে। কিন্তু আজ নিজে বাবা হয়েই হোক, বা তার এই পেশায় আসার জন্যই হোক, বাবাদের সাইকোলজিটাও সে বোঝে। একটা বাবার শুধুমাত্র তাঁর নিজের সন্তান নয়,তাঁর পরিবার, তাঁর বাড়ি, তাঁর পেশা এগুলোকেও তিনি সন্তানরূপে সামলাতে থাকেন। একটা পরিবারের সকলের মুখে হাসি ফোটানোর দায়িত্বটা আপনা থেকেই নিজের কাঁধে তুলে নেন বাবা। তিনি জানেন সেটা কতটা কঠিন,এর জন্য নিজের সব শখ জলাঞ্জলি দিয়েও কখনো কখনো তিনি ব্যর্থ হন। একদিকে বয়স্ক বাবা-মা,তাদের সুস্থতা ,অন্যদিকে সন্তান ও তাদের ভবিষ্যৎ তৈরী করা।এটা কত বড়ো মানসিক চাপ একটা বাবার কাছে। তাঁর সাইকোলজি বলে,' আমার সন্তানকেও এই একই চাপের মধ্যে দিয়ে যেতে হবে। ও পারবে তো! যতদিন আমি আছি, আমি সব সামলে নেবো। কিন্তু আমার অবর্তমানে ছেলেটা/মেয়েটা পারবে তো এতকিছু সামলাতে! ওকে নিজের পায়ের তলার জমিটা আগে শক্ত করতে হবে। ওকে শুধু নিজের নয়,গোটা পরিবারের দায়িত্ব নেওয়ার মতো মজবুত করে তৈরী করতে হবে। আর ওকে এইরকম করে গড়ে তোলার দায়িত্বটাও আমারই। 'কমবেশি সব বাবাই এই দৃষ্টিকোণ দিয়ে দেখেন, আর এই চিন্তার বশবর্তী হয়েই বাবারা ক্রমাগত তাদের ছেলে/মেয়েকে চাপ দিতে থাকেন নিজেকে তৈরী করার জন্য। এমন নয় যে বাবা কখনও তার ছেলেমেয়ের ভালো কিছু চোখে দেখেও দেখেননা। বরং তাতে নিজের মনের মধ্যে গর্বে বুক ফুলে ওঠে তাঁর, আর তারপর আরও বড়ো ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখতে থাকেন। অথচ তিনি এটাও জানেননা যে তাঁর সন্তান ভবিষ্যতে তাঁকে দেখবে কিনা। তা সত্ত্বেও একজন বাবা তার সন্তানের জন্য যেটা ভাবেন, অন্য কেউ সেটা ভাবেনা। তার সাথে ভালোবাসা দিয়ে ভরিয়ে রাখা তো আছেই। প্রত্যেক বাবা তাঁর জীবনে পাওয়া সেরা জিনিসগুলো তুলে রাখেন তাঁর সন্তানদের জন্য। সে মাছ-মাংসের বড়ো পিসটাই হোক বা কর্মসূত্রে পাওয়া কোনো উপহারই হোক, বাবা সবসময় সেটা তুলে দেন সন্তানের হাতে।বাবার ভালোবাসা অতি সাধারণ বিষয়েও প্রকাশ হয়ে পড়ে। যে সন্তান সেটা বোঝেনি, তার মতো হতভাগ্য বোধহয় জগতে নেই। 

 ডঃ অনীশ তাঁর রুগীকে বললেন, "তোমাকে একটা কাজ দিলাম। একদিন বাবাকে জড়িয়ে ধরে বলবে 'তোমাকে আমি খুব ভালোবাসি বাবা। আমাকে বলো তোমার কষ্টের কথা। আমি তোমার পাশে সারাজীবন থাকবো। ' এটা করতে পারলে তোমার সমস্যা অর্ধেক সমাধান হয়ে যাবে। " রুগীটি চলে যাওয়ার পর ডঃ অনীশ ভাবলেন, আজ একটা বাবা-ছেলের সম্পর্ক উনি বাঁচাতে পারলেন। 

বাবা

লেখক : মোঃ আল-আমিন খান 

লেখক ঠিকানা : থানা+জেলা : মাদারীপুর 

যোগাযোগ : 0132638782

 

বাবা আমি তোমায় ভালবাসি, বড্ড ভালবাসি। জীবনে মুখ ফুটে বলতে পারি নাই। বলার মত সময়ও দিলে না। তুমি চলে গেছে মহান আল্লাহর নিকটে। এই স্বার্থপর দুনিয়ায় আমার সাফল্যের জন্য তুমি করোছ নিঃস্বার্থ সাহায্য। তোমার ভালবাসায় আমি স্নিগ্ধ। বাবা তোমার নীতি আদর্শ আমি সারাজীবন বয়ে বেড়াতে চাই এই মোর প্রার্থনা।

বাবা নামটি ছোট্ট একটা শব্দ যার গভীরতা অসীম। বাবা দুটি অক্ষরের শব্দ হলেও পরিধি সীমাহীন। বাবা নামের বটবৃক্ষ যাহার নাই সেই বুঝে পৃথিবী কত কঠিন। যে বটমূল আশ্রয়, ভরসা ও অনুপ্রেরণার উৎস। সুরক্ষা ও ভালোবাসার ছায়ায় আগলে রাখে বাবা নামের বটবৃক্ষ। বাবারা কঠোর পরিশ্রম করেন শুধু পরিবারকে সুখে-শান্তিতে রাখতে। একজন বাবা নিজের জন্য কখনও বাচে না। সে বেচে থাকে তার পরিবারের জন্য। নিজের কষ্ট, দুঃখ চাওয়া-পাওয়াকে ত্যাগ করে হয়ে উঠেন ভ্যান্ডিং মেসিনের ন্যায়। পরিবার যখন যা চায় তখন তাই দেয়। বাবা নামের ভাল-বাসা কখনও প্রকাশ করা যায় না। বাবা প্রতিটি সন্তানের আবেগ। যা মুখ ফুটে কোন সন্তান বলতে পারে না। বাবা আমি তোমায় ভালবাসি। বাবারা তার ভালবাসা মায়েদের মতো প্রকাশ করতে পারে না পারলেও প্রতিটি বাবার চিন্তা চেতনা ও পরিশ্রমের পিছনে থাকে সন্তানের সাফল্য। সন্তানের বিন্দুমাত্র সাফল্যেতে প্রতিটি বাবা গর্বিত ও আনন্দিত হন। এবং সন্তানের ব্যর্থতায় সাহস যোগান ও বিপদে ঢাল হয়ে দাড়ান। সন্তানের নৈতিকতা প্রাথমিকভাবে গড়ে উঠে প্রতিটি বাবার থেকে। শিক্ষাদিক্ষা জীবনের সঠিক পথ দেখানোর ক্ষেত্রে সব থেকে বাবার ভূমিকায় বেশি। বাবা হলেন সন্তানের জন্য প্রথম শিক্ষক ও আদর্শ। বাবার উপদেশ সন্তানের কাছে তিক্ত লাগলেও জীবনের কঠিন সময়ে বাবার উপদেশই প্রধান অম্বলন হয়ে দাঁড়ায় এবং বাবার অভিজ্ঞতাই সন্তানকে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে। বাবা হলেন শক্তি, সাহস ও নির্ভরতার প্রতীক। বাবা হারা সন্তানই জানে জীবনটা কতটা বেদনা। প্রতিটি বাবা সন্তানের জন্য পৃথিবীতে আশীর্বাদ। বাবা আছে তো নিশ্চিত, নিঃভয়ে রাত্রি যাপন করা যায়।রাত্রের আধারে বাবার জন্য বাবা হারা সন্তানের চোখে মেঘ জমে। সন্তানের নিকটে বাবা এক আকাশ সমান বিশালতা। যাহার নিকট শত ক্লান্তি, সহস্র আবদার, সুখের প্রতিটি মুহূর্তে বাবা নামের ছায়ায় কাটে। বাবা শিকায় রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে হলেও পরিবারের মুখে হাসি ফোটানো। বাবার হাত ধরেই সন্তানের পথ চলা শিখে, স্বপ্ন দেখে। বাবার সাহসী কন্ঠস্বর জাগায় ভেঙ্গে পরা সন্তানের মনোবল। বাবার ভালবাসা ও ত্যাগের কাছে হার মেনে নেয় পৃথিবী। বাবা তো নক্ষত্রের ন্যায় আলো দিয়ে বেড়ায় সন্তানের জীবনে। নক্ষত্র ঝরে গেলে নিভে যায় আলো। তেমনি বাবা ছাড়া সন্তানের জীবন আলোহীন, অন্ধকার।

দুবছর পূর্বে হারিয়ে ফেলেছি আমার জীবনের অমূল্য সম্পদ, আমার বাবাকে। তার ত্যাগ, ভালোবাসা ও অবদান কখনোই শোধ করার ক্ষমতা নাই। দোয়া করি পরকালে তুমি জান্নাত লাভ কর এবং আমায় ক্ষমা কর আমার অজান্তে সকল ভূলের জন্য।। 

পিতা পরম গুরু

রম বর্মণ রায়

 

ছোট থেকেই বাবাকে বেশি হাসতে দেখিনি। অথচ হাসলে মানুষটাকে বেশ লাগে। বেশিরভাগ সময় মানুষটা চুপচাপ সময় কাটায় নিজের মত ছাদবাগানে। কিন্তু আমাদের প্রতিটি ছোটখাটো অসুবিধা ইচ্ছা -অনিচ্ছায় তাঁর কড়া নজর।  ছোটবেলায় সেভাবে বুঝিনি কিন্তু বড় হয়ে বুঝেছি , অনেকগুলো ভাইবোনের মধ্যে বড় হওয়া বাবার সেই অর্থে মনের কথা ধৈর্য্য ধরে বসে শোনার  মত কোন লোক ছিলনা। নিজের মত বৃষ্টিতে ভিজে ,মাঠে একা একা বল নিয়ে ছুটতে ছুটতে হয়ত ওই একা থাকার অভ্যাস হয়ে গিয়েছিল বাবার। হয়ত মনের মধ্যে অনেক কথা থাকত সবাইকে বলার জন্য কিন্তু সেভাবে নিজেকে কারুর কাছে মেলে ধরার মত ভাষা খুঁজে পেতো না। খুব অল্পবয়সে বাবা মায়ের ইচ্ছায় সামাজিকভাবেদেখেশুনে বাবার

বিয়ে হয়েছিল। অল্প বয়সে বাবাও হয়ে গিয়েছিলেন। মায়ের মুখে শুনেছি সেই প্রথমদিন আমাকে বুকে নিয়ে বাবা আনন্দে একই সঙ্গে হেসে ও কেঁদে  ফেলেছিলেন। খুব ছোট থেকেই আমার গাড়ির প্রতি অদম্য টান। বাবা অফিস থেকে ক্লান্ত ঘেমেনেয়ে ফিরতেন। তারপর হাতমুখ ধুয়ে মায়ের দেওয়া এক কাপ চা পান করে ,স্কুটির সামনে আমাকে বসিয়ে চলে যেতেন হাইরোড। নিজেও রাস্তার ধারে একটা সিমেন্টের বেঞ্চে চুপ করে বসে থাকতেন,আমাকেও পাশে বসিয়ে দেখতেন কি করছি। আমি মন দিয়ে হাঁ করে একের পর এক ছুটে যাওয়া গাড়ি দেখতাম। বাবা আমাকে দেখতেন একভাবে ,আর তাঁর চোখ মাঝেমাঝে চিকচিক করে উঠত। হয়ত নিজের ছোটবেলায় উনিও ওনার বাবার সঙ্গ এভাবে পেতে চেয়েছিলেন কিন্তু ঠাকুর্দার প্রচন্ড সাংসারিক চাপ  ছিল অনেকগুলো ছেলেমেয়ে হওয়ার কারণে , সেই পিতৃসঙ্গের অপ্রাপ্তিটুকু বেশি করে আমাকে সঙ্গ দিয়ে পূরণ করতে চাইতেন বাবা। আমার মনে পড়েনা সেইসময় আমাদের মধ্যে কোন কথা হত কিনা, কিন্তু বাবার ওই স্নেহ কোমল ভারী হাতের স্পর্শ এক কাঁপন ধরাত ছোট্ট শরীরে। আমি আনন্দে মাঝেমাঝেই হাততালি দিয়ে উঠতাম। বাবা ভাবতেন, হয়ত এত গাড়ি দেখে খুশিতে। কিন্তু আমার ওই বিকেলগুলো বড্ড ভালো লাগত।

বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাবার সঙ্গে দেখা হওয়ার সময় কমতে লাগলো ,কারণ আমার স্কুল শেষে প্রাইভেট টিউশন আর বাবার ঘনঘন অফিসের কাজে রাজ্যের বাইরে যাওয়া। কিন্তু রাতে যখনই বাবা বাড়িতে থাকতেন , কোনদিন হাজার খিদে পেলেও আমার পড়ে ফিরতে দেরী হলেও নৈশভোজ করতেন না। রাতে খাবার টেবিলে বসে সবসময় মাছের ভালো টুকরোটা বা মাংসের পছন্দের টুকরোগুলো নিজে হাতে আমার পাত্রে তুলে দিতেন। মা বলতেন, সবসময় ওই কেন খাবে? তুমিও তো ওই টুকরোটা কত ভালোবাসো। "

বাবা মৃদু হেসে নিজের খাবার খেয়ে যেতেন। করোনা মহামারীর সময় আমার টনসিল ফুলে জ্বর আসছিল বারবার। বাবা পাগলের মত এই ডাক্তার ওই ডাক্তার ছুটছেন আর যখনই সময় পাচ্ছেন আমার মাথার কাছে চুপচাপ বসে আছেন। বড় হয়ে সেই প্রথমবার দৃঢ় ভাবে অনুভব করলাম ,বাবার স্নেহ ভালোবাসা অন্তঃসলিলা নদীর মত যা ক্রমাগত মাটির গভীরে বয়ে চলে।

প্রিয় বাবা,

রাত নিঝুম আকাশটা বড্ড ক্লান্ত,তারাগুলো আহ্লাদে মিটিমিটি হাসছে,খোলা জানালা দিয়ে ধেঁয়ে আসছে হাসনাহেনা ফুলের সৌরভ। খাতা কলম হাতে নিয়ে ভাবছি তোমায় কিছু লিখব।পত্রের শুরুতে আমার ভালোবাসা নিও,আমি আল্লাহর অশেষ রহমতে ভালো আছি। তুমিও হয়তো সবাইকে নিয়ে ভালো আছো,আমি জানি হাজার কষ্টের ভিড়ে তোমার মুখে সর্বদা হাসি থাকে।হাজার বিষাদের ভিড়ে কিভাবে জীবনটাকে রঙিন করে সাজাতে হয় তোমার থেকেই শেখা।বাবা,মাঝে মাঝে খুব কষ্ট হয়,কষ্টগুলো বৃষ্টি হয়ে ঝরে টপটপ করে মুছে দেয় নয়নের অঞ্জন।
কিসের ব্যথা বাসা বেঁধে আছে হৃদয় কোণে? নিত্যদিন তারা হৃদয়ের বেলকুনিতে আন্দোলন করে প্রশ্ন করে আমায়,কে দাঁড়াবে তোমার বাবার পাশে ?তোমার বাবার তো ছেলে নেই?তোমাকেই তো ছেলে হিসাবে দেখতে চায় তোমার বাবা।তারা আরো প্রশ্ন করে,কিসের জন্য লেখাপড়া করেছো?যদি বাবার পাশে প্রতিষ্ঠিত হয়ে দাঁড়াতে না পারো? আমি একটা দীর্ঘশ্বাসে এসব প্রশ্নের উত্তর চাপা দিয়ে রাখি।
তখন আমার খুব মনে পড়ে সে দিনের কথা, আমি এসএসসি পরীক্ষায় যখন এপ্লাস পেয়েছিলাম,তখন তুমি কতই না খুশি হয়েছিলে। আজ যদি আমি প্রতিষ্ঠিত হয়ে তোমার পাশে দাঁড়াতে পারতাম তাহলে তোমার হৃদয়ে নামতো সুখের জোয়ার। সবাইকে বুক ফুলিয়ে বলতে পারতে ছেলে নেই তো কি হয়েছে। কিন্তু আমি পারিনি তোমার হৃদয়ের সুখের জোয়ারে নামাতে,বরং তুমি আমাকে নামিয়ে দিয়েছো অন্যের ঘরে আলো জ্বালাতে। এক হাতে আলো,অন্য হাতে স্বপ্নেরা পুড়ে হয় ছাই। বিয়ের পরে মেয়েদের নাকি বেশি পড়তে হয় না,চাকরি করলে নাকি সংসার হয় না। নিত্যদিন পাড়া-প্রতিবেশী আত্মীয়দের এই একই কথন।আমি তো স্বপ্ন দেখেছিলাম,তোমার আকাশ ভরিয়ে দেব তারায়।সাঁঝের পাখি হয়ে ফিরব তোমার সুখের আকাশে,আমি উড়তে শেখার আগেই আমার ডানা ভেঙ্গে দিলে।এখন আমি ডানা ঝাপটাই আর উঁকি দিয়ে দেখি স্বপ্নেরা আমায় ছেড়ে চলে যাচ্ছে বহুদূর।বাবা,তুমি ভালো থেকো,শরীরের যত্ন নিও।তোমার মেয়ে পরের ঘরে থাকলে ও তোমার পাশে সব সময় আছে থাকবে,তোমাকে খুব ভালোবাসি কিন্তু মুখ ফুটে বলতে পারি না। তুমি চিন্তা করো না আমি খুব ভালো আছি।শুধু এই একটা ব্যথাই আমাকে সব সময় জ্বালাতন করে।মুয়াজ্জিনের মধুর আযান ভেসে আসছে,পাখিদের কলরব শুনতে পাচ্ছি, ভোর হয়ে গেছে নামাজ পড়ব, আমি প্রতি নামাজে আল্লাহকে বলি,হে আল্লাহ আপনি আমার বাবাকে সব সময় সুস্থ রাখুন ভালো রাখুন।

ইতি
তোমার বড় মেয়ে
শারমিন নাহার ঝর্ণা।
১৩/৫উত্তর-পশ্চিম যাত্রাবাড়ী
যাত্রাবাড়ী,গেন্ডারিয়া
ঢাকা ১২০৪। 

 

স্মৃতিতে বাবা

বাবা তুমি ছিলে একটি বটবৃক্ষ। তোমার বিশুদ্ধ অক্সিজেন ও হৃদয় নিংড়ানো অকৃত্রিম ভালোবাসার সুশীতল পরশে আমরা আনন্দঘন পরিবেশে দিনগুলি ভালোভাবেই কাটাতাম। কোথা থেকে এক অজানা ধূলিঝড় সব নিমিষেই লণ্ডভণ্ড করে দিল আমাদের বেঁচে থাকার জীবনপ্রদীপ। আমাদের জীবনে নেমে এলো অমানিশার নিস্তব্ধ ঘন কালো আঁধার।যেদিন রংপুরের গুড হেলথ ক্লিনিকের ডাক্তার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে রেজাল্ট দিলেন—তোমার শরীরের গভীর কোণে (লিভার সিরোসিস) ক্যান্সার বাসা বেঁধেছে, আর মাত্র ১৫ দিন তুমি এই মায়াবী পৃথিবীতে বেঁচে আছো।

তোমার বুঝতে বাকি ছিল না। কারণ তুমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রাইভেটে ইংরেজি সাহিত্যে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেছিলে। রংপুর থেকে ফেরার সময় ডাক্তারদের প্রেসক্রিপশন পড়ে ফেলেছিলে। তাই বারবার বলছিলে—“মা, আমার অপারেশন করার কথা ছিল, কিন্তু ক্লিনিকের ডাক্তার আমাকে ফিরিয়ে দিল।” সব জেনে তুমি না জানার ভান করেছিলে।পরিবার-পরিজন, আত্মীয়স্বজন সবার চোখেমুখে ছিল বুকফাটা চাপা কান্না। আমরা তোমার সামনে ভালো থাকার অভিনয় করছিলাম। কিছুতেই ডাক্তারদের রিপোর্ট মেনে নিতে পারছিলাম না। গোটা বাড়িতে রান্নাবান্না, খাওয়া-দাওয়া সব বন্ধ হয়ে শোকের মাতম শুরু হলো। আমি চাকরি, সন্তান ছেড়ে পাগলের মতো ছুটে এলাম তোমার কাছে।

তোমার হাড্ডিসার নিথর দেহ বিছানায় জড়োসড়ো হয়ে পড়ে ছিল। পৃথিবীর সবকিছু থেকে তুমি আলাদা হয়ে গিয়েছিলে। ডাক্তার কুতুবউদ্দিন সাহেবকে ফোন করে পরামর্শ করলাম। তিনি হাসপাতালে নিতে বললেন, কারণ অক্সিজেন দিলে কষ্ট কিছুটা কমবে।প্রবল বর্ষণ, জয়পুরহাট শহর একহাঁটু পানিতে ডুবে গেছে—“মরণের উপর খাঁড়ার ঘা” যেন। অনেক কষ্টে বাবাকে হাসপাতালে নেওয়া হলো। জরুরি বিভাগের ডাক্তার বললেন, “আল্লাহ ভরসা।” রোজার প্রথম দিন ছিল। ছোট বোন টপি বাবার কাছে রয়ে গেল। আমি ও মা বাসায় এসে প্রয়োজনীয় জিনিস নিতে গেলাম। শহরের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে হাসপাতাল। বৃষ্টির কারণে অনেক দেরি হয়ে গেল। প্রায় মধ্যরাত। আমি ও মা বাবার কাছে যেতে সাহস পাচ্ছিলাম না।

টপি সারা রাত বাবাকে আগলে রেখেছিল।

সারারাত নিদ্রাহীন কেটে গেল।

আজানের করুণ সুর বাতাসে ভেসে এলো।

আমরা নামাজ আদায় করে হাসপাতালের উদ্দেশে রওনা হলাম। গিয়ে দেখি টপি সারা রাত বাবাকে আগলে রেখেছে।

বাবার দিকে তাকাতেই হুহু করে কেঁদে উঠলাম।

নিরব, নিথর দেহে শুধু জীবনের শেষ স্পন্দন।

মা কেঁদে বলল—“দেখ, তোর বাবার নাক-কান বাঁকা হয়ে আসছে।”

সারা শরীর থেকে ঘাম ঝরছিল।

বাবা জিহ্বা বের করে পানি চাইল।

আমি দৌড়ে গিয়ে পানি এনে বাবার মুখে দিতেই বাবা চলে গেলেন না ফেরার দেশে।

তারপর পারিবারিক কবরস্থানে দাদা-দাদির কবরের পাশে তাকে শায়িত করা হলো।

দিন, মাস, বছর—প্রায় দেড় যুগ পেরিয়ে গেছে।

এত নির্দয়ভাবে কেন নিজেকে আড়াল করে রেখেছো বাবা?

একবার চোখ তুলে দেখো, আমরা তোমাকে কতটা মিস করি।

তোমার মতো অনর্গল ইংরেজি কেউ বলতে পারতো না। এই তল্লাটের মানুষ তোমার কাছে ইংরেজি চিঠি অনুবাদের জন্য আসতো।

বাবা, তোমার সাত সন্তান কেমন আছে জানতে ইচ্ছে করে না?

তোমার আদরের সুফিয়া বেগম—তাকে কি মনে পড়ে না?

তোমার মৃত্যুর পর মা তোমাকে জড়িয়ে ধরে পাগলের মতো কেঁদেছিল।

“আমি বেশি দিন বাঁচব না, তোমার কাছেই চলে আসব”—মা বলেছিল।

তারপর মা-ও একদিন আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন—২০০৯ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি, ব্রেইন স্ট্রোকে।

বাবা, আমি এখন গাইবান্ধা জেলার সুন্দরগঞ্জ উপজেলা সদরের ডিগ্রি মহিলা কলেজের ভাইস প্রিন্সিপাল, সমাজসেবী ও লেখক।

তুমি কি এখনো আমার উপর অভিমান করে আছো?

আমি কি তোমার স্বপ্ন পূরণ করতে পেরেছি?

তোমার আদরের দুলালি শেফালী আপা, বড় ছেলে আলম ভাই—সবাই কেমন আছে জানতে ইচ্ছে করে না?

তোমাদের স্মৃতি আজও আমাকে কাঁদায়।

বাবা, তোমার শেষ কথা আজও মনে পড়ে—

“তোর মা-কে কখনো কষ্ট দিস না, তাকে আগলে রাখবি।”

আমি কি সেই কথা রাখতে পেরেছি?

বাবা, পৃথিবীর সব বৃক্ষ যদি কলম হয়, আর সমুদ্রের নোনা জল যদি কালি হয়—তবুও তোমার কথা লিখে শেষ হবে না।

 

কবিতা, 

বাবা

বাবা তোমায় খুঁজে মরি

হাজার তারার ভীড়ে

হেথায় খুঁজি, হোথায় খুঁজি

সাত সমুদ্রের তীরে।

তোমার স্মৃতি মনে হলে

চোখের জলে ভাসি

স্নেহের পরশ পেতে বাবা

বারে বারে আসি।

 

নাসরীন সুলতানা রেখা

(লেখক নাম: নাসরীন রেখা)

সাবেক উপাধ্যক্ষ

কুপতলা

গাইবান্ধা সদর

 

 

বাবা গো, ভালোবাসি তোমায়..!

বাবাকে নিয়ে এটাই আমার প্রথম লেখা। কোনোদিন মুখ ফুটে বাবাকে বলতে পারিনি-“বাবা গো, ভালোবাসি তোমায়।” কিন্তু বাবার প্রতি আমার ভালোবাসা কত গভীর, তা হয়তো এই কয়েকটি শব্দে কিংবা একটি লেখায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। আমার বাবা একজন আদর্শবান মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। তাঁকে আদর্শবান বলার কারণও আছে। তাঁর অসংখ্য ছাত্র আজ দেশ-বিদেশে সুনামের সঙ্গে বিভিন্ন পেশায় প্রতিষ্ঠিত। হঠাৎ কোনো ছাত্রের সঙ্গে দেখা হলে তারা শ্রদ্ধাভরে বাবার কথা বলেন, তাঁর শিক্ষা ও আদর্শের প্রশংসা করেন। তখন গর্বে আমার হৃদয় ভরে যায়।

অনেকেই বলেন, “আমার বাবাই পৃথিবীর সেরা বাবা।” আমি সব সময় এই কথার সঙ্গে একমত হতে পারিনি। কারণ, শুধু সন্তান জন্ম দিলেই একজন মানুষ সেরা বাবা হয়ে ওঠেন না; সন্তানকে সঠিক শিক্ষা, মূল্যবোধ ও আদর্শে গড়ে তোলার মধ্যেই একজন বাবার প্রকৃত সার্থকতা নিহিত থাকে। আর সেই জায়গা থেকে আমি নিঃসন্দেহে বলতে পারি-আমার বাবাই পৃথিবীর সেরা বাবা। বাবা আমাকে শিখিয়েছেন বড়দের সম্মান করতে, ছোটদের স্নেহ করতে। শিখিয়েছেন মানুষের দুঃসময়ে পাশে দাঁড়াতে, অসহায় মানুষের কষ্ট অনুভব করতে। লেখাপড়ার পাশাপাশি নিজের কাজ নিজে করার অভ্যাসও তাঁর কাছ থেকেই শেখা। আজও বাবা বলেন, “উচ্চতর ডিগ্রির চেয়ে সুশিক্ষায় শিক্ষিত হওয়া অনেক বেশি জরুরি।”

বাবার সামান্য শিক্ষকতার সম্মানী দিয়েই চলেছে আমাদের ছয় ভাই-বোনের সংসার। আমরা ছিলাম একটি সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবার। সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও বাবা কখনো আমাদের শিক্ষার সঙ্গে আপস করেননি। অক্লান্ত পরিশ্রম, ত্যাগ আর সংগ্রামের মাধ্যমে তিনি আমাদের সুশিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়ে তুলেছেন। বাবাকে অনেকেই বটবৃক্ষের সঙ্গে তুলনা করেন। সত্যিই, আমার বাবা সেই বটবৃক্ষের মতোই। জীবনের প্রতিটি ঝড়-ঝাপটা থেকে তিনি আমাদের আগলে রেখেছেন, আর আজও তাঁর স্নেহ, মমতা ও আশ্রয়ের ছায়ায় আমরা নিরাপদ।

বাবা, হয়তো কোনোদিন সরাসরি বলতে পারিনি, কিন্তু আজ বলতে চাই-বাবা গো, ভালোবাসি তোমায়। তোমার ত্যাগ, তোমার আদর্শ, তোমার ভালোবাসার ঋণ কোনোদিন শোধ করার নয়। আল্লাহ তোমাকে সুস্থ রাখুন, দীর্ঘায়ু দান করুন। তোমার ছায়া যেন আমাদের মাথার ওপর চিরকাল অটুট থাকে।

মাহবুবুর রশিদ 

সাধারণ সম্পাদক 

কানাইঘাট প্রেসক্লাব, সিলেট

 

বট বৃক্ষের ছায়া

              

আমার বাবা ছিলেন শুকদেব বিশ্বাস। তাঁর ডান পায়ে সমস্যা ছিল। খুরিয়ে খুরিয়ে হাঁটতেন। বাবা বিএ পাস ছিলেন। আমরা ছিলাম শীল সম্প্রদায়ের। নব্বই দশকের কথা। আমি যখন অষ্টম শ্রেণীতে পড়ি বাবা তখন আমাদের স্কুলে পড়াতেন। আবার আমাদের গ্রামের হাটে নরসুন্দরের কাজ করতেন। প্রায়ই আমার বন্ধুরা জিজ্ঞাসা করতো বাবা কেন নরসুন্দরের কাজ করে। পরে আমি জেনেছিলাম বাবা ওই স্কুলের খন্ডকালীন শিক্ষক ছিলেন। স্কুল থেকে নামমাত্র  টাকা পেতেন। ওই টাকায় আমাদের সংসার চলতো না। তাই বাবা নরসুন্দরের কাজ করতেন। বাবা আমাদের কষ্টের সংসার চালাতে রাতে আবার দুই- একটা টিউশনিও করতেন। সংসারের খরচ আমার পড়ার খরচ ওদিকে আবার আমার দিদির সংসারের খরচ চালাতে বাবা যেন হিমশিম খেয়ে যেতেন। বাবার স্বপ্ন ছিল বড় হয়ে আমি ডাক্তার হবো। 

দিদির শ্বশুর বাড়ির লোকেরা ছিল কষাই। কয়েকদিন পরপরই জামাইবাবুর হাতের মার খেয়ে  দিদি কেঁদে কেঁদে বাড়ি আসতো। সাথে বাবাও কাঁদো কাঁদো হয়ে যেতেন। মায়ের হাতের বালা পর্যন্ত বিক্রি করে দিদির শ্বশুর বাড়ি টাকা পাঠাতে হতো। আমাদের যে অল্প জমি ছিল বাবা তা নিজেই কষ্ট করে আবাদ করতেন। ফসল ঘরে ওঠার পর ধানের তুষগুলো থাকতো আমাদের আর চাল থাকতো দিদির বাড়ি। একদিন দিদি বাড়ি আসলো টাকা নিতে। বাবা কোন উপায় না দেখে তার প্রিয় সাইকেলটাই বিক্রি করে দিলেন। আমি তখন কলেজে পড়ি। বাবার এত কষ্ট দেখে আমি একদিন দূরের হাটে নর- সুন্দরের কাজ করতে গিয়েছিলাম। বাবা কার কাছে শুনে যেন আমাকে কড়া শাসন করলেন। তারপর কেঁদে দিয়ে বললেন, "আমার স্বপ্ন ভেঙ্গে দিসনে অবিনাশ। তুই ডাক্তার হবি এই আশাতেই এত কষ্টের মাঝেও বেঁচে আছি বাপ।" আমি সেদিন বাবার হাত ধরে প্রতিজ্ঞা করলাম ডাক্তার আমি হবোই। আমি মেডিকেলে চান্স পেলাম। বাবার পরিশ্রম দ্বিগুণ হলো। তবু বাবার আনন্দ দেখে কে? যেদিন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের চাকরি পেলাম খুশি হয়ে বাবার গেছে চিঠি লিখলাম । আমার মনের অব্যক্ত কথাগুলো যেগুলো আমি বাবাকে মুখে বলতে পারিনি তাই লিখলাম। বাবা আমার চাকরি হয়েছে। তোমার আর পরিশ্রম করতে হবে না। আমাদের দুঃখ এবার ঘুচে যাবে। মায়ের চিকিৎসা দিদির বাড়ির খরচ সব হবে। গর্ব করে লিখলাম বাবা তুমি আমার প্রথম  জীবনে আঙ্গুল ধরে হাঁটতে শিখিয়েছিলে। তুমিই আলোর পথ দেখিয়েছিলে। তুমি আমার জীবনের সেরা মানুষ। তুমি আমার জীবনের সুপারহিরো। আমার মনে আছে বাবা তুমি কেমনে নিরবে কোমল স্নেহ বিলাতে আবার প্রকাশ্যে কড়া শাসন করতে। মানুষের সাথে মানুষের ব্যবহার কেমন হবে তুমিই আমাকে শিখিয়েছিলে বাবা। কিভাবে এত কষ্টের মাঝেও তুমি আমাকে সফলতার পথ দেখাতে। তুমি ছিলে সুখে-দুঃখে কষ্ট যন্ত্রণায় এক বটবৃক্ষের ছায়া। যেদিন বাড়ি থেকে দুঃসংবাদের চিঠি আসলো আমি বাড়ি গেলাম। দিদি বলল," বাবা মারা গেলেন দুপুরে আর তোর চিঠি এসেছিল বিকেলে। চিঠিটি পড়ে বাবাকে শোনাতে পারিনি ভাই। আমায় ক্ষমা করে দিস।"

সমাপ্ত

 

ঠিকানা -

নাম: কিশোর পণ্ডিত 

 গ্রাম:বেকার কোনা,

উপজেলা: মধুপুর

জেলা: টাঙ্গাইল

 

না বলা ভালোবাসার নাম

বাবা একটি ছোট শব্দ, অথচ এর গভীরতা আকাশের মতো বিস্তৃত। ছোটবেলায় বাবার শাসনকে অনেক সময় কঠোরতা মনে হতো। পড়াশোনার জন্য বকাঝকা, ভুল করলে শাসন, সময়মতো সবকিছু করার তাগিদ, এসবের মধ্যে তখন ভালোবাসা খুঁজে পাইনি। কিন্তু বড় হতে হতে বুঝেছি, বাবার প্রতিটি শাসনের আড়ালে লুকিয়ে ছিল আমার ভবিষ্যতের জন্য তাঁর নিরন্তর চিন্তা আর সীমাহীন মমতা। তিনি হয়তো কখনো মুখে ভালোবাসা প্রকাশ করেন না, কিন্তু তাঁর প্রতিটি কাজেই আমি সেই ভালোবাসা অনুভব করি। তাঁর হাত ধরে চলতে শিখেছি, তাঁর আদর্শ থেকে জীবনকে দেখতে শিখেছি।

জীবনের প্রতিটি ধাপে এমন একজন মানুষ আছেন, যাঁর অবদান কখনো পুরোপুরি ভাষায় প্রকাশ করা যায় না, তিনি আমার বাবা। বাবাকে অনেক কথাই বলা হয়নি। বলা হয়নি তাঁর প্রতি আমার কৃতজ্ঞতার কথা। বলা হয়নি, তাঁর ত্যাগ আর পরিশ্রম আমাকে কতটা অনুপ্রাণিত করে। বলা হয়নি, তাঁর আদর্শ অনুসরণ করেই আমি জীবনের পথে চলতে শিখেছি। হয়তো আমরা অনেকেই মাকে সহজে ভালোবাসার কথা বলতে পারি, কিন্তু বাবার প্রতি মনের গভীরে জমে থাকা অনুভূতিগুলো প্রকাশ করতে পারি না। আমিও পারিনি।

বাবা, তোমার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার মতো যথেষ্ট শব্দ আমার জানা নেই। আজ শুধু বলতে চাই ধন্যবাদ। আমার প্রতিটি পদক্ষেপে ছায়ার মতো পাশে থাকার জন্য ধন্যবাদ। আমাকে সৎ, দায়িত্বশীল এবং ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য ধন্যবাদ। তুমি শুধু আমার বাবা নও, তুমি আমার জীবনের প্রথম শিক্ষক, প্রথম নায়ক এবং সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়। বাবা, তোমার ঋণ কখনো শোধ করার নয়। শুধু চাই, তোমার মুখের হাসিটুকু যেন সবসময় অটুট থাকে। পৃথিবীর সব সম্পর্কের ভিড়ে বাবার ভালোবাসা হয়তো সবচেয়ে নীরব, কিন্তু সেটিই সবচেয়ে গভীর, সবচেয়ে নিঃস্বার্থ এবং সবচেয়ে সত্য।

 

লেখা:

মোঃ শাফায়াত হোসেন, ভোলা। 

সভাপতি, বসুন্ধরা শুভসংঘ, ভোলা জেলা শাখা। 

শিক্ষার্থী, সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, ইউনিভার্সিটি অব ইনফরমেশন টেকনোলজি অ্যান্ড সায়েন্সেস (ইউআইটিএস) 

 

 

স্বপ্নপূরণের অভিযাত্রায় বাবা অবিচল সহযাত্রী

বাবার উৎসাহ,আগ্রহ ও সমর্থন তাঁর সন্তানকে আত্নবিশ্বাসী এবং দৃঢ়চেতা  হতে সাহায়্য করে।বাবা আমাদের জন্য সবটাই ত্যাগ করতে সবসময় প্রস্তুত থাকেন।তিনি আমাদেরকে স্বপ্নের বীজবপন করতে সহায়তা করেন।তিনি শাসন করেন আবার সবচেয়ে বেশি  ভালোবাসেনও তিনি।বাবা কিছু কিছু ক্ষেত্রে কড়া শাসনে রাখেন আমাদেরকে তবে তাঁর প্রতিটা শাসনের পিছনে থাকে একটি করে শিক্ষা।শাসন সেই বেশি করে যার ভালোবাসা থাকে সবচেয়ে নিগুঢ় এবং স্বার্থহীন।বাবা আমাদেরকে এমন করেই ভালোবাসেন। লক্ষ্য পূরণের সময় আমরা অনেকসময় দ্বিধাদ্বন্দে ভুগি,সিদ্ধান্ত নিতে ভুল করি,যা আমাদের জন্য ঠিক নয় সেইটা করে ফেলি।সেইসময় বাবা আমাদেরকে সঠিক পথের দিশা দেন ।আর বাবা শুধু ঠিক পথের নির্দেশনা দেন তা নয় সেই পথের জন্য প্রয়োজনীয় যা যা লাগে সবটাই বাবা আমাদেরকে দেন।সন্তানের জন্য করণীয় কাজ তিনি 

সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করেন।তাঁর দায়িত্ব পালনে তিনি কোনো কার্পণ্য করেন না। সন্তানের স্বপ্ন পূরণ করতে অর্থ,পরামর্শ,জ্ঞান প্রদান,পড়াশোনায় সহায়তা, মানসিক সমর্থন,পরিচর্যা সকল দায়িত্ব ও কর্তব্য বাবা তার সাধ্যমতো করার চেষ্টা করেন।বাবাই শিখিয়েছিলো আমাকে স্বপ্ন পূরণ করতে তোমাকে শুধু স্বপ্নদ্রষ্টা হলেই হবে না সেই স্বপ্নের বাস্তবায়নকারী হতে হবে।সেটি না করতে পারলে সেই স্বপ্নের কোনো স্বার্থকতা থাকে না।বাবার শিক্ষা ও সেগুলোর যথার্থতা যতো বড় হয়েছি বুঝতে শিখেছি একটু একটু করে।তাঁর দেখানো পথেই চলছি সর্বদা।এজন্য আমাদের স্বপ্ন বুননের প্রদর্শক।

 

লেখক: আফিয়া আলম 

বিভাগ: সমাজকল্যাণ 

শিক্ষার্থী ,ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়,কুষ্টিয়া এবং সদস্য বাংলাদেশ তরুণ কলাম লেখক ফোরাম, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা। 

 

 

বুকজুড়ে ল্যাপ্টে থাকা বাবা

মায়ের মৃত্যুর পর বাবা কোনো জায়গাতেই স্বস্তি পেতো না।
ঘরে,বাইরে,মাঠে,মসজিদে সর্বত্র বাবার মধ্যে কেমন অস্থিরতা বিরাজ করতো।
আমি লক্ষ্য করতাম,বাবা কখনো বিছানাতে শুয়ে দশ মিনিট চোখ বন্ধ করে থাকলে উঠে বসে থাকতেন পাঁচ মিনিট।কিংবা ফজর হবার আগেই ঘুম থেকে উঠে তাহাজ্জুদ পড়ে বাবা চুপি চুপি চলে যেতেন লোকালয় থেকে খানিকটা দূরে গোরস্থানে,যেখানে মায়ের কবর।
কখনো কখনো বাবাকে খুঁজতে গিয়ে গোরস্থানে মায়ের কবরের পাশেই আবিষ্কার করতাম।

বাবা সংসারধর্ম ছেড়ে দিছিলেন অনেক আগেই,শুধু ধর্মকর্ম নিয়েই থাকতেন।কখনো কখনো ৪০ দিনের তাবলীগে চলে যেতেন,ঘুরে বেড়াতেন দূর দূরান্তের মসজিদগুলো।
আমি নানাভাবে বাঁধা দিলেও বাবা কে আটকাতে পারিনি কোনোদিন।

মায়ের মৃত্যুর পর বাবা আরোও বেশি সংসার বিমুখ হয়ে পড়েন।
কখনো অস্থিরতার কারন জিজ্ঞেস করলে আব্বা বলতেন- তোমার মায়ের মুখটা ভুলতে পারিনা আমি!
চুপ থাকতাম,বাবা কে শান্তনা দিতে পারতাম না কখনোই,কখনো কখনো বাবাকে বুকে জড়িয়ে কেঁদে ফেলতাম নিজেই।

মায়ের মৃত্যুর পর একটাও ঈদ হাঁসিমুখে কাটেনি আমাদের।
ফজরে উঠেই নামাজ পড়ে কবর জিয়ারত শেষে বাড়িতে এসে ঘরটাকে কেমন শ্মশান,মরু ধূ ধূ মনে হতো।
নিঃশব্দে চোখে জল আসতো,কেউ শান্তনা দিতে আসলে ডুকরে কেঁদে উঠতাম আমরা।
বাবাকে কতোবার বলেছি -তোমাকে গ্রামে আর থাকতে দিবো না,বাবা কিছুতেই মানেনি,বলতেন-প্রতিদিন তোমার মায়ের কবরে না গেলে আমার দম বন্ধ হয়ে আসে!

সেবার কয়েক দিনের ছুটিতে বাড়িতে ছিলাম।
বাবা খানিকটা অসুস্থতা বোধ করছেন কিছুদিন,বুকে ব্যথা।
নির্ঘুম রাত কাটান প্রায়ই।
বাড়িতে আসলে বাবাকে ছাড়া আমি কিংবা আমাকে ছাড়া বাবা এক বেলাও খাবার খেতেন না।কোথাও গেলে বাসায় ফিরে না আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করতেন অথবা খোঁজে এনে খাবার খেতেন একসাথে।

সেদিন রাতে খাবার খেয়ে বাবা কে শুইয়ে দিয়ে ঘুমাতে গেছি।
সবেমাত্র ঘুমে চোখ বুজেছি,অমনি বাবার ডাক- বাজি,কই তুমি,মরে গেলাম!
আমি লাফ দিয়ে ঘুম থেকে উঠে বাবার পাশে আসি।।
বাবার বুকের ব্যথাটা বেড়েছে,নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।ভাই-ভাবি সবাই যে যার ঘরে ঘুমোচ্ছে।
কাউকেই ডাক না দিয়ে আমি বাবাকে বুকের সাথে চেপে ধরে বুকটা মালিশ করতে লাগলাম,খানিক পরেই বাবা স্বস্তিবোধ করলেন।
আমার হাতটা ধরে বুকের কাছে নিয়ে চোখ দিয়ে পানি ছেড়ে দিলেন- আমি তোমার সুখটা দেখে যেতে পারবো না বাজি!

আমি নিশ্চুপ,বললাম এবার সাথে করে ঢাকায় নিয়ে যাবো তোমাকে,ভালো ডাক্তার দেখাবো।
মা নেই,তোমাকে হারালে আমার আর কী থাকবে!
বাবা অঝোড়ে কাঁদতে লাগলেন-দুনিয়াতে এতো মানুষ দেখি,তোমার মায়ের মতো কাউকেই দেখি না আমি!
আমি সেদিন বাবার বুকে ল্যাপ্টে ছিলাম।

বাড়ি থেকে ফেরার দিন বাবাকে সুস্থ রেখে আসি কর্মস্থলে।
দুই সপ্তাহ পরেই বাবা আমার মায়ের কাছে চলে যাবেন ভাবতেও পারিনি।
নিজের হাতে বাবাকে মায়ের পাশে রেখে আসতে গিয়ে বুঝলাম-আমি এই পৃথিবীর কেউ না!

মাজহারুল ইসলাম লালন

 

এই ঘর আমার নাএই সংসার আমার না

বাবা,

মমতায় জরানো আদর ও সালাম নিও, কিছু স্মৃতি মনে করে লিখতে বসেছি জানি তোমাকেও কাঁদাবে ও নতুন করে জাগরিত করবে স্মৃতিগুলো। 

হাফপ্যন্ট, ফ্রগ পড়ে সাইকেলের পেছনে তাওয়ালে বসিয়ে পাহাড়ের ঢালের গা ঘেঁসে শুকনো পল্লব ঝড়া পথ দিয়ে  প্রথম যেদিন নিয়ে গিয়েছিলে সেনানিবাস পর্ষদ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে তখন আমার বয়স সবে সাত। সেই একদিনই আমার স্কুলে তোমার যাওয়ার সৌভাগ্য হয়েছিলো পরে আর কখনো যেতে পারোনি কারণ তুমি একজন দেশ সেবক ছিলে। দেশের জন্য তোমার যৌবনের বারুদ দীপ্ত সম্পূর্ণটা সময় ব্যয় করেছো দেশ সেবক হয়েই। ওয়ান ইন্জিনিয়ার ব্যাটালিয়ান এর চৌকশ একজন সেনা সদস্য ছিলে তুমি। তোমার বোটের পালিশের উপর যতক্ষণ স্বচ্ছ জীবনের নিয়মের ধারাবাহিকতার প্রতিচ্ছবি ভেসে না উঠতো ততক্ষণ পালিশ করতে ব্রাশ দিয়ে, ব্যাজগুলোতেও পিতল পালিশ করতে যতক্ষণ না উজ্জল হয়, বেল্ট পড়তে কোমড়ে যতক্ষণ না ফিট হয়, ক্যাপ পড়তে একটু আর করে। বর্দি পড়া পরিপূর্ণ হলে নাস্তা সেরে ওলিপুরের চৌদ্দ নং কোয়াটার থেকে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামার হাঁটার আওয়াজ আজও কানে বাজে। 

দীর্ঘ চব্বিশ থেকে ছাব্বিশ বছরের নিয়মানুবর্তিতায় গড়া গোটা একটা জীবন ঘুম, গোসল, ধৈর্য, ত্যাগ, শ্রম, ঘাম সার্বোভৌম রক্ষার্থে যুদ্ধ কিংবা রণকৌশল শিখনের যে নতুন নতুন পাঠ-পরিক্রমা নিয়মিত অনুশীলন করার  যে কঠিন পণ সব মিলিয়ে ত্যাগী সৈনিক জীবন! 

তোমার আর আমার পাশাপাশি পড়ার টেবিল ছিলো, তুমি শিখতে ছক একে রণকৌশলের পদ্ধতি আর আমি সাধারণ জীবনে যুদ্ধ ছাড়াই কিভাবে বেঁচে থাকা যায় সে বিষয়ের উপর পড়তাম পাঠ্যবই । যে শপথ করেছিলে দেশের শান্তি রক্ষার্থে, জাতির স্বার্থে সেকারণে তোমার সন্তানদের সময় দিতে পারনি বেশিরভাগ সময়ই। নয়টা স্কুলের গন্ডি পেরিয়ে আজ তোমার সন্তানদের জীবন অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কষাঘাতে ধুঁকছে আর এখন সেই অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ নিয়ে বিধ্বস্ত দেশেই থাকতে হচ্ছে। 

১৯৯৭ সালে ইরাক ও কুয়েত যুদ্ধের পর থেকেই UN মিশনের কার্যক্রম শুরু হয়। ২০০০ থেকে ২০০১ সনে স্মৃতির স্বাক্ষর নিয়ে এসেছিলে জাতিসংঘের শান্তি রক্ষা মিশন থেকে। এ ইতিহাস জাতিসংঘ এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা হয়ে আছে।  তিমুরে ব্যানইন্জিনিয়ার ১ ব্যাটালিয়ানের অবদান তিমুরবাসী যুগ যুগ মনে রাখবে। অকোসি থেকে তিনশো কিলো দূরে তিমুরের রাজধানী দিলিতে হেলিকপ্টারে এসে টেলিফোনে কথা বলতে মাসে একদিন তাও সময় বেঁধে দেয়া হতো, সৈনিকদের চিঠির যোগাযোগ  আরও দীর্ঘ অপেক্ষার ছিলো। তোমার টেলিফোনের অপেক্ষা হাজার বাঁধা উপেক্ষা করে পাহাড় বেয়ে অঝোর বৃষ্টির ঢলের স্রোতে গা ভাসিয়ে কাঁদাময় কমলা পুরের এক মাইল মাটির রাস্তা পেরিয়ে ওপাশ থেকে "মা" ডাকটি যখন শুনতাম মনটা আমার ধীর ও প্রশান্তিতে শান্ত হতো ক্ষানিক সময়ের জন্য। 

০৩ আগষ্ট পূর্ব তিমুরের দিলির ভূমি থেকে বিস্ফোরক দ্রব্য মুক্ত করার সময় একজন প্রাণ হারালে খবরের পাতায় শিরোনামের প্রধান খবর ও BTV এর নিউজে কাভারেজ হচ্ছিলো মৃত্যুর এ  খবর। আমি দৌড়ে গিয়ে চেকপোস্ট থেকে খবরের কাগজ সংগ্রহ করে বাবার নাম খুঁজতে ব্যস্ত হলাম আর বড় বড় নিঃশ্বাস নিচ্ছিলাম, নাম চোখে পড়লো কর্পোরাল আব্দুল আজিজ আঙ্কেল। ইন্জিনিয়ার কোরের নামটা থাকার কারনেই উদ্বিগ্নটা বেশি ছিলো। আবার  তুমিও যে ইন্জিনিয়ার কোর হতেই গিয়েছিলে তিমুরে। বাবার নাম নেই পত্রিকার পাতায় কিন্তু সে ভয় এখনো আমাকে মাঝে মাঝে  তাড়া করে, অপেক্ষায় রইলাম আরেকটি বার "মা" ডাক শোনার!

স্বশরীরে  জাতিসংঘ থেকে  সম্মাননা নিয়ে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জল করে বাংলাদেশে এসে আমাকে জরিয়ে ধরে চুমু খেলে কপোলে সেদিন মনে হয়েছিলো আমার বাবাই সেরা। তোমার ছোট মেয়ে ভয়ে তোমার কোলে যায়নি সেদিন অনেক কালো ও মুটিয়ে গিয়েছিলে। সে বলেই ফেললো এটা তো আমার বাবা না!

দীর্ঘদিন বাবাকে না দেখার কারণে সৈনিকদের সন্তানদের বাবার অবয়ব ভুলে যাওয়ারই কথা। 

হয়তো আমাদের সময় দিতে পারোনি কিন্তু দেশের শান্তির জন্য পুরোটা যৌবন দেশকে ঠিকই সময় দিয়েছো, যুদ্ধের জন্য নিজেদের সর্বদা প্রস্তুত রেখেছো। চলোনা বাবা ফিরে যাই ১৯৯৯-২০০২ সনের সেই প্যারেড গ্রাউন্ডের  মাঠে, তোমার কন্ঠে প্যারেডের কমানে, রাইফেলের ঝনঝন আওয়াজে,সাজোয়া যান পারাপারের জন্য প্রস্তুত ফ্লটিন ব্রীজ তৈরী রাখা, মাঠ ভরা যুদ্ধের   জন্য  ট্যাঙ্ক প্রস্তুতের দায়িত্বে থাকা সেই চৌকস সার্জেন্ট  আতাহারের ইউনিটের তিন ইন্জিনিয়ার ব্যাটালিয়নে।

চলোনা বাবা ফিরে যাই তোমার আঙ্গুল ছুঁয়ে হাঁটবো আবার নতুন করে, খুঁজবো প্রশান্তি সেনানিবাসের সবুজ ছাউনিতে।ফিরে যাওয়া যায়না বাবা অতীতে কিন্তু বর্তমানকে ফেলে আসা দুঃখ সুখের  অতীত দ্বারা সাজিয়ে রাখা যায় গল্পের মাধ্যমে। তুমি ভালো থেকো বাবা যেমন ভালো রাখতে চেয়েছিলে অতীতে আমাদের  আর লিখতে পারছি না বাবা। চোখ ঝাপসা হয়ে আসছে। 

 

ইতি,

তোমার বড় কন্যা

শাহিনূর পারভীন।

নরসিংদী সদর

 

 

বাবার সাথে আমার অনেক স্মৃতি জড়িয়ে আছে। আমি বাবার বড় মেয়ে তাই আমার প্রতি বাবার মায়াটা একটু বেশি।বাবা আমার সমস্ত আবদার মেনে নেন।বাবার ইচ্ছা ছিল আমি ডাক্তার হয়ে দেশের মানুষের সেবা করবো। বাবার ইচ্ছাকেই ছোটবেলা থেকে ধারণ করে নিজেকে সেভাবে গড়ে তুলেছি এবং ডাক্তার হয়ে মানুষের সেবা করছি। বাবাও আমাদের জন্য অনেক কষ্ট করেছেন।তিনি অনেক ধৈর্যশীল, পরিশ্রমী ও বিনয়ী একজন মানুষ ।আমার কোন শখ অপূর্ণ রাখেননি।আমার যেকোনো বিপদে বাবাকে সবসময় পাশে পেয়েছি। বাবা আছে মানে মাথার উপর ছায়া আছে।বাবা মেয়ের সম্পর্ক টা সত্যি অনেক সুন্দর।এখনোও বাবার বাড়িতে গেলে আমার পছন্দের সব খাবার নিয়ে আসেন। মনে হয় যেন এখনোও বাবার সেই ছোট মেয়েটিই আছি। কিন্তু বাবার বয়স হয়েছে, তিনি এখনোও আগের মতো পরিশ্রম করেন, ঔষধ খেতে চান না একদম ই।বাবা কে বোঝাতে হয় যে , তোমাকে সুস্থ থাকতে হবে।মেয়ে হয়ে এখন বাবা কে মায়ের মতো শাসন করি।এখন আমার নিজের বাচ্চাদের বাবা কে দেখে বাবার সাথে আমার ছোট বেলার স্মৃতি মনে পড়ে। বাবা, তুমি আমার পরম শ্রদ্ধার পাত্র। তোমার জন্য আমরা গর্ববোধ করি।তোমাকে কখনোও বলা হয়নি কতটা ভালোবাসি তোমাকে। আজকে আমি যেখানে তার পুরো কৃতিত্বই তোমার।মহান আল্লাহ পৃথিবীর সকল বাবাকে সুস্থ ও নিরাপদে রাখুক ।

 

 

 

আর একটাবার

আব্বা! আব্বাগো! আব্বা! আমার আব্বা। আমার বাবা। কতদিন হলো, কতগুলো বছর পেরিয়ে গেলো। আমার মুখ থেকে আর আব্বা শব্দটা বের হয় না। তোমার বাকি দুই সন্তানেরও একই অবস্থা। তোমার মৃত্যুর এক যুগেরও বেশি সময় পর আজ তোমায় নিয়ে লিখতে বসেছি। কী লিখছি, কেন লিখছি, কীভাবে লেখা উচিত জানি না। এই লেখাগুলো হয়তো কোনোদিন তোমার কাছে পৌঁছবেও না। তুমি যখন সবাইকে কাঁদিয়ে না ফেরার দেশে পাড়ি জমিয়েছিলে তখন আমি খুব ছোট। তাই হয়তো তখন বাবা হারানোর কষ্টটা ঠিক করে বুঝতে পারি নি। 

আব্বা তুমি সবার কাছে আমাকে নিয়ে গর্ব করতে। কিন্তু কী যোগ্যতা ছিল আমার তা আমি কখনোই জানলাম না। তুমি আমার বাবা ছিলে বলেই হয়তো আমার মতো একটা অপদার্থ ছেলেকে নিয়ে স্বপ্ন দেখতে পারতে, গর্ব করতে পারতে, বুক ফুলিয়ে বলতে আমার ছেলে একদিন অনেক বড় হবে।

 আব্বা! ছবি না দেখে তোমার চেহারা মনে করাটা আমার জন্য আজকাল বেশ কঠিন হয়ে পড়েছে। কিন্তু জানো আব্বা যখন তুমি শেষবারের মতো পৃথিবীর মাটিতে নিঃশ্বাস নিয়েছিলে সেই মুহূর্তটা আমি কোনোদিন ভুলি নি। ভুলতে পারি না। শেষ নিঃশ্বাসগুলো নেওয়ার সময় যতদূর মনে পরে শেষবারের মতো তুমি মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ'র নামটা উচ্চারণ করেছিলে। কেউ হয়তো তোমাকে দ্রুত যাওয়ার জন্য তাড়া করছিলো। তুমি সেই ডাকে সাড়া দিলে। তোমার ছোট্ট অমিতটা যে তখনও বাবা শব্দের মাহাত্ম্যটা বুঝে ওঠতে পারে নি সেকথা হয়তো তখন তুুমি কল্পনায়ও আনতে পারো নি। আর পারলেই বা কী? মৃত্যুর অনিবার্য সত্যিটা তো মেনে নিতেই হতো। তুমি ছিলে আমার জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষক, সবচেয়ে বড় চিকিৎসক, সবচেয়ে বড় সাহিত্যিক। 

আব্বা গো তুমি কত সহজ-সরল ছিলে। তোমার সরলতার সুযোগ নিয়ে কত লোক তোমাকে ঠকিয়েছে। কিন্তু কোনোদিন দেখি নি কারও বিরুদ্ধে তুমি কটুকথা বলেছো। আমার জীবনে যে ক'টা বছর তোমায় আমি পেয়েছি কোনোদিনই শুনি নি তুমি কাউকে গালি দিয়েছো, তিরস্কার করেছো কিংবা একটা ধমকও কাউকে কোনোদিন দিতে শুনি নি। একদিন দুপুরে তুমি বিছানায় শুঁয়ে ছিলে। আমি স্কুল থেকে এসে বন্ধুদের সাথে খেলার জন্য দূর থেকেই এক ঢিলে ব্যাগটা বিছানায় ফেলে চলে গিয়েছিলাম। ব্যাগটা গিয়ে তোমার শরীরে আঘাত করে। আমি খুব ভয় পাচ্ছিলাম৷ তুমি হয়তো খুুব বকাঝকা করবে। চাইলে মারতেও তো পারতে। কেন একটুও বকলে না? কেন একটুও মারলে না? কোলে তুলে আদর করে কেন বুঝিয়ে বললে তুমি? মাঝেমাঝে স্কুল ছুটির পর বাড়িতে না এসে কোথাও হয়তো দেরি করেছি। মা আর তুমি দু'জনেই আমায় নিয়ে বেশ চিন্তিত হয়ে পরতে। মা বকা দিতে নিলে তুমিই আগলে রাখতে। পৃথিবীর সব দুঃখ, সব কষ্ট, সব যাতনা মুছে দিতে চাইতে তুমি। তুমি ছিলে আমার জীবনের এমনই এক পরশপাথর যার ছোঁয়া পেলে কোনো দুঃখই থাকে না। তোমার হাত ধরেই তো প্রথম স্কুলে গিয়েছিলাম। কিন্তু স্কুল পাস করে যখন কলেজে গেলাম, কলেজ পাস করে বিশ্ববিদ্যালয়ে আব্বা তোমার হাতটা আমি আর আমার কাঁধে পাই নি। তুমি ছাড়া কে আর ছিল আমার হাত ধরবে? আমাকে আগলে রাখবে? আমার চোখের পানি মুছে দিবে? আমায় হাসতে শেখাবে?

আব্বা মনে আছে স্কুলে একবার স্কুলদৌড়ে হেরে গিয়ে কান্না করতে করতে বাড়ি আসার সময় তুমি আমার কান্না মুছিয়ে দাও নি। তুমি আমার সহজ শৈশবে কঠিন জীবনের শিক্ষা দিতে চেয়েছিলে। 'অ' তে অজগরটি আসছে তেড়ে না শিখিয়ে শিখিয়েছিলে অন্যায় থেকে বিরত। 'আ' তে আমটি আমি খাবো পেরে না শিখিয়ে শিখিয়েছিলে আশার সামনে বাঁচতে। আব্বা গো তুমি নেই আজ কতদিন হলো। আমার মাথার উপর একটা ছায়া নেই। আমি ভুল করলে ভুলগুলো ধরিয়ে দেওয়ার একটা মানুষ নেই। আমার মন খারাপ হলে আমাকে গল্প শুনিয়ে মন ভালো করে দেওয়ার একটা মানুষ নেই। রাতে ঘুম না এলে রুপকথার গল্প বলার আজ আর কেউ নেই। কেউ নেই আব্বা। আমার আজ আর কেউ নেই।

তুমি মৃত্যুর আগে যে ঘরটায় থাকতে সেখানে এখন আমি থাকি। তুমি মারা যাওয়ার পর তোমার দুনিয়ার ঘরটাই এখন আমার দুনিয়ার ঘর। যখন রাতে ঘুম আসে না কিংবা অলস ক্লান্ত দুপুরে তোমার কথা খুব মনে পরে। আব্বাগো তোমাকে আরেকটাবার আব্বা বলে ডাকতে খুব ইচ্ছে করে।আব্বা! আব্বা! আব্বাগো! আব্বা! আমি তোমাকে আর কিছু বলতে চাই না। কোনো আবদার করবো না। নতুন জামা, সাইকেল বা চকোলেট কিচ্ছু কিনে দিতে বলবো না। শুধু আর একটাবার যদি আব্বা বলে ডাকতে পারতাম! আর একটাবার!

অমিত হাসান 

শিক্ষার্থী, মাস্টার্স শেষপর্ব, বাংলা বিভাগ, ঢাকা কলেজ

 

 

আমার জীবনের সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ আমার বাবা

শৈশব থেকে জীবনের শেষ দিন অবধি বাবা এমন এক ভরসার নাম যেখানে প্রতিটা সন্তান নিজেকে নিরাপদ মনে করে। জীবনে চলার পথে অজস্র সংকট, সংগ্রাম ও প্রতিকূলতা আসুক না কেন বাবা সেগুলো সাহসিকতা ও দৃঢ়তার সঙ্গে মোকাবিলা করেন। বাবাই বটবৃক্ষ হয়ে সন্তানদের ছাঁয়া দেয় যেন সন্তানেরা কোন সংকট বুঝতে না পারে। তাঁর চোখে সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশা আকাঙ্ক্ষার শেষ নেই। বাবা তিলে তিলে তার জীবনের সর্বোচ্চ সময়, প্রচেষ্টা ও সম্পদ ব্যয় করতে পিছপা হোন না তার সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়ার জন্য। একজন বাবাই জানে তার সন্তানকে তার সফলতার সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছে দিতে তার কতখানি ত্যাগ স্বীকার করতে হয়। বাবাই সেই মানুষ যিনি সন্তানকে জেতাতে গিয়ে উনি নিজে বারবার হেরে যান কিন্তু তিনি কখনও হাল ছেড়ে দেন না কারণ প্রতিটি বাবাই তার জীবনের সর্বস্ব দিয়ে তার সন্তানের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ গড়তে মরিয়া হয়ে থাকে।বাবা হয়তো অনেকসময় মায়ের মতো প্রকাশ করে না সবকিছু কিন্তু তার ভালোবাসা সবচেয়ে গভীর। 

ছোটবেলায় বাবার শাসন খুব কঠোর মনে হতো। তার বকা দেওয়া ও নিষেধের বেড়াজাল বড়ই অপ্রিয় লাগতো। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় আজ বুঝতে পারি তার সমস্ত শাসন এর পিছনেই লুকিয়ে ছিলো গভীর মমতা, দায়িত্ববোধ এবং আমাকে ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার এক নীরব প্রচেষ্ঠা। সেই শৈশব থেকে দেখে আসছি আমাদের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য উনার ব্যক্তিগত স্বপ্ন, ইচ্ছা, শখ, আশা-আকাঙ্ক্ষা সবকিছু বিসর্জন দিয়েছেন।সুতরাং, আমাদের বাবা আমাদের স্বপ্নপূরণের যাত্রায় পথচারী।

 

আসিফ আহাম্মেদ 

বিভাগ: ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ 

শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়,কুষ্টিয়া 

 

আমার বাবার কথা

সূর্য ওঠার দিনগুলো আজ অনেক দূরেঅজানা কারণে খুব ভোরে ঘুম ভেঙ্গে যেতো আমার। ঘুম ভাঙলেই প্রথমেই খোঁজ করতাম বাবাকে। বাবাও ভোরে ঘুম থেকে উঠতেন। কাজের লোকদের ডেকে তুলতেন। ওরা গুরু-লাঙল-জোয়াল নিয়ে মাঠের পানে যাত্রা করলে বাবা ফ্রি। তখন আমাকে তার ঘাড়ে তুলে নিতেন। গলার দুপাশে দুপা ঝুলিয়ে আমি মজা করে বসতাম আর মজার মজার কথা বলে বাবা পূর্বের মাঠের দিকে হাঁটতেন। বাবার ঘাড়ের ওপর বসে খুব সুন্দর লাগতো সবকিছু। উচু থেকে দেখার একটা আলাদা মজা যে আছে সেটা আমি ঐ সময়ই বুঝতে পারি। শীতকালে আমাদেও বাপ-বেটার প্রভাত অভিযান নিয়মিত হতো। গ্রীষ্ম বর্ষায় বৃষ্টি না হলে এ পর্ব কখনও বাদ পড়তো না। সেই সময়ে ৩ ভাইবোনদের ছোট ছিলাম আমি। ফলে বাবার আদরও একটু বেশি পেতাম। রোগা হাড্ডিসার শরীর ছিলো আমার। খাওয়া দাওয়ায়ও মন ছিলোনা। আমার ধারণা পেটটাও মনে হয় বেশী খাওয়া দাওয়া সায় দিতো না। একারণেই বাবার আদরটা বেশী পেতাম। আমাদের কাপড়ের ব্যবসা ছিলো। বাবাকে সপ্তাহে ২/৩ দিন নরসিংদীর বাবুরহাট আর ঢাকার পাটুয়াটুলীতে হাটে যেতে হতো। তখন খুব কষ্ট হতো আমার। আলনায় ঝুলে থাকা শার্ট (পাঞ্জাবাীর মতো দেখতে) লুঙ্গিতে বাবার গন্ধ লেগে থাকতো বার বার বাবার গন্ধ শুঁকতে যেতাম। মা আর ভাইবোনরা এসব দেখে হাসতো। আমি পাত্তা দিতাম না। বাবার গন্ধটাই যেনো আমাকে বাবার কাছে নিয়ে যেতো। বাবা আমাকে অনেক মজার মজার নামে ডাকতেন। আজ অনেক চেষ্টা করেও সেই নামগুলো মনে করতে পারছি না। তিনি বেঁচে থাকলে জিজ্ঞেস করতে পারতাম। তুমি আমাকে কি কি নামে ডাকতে ? 
 

তার জন্ম শৈশব আর বড় হবার দিন 

তার নাম নীরোদ রঞ্জন পাল। তিনি আমার বাবা। তাঁর জন্ম সালটা তাঁরও জানা ছিলোনা। হয়তো ঠিকুজি হারিয়ে ফেলেছিলেন। তবে ব্রিটিশ শাসনের শেষ পর্বে তার জন্ম। ১৯৪২ এর মন্বন্তর, স্বদেশী আন্দোলন এসবের গল্প বলতেন বাবা। ৪৭ সালে ভারত এবং আমাদের আত্মীয় স্বজনদের দেশ ত্যাগের কথাও বলতেন। বাবা ছিলেন খুবই দুঃখী একজন মানুষ। তিন বোনের একভাই। মাত্র তিন বছর বয়সে মা এবং দশ বছর বয়সে তার বাবা মারা যান। দিদিদের কাছে মানুষ হতে না হতেই পর পর তিন দিদিরই বিয়ে হয়ে যায়। এরপর মা-বাবা সবই তার জ্যেঠিমা। কৈশোরটা কেটেছে পুরোটাই বাঁদরামী করে। বিশাল সংসারে জ্যেঠিমার সময় কোথায় দূর্দান্ত কিশোরটাকে সময় দেবার। তারও তো কয়েকজন সন্তান আছে। তারপর নোয়াগাঁও প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তাকে ভর্তি করে দেয়া হলো। ছয় সাত মাইল দূরে স্কুল। গ্রামের এক বয়স্কা মহিলা উনাকে স্কুলে নিয়ে যেতেন। বাড়ি থেকে বেরিয়ে রেলপথ ধরে যাবার পথে ডান পাশে রামনগরের জঙ্গল। প্রায় প্রতিদিনই জঙ্গলের কাছে গিয়ে ওর প্রাকৃতিক সাড়া দিতে হয়। বুড়িকে রেল লাইনে বসিয়ে রেখে নীরোদ জঙ্গলে ঢুকে যায়। বইপত্র নিয়ে বুড়ি রেল লাইনে বসে থাকে। নীরোদ জঙ্গলের এদিকে ঢুকে ওদিক দিয়ে বেরিয়ে গ্রামের ছেলেদের সাথে খেলায় মেতে ওঠে। বুড়ি দুতিন ঘন্টা পর বাড়ি ফিরে জ্যেঠিমাকে বিস্তারিত জানায়। জ্যেঠিমা রাগ করেন। বলেন আজ থেকে ওর ভাত বন্ধ। কিন্তু দুপুরে ক্ষুধা নিয়ে বাড়ি ফিরলে একটু বকা ঝকা একটু বুঝানো। তারপর মা মরা ছেলেটাকে ভাত না দিয়ে জ্যেঠিমা কি থাকতে পারেন ? এভাবেই চলছিলো জীবন। ক্লাস এইটের পর তার পড়াশুনা আর এগোলো না। একদিন টিফিন পিরিয়ডে বাইরের বন্ধুদের সাথে বিড়ি খাচ্ছিল নীরোদ। (বিড়ি খাওয়া ততদিনে শুরু হয়ে গেছে)। এর মধ্যে ঘন্টা পড়ে যায়। তাড়াহুড়া করে ক্লাসরুমে ফিরে দেখে স্যার উপস্থিত। মুখের ভেতর তখনও ধোঁয়া রয়ে গেছে। মুখ খুলতেই ধোয়ার কুন্ডলী বেরিয়ে এলো মুখ থেকে। স্যার বললেন এইকান্ড টিফিন আওয়ারে ধোঁয়া গিলছিস আর সেই ধোঁয়া ছাড়াছিস আমার মুখে। জোড়া বেত দিয়ে তাড়া দিতেই জানালা দিয়ে বের হয়ে সেই যে বাড়ি ফিরলেন আর স্কুলে ফেরা হয়নি। সর্বসাকুল্যে ক্লাস এইট পর্যন্ত পড়াশুনা করেছিলেন বাবা। কিন্তু বাংলা বা ইংলিশ হাতের লেখা এবং জ্ঞানের গভীরতা দেখে অবাক হতাম আমরা। ইন্টারমিডিয়েট পড়ার সময়ও বাংলা ইংলিশ দুবিষয়ে বাবার কাছ থেকে সহযোগীতা পেতাম আমরা। স্কুল ছাড়ার পর এ কিশোরের দিন কাটে টো টো করে ঘুরে। জ্যেঠিমা দেখলেন এ ছেলেতো নষ্ট হয়ে যাবে। একে কোন কাজে লাগানো দরকার। পীরধন রাউথমল তখন শ্রীমঙ্গলের মাড়োয়ারী ব্যবসায়ীদের মধ্যে সবচেয়ে জমজমাট ব্যবসার মালিক। জ্যেঠামশাই ওখানে ব্যবসা শেখার জন্য নীরোদকে নিয়োজিত করলেন। পীরধন রাউথমল এর কাপড়ের গদিতে স্থান হলো নীরোদ এর। 

এগিয়ে যাবার দিন

মাড়োয়ারী ফার্ম এর কাজ নীরোদকে আত্মবিশ্বাসী করে তুলে। তার সততা ওদের মুগ্ধ করে ক্রমান্বয়ে শিক্ষানবীশ থেকে পুরোপুরি একজন দায়িত্বশীল কর্মীতে রূপান্তরিত হয় নীরোদ। সপ্তাহে একদিন ডে অফ তার। সেদিন বাড়িতে থাকে। সারা পাড়া মাতায়। সমবয়সীরা মিলে হৈহল্লা, খেলাধূলা। এখানে নীরোদ নেতা। ওর কথাই শেষ কথা। পরোপকারী আর বন্ধুসুলভও। জেঠিমা এবার বিয়ের জন্য উঠে পড়ে লাগেন। অনেক বুঝিয়ে সুঝিয়ে মতামত নেন। কন্যা কমলগঞ্জ থানার ভরতপুর গ্রামের নরেন্দ্র পাল এর কন্যা শেফালী পাল। জেঠিমার পিড়াপিড়িতে কন্যা দেখতে যেতে হলো। কন্যা পছন্দ হলো। দ্রুততম সময়ে বিয়েও হয়ে গেলো। পনেরো/ষোল বছরের কিশোরীর হাত ধরে শুরু তার সংসার। জেঠিমা যৌথ সম্পত্তি থেকে সব ভাগ করে ওর আলাদা সংসার সাজিয়ে দিলেন। ক্রমান্বয়ে সন্তানরা আসেত থাকলো। ১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধের সময় মাড়োয়ারীরা সব ফেলে রেখে চলে গেলো ভারতে। নীরোদ এর চাকুরী আপাতত বন্ধ। দুতিন বছর পর কিছু জমানো টাকা আর কিছু জমি বিক্রির টাকা দিয়ে শ্রীমঙ্গলের নূতন বাজারে একটি ঘর নিয়ে কাপড়ের ব্যবসা শুরু করলো নীরোদ। ওর মেধা শ্রমে দ্রুতই ব্যবসায় উন্নতি হলো। ইতোমধ্যে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি উত্তাল হয়ে উঠেছে। তিনি ভাবলেন নিশ্চয়ই একটা সমঝোতা হবে। কিন্তু তিনি কি জানতেন তার স্বপ্নকে গুড়িয়ে দিতে আসছে ১৯৭১।

১৯৭১,  স্বপ্নকে গুড়িয়ে দেবার কাল

রাজনৈতিক নানা টানাপোড়েন চলছে ৬৯-৭০-৭১ এর শুরুর দিনগুলিতে। অসহযোগ আন্দোলন ইত্যাদির কারণে মানুষের জীবন হয়ে গেলো গতিহীন। ২৫ শে মার্চ এর ক্র্যাক ডাউন তছনছ করে দিলো বাংলাদেমের (তদানিন্তন পূর্ব পাকিস্থান) মানুষের জীবন। এপ্রিল’৭১ এর শুরুর দিকে পাকবাহিনী যখন শ্রীমঙ্গলে বোমাবর্ষণ করলো, শুরু হয়ে গেলো হিন্দু সম্পত্তি লুটপাট। তার দীর্ঘ দিনের কষ্টের ফসল বিশাল কাপড়ের দোকানটি লুট হয়ে গেলো। আমাদের পুরো পরিবার এবং গ্রামের হিন্দু সম্প্রদায় বাড়ি ঘর-সহায় সম্পদ ফেলে শরনার্থী হিসাবে ভারতের ত্রিপুরায় উপস্থিত হলাম। দীর্ঘ প্রায় দশমাস বিভিন্ন শরনাথী ক্যাম্পে কাটানোর পর ৭২ এর জানুয়ারীতে আর শ্রীমঙ্গল ফিরলাম। বাড়িতে একটা সবুজ চারা পর্যন্ত নেই। পুকুর সেঁচে মাছ পর্যন্ত নিয়ে গেছে লুটেরার দল। পিরধন রাউথমলের এর পরিত্যাক্ত বাড়িতে আবাস গড়লাম আমরা। বাবা তিল তিল করে একটা ঘড়ের ঘর গড়ে তুললেন বাড়িতে। ঋণ করে আবার ব্যবসা শুরু করতে চেষ্টা করলেন। কিন্তু সংসারের বিপুল খরচ সে ছোট দোকান সামলাতে পারলোনা। দোকান ছেড়ে একটা প্রাইভেট ফার্মে যোগ দিলেন বাবা। শুধু আমাদের, তার ৭ সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে নিজেকে বিলিয়ে দিলেন। তার স্বপ্নের সৌধ ভেঙ্গে চুরে গুড়ো হয়ে গেলো। তারপরও আফসোস করতেন না বাবা। বলতেন, যে কোন ভাবেই মানুষ হতে হবে তোদের। আমার যতো কষ্টই হোক। তাদের পড়াশুনা করতে হবে। 


 

তাঁর হাসিমুখ,তার তৃপ্তির ক্ষণ

বড়দা এস এস সি পাস করেই টিউশনী শুরু করলো । আমি ক্লাস ফাইভে থাকতে শুরু করলাম  গ্রামের বাচ্চাদের হাতেখড়ি দেওয়ার কাজ । সাথে বাবার অমানুষিক পরিশ্রম । কৃষি কাজ ,দোকানের চাকুরী একই তালে করতে থাকলেন বাবা।আমরা সাতভাই বোন পড়াশুনা করতে থাকলাম ।  স্কুল কলেজে যাবার আগে  মাঠে কৃষিকাজে সহযোগীতা করতাম । স্কুল কলেজ থেকে বাসায় না ফিরে বাহিরে হালকা নাস্তা করে টিউশনীতে চলে যেতাম ।  রাত নয়টা দশটা পযর্ন্ত টিউশিনী করত্মা বড়দা আর আমি । বাবা কষ্ট পেতেন । মাঝে মাঝে অনুশোচনা করতেন, বলতেন, তোদের পড়ার সময়টাতে আমি কিছুই করতে  পারছিনা । তবে কষ্ট করছিস । ঈশ্বর একদিন  মুখ তুলে তাকাবেন
 

ব্যক্তি নীরোদ রঞ্জন পাল

 প্রখর নীতিবোধ নিয়ে ,দেশীয় মূল্যবোধে পরিচালিত হতেন আমার বাবা  নীরোদ রঞ্জন পাল । নীতির বাহিরে কখনও চলতেন না  তিনি । তার একটাই কথা থাকতে হবে সৎ,চরিত্র ঠিক রাখতে হবে।চরিত্রের  স্খলন হলে তোমার আর কোন কিছু থাকলো না । কারো উপকার করতে পারো ভালো কিন্তু কারো ক্ষতি করো না।অবৈধ পয়সার প্রতি লোভ করোনা । অবৈধ এক টাকা পরোক্ষে হলেও তোমার দশ টাকা ক্ষতি করবে । ঈশ্বর এবং মানুষের প্রতি বিশ্বাস রেখো । অল্পে সšু‘ষ্ট থেকো । বাবার প্রতিটি কথা চেষ্টা করছি পালন করে যেতে । বাবা এবং ঈশ্বরের আর্শীবাদে ভালো আছি আমরা সাত ভাইবোন । অর্থের প্রাচুর্য নেই আমাদের । কিন্তু আমরা সবাই সুখে আছি । শুধু গ্রাম নয় এলাকার বড় বড় সমস্যায় বাবাকে ডাকতো সবাই । একটা সময় পঞ্চায়েত এর বিচারে তাকে প্রচুর সময় দিতে হতো । আমরা রাগ করতাম কিন্তু তিনি রাগ করতেন না । নিজের ক্ষতি করেও অন্যের উপকারের জন্য তিনি ছিলেন নিবেদিত প্রাণ । 

অবশেষে সবই ঝরে যায় 

ষ্টোক এর পর  শরীর এর একদিন  প্যারালাইজড হয়ে যায়  তার । কিছুদিন চিকিৎসার পর মোটামুটি সুস্থ্য  হয়ে যান ।অর্থোপেডিক ডাক্তার আর আর কৈরীর চিকিৎসাধীন ছিলেন দীর্ঘ  দিন । হয়তো সময় শেষ হয়ে যাচ্ছিল । মোটামুটি সুস্থ্য হবার পথে যখন তখন তার কি মনে হলো কে জানে নিজে নিজে দাড়াতে চেষ্টা করলেন । নিজেকে সামলাতে পারলেন না। পড়ে গিয়ে মাথায় আঘাত পেলেন । অনেক  চেষ্টার ফল  তেমন বয়ে আনলো না । ২০০২ সালের ১২ই এপ্রিলে খবর পেলাম  বাবার একটু একটু শ্বাসকস্ট হচ্ছে । আমার মনে হলো আমার যাওয়ার দরকার । ১৩ই এপ্রিলে দুপুরেই আগেই পৌছলাম সবাইকে নিয়ে । তার বিছানার পার্শ্বে বসে তার হাত ধরলাম ্ শক্ত করে হাতটা ধরে রাখলেন । খুব শ্বস কষ্ট হচ্ছিল । খুব  অল্প সময়ের মধ্যে আমার হাত ধরা অবস্থায় চোখ বন্ধ করলেন । ধীরে ধীরে তার নিশ্বাস বন্ধ হয়ে গেলো।বুঝলাম তিনি চলে গেলেন । হাত ধরে বসে থাকলাম । বড়দির চিৎকারে সবাই ছুটে এলো । সবাই কে কান্নার সাগরে ভাসিয়ে  উত্তরসুবের বড় বাড়ির মহীকান্ত পাল এর একমাত্র সন্তান নীরোদ রঞ্জন পাল পর জগতের পথে যাত্রা করলেন ।

    আজও আমাদের ভাইবোনদের  বিয়ের ভিডিত্ত গুলোতে বাবা হাসছেন,কথা বলছেন বিন্তু রক্তমাংসের মানুষটি নেই । কিন্তু আমি তো জানি  বাবা তাঁর সমস্ত আশীর্বাদ নিয়ে সব সময়ই আমার কাছে থাকেন । তার আশীর্বাদ এর হাত  আমার মাথার উপর না থাকলে  টিকে আছি কি ভাবে ? বাবা ,তুমি যেখানে থাকো ভালো থেকো ।অনেক অনেক ভালো  থেকো ।


চন্দনকৃষ্ণ পাল

খিলক্ষেত, ঢাকা।

চন্দনকৃষ্ণ পাল

 

পাতার নৌকা


বাবা সারাজীবন কথা বলেছেন কম। ছোট্ট একটা চাকরি, তিন ছেলেমেয়ের সংসার, অভাবের সঙ্গে নীরব লড়াই, এই ছিল তাঁর জীবন। আমি সবার বড়, তারপর ভাই, সবচেয়ে ছোট বোন আঁচল। অভাব ছিল, কিন্তু অভাবের কথা বাবার মুখে কখনো শুনিনি। শুধু দেখেছি, প্রতিদিন একই রঙের জামা পরে বেরিয়ে যেতেন, আর সন্ধ্যায় ফিরতেন একটু বেশি ক্লান্ত হয়ে।
ছোটবেলায় বাবার শাসনকে ভয় পেতাম। ভুল করলে বকতেন, মিথ্যা বললে কঠিন চোখে তাকাতেন। তখন বুঝিনি, সেই কঠোরতার আড়ালেই ছিল আমাদের মানুষ করে তোলার গভীর মায়া।
এখন বাবা বয়সের ভারে নুয়ে পড়েছেন। মাথার চুল সাদা, কিন্তু চোখের দৃঢ়তা আগের মতোই। দুপুরে আমাদের বাড়ির বারান্দায় বসে থাকেন। একদিন আমার দশ বছরের ছেলে আবেগ আমগাছের নিচ থেকে একটি পাতা কুড়িয়ে এনে তাঁর হাতে দিল। বাবা ধীরে ধীরে পাতাটি ভাঁজ করে ছোট্ট একটি নৌকা বানিয়ে আবেগের হাতে তুলে দিলেন।
আবেগ বলল, “আমি এটা জলে ভাসাব।”
বাবা মৃদু হেসে বললেন, “সব নৌকা জলে ভাসানোর জন্য হয় না। কিছু নৌকা হৃদয়ে রেখে দিতে হয়।”
আমি দূর থেকে দৃশ্যটা দেখছিলাম। হঠাৎ মনে হলো, বাবা আমার ছেলেকে কয়েকটি কথায় যে শিক্ষা দিলেন, তা আমি বহু বছরেও বুঝে উঠতে পারিনি। ভালোবাসা আসলে বড় কোনো আয়োজন নয়, ছোট ছোট স্পর্শে, নীরব যত্নে, আর অদৃশ্য ছায়ায় বেঁচে থাকে।
আজ বাবা আমার কাছে শুধু অভিভাবক নন, একজন বন্ধু। জীবনের টানাপোড়েনের গল্প তাঁর সঙ্গে ভাগ করে নিতে পারি। পথ চলতে গিয়ে কোথাও থমকে গেলে এখনও মনে হয়, বাবা আছেন বলেই সাহস পাই।
একটা কথাই শুধু কোনো দিন বলা হয়নি। “বাবা, আমি তোমাকে ভালোবাসি।” কথাটা আজও গলায় আটকে যায়। তাই মনে হয়, আবেগের হাতের সেই ছোট্ট পাতার নৌকাটাই যেন আমার না-বলা ভালোবাসা হয়ে বাবার কাছে ভেসে যায়।


মারুফা আক্তার আইভি

রামপুরা ফেনী
আমার বাবা

সাদিয়া সেলিম

রাংগুনিয়া, চট্টগ্রাম।
 

পৃথিবীর প্রতিটি মেয়ের জীবনে একজন বিশেষ মানুষ থাকেন, যাঁর কাছে সে সবসময় রাজকন্যা হয়ে থাকে। সেই মানুষটি হলেন বাবা। একজন মেয়ের প্রথম ভালোবাসা, প্রথম নায়ক, প্রথম নিরাপদ আশ্রয় এবং সবচেয়ে বড় ভরসার নাম বাবা। পৃথিবী বদলে যায়, সময় বদলে যায়, কিন্তু বাবার ভালোবাসা কখনো বদলায় না। বাবার স্নেহ, ত্যাগ ও নিঃস্বার্থ ভালোবাসাই সন্তানের জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি।

আমার বাবাও আমার কাছে ঠিক তেমনই একজন মানুষ। ছোটবেলায় তিনি প্রবাসে ছিলেন। তাই বাবাকে সব সময় কাছে পাওয়ার সৌভাগ্য আমার হয়নি। যখন অন্য বন্ধুদের বাবাকে হাত ধরে স্কুলে নিয়ে যেতে দেখতাম, তখন বুকের ভেতর একটা শূন্যতা অনুভব করতাম। কত দিন বাবাকে কাছে পাওয়ার জন্য মন কেঁদেছে, কত দিন তাঁর স্নেহময় হাতের স্পর্শ অনুভব করার ইচ্ছে হয়েছে—তার হিসাব নেই। কিন্তু দূরে থেকেও বাবা আমাকে কখনো তাঁর ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত করেননি। ফোনের ওপাশে তাঁর কণ্ঠস্বর শুনলেই মনে হতো, আমার সবচেয়ে নিরাপদ মানুষটি আমার পাশেই আছেন।

আমরা মেয়েরাই বাবার কাছে রাজকন্যা হয়ে উঠি। বাবা হয়তো কখনো মুখে বলেন না, কিন্তু তাঁর প্রতিটি আচরণে সেই ভালোবাসা প্রকাশ পায়। আমি দেখতে যেমনই হই না কেন, আমার বাবার চোখে আমি সবসময় তাঁর সবচেয়ে আদরের রাজকন্যা। পৃথিবীর কেউ হয়তো আমার মধ্যে ত্রুটি খুঁজে পেতে পারে, কিন্তু আমার বাবা সবসময় আমার ভেতরের সৌন্দর্যটাই দেখেন। তাঁর ভালোবাসার কাছে আমি আজও সেই ছোট্ট মেয়েটি, যে তাঁর বুকভরা স্নেহ আর আশ্রয়ে নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে ভাগ্যবতী রাজকন্যা মনে করে। মেয়ের ছোট্ট হাসির জন্য তিনি নিজের হাজারো কষ্ট ভুলে যান। মেয়ের চোখে এক ফোঁটা জল দেখলে তাঁর বুক কেঁপে ওঠে। তিনি চান তাঁর মেয়ে মাথা উঁচু করে বাঁচুক, নিজের স্বপ্ন পূরণ করুক এবং জীবনের প্রতিটি পথে সফল হোক।

আজ বড় হয়ে বুঝতে পারি, আমার সুখের জন্য বাবা কত ত্যাগ করেছেন। প্রবাসের নিঃসঙ্গ জীবন, পরিবারকে ছেড়ে দূরে থাকা, অসংখ্য কষ্ট আর পরিশ্রম—সবকিছু তিনি হাসিমুখে সহ্য করেছেন শুধু আমাদের সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য। হয়তো অনেক ঈদ, অনেক আনন্দের মুহূর্ত তিনি আমাদের ছাড়া কাটিয়েছেন। আমাদের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য নিজের চোখের জল লুকিয়ে রেখেছেন। কারণ একজন বাবা তাঁর সন্তানের সুখকেই নিজের সবচেয়ে বড় আনন্দ মনে করেন।

বাবার ভালোবাসা আকাশের মতো বিশাল, সমুদ্রের মতো গভীর। তাঁর ঋণ কোনোদিন শোধ করা সম্ভব নয়। আমি যখন জীবনের কঠিন পথে ভয় পাই, তখন বাবার কথা মনে পড়ে। তাঁর শেখানো সাহস, সততা ও পরিশ্রম আমাকে সামনে এগিয়ে যাওয়ার শক্তি দেয়। আমার কাছে বাবা শুধু একজন মানুষ নন, তিনি আমার জীবনের সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ।

আমি মহান আল্লাহর কাছে দোয়া করি, যেন আমার বাবাসহ পৃথিবীর প্রতিটি বাবাকে সুস্থতা, সুখ ও দীর্ঘায়ু দান করেন। কারণ একজন বাবা শুধু পরিবারের উপার্জনকারী নন; তিনি একটি পরিবারের ছায়া, সাহস, নিরাপত্তা ও ভালোবাসার সবচেয়ে সুন্দর নাম। আমার কাছে বাবা মানেই—একজন মানুষ, যাঁর কাছে আমি আজও সেই ছোট্ট, আদরের রাজকন্যা।

স্মৃতিবিজড়িত মানাস-তিস্তা আমি আর বাবা

রুবেল ইসলাম

 

তখন আমি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্র। আমাদের বাড়ির ঠিক পাশ ঘেঁষেই বয়ে যেত দুটি নদী—মানাস ও তিস্তা। সে সময় নদী দুটি যেন ছিল ভরা যৌবনের অধিকারিণী। তাদের উচ্ছ্বাস, গতি আর গর্জন আজও আমার স্মৃতির গভীরে অমলিন হয়ে আছে। কালের পরিক্রমায় হয়তো নদী দুটি আজ অনেকটাই বদলে গেছে, কিন্তু আমার স্মৃতিতে তারা এখনো চিরযৌবনা। সেই শৈশবেই দেখেছি, আমার আব্বার ছিল মাছ ধরার প্রতি এক অদম্য ভালোবাসা। বাড়ির এত কাছে নদী থাকায় তাঁর সেই শখ যেন আরও গভীর হয়েছিল। আর আব্বার প্রতিটি মাছ ধরার অভিযানের একমাত্র সঙ্গী ছিলাম আমি। তিনি কোথাও মাছ ধরতে গেলে আমাকে সঙ্গে নিতেনই; এ ব্যাপারে কোনো ব্যতিক্রম ছিল না।

বর্ষাকালে মানাস ও তিস্তা যখন দুকূল ছাপিয়ে উঠত, আব্বা তখন খেপলা জাল আর ওনা জাল গুছিয়ে প্রস্তুত হতেন। আমাদের রংপুর অঞ্চলে এসব জালকে অনেকে ‘পাকজাল’ বা ‘কারেন্ট জাল’ বলতেন। আমার দায়িত্ব ছিল একটি ছোট বাঁশের খালুই হাতে নিয়ে তাঁর পেছনে পেছনে হাঁটা। কাদা-মাটি মাড়িয়ে নদীর পাড়ে পৌঁছে আব্বা যখন বুকসমান পানিতে নেমে জালের দড়ি হাতে পেঁচিয়ে ধরতেন, আমি মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থাকতাম। মুহূর্ত পর তিনি সমস্ত শক্তি দিয়ে জালটি ছুড়ে দিতেন নদীর বুকে। পানির ওপর তখন এক বিশাল বৃত্ত তৈরি হতো। জাল ফেলার পর অপেক্ষার সেই সময়টুকু ছিল আমার জন্য উত্তেজনায় ভরা।

জাল টেনে তোলার সময় দেখা যেত ঝাঁকে ঝাঁকে মাছ। পুটি, টেংরা, চিতল, রুই, শোল, বোয়াল—কত নাম যে মনে পড়ে! তিস্তায় আবার আইড় মাছ বেশি পাওয়া যেত। মাছগুলো জালের ভেতর ছটফট করত, আর আমি আনন্দে আত্মহারা হয়ে সেগুলো খালুইতে ভরতাম। কোনো মাছ কাদায় পড়ে গেলে সাবধানে কুড়িয়ে আবার খালুইতে তুলে রাখতাম। ছোটবেলায় আমাকে সবচেয়ে বিস্মিত করত আরেকটি বিষয়। মানাসের পানি ছিল স্বচ্ছ ও টলটলে, আর তিস্তার পানি ছিল ঘোলা। কিন্তু দুই নদী মোহনায় মিলিত হওয়ার পরও তাদের পানির রঙ যেন আলাদা আলাদাই থাকত। পাশাপাশি বয়ে চললেও তারা নিজেদের স্বকীয়তা ধরে রাখত।

শীতকালে নদীর চেহারা বদলে যেত। পানি কমে আসত, কিন্তু আব্বার উৎসাহ কমত না। কুয়াশাভেজা ভোরে তিনি আমাকে নিজের চাদরে জড়িয়ে নদীর চরে নিয়ে যেতেন। কনকনে ঠান্ডা পানিতে নেমে তিনি জাল ফেলতেন, আর আমি চরের নরম বালু খুঁড়ে ছোট কাঁকড়া কিংবা শামুক খুঁজতাম। আজ নদী দুটি অনেকটাই শুকিয়ে গেছে। আব্বাও আজ প্রৌঢ়ত্বের দোরগোড়ায়। তবে মহান আল্লাহর অশেষ রহমতে তিনি এখনো সুস্থ আছেন। সময় বদলেছে, নদীর রূপ বদলেছে, কিন্তু বদলায়নি আমার স্মৃতিগুলো।

এখনো চোখ বন্ধ করলে আমি মানাস ও তিস্তার ভেজা মাটির গন্ধ পাই। কানে ভেসে আসে নদীর গর্জন আর আব্বার সেই পরিচিত ডাক“এই ধর, মাছটা যেন জাল থেকে ছুটে না যায়। বাবা দিবসে পৃথিবীর সব বাবার প্রতি শ্রদ্ধা আরও গভীর হয়ে ওঠে। আর আমার মনে পড়ে যায় সেই মানুষটিকে, যিনি শুধু মাছ ধরাই শেখাননি, শিখিয়েছেন ধৈর্য, ভালোবাসা, দায়িত্ববোধ আর প্রকৃতির সঙ্গে মিশে থাকার আনন্দ। শৈশবের সেই নদী আর বাবার সঙ্গে কাটানো মুহূর্তগুলোই আজ আমার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। বাবা দিবসে বাবার প্রতি রইল অফুরন্ত ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা। 

 

রুবেল ইসলাম 

সারাই দর্জি পাড়া,হারাগাছ পৌরসভা, রংপুর বাংলাদেশ। 

 

বাবার যুদ্ধ স্মৃতি

১৯৭১ সালের নভেম্বর মাসের পঁচিশ তারিখে আমার জন্ম । বাবা কৃষক পরিবারের বড়ো ছেলে । ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত লেখাপড়া শেষে পরিবারের দায়িত্ব নিয়ে কৃষি পেশায় নিয়োজিত হন । নওগাঁ জেলার সাপাহার থানার জবই গ্ৰামটি তখন কৃষিনির্ভর ছিলো । বাবা প্রত্যক্ষভাবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করলেও সরাসরি যুদ্ধে অংশ নিতে পারেননি। তবে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী শক্তিকে দাদার মতোই প্রচণ্ড ঘৃণা করতেন । গ্ৰামের কতিপয় রাজাকার বিষয়টি আগ্ৰাসী শক্তির হাই কমান্ডকে অবগত করে । বাবা উত্তাল যুদ্ধের সেই কঠিন সময়ে নিজ জমিতে বোরো ধানের চারা রোপণ করতে গেছেন । সময়টা ডিসেম্বর মাসের এক তারিখ । মাঠে আরো দশ বারো জন লোক ছিলো । হাই কমান্ডের নির্দেশে স্থানীয় রাজাকাররা বাবাসহ সবাইকে পুনর্ভবা নদীর পাশে নিয়ে যায় । সদ্য সন্তান প্রসবা মা ঘটনা জানতে পেরে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন । বাবাসহ ধৃত মোটামুটি চল্লিশ জনের মতো লোককে ব্রাশ ফায়ারে হত্যার জন্য কোমরে দড়ি বেঁধে দাঁড় করানো হয় । 

গোপন সংবাদের ভিত্তিতে মুক্তিযুদ্ধের কতিপয় দুঃসাহসী যোদ্ধা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতির ভয়াবহতা উপলব্ধি করে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে সম্মুখ যুদ্ধে অবতীর্ণ হন । পরোক্ষ ঐশী সাহায্যের বদৌলতে বাবাসহ নিরপরাধ মানুষগুলো জীবন নিয়ে বাড়ি ফিরে আসেন । দেশ স্বাধীন হলে আমাদের পরিবারের সবাই আনন্দে শিহরিত হন।  কৃষক বাবার কষ্টার্জিত অর্থে আমি শিক্ষানগরী রাজশাহীর নিউ গভঃ ডিগ্রি কলেজ হতে এইচএসসি এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় হতে আইনে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করি । পেশাগত কারণে দীর্ঘদিন গ্ৰামের বাড়ি থেকে জেলা শহরে অবস্থান করি । পরিবারে গেজেটেড মুক্তিযোদ্ধা না থাকায় আমি গেজেটেড মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের একজন মেয়েকে বিয়ে করেছি । আমাদের জাতীয় জীবনে সবচেয়ে বড়ো , অদ্বিতীয় ও মহোত্তম অর্জন হলো সশস্ত্র যুদ্ধের মাধ্যমে প্রশিক্ষিত সেনাবাহিনীকে পরাজিত করে স্বাধীনতা অর্জন।

আমি বড়ো হয়ে বাবার মুখে আমাদের দাসত্ব মুক্তির চিরায়ত আকাঙ্ক্ষার বিশ্বাসযোগ্য ইতিহাস শুনে এবং কলেজ ও ভার্সিটিতে পড়ার সময় প্রাণবাদী যুদ্ধ কাহিনী পড়ে আজো গর্বে আমার অস্তিত্ববাদী চেতনা আনন্দ পঙ্ক্তিমালায় " সালাম সালাম হাজার সালাম লাখো শহীদের স্মরণে " নেচে ওঠে । 

                    জয়তু স্বাধীনতা ! 

 

এম এ ওয়াজেদ 

আমানা গ্ৰীন সিটি, নওগাঁ সদর, নওগাঁ 

 

জীবনের ভেঙে পড়া মুহূর্তগুলোতে বাবা যেন রথের সারথি


“ছেলে আমার বড় হবে,মাকে বলত সে কথা।
হবে মানুষের মত মানুষ,এক লেখা ইতিহাসের পাতায়।”
এমন গানের প্রতিটা লাইনের মতোই আমার/আমাদের বাবারা স্বপ্ন দেখেন একদিন তাঁর সন্তান ইতিহাস সমান কিছু হবে।ছাতা হয়ে যে মানুষ টা আমাদের আগলে রাখে তাঁর কথা মনে করার জন্য কেবল একটা দিন যথেষ্ট নয় বরং প্রতিটা দিনই বাবা দিবস।আমরা যারা পড়াশোনার ক্ষেত্রে পরিবার থেকে দূরে অবস্থান করছি,আমরাই হয়তো সবচেয়ে বেশি এই জিনিটা ফিল করি।হাজারো ক্লান্তি শেষে মুখে খুব বেশি কিছু হয়তো বলা হয়ে উঠে না,তবে বাবার চোখের পাতায় আর ক্লান্ত হাসিতে আমি যেন সব কথা বুঝে যাই।সন্তানদের জন্য বাবার এই আত্মত্যাগ,নিরলস পরিশ্রম আর নিঃশব্দ ভালোবাসা আমাদের প্রতিদিন শক্তি যোগায়।মুখ ফুটে হয়তো কখনো বলা হয়ে উঠবে না ঠিক কতটা ভালোবাসি বাবা।তবে তোমার সেই ছোট্ট অর্ণব তোমায় অনেক ভালোবাসে।

বাবার প্রতিদিনের পরিশ্রমে লিখিত হয় একটা পরিবারের ভালো থাকার গল্প আর মা হলেন তাঁর সহযোগী।আমার কাছে সবসময় মনে হতো,বাবা মানে ভয় দিয়ে মোড়ানো একটা বাসা।শাসনের বেড়াজালে ছেলেরা বাবাকেই হয়তো সবচেয়ে বেশি ভয় পাই।আমিও তার ব্যতিক্রম না।আমার পড়াশোনার ক্ষেত্রে ছোটবেলা থেকেই বাবা সবচেয়ে বেশি তদারকি করতো।হাজার ব্যস্ততা আর ক্লান্ত শরীর নিয়ে দিনশেষে বাসায় এসেও কখনো যেন তদারকি করতে ভুলতো না আমার পড়ালেখা কেমন হচ্ছে বা কেমন করছি।বাবার প্রতি ভয় কাজ করাটা হয়তো এখান থেকেই শুরু।পরিবারের সবার মুখে শোনা সেই ছোটবেলায় বাবার কোলে পিঠে চড়ে চারপাশের পরিবেশ দেখা আর বাবার আঙুল ধরে হাঁটার স্মৃতিগুলো আমাকে বারবার ফেলে আসা দিনগুলোতে নিয়ে যেতে চাই।তাইতো ছেলেরা বাবা হয়,কিন্তু বাবারা কখনো ছেলে হয় না।
পৃথিবীর সকল বাবাদের জানাই বিশ্ব বাবা দিবসের শুভেচ্ছা।ভালো থাকুক পৃথিবীর সকল বাবা।

অর্ণব দাশ
শিক্ষার্থী,সংগঠক সমাজকর্মী

বাবা আমার অসমাপ্ত ভালোবাসা জীবনে আমার বাবাকে নিয়ে রয়েছে এক অসমাপ্ত গল্প। এটাকে অসমাপ্ত গল্প বলছি এই কারণে, যে মানুষটা আমাদের আগলে রাখার জন্য সারাজীবন সংগ্রাম করে গেছেন তাঁকে একটিবারের মতোও ‘ভালোবাসি’ শব্দটি বলতে পারি নি। যে মানুষটা সারাদিন ডুবে থাকত পত্রিকার পাতায়। আজ তাঁর মেয়ের শতাধিক লেখা প্রকাশিত হয়েছে পত্রিকায়, অথচ বাবা সেটা দেখে যেতে পারে নি। হয়তো অন্য লেখকদের বাবার মতো আমার বাবাও এতদিনে তার মেয়ের প্রকাশিত লেখাগুলো সংগ্রহ করতেন। সবার কাছে বুক ফুলিয়ে বলতেন, ‘এটা আমার মেয়ের লেখা’। কিন্তু বাবার থেকে এমন বুলি শোনার আগেই পৃথিবীর মোহ ত্যাগ করেন। আর বিচ্ছেদের বেদনাভরা শৈশব এখনও আমার স্মৃতিতেই পড়ে থাকে।

আমার জীবনে আমার বাবা ছিলেন এক অন্যরকম পথপ্রদর্শক। ছোটবেলা থেকে বাবাকে অসুস্থ অবস্থাতেই দেখে আসছি। তাই বাবার সাথে ঘুরতে কিংবা বেড়াতে যাওয়ার স্মৃতি তেমন মনে নেই। তবে বাসায় বসে বাবার সাথে কাটানো মুহুর্তগুলো ছিল অসাধারণ। অসুস্থতার কারণে বাবা তেমন বাইরে যেতে পারতেন না বলে আমার আর ছোট ভাইয়ের পড়াশোনার দায়িত্ব ছিল বাবার। পৌষের শীতে বাড়ির উঠানে মাদুর বিছিয়ে নতুন বইয়ে মোড়ক লাগানো, স্কুলের পড়া, পরীক্ষা শেষে বাড়িতে এসে প্রশ্নপত্র দেখানো- সবই হতো বাবার কাছেই। বাবা আমাদের একাডেমিক পড়ার পাশাপাশি অনেক সমসাময়িক বিষয় নিয়েও আলোচনা করতেন। পড়াশোনার প্রতি আমাদের চেয়ে বাবার বেশি আগ্রহ দেখে ভালোই লাগত। বাবা সারাদিন বাসায় থাকতেন বলে আমাদের পুরো সময় বাবার সাথেই কাটত। বাবাকে অজুর পানি এনে দেওয়া, টেবিলে খাবার সাজিয়ে রাখা ইত্যাদি ছিল আমাদের কাজ। কিন্তু হঠাত হঠাত বাবা যখন অসুস্থ হয়ে পড়তেন, তখন বুকের ভেতরটা কেমন যেন কেঁপে ওঠত। রাতের বেলায় ঘুমের মাঝে যখন দেখতাম বাবার শরীর খারাপ লাগছে, তখন ঘুম ভেঙে দু’য়ার বই নিয়ে সুরা পড়ে বাবার গায়ে ফুঁ দিতাম। বাবা হাসপাতালে গেলে সারাদিন আতঙ্কের মাঝে কাটাতাম। এই বুঝি বাবার কোনো খারাপ খবর চলে আসে।

তবে খুব শীঘ্রই যে এ আতঙ্কের অবসান ঘটবে তা কল্পনাও করতে পারি নি। তখন আমি নবম শ্রেণিতে পড়তাম, বাবার হার্টের সমস্যা বেড়ে যাওয়ায় আবারো হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল। হাসপাতালে যাওয়ার পর রাতে আমি বাবাকে দেখতে গিয়েছিলাম। তারপর হাসপাতাল থেকে বাবার থেকে বিদায় নেওয়ার পর বাবা কিছুক্ষণ ঘুমিয়েছিলেন। কিন্তু এ ঘুম ভেঙে যে বাবার সকাল হয় নি, হয়েছে পরকাল। আর বাবার সাথে কাটানো সময়গুলো পড়ে থাকল স্মৃতির পাতায়।

আমার বাবা শুধু একজন বাবাই ছিলেন না, বরং একজন যোদ্ধা। একজন শিক্ষক, একজন পথপ্রদর্শক। ছোটবেলা থেকে বাবাকে  ভালো পোশাক পড়তে খুব কমই দেখেছি। সন্তানকে হাসিমুখে রাখতে তিনি ছিলেন দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। আমার বাবা ছিলেন আমার আদর্শ, আমার অসমাপ্ত ভালোবাসা। বাবার জীবনের সমাপ্ত হলেও বাবার প্রতি আমার ভালোবাসা কোনোদিন যেন সমাপ্ত না হয়। বাবা দিবসে এ আমার প্রত্যাশা।

মাইফুল ঝুমু

শিক্ষার্থী, ফরাসি ভাষা ও সংস্কৃতি বিভাগ, 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

 

বাবা, তোমাকে বলা হয় নি কতটা ভালবাসি 

বাবার কঠোর শাসনের আড়ালে যে এত গভীর মায়া লুকিয়ে থাকতে পারে, তা আমি খুব দেরিতে বুঝেছি। ছোটবেলা থেকেই বাবা আমাকে কড়া শাসনের মধ্যে বড় করেছেন। বিকেলে বন্ধুদের সঙ্গে খেলতে যেতে দিতেন না। ঈদের দিনেও নতুন জামার আনন্দের চেয়ে বইয়ের পাতার সঙ্গেই বেশি সময় কাটাতে হতো। বাবা বলতেন, "ছাত্রদের আবার ঈদ কিসের?" সামান্য ভুলের জন্যও বকাঝকা, কখনও কখনও মারধরও করতেন। বাবার কণ্ঠস্বর শুনলেই বুকের ভেতর ভয় জমে যেত। তাঁকে আমি শ্রদ্ধা করতাম, কিন্তু ভয়ও পেতাম ভীষণ।

একদিনের ঘটনা আজও স্পষ্ট মনে আছে। তখন আমি মেট্রিক পরীক্ষা শেষ করে বিএএফ শাহীন কলেজের একাদশ শ্রেণির ছাত্র। বিকেলে মোটরসাইকেল চালাতে গিয়ে বাসার কাছেই দুর্ঘটনার শিকার হলাম। খবর পেয়ে বাবা দৌড়ে এসে আমাকে উদ্ধার করলেন এবং দ্রুত ফার্মগেটের আল-রাজী হাসপাতালে ভর্তি করালেন। সেদিন সারা রাত তিনি আমার শয্যার পাশে জেগে ছিলেন। আমার সামান্য কষ্টেও তিনি অস্থির হয়ে উঠছিলেন। বারবার খোঁজ নিচ্ছিলেন, মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিলেন, নিজের উদ্বেগ লুকানোর চেষ্টা করছিলেন।

সেই রাতেই আমি বাবাকে নতুন করে চিনেছিলাম। যে মানুষটিকে সারাজীবন কঠোর মনে হয়েছে, তাঁর বুকভরা ভালোবাসার গভীরতা প্রথমবার উপলব্ধি করেছিলাম। বুঝেছিলাম, তাঁর শাসনের আড়ালে ছিল সীমাহীন মমতা, ছিল সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে অদম্য স্বপ্ন।

আজ বাবা নেই প্রায় নয় বছর। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বুঝতে শিখেছি কেন তিনি আমাদের তিন ভাইকে এত কঠোরভাবে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। কেন তিনি চেয়েছিলেন আমরা জীবনের প্রতিকূলতা, অন্যায় আর ধ্বংসাত্মক শক্তির সামনে মাথা নত না করি। আজ বুঝি, তিনি আমার প্রতি কতটা আস্থা রাখতেন। আশ্চর্যের বিষয়, সেই বিশ্বাস তিনি কখনও সরাসরি আমাকে বলতেন না; বরং তাঁর বন্ধুদের কাছে গর্ব করে আমার কথা বলতেন।আজ আমি নিজেও একজন বাবা। তাই আরও গভীরভাবে উপলব্ধি করি, একজন সন্তানের জন্য একজন বাবার ত্যাগ কত বিশাল হতে পারে।

বাবা, তোমাকে অনেকবার বলতে চেয়েও বলা হয়নি— আমি তোমাকে অনেক ভালবাসি। তোমার শাসন, তোমার ত্যাগ, তোমার নীরব ভালোবাসা আজও আমার জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি। তুমি যেখানে আছো, ভালো থেকো। আল্লাহ তোমাকে জান্নাতের সর্বোচ্চ মর্যাদা দান করুন। আমিন।

 

মো: বদরুল আলম সোহাগ 

অ্যাডভোকেট 

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট

 

 

বাবার শাসনের আড়ালে মায়ার পটভুমি


বাবার শাসন মানেই যেন এক দুর্ভেদ্য দেয়াল, যার ওপারে থাকা অসীম স্নেহের রূপ আমরা শৈশবে বুঝতে চাই না। সমাজ বা সংসারের প্রয়োজনে বাবাদের সবসময় এক গম্ভীর ও কঠোর রূপ ধারণ করতে হয়। কিন্তু সেই কাঠিন্যের আড়ালে যে এক সমুদ্র মমতা লুকিয়ে থাকে, তা উপলব্ধিতে আসে অনেক দেরিতে যখন আমরা নিজেরা জীবনের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হই। আমার বাবাও ঠিক তেমনই। ছোটবেলা থেকে দেখেছি, বাড়ির নিয়মশৃঙ্খলার প্রশ্নে তিনি আপসহীন। পড়ার টেবিলের শৃঙ্খলা, সময়ের গুরুত্ব বা আচরণের মার্জিত ভঙ্গি, প্রতিটি ক্ষেত্রেই তাঁর তীক্ষ্ণ চোখ আমাদের প্রতিটি পদক্ষেপকে নিয়ন্ত্রণ করত। ভুল করলে শাসন ছিল সুনিশ্চিত। তখন মনে হতো, বাবা কেন এমন? কেন অন্য বন্ধুদের বাবার মতো বন্ধুর মতো মিশতে পারেন না? তখন সেই শাসনের আড়ালে লুকিয়ে থাকা উদ্বেগকে আমি অবহেলা করেছি, হয়তো ভয়ও পেয়েছি। অথচ তিনি তখন আমাদের ভবিষ্যতে যেন কোনো বিপদের ছায়া না পড়ে, সে জন্য নিজেই এক ঢাল হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। কিন্তু সময় গড়িয়েছে। এখন কর্মব্যস্ত জীবনের মোড়ে দাঁড়িয়ে বুঝতে পারি, সেই কঠোরতা আসলে ছিল তাঁর ভালোবাসারই অন্য নাম। তিনি জানতেন, এই পৃথিবীটা খুব কঠিন। আর সেই কঠিন পৃথিবীর সাথে লড়াই করার মতো অকুতোভয় মানসিকতা যেন আমার তৈরি হয়, সে জন্যই তিনি ছড়ি হাতে কঠোর ছিলেন। আমি যখন গভীর রাতে পড়ার টেবিলে ঘুমিয়ে পড়তাম, তখন নিঃশব্দে ঘরে ঢুকে মশারি টাঙিয়ে দেওয়া, আমার কপালে হাত রেখে শরীরের তাপমাত্রা মেপে দেখা এসবই তো ছিল সেই কঠোর শাসনের বিপরীতে জমে থাকা কোমল মায়ার নীরব বহিঃপ্রকাশ। তিনি মুখে কিছু না বললেও তাঁর প্রতিটি পদক্ষেপেই ছিল আমার মঙ্গল কামনা।


বাবার সাথে আমাদের দূরত্বটা মূলত এক অদৃশ্য ভাষার। তিনি কখনো আড়ম্বর করে বলেননি, ‘আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি’, কিন্তু তাঁর ঘামে ভেজা প্রতিটি দিন আমার স্বচ্ছল ভবিষ্যতের স্বপ্ন বুনেছে। সংসারের অভাব বা বাইরের জগতের হাজারো চাপের কথাগুলো তিনি কখনো আমাদের বুঝতে দেননি, হাসি মুখে নিজেই সব সামাল দিয়েছেন। আজকের আমি যা কিছু অর্জন করেছি বা যেটুকু মানুষ হওয়ার চেষ্টা করছি, তার প্রতিটি ইটের গাঁথুনির পেছনে রয়েছে তাঁর সেই শাসনের ছায়া আর নিরব ত্যাগের গল্প। মনে জমে থাকা অনেক কথাই তাঁকে বলা হয়নি। বলা হয়নি, “বাবা, তোমার ওই কঠোরতা ছাড়া আমি হয়তো আজ পথ হারিয়ে ফেলতাম।” আজ যখন তাঁর মাথার চুলে রূপালি রঙের ছোঁয়া লেগেছে, যখন তাঁর গলার স্বর কিছুটা দুর্বল হয়ে এসেছে, তখন খুব ইচ্ছে হয় তাঁর চোখের দিকে তাকিয়ে সেই সব না বলা কথাগুলো বলে দিতে। কিন্তু দ্বিধা আর জড়তা আজও দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। শুধু এটুকুই জানি, বাবার কঠোর শাসনের আড়ালে যে কোমল মায়া ছিল, তা আমার জীবনের সবচেয়ে বড় পাওনা। সেই নিঃশব্দ ভালোবাসা কোনো বিশেষ দিনে নয়, প্রতি মুহূর্তে আমাকে আগলে রাখে। তিনি আমার আকাশের সেই ধ্রুবতারা, যার আলো হয়তো সবসময় সরাসরি চোখে পড়ে না, কিন্তু বিপদের ঝড়ে তিনিই পথ দেখান।ছোটবেলায় যে মানুষটি প্রথম আমার হাত ধরে হাঁটতে শিখিয়েছেন আমার প্রথম শিক্ষক এবং পথপ্রদর্শক হয়েছেন মায়ের পরে পরম যত্নে ছায়া দিয়ে আগলে রেখেছেন সে মানুষটি আমার বাবা। তিনি আমার জীবনের সবচেয়ে বড় হিরো।

ছোটবেলায় বাবার হাতে মাথা না রাখলে আমার ঘুম আসত না। বাবার হাতের উপর মাথা রেখে তাঁর কোলে ঘুমিয়ে পড়তাম। সেই ঘুম কত নিরাপদ ছিল তখন বুঝিনি। বাবার ছোট ছোট উপদেশ মিষ্টি শাসন  এগুলোই আমাকে আজকের এতদূর নিয়ে এসেছে। সেই শাসনের আড়ালে যে মায়া আর ভালোবাসা লুকিয়ে থাকত সেটা তখন টের পাইনি এখন প্রতিদিন বুকের ভেতর অনুভব করি।

তিন বছর ধরে বাড়ির বাইরে থেকে পড়াশোনা করছি। মেসের রাতগুলো দীর্ঘ হয় ঘুম আসে না। শুয়ে শুয়ে মনে পড়ে  বাড়িতে বাবার পাশে গা ঘেঁষে শুলে চোখ আপনিই বুজে আসত। এখন সেই ঘুম নেই। রাত বাড়লে ছাদের দিকে তাকিয়ে থাকি মনে হয় বাবার পাশে থাকলে এই অন্ধকারটুকুও অত ভারী লাগত না। দুপুরে বা রাতে একা খেতে বসলে মন চায় না। তখন মনে পড়ে  বাবার পাশে বসে এক টেবিলে খাওয়া তাঁর হাতে তুলে দেওয়া এক গ্রাস ভাত‌ সেই ছোট ছোট আদরগুলো। মেসে থাকতে থাকতে বুঝেছি বাবার উপস্থিতি কতটা অমূল্য ছিল  যা  বাবার কাছে থাকতে বুঝিনি এখন বাবার অনুপস্থিতি প্রতিদিন টের পাই। দূরে থাকলেও ফোনের এপাশ থেকে যখনই কোনো আবদার করি বাবা কখনো না বলেন না। তাঁর কণ্ঠস্বর শুনলে মনে হয় একটু হলেও কাছে গেলাম। ফোনে সেই ছোট ছোট উপদেশ‌ আর তুমি এগিয়ে যাও, আমি তো আছি  এই কথাগুলো দূরে থেকেও আমাকে সাহস দেয়। ছুটিতে বাড়ি গেলে বাবার আদর আর যত্নের কোনো কমতি থাকে না। দরজায় পা দিলেই মনে হয় অনেকদিন পর নিজের জায়গায় ফিরলাম।  মাঝে মাঝে মনে হয় আল্লাহ তাঁকে আমাদের জন্য অফুরন্ত ভালোবাসা দিয়ে পাঠিয়েছেন।

বাবা, তোমার ভালোবাসার গভীরতা আগে কখনো বুঝতে পারিনি। ছোটবেলা থেকে আজ পর্যন্ত নিজে কষ্ট করে আমাকে যেভাবে গড়ে তুলেছ সেই ঋণ শোধ হওয়ার নয়। দূরে এসে বুঝলাম  তুমি কাছে না থাকলে পৃথিবীটা কেমন অসম্পূর্ণ লাগে। ছোটবেলায় তোমার হাত ধরে যে পথ চলা শুরু হয়েছিল সেই পথ আজও তোমাকে ছাড়া একা মনে হয়। তোমাকে  কোনোদিন বলা হয়নি বাবা, তোমাকে আমি জীবনের চেয়েও বেশি ভালোবাসি। দূরে থাকলেও তোমার ভালোবাসা কখনো ভুলতে পারব না। তাই আজ  না বলা অনেক কথা থেকে কিছু কথা লিখে বললাম । বাবা, আমি তোমাকে ভালোবাসি।

 

মোঃ মাজহারুল ইসলাম 

শিক্ষার্থী: সরকারি আজিজুল হক কলেজ, বগুড়া 

 

ভালোবাসা আর বিশ্বাস সবচেয়ে বড় শাসন

বাবা নামটার মধ্যে থাকে শক্তি, সাহস আর পথ চলার ভরসা।  আমার বাবা ঠিক কবে আমাকে শাসন করেছিলো আমার মনে নেই তবে মা একদিন করেছিলো মনে আছে।  তাই বাবার শাসন কেমন হয় তা আমার পক্ষে অনুভব করা সম্ভব হয়নি। অনেকের বাবা যখন শাসন করতো ঠিক সেটা দেখেই লেখা।আজ বাবা নেই প্রায় কয়েক বছর হয়ে গেলো। বাবা আমার রেমিট্যান্স যোদ্ধা, বলতেই বুকে সাহস ফিরে পাই।  বাবার কাজের চাপ আমার পড়াশোনা বিভিন্ন কারণে বাবার সাথে প্রতিদিন কথা বলা হয়না। মাঝে মধ্যে ফোন করে বলি কেমন আছেন, খাওয়া দাওয়া করেছেন কিনা।   দুটো শব্দের মাঝে লুকিয়ে থাকে হাজারো দীর্ঘশ্বাস,  বাবাকে কখনো বলা হয়নি বাবা আমি তোমাকে ভালোবাসি। গ্রামে বড়ো হয়েছি, সেই সুবাদে বাবাকে কখনো জড়িয়ে ধরা হয়নি। জানি না সেই অনুভূতি।  গ্রামে বেড়ে ওঠা হাজারো ছেলে বলতে পাড়বে না বাবাকে জড়িয়ে ধরে দু’চোখে  কোনায় একটু পানি নিয়ে বাবাকে বলেছি বাবা তোমাকে ভালোবাসি। গ্রামে এটাকে ভালোবাসা প্রকাশকে বুঝায় না, বুঝায় আদিখ্যেতা। 

 

মাস শেষে বাবার রক্ত, ঘাম মিশ্রিত টাকা নিয়েও কখনো বলা হয়নি, বাবা তুমি আর একটু কষ্ট করো,  তোমার ছেলে বড় হলে আর তোমাকে কষ্ট করতে হবে না।  বাবা আমাকে সর্বদায় আপনি করে ডাকে।  বাবার মুখে কখনে আমি তুই শব্দটা শুনিনি।  বরঞ্চ আমি বাবাকে অনেকবার শাসন করেছি, কথা শুনেছি। বাবা কেনো আমাকে শাসন করেনি? 

বাবারা সন্তানদের শাসন করে মূলত যৌবন কালে মাদকাসক্ত, রিলেশন বা বড় কেনো অপরাধ করলে।  আমার বাবা জানে আমি কখনো মুখে মাদক উঠবো না।

১।  হয়তোবা শাসন করার প্রয়োজন হয়নি। 

২।  অথবা  বাবা জানে ভালোবাসা আর বিশ্বাস সবচেয়ে বড় শাসন। 

গ্রামে একটা কথা প্রচলিত আছে,  চোখের ভয় সবচেয়ে বড় ভয়।  আসলেই যে চোখ দেখে ভয় পায় না তাকে আপনি শাসন করতে পারবেন শিক্ষা দিতে না।

 

মো: বাপ্পি হোসেন 

সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ

পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

 

বটবৃক্ষের মত নিঃস্বার্থ ভালোবাসায় আগলে রাখার নাম বাবা

মাঈন উদ্দীন রুবেল

 

বাবা মানে আদর, স্নেহ, মায়া-মমতা ও নিঃস্বার্থ 



ভালোবাসায় আগলে রাখার এক মহান ব্যক্তিত্ব। বাবা মানে হৃদস্পন্দন, আস্থা, নির্ভরতা ও ভালোবাসার শেষ আশ্রয়স্থল। বাবা মনে বন্ধু,পথ পদর্শক, যার হাত ধরে হাটা শেখা। বাবা ছেলে-মেয়ের জন্য অমূল্য সম্পদ। বাবা নামক বটবৃক্ষ ছায়া হয়ে পাশে থাকলে মনে হয় যেন বিশ্বটা জয় করা খুব সহজ।

প্রতি বছর জুন মাসের তৃতীয় রবিবার বিশ্ব বাবা দিবস পালিত হয়। এ বছর ২১ শে জুন সারা বিশ্বে বাবা দিবস পালিত হবে। তবে বাবাকে স্মরণ করতে ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা জানাতে কোনো দিনক্ষণের প্রয়োজন হয় না। প্রতি দিনই বাবাকে ভালোবাসা যায়। তারপরও একটা বিশেষ  দিবসের মাধ্যমে পুরো বিশ্ববাসী বাবার প্রতি ভালোবাসা, শ্রদ্ধা,সম্মান  ও নানা আয়োজনের মাধ্যমের তা পালন করতে চাই। তাই আমিও এর ব্যতিক্রম নই, বাবা দিবসে আমিও বাবার অক্লান্ত পরিশ্রম,ত্যাগ,মায়া মমতায় আগলে রাখার সেই মুহুর্তগুলোকে স্মরণ করে বাবার প্রতি দোয়া,শ্রদ্ধা ও সম্মান জানিয়ে দিনটি উদযাপন করে থাকি। ১৯১০ সালের ১৯ জুন বিশ্বে প্রথমবারের মতো পালিত হয় বাবা দিবস। এরপর ১৯২৪ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ক্যালভিন কুলি বাবা দিবসের সম্মতি দেন। ১৯৬৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট লিন্ডন বি. জনসন জুনের তৃতীয় রবিবারকে আনুষ্ঠানিকভাবে বাবা দিবস হিসেবে নির্ধারণ করেন।

বাবা হচ্ছেন একজন ছেলে-মেয়ের উন্নতির শিখড়ে পৌঁছানোর জন্য আর্থিকভাবে, মানসিকভাবে, প্রেষণামূলক, সাহস ও উৎসাহ পাওয়ার বিরাট শক্তি। বাবা এমন একজন মহান পুরুষ যিনি নিজের সুখ বিসর্জন দিয়ে পরিবার ও ছেলে-মেয়েদের সুখের কথা চিন্তা করে দিন-রাত পরিশ্রম করেন। পরিবার ও সন্তানদের মুখে হাসি ফোটানোর চেষ্টা করেন। বাবারা নিজে না খেয়ে ছেলে-মেয়েদের খাওয়ান, নিজে ভালো জামা-কাপড় না পরে ছেলেমেয়েদের পরান। সন্তানদের ভালো রাখার জন্য নিজের শখ আহ্লাদ ত্যাগ করেন। তাদের আলোকিত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার প্রাণপণ চেষ্টা করেন।

ছোটবেলা থেকে কোলেপিঠে মানুষ করে তোলার নিরলস ও অবিশ্রান্ত ব্যক্তির নাম বাবা। ছেলেমেয়েদের যত আবদার সামর্থ্য অনুযায়ী পূরণ করার চেষ্টা করেন। বাবার সমতুল্য ধরণীতে আর কেউ নাই। বাবা এক অতুলনীয় সম্পদ, যার প্রত্যেকটি কথা সন্তানদের জন্য উপদেশ ও অমিয় বাণী। বাবারা সবসময় ছেলে-মেয়েদের উন্নতি ও মঙ্গল কামনা করেন।

বাবা ধনী হোক কিংবা গরিব সব বাবার ইচ্ছা থাকে তার ছেলে-মেয়েদের মানুষের মতো মানুষ করবেন, যারা পরবর্তীতে দেশ, জাতি, এলাকা ও পরিবারের উন্নয়নে অবদান রাখবে। প্রয়োজনে উচ্চ শিক্ষা অর্জনের ক্ষেত্রে দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশ থেকে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জনের জন্য পাঠান। কিন্তু যাদের আর্থিক সামর্থ্য নেই তারা অন্তত দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপিঠে নিয়ে যাওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যান। বাবারা এমনই হয় তারা তাদের শেষ সম্বলটুকু দিয়ে হলেও তাদের ছেলে-মেয়েকে সু-শিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়ে তোলার প্রয়াস করেন। তাদের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ কামনা করেন যেন তারা মানুষের মত মানুষ হয়ে দেশ,জাতি ও পরিবারের সেবায় নিয়োজিত থেকে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। তবে বাবারা অনেক সময় আর্থিক দিক দিয়ে গরিব হলেও, মনের দিক থেকে কখনো গরিব হোন না।  সন্তানদের নিয়ে তারা বিশাল স্বপ্ন বুনে।

কখনো ছেলে-মেয়েদের অসুখ হলে মা-বাবার চোখে ঘুম থাকেনা, তারা সুস্থ হয়ে না ওঠা পর্যন্ত। বাবার আর্থিক অবস্থা যেমনই হোক না কেন বাবা পাশে থাকলে আকাশের ন্যায় অসীম সাহস ও মনোবল তৈরি হয়ে যায়। কিন্তু যার বাবা নেই সে বোঝে বাবা কত বড় অমূল্য সম্পদ, ছায়া হয়ে পাশে থাকা ও ভালোবাসার মানুষ।

বাবা হারিয়েছি আজ প্রায় তেরটি বছর, ২০১৩ সালের আগস্ট মাসের ২৩ শে আগস্ট  বাবাকে হারালাম। সেই থেকে ১৩ টা বছর আর বাবা বলে ডাকা হলো না। মনের গহিনে জমে থাকা শত ব্যথা আর কাউকে বোঝানো যায় না। বাবা তার সারাটি জীবন পার করেছেন ছেলে-মেয়েদের তরে নিজের সুখ বিসর্জন দিয়ে। আজ বাবাকে খাওয়াতে চাইলে বাবা নেই। সুন্দর জামা-কাপড় পরিধান করতে চাইলে বাবা নেই।  বাড়িতে গেলে পুত বলে জড়িয়ে ধরার বাবা নামক সেই মানুষটি নেই। বাবা বলে ডাকবো সেই শব্দটাও বাদ পড়ে গেল। দিন-রাত বাবার কথা মনে পড়ে। ছোটবেলায় একটু অসুস্থ হলে বাবা তার কাঁধে করে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেত, রাত-দিন দেখতো না। কোনো রকম মান-অভিমান হলে, বাবা জড়িয়ে ধরলে সব অশান্তি ও চিন্তা দূর হয়ে যেত।  বাবার হাসি মাখা মুখ আর মায়া ভরা  কথা শুনলে মনটা ভালো হয়ে যেত। বাবার হাতের লেখা ছিলো কত যে সুন্দর টানা টানা লেখা যা আজো স্মৃতি হয়ে রইলো। প্রত্যেকটা ভালো কাজে সাহস যুগাতেন, সুপরামর্শ দিতেন। কিন্তু বাবা না থাকায় পরিবারের এক অপূরণীয় ক্ষতি। যার শূন্যতা কখনো পূরণ হওয়ার নয়।

বাবার বলা কিছু মহামূল্যবান বাল্যশিক্ষার কথাগুলো বারে বারে মনে পড়ে- "খেলায় মজিয়া শিশু কাটায়ও না বেলা, সময়ের প্রতি কভু করিও না হেলা,"  "নদী কভু পান নাহি নিজ নিজ জল, তরুগণ নাহি খায় নিজ নিজ ফল "আপনারে বড় বলে, বড় সেই নয় লোকে যারে বড় বলে বড় সেই হয়। বড় হওয়া সংসারেতে কঠিন ব্যাপার, সংসারে সে বড় হয়, বড় গুণ যার। গুণেতে হইলে বড়, বড় বলে সবে, বড় যদি হতে চাও, ছোট হও তবে,"এমন বাক্যগুলো আজো হৃদয়ে গেঁথে আছে। বাবা হারানোর ব্যথা আজো ভোলার নয়। প্রতি মুহূর্তে বাবার কথা মনে পড়ে, তার উপদেশমূলক কথাগুলো বারবার অন্তরে নাড়া দেয়। এখন বাবা শব্দটা বলে ডাকা আর সম্ভব নয়। বাবা দিবসে বাবাকে ভীষন মনে পড়ে যায়। আল্লাহ তায়ালা বাবাকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করুন।

 

বাবারা যেন শেষ বয়সে কারও বোঝা না হয়। তার জীবন-যৌবন যে ছেলেয়েদের লালন পালনে কাটিয়ে দেন। তার শেষ বয়সে যেন শেষ আশ্রয়স্থলটা পরিবারেই হয়, নাতি-নাতনির পাশে হয়,কোনো বৃদ্ধাশ্রমে যেন না হয়।  বাবা দিবসে সব বাবার প্রতি জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও সালাম। পৃথিবীর সকল বাবা ভালো থাকুক আজকের এই দিনে মহান রবের নিকট এটাই ফরিয়াদ করি।

 

এস.এম. মাঈন উদ্দীন রুবেল 

ইমামুল্লারচর , বোয়ালখালী, চট্টগ্রাম 

 

বিশ্বকাপ এবং বাবা
আহসানুল কবির রিটন

 

১৯৮৬ সালের ২৯ জুন গভীর রাত। গভীর ঘুমে বিভোর আমি। আমরা তখন বাবার চাকরির সুবাদে চট্টগ্রামের বহদ্দারহাট ওয়াপদা কলোনির এফ -১/৬ বাসায় থাকি। বাসায় তখনো টেলিভিশন নামক বক্সটি প্রবেশ করেনি। যে কারণে সে মৌসুমে  ফিফা বিশ্বকাপের বিষয়ে খুব বেশি বুঝতাম না। সেই রাতে মেক্সিকো সিটির এস্তাদিও অ্যাজটেকা স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হচ্ছিলো আর্জেন্টিনা বনাম পশ্চিম জার্মানীর মধ্যে শ্বাসরুদ্ধকর ফাইনাল ম্যাচ।

প্রচন্ড বৃষ্টি হচ্ছিলো সে রাতে। হঠাৎ খেয়াল করলাম বাবা আমাকে ডেকে বলছেন ম্যারাডোনার খেলা দেখবো কিনা। আমি কিছু না বুঝেই লাফ দিয়ে বাবার সাথে ছুটলাম সামনের ভবনের নিচতলায় নাদেরুজ্জামান চাচার বাসায়।

দেখি বাসার সবাই জেগে আছে খেলা দেখার জন্য। চলছিলো খেলাকেন্দ্রিক আগাম আলোচনা সমালোচনা। বাসার এখানে ওখানে ম্যারাডোনা ও আর্জেন্টিনার ছবি ঝুলছে।

এক সময় শুরু হলো খেলা। নির্দিষ্ট সময় শেষ হলো খেলা।

পশ্চিম জার্মানিকে হারিয়ে জিতে নিলো সেবারের বিশ্বকাপ। মুহুর্মুহ করতালি আর শোরগোলে কাটলো সেই রাত।

পদিন দেখি কিশোর-যুবা সবার গায়ে আর্জেন্টিনার পতাকা ও ম্যারডোনার ছবি সম্বলিত গেঞ্জি।

বাবা আগে থেকেই ব্রাজিল সমর্থক ছিলেন। তবে সেদিন থেকে আজ অবদি আমি আর্জেন্টিনার সমর্থক।

৩৯ বছর আগে খেলা দেখতে ছুটেছিলেন বাবা। বাবা এখন আটাত্তরের কোঠায়। এখন বাসায় দুইটি রঙিণ টেলিভিশন। কিন্তু রাত জেগে খেলা দেখার ধৈর্য্য এবং শক্তি কোনটিই নেই তার। দিনেরবেলা খেলা হলে মন দিয়ে তা দেখেন বাবা। রাতের খেলা হলে সকালে আগ্রহ নিয়ে জানতে চান খেলার কি খবর।

বলি খেলার জয়-পরাজয় ও খুটিনাটি নিয়ে। আব্বা পুরোনো দিনের গল্প করেন আর চোখ পানি মোছেন। আর আমার চোখের পানি মুছি গোপনে। বাবারা এমনই হয়।

 

আহসানুল কবির রিটন

স্টাফ করসপনডেন্ট, ইনডিপেনডেন্ট টিভি,

লালখান বাজার, চট্টগ্রাম ব্যুরো

 

 

আমার বাবা মহানায়ক

আমার বাবার সাথে যে কতো স্মৃতি তার একেকটি আমার জীবনের একেকটি অধ্যায়। আমার বাবা আমাকে শাসন করতে গিয়ে আমার গায়ে হাত তুলেছেন এমনটা কোনদিন হয়নি। তার শাসনের চেয়ে স্নেহটাই আমি বেশি পেয়েছি। আমি বুঝতে শিখেই জেনেছি বাবাই আমার শ্রেষ্ঠ বন্ধু, তার সাথে সব কথা বলা যায়। যখন আমি স্কুলে পড়তাম তখন আমি একবার খুব অসুস্থ হয়ে পড়ি। আমার দু'হাতের আঙুলে খোসপাঁচড়া(স্কাবিস) দেখা দেয়। হাতের আঙুল ও আঙুলের মাঝের মাসেলে বিশ্রী নোংরা ধরনের ক্ষত হয়, ভীষণ যন্ত্রণা, পুঁজ বের হতো,হাত দিয়ে তুলে কিছু খাবার মতো সাধ্য আমার ছিল না। সেইসব দিনগুলোতে আমার বাবা আমাকে যে কি পরিমান টেককেয়ার করেছে তা আজ যখন ফিরে দেখি তার প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধায় দু-চোখে জল এসে যায়। সে নিজের হাতে আমার ঘা পরিস্কার করেছে, আমাকে খাইয়ে দিয়েছে। আমি টেরও পাইনি কিভাবে আমি অতো দ্রুত সুস্থ হ'য়ে উঠেছিলাম। আমার বাবার মুখ যখনই আমার সামনে আসে তখনই দেখি এক পরমতসহিষ্ণু,সদা হাসিখুশি,সত্যবাদী,প্রাণচাঞ্চল্যে ভরপুর এক মহানায়ক। এসএসসি পরীক্ষার আগে আমার একবার টাইফয়েড হয়। হাঁটতে পারতাম না,উঠতে বসতে ভীষণ কষ্ট হতো। আমি প্রায় একমাস শয্যাশায়ী ছিলাম। আমার গ্রাম ছিল প্রত্যন্ত এলাকায়, নিকটস্থ বাজার বা শহরের সাথে যোগাযোগ ব্যবস্থা খারাপ ছিল। আমার টাইফয়েডের সময় বাবা অনেক বলে কয়ে শহরের কাছে আমার এক মাসিমার বাড়িতে আমাকে নিয়ে থাকতো। তার ধারণা ছিল শহরের নিকটে কোথাও থাকলে আমার চিকিৎসা ভালো হবে। এখন বুঝতে পারি কোথাও অসুস্থ রোগী নিয়ে থাকা কতটা কষ্টকর। সেবারও বাবার দুরদর্শিতার কারনে আমি দ্রুত সুস্থ হ'য়ে উঠি। আমার বাবার ভূমিকা আমার জীবনের পরতে পরতে মিশে আছে। লেখাপড়া শেষ করার পরও বাবা আমাকে চাকরি ধরার জন্য একদিনও প্রেসার দেয়নি। বাবা এখনোও বলে,'চাকরি একটা অবলম্বন যদি করতে পারো ভালো। কিন্তু মনে রাখবে চাকরিটাই জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য নয়, জীবনের আসল উদ্দেশ্য ভালো মানুষ হওয়া, সততার সঙ্গে চলাফেরা করা।'

বাবা আমি ভালো মানুষ হতে পেরেছি কিনা জানিনা তবে তোমার দেয়া উপদেশ আমিও আমার শিশু কন্যাটিকে দিতে চাই। কারন আমি বিশ্বাস করি তোমার কথা মতো যদি আমার কন্যা চলতে পারে তবে সেও একদিন ভালো মানুষ হবে, দেশ ও জাতির কল্যাণে নিজেকে উজাড় করে দিবে।

 

রাহুল দেব বিশ্বাস

খুলনা সদর, খুলনা

 

জীবন যুদ্ধে হার না মানা  সংগ্রামী বাবার গল্প

প্রত্যেকের কাছে বাবা 'একজন সুপার হিরো'। বাবা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ উপহারগুলোর নিঃসন্দেহে একটি। তিনি শাশ্বত, চির আপন। বাবা দিবসের বিশেষ দিনটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, জীবন সংসারে  প্রতিটি ধাপে বাবার অবদান কতটা গভীর। আমার দেখা এক জীবন যোদ্ধা বাবা ! জীবনের ঊষালগ্ন থেকেই পরিবারের সকল সদস্যর জন্য সংগ্রাম করে বাঁচতে তাকে । ভীষণ দায়িত্ব কর্তব্যের গল্প লুকিয়ে আছে এই বাবা নামক শব্দটিতে। সত্যি বলতে বাবাকে নিয়ে যত বলি কম হবে। বাবা অসাধারণ একজন ফুটবলার ছিলেন। তিনি স্বপ্ন দেখতেন গ্রাম থেকে ওঠে এসে একদিন শহরে ক্লাব -এ খেলবেন। তার স্বপ্ন একসময় থেমে যায়।  ১৯৭০ সালে মাধ্যমিক পাশ করার পর তার পিতা অসুস্থ হয়ে পড়েন। তখন থেকেই সংসারের হাল ধরতে হয়। মহান মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তার আর উচ্চমাধ্যমিক পড়াশুনা শেষ করতে পারেনি।

আমার বাবারা ৭ ভাইবোন। ৬ বোনের মধ্য বাবা পুরুষ একা।  নিন্মবিত্তের সংসার। নিজের সব স্বপ্ন বিসর্জন দিয়ে জীবন যুদ্ধে হার মানতে না চাওয়া সংগ্রামী বাবা নাীরবে পৈত্রিক পেশা 'স্বর্ণশিল্পী ' হিসেবে বেছে নেন। সোনা বা রুপার অলংকার তৈরিতে নিঁখুতভাবে শিক্ষা অর্জন করে। দিনের পর দিন হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে সংগ্রামের পাহাড় ডিঙিয়ে ৬ বোনদের খাওয়া- পড়াশুনার খরচ চালাতে হয়।  ৬ বোনকে তিনি নিজের উপার্জনের টাকা দিয়ে পড়াশুনা করিয়ে বিয়ে পর্যন্ত দেওয়া -এই আদম্য সংগ্রাম ও আত্মত্যাগ বর্তমান সময়ে অসাধারণ মানবিক উদাহরণ । তারপর কেটে গেছে কয়েক বছর। 

তারপর বাবা-মায়ের কোল জুড়ে পৃথিবীর আলো দেখলাম। আমার কতবশত স্মৃতি মনে পড়ে। ছোট থেকেই দেখে আসছি দিনের পর দিন কঠোর পরিশ্রম করে পরিবারের সাফল্য নিশ্চিত করতে বাবা অনেক খেঠেছেন। জীবনের নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি ধৈর্য্য ধরে মোকাবেলা করতে দেখেছি বাবাকে।

বাবা তার কাজে যতটুকু পরিশ্রম করত, দিব্যি সংসার চলে যেত আমাদের। আনন্দ -উল্লাসে সোনালী দিনগুলো ঠিকঠাক চলছিল। বাবা নতুন স্বপ্ন বুনতে শুরু করেছেন আমাদের নিয়ে। সেই সুখও বেশিদিন টিকেনি। ১৯৯৩ সালের এক গভীর রাতে তার তিলে তিলে গড়ে তোলা ব্যবসা  প্রতিষ্ঠানে আগুণ লাগে।  সেই দূঘর্টনায় জমানো টাকা, দোকান ও মহামূলবান জিনিসপত্র পুড়ে তার স্বপ্ন ছাই হয়ে যায় অল্প সময়ের মধ্য। তবুও কখনো তাকে কান্না করতে দেখেনি। 

আমরা দুইভাই বোন  তখন স্কুলে পড়ি। ১৯৯৭ সাল। আমার ঠাকুরমার (বাবার মা)  হঠাৎ মরণব্যাধি ক্যান্সার ধরা পরে। ক্যান্সারের ব্যয়বহুল খরচ চালাতে গিয়ে হিমশিম খেতে হয়েছে তাকে।  তার জমানো কষ্টের টাকা আর ধার- দেনা করে চিকৎসার টাকা জুগিয়েছে প্রিয় মাকে বাঁচাতে। শেষ রক্ষা হয়নি। দেড় বছর ক্যান্সরের সঙ্গে লড়াই করে মারা যান। আমি তখন অনেক ছোট। তবুও দমে যান নি। পরিবার ও সন্তানদের মুখে হাসি ফোটাতে ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল করতে আজীবন দিন রাত অক্লান্ত পরিশ্রম করে গেছেন। ছেলে মেয়েদের আদর্শ মানুষ করার জন্যই বাবার নিরলস চেষ্টা। আমি যতবার ভেঙে পরি, এই মানুষটা আমাকে বার বার গড়ে তোলে। বাবা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সম্পদ। আদর স্নেহ, ভালোবাসা,  আস্থা,ভরসা, বিশস্ততা আর পরম নির্ভরতার নাম বাবা। আমার জীবনের রোল মডেল। তার মতে হতে পারাটাই আমার জীবনের বড় সাফল্য। এই হলো আমার বাবার 

জীবন যুদ্ধে হার না মানা  সংগ্রামী  গল্প।

রাজীব পাল রনী 

টংগিবাড়ী, মুন্সিগঞ্জ

 

আব্বা

নিলুফার রুখসানা   

জীবনে এতোটা বড় কোনোদিন হতে চাইনি, যে জীবনে বাবা মা হারিয়ে যায়...! ছোটবেলায় বাবা মা, ভাই বোন মিলে অদ্ভূত মায়ার এক সংসার থাকে। ছায়ায়  মায়ায় মোড়ানো ঘরদোর। সে আঙিনায় সারাদিন হৈ হুল্লোড়, ছোট ছোট দুঃখ কষ্ট থাকে, কিন্তু নিঃস্ব হয়ে যাবার মতো, শেকড়হীন হবার মতো যন্ত্রণা এক বিন্দুও থাকেনা, যে জীবনে আব্বা থাকেন ... ।

ঠিক কবে থেকে আব্বার পিছনে পিছনে সারাক্ষণ ঘুরঘুর করি ঠিক মনেও পড়েনা। আব্বা যেখানেই যেতেন, প্রায় সবখানেই আমাকে সঙ্গে নিয়ে যেতেন। শিক্ষকতার  সীমিত সামর্থ্যেও বালিকা আমাকে দই, পুরি খাওয়াতে নিয়ে যেতেন, ‘ইলোরা অথবা সাজ্জাদে (রেস্টুরেন্ট)’।

তারপর আব্বা, আমাদের পড়ালেখার জন্য,  প্রিয় গ্রাম ছেড়ে একদিন পাড়ি জমালেন অচেনা মফস্বলে। আব্বা আম্মার হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রমের নতুন আবাস।

একদিন স্কুল কলেজের পালাও ফুরালো, নতুন ঠিকানা হলো জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়,  সে যাত্রাও আব্বার হাত ধরে। আহা সময়, কখন পালালো!

আজকাল প্রায়ই ভাবি, যদি আর কিছুদিন আব্বাকে দেখতে পেতাম ! তারা সত্যি ভাগ্যবান, যারা হাত বাড়ালেই মা বাবাকে ছুঁতে পারে…  

হাজার মাইলের দূরত্বে, সাদা কাফনে মোড়া আব্বা যেন পরিচিত ঘুমে ডোবা। তবু,  কখনো মুহূর্তের জন্যও আমার অন্ততঃ  মনেহলোনা , আমাদের আব্বাও কোনোদিন অনন্ত যাত্রায় হারিয়ে যেতে পারেন! আব্বা আল্লাহ্‌র মেহমান হয়েছেন, সাড়ে তিন হাত তাঁর মাটি ! অথচ অবলীলায় আমার সবটুকু আশ্রয় তিনি সঙ্গে নিয়ে গেছেন।

এরপরে যতবার দেশে গিয়েছি, আমার মন বলেছে, এয়ারপোর্টে ঠিক আব্বাকে দেখতে পাবো। সেই গিজগিজে মানুষের ভীড়ে, আকুল হয়ে খুঁজেছি। অবিশ্বাস্য চোখে কান্না লুকিয়েছি, এয়ারপোর্টে নাই! তাহলে নিশ্চয়ই অন্যকোথাও। হতভাগ্য আমি, শেষ  দেখাটাও পাইনি আব্বার ...

 তারপর ছুটেছি গ্রামের বাড়ি, প্রতিটি ধূলোকণা পথঘাট, মাঠ অথবা ঘাস, যেখানে আব্বার ছোঁয়া লেগে আছে। এখানেই আমাদের পারিবারিক গোরস্তান, আব্বা, দাদা দাদী, চাচা, চাচীসহ আরো কতো স্বজন চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন। আব্বার কবরখানা দেখে আমার পাঁজর ভেঙ্গে এলেও, মাথা আর মন জুড়ে  তীব্র দ্বৈত অনুভূতি, না এখানে কেউ নেই!

সময় ফুরায়, পরবাসে ফিরি একা। অনেক দোয়ায় আগলে রেখে, বিদায় জানানোর আমার  কেউ নেই আর। আব্বা, আপনি আছেন… অনন্ত অপেক্ষার চোখ ভরা নোনা জলে আমি খুঁজবো স্বদেশের আনাচ-কানাচ অথবা ওপারে...

মনেহলো, আব্বা এখানে থাকতেই পারেন না, কোনোদিন না! এই দোলাচলের নির্মম অনুভূতি নিয়েই আমি বারবার চোখ ভর্তি জল সমেত দূর পরবাসে ফেরত আসি…  আর মনেহয় এই বোধহয় এলো আব্বার কল! চোখ ঝাপসা হতে হতে ভাবি, এতো ভালোবাসা যাদেরকে আপনি দিলেন, তাদেরকে ফেলে কিভাবে পারলেন চলে যেতে? সৃষ্টিকর্তা কেন আমাকে আরো কিছুদিন আপনাকে শুধু চোখের দেখা দেখতে দিলেন না? আমি জানি না তিনি কেন এভাবে সবটা কেড়ে নেন?

আমার সব কথা তো আপনাকে বলাও হয় নাই! আব্বার মতো করে আর কেউ কখনো আমাকে ভালোবাসেনি…

বিশ্বাস করেন আব্বা, আমার আর গভীর দুঃখে কোথাও  যাওয়ার নাই!

 

 

 

 

 

 

 

 

 


 

 

 

 

 

 

 

 

 

থাইরয়েড নিয়ন্ত্রণে সেলেনিয়াম কেন জরুরি, জানুন কী খাবেন

জীবনযাপন ডেস্ক
থাইরয়েড নিয়ন্ত্রণে সেলেনিয়াম কেন জরুরি, জানুন কী খাবেন
সংগৃহীত ছবি

থাইরয়েডের সমস্যা এখন ঘরে ঘরে দেখা যায়। থাইরয়েড আমাদের শরীরের একটি গ্রন্থি, যা থেকে তৈরি হওয়া হরমোন মানুষের শরীরের নানা কাজ নিয়ন্ত্রণ করে। এর মধ্যে রয়েছে বিপাকক্রিয়া, শিশুদের বেড়ে ওঠা ও বুদ্ধির বিকাশ, বয়ঃসন্ধির লক্ষণ, নারীদের ঋতুচক্র ও সন্তান ধারণের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কোনো কারণে শরীরে এই হরমোনের ভারসাম্য বিগড়ে গেলে ক্লান্তি, অল্পতেই হাঁপিয়ে যাওয়া, দ্রুত ওজন পরিবর্তন হওয়া কিংবা অনিয়মিত ঋতুস্রাবের মতো লক্ষণ দেখা দেয়। এই রোগ নিয়ন্ত্রণে ওষুধের পাশাপাশি জীবনযাত্রা ও খাবারে বদল আনা ভীষণ জরুরি। পুষ্টিবিদ ও চিকিৎসকদের মতে, থাইরয়েড নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রতিদিনের ডায়েটে সেলেনিয়ামযুক্ত খাবার রাখা খুবই দরকার। এই উপাদানটি আমাদের থাইরয়েড গ্রন্থির কার্যকারিতা বাড়াতে সরাসরি সাহায্য করে। চলুন, জেনে নিই শরীরে সেলেনিয়ামের কাজ কী কী।

হরমোন সক্রিয় করা : এটি শরীরের টি-ফোর হরমোনকে কার্যকর টি-থ্রি হরমোনে রূপান্তর করতে সাহায্য করে।

রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা : শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বা ইমিউনিটি বাড়াতে এটি ভূমিকা রাখে।

গ্রন্থি রক্ষা : থাইরয়েড গ্রন্থিকে এক ধরনের মানসিক ও শারীরিক চাপ বা অক্সিডেটিভ স্ট্রেস থেকে রক্ষা করে।

প্রতিদিনের চেনা কিছু খাবার থেকেই খুব সহজে এই পুষ্টি উপাদানটি পাওয়া সম্ভব।

সামুদ্রিক খাবার : বিভিন্ন ধরনের সামুদ্রিক মাছ, কাঁকড়া ও চিংড়ি সেলেনিয়ামের ভালো উৎস।

ডিম : প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় ডিম রাখলে সহজেই সেলেনিয়াম পাওয়া যায়।

দানাশস্য : কমপ্লেক্স কার্বোহাইড্রেট বা দানাশস্য যেমন কিনোয়া, ডালিয়া ও ওটস।

অন্যান্য : রসুন, সূর্যমুখীর বীজে প্রচুর পরিমাণে সেলেনিয়াম থাকে।

একজন সুস্থ ও প্রাপ্তবয়স্ক নারী বা পুরুষের জন্য প্রতিদিন ৫৫ মাইক্রোগ্রাম সেলেনিয়ামই যথেষ্ট। তবে অন্তঃসত্ত্বা নারী ও যেসব মায়েরা শিশুকে স্তন্যপান করাচ্ছেন, তাদের শরীরে সেলেনিয়ামের চাহিদা সাধারণের চেয়ে কিছুটা বেশি থাকে।

সতর্কবার্তা : উপকারী বা স্বাস্থ্যকর মনে করে কোনো খাবারই অতিরিক্ত খাওয়া ঠিক নয়, এতে হরমোনের সমস্যা আরো বাড়তে পারে। তাই আপনার শারীরিক অবস্থা বুঝে ঠিক কতটা সেলেনিয়াম খাওয়া উচিত, তা একজন চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের সঙ্গে পরামর্শ করে নির্ধারণ করাই সবচেয়ে নিরাপদ।

অনলাইনে ফ্রিতে বিশ্বকাপের খেলা দেখে বিপদে পড়ছেন না তো?

অনলাইন ডেস্ক
অনলাইনে ফ্রিতে বিশ্বকাপের খেলা দেখে বিপদে পড়ছেন না তো?
সংগৃহীত ছবি

চলছে ফুটবল বিশ্বকাপ ২০২৬। বিশ্বকাপ ঘিরে উন্মাদনায় সমর্থকরা। পছন্দের দলের খেলা দেখতে উৎসবে মাতেন তারা। অনেকে খেলা দেখার জন্য অনলাইনে লিংকে খোঁজেন। সার্চের ফলাফলে আসা লিংকে প্রবেশ করলে জুয়ার সাইটে নিয়ে যায় আবার নির্দেশনানুযায়ী অ্যাপ ডাউনলোড করতে বলে। এসব লিংকে ক্লিক করলে চুরি হতে পারে আপানার ব্যক্তিগত তথ্য।

সাইবার নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, ফ্রিতে অনলাইনে খেলা দেখানোর এসব লিংকে প্রবেশ করলেই অনেক ক্ষেত্রে তার ডিভাইস, অনলাইন কার্যক্রম ও ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ বা চুরি করা হয়ে থাকে।

সাইবার নিরাপত্তা বিশ্লেষক তানভীর হাসান জোহা বিবিসি বাংলাকে বলেন, ‘ফ্রি অনলাইন ফুটবল স্ট্রিমিং সাইট ব্যবহার করলে বড় ধরনের সাইবার নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এ ছাড়া ব্যক্তিগত তথ্য, পাসওয়ার্ড, ব্যাংকিং তথ্য ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্টের তথ্য চুরির ঝুঁকিও থাকে।’

বিশ্বকাপ ফুটবল, ক্রিকেটসহ বড় কোনো ক্রীড়া আসর শুরু হলে অনলাইনে খেলা দেখতে দর্শকদের আগ্রহ বেড়ে যায়।

বাংলাদেশের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে অসংখ্য অননুমোদিত লিংক ছড়িয়ে দিয়ে প্রতারণার ফাঁদ তৈরি করা হয়।

তথ্য সূত্র :  বিবিসি


 

ঘামাচি ও র‍্যাশের ঘরোয়া সমাধান নিমপাতা, যেভাবে করবেন ব্যবহার

জীবনযাপন ডেস্ক
ঘামাচি ও র‍্যাশের ঘরোয়া সমাধান নিমপাতা, যেভাবে করবেন ব্যবহার
সংগৃহীত ছবি

তীব্র গরমে ঘামাচি, র‍্যাশ, ব্রণ ও চুলকানির সমস্যায় কমবেশি সবাই ভোগেন। এসব সমস্যা থেকে বাঁচতে অনেকেই দামি বডিওয়াশ, সিরাম বা ট্যালকম পাউডার ব্যবহার করেন, যা অনেক সময় কোনো কাজে আসে না। তবে নামী-দামী প্রসাধনী ছাড়াই প্রকৃতির কোল থেকে মিলতে পারে এর স্থায়ী সমাধান। একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে, নিমপাতায় থাকা অ্যান্টি-ব্যাকটেরিয়াল ও অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি উপাদান ত্বকের যেকোনো সংক্রমণ ও গরমের সমস্যা দূর করতে অত্যন্ত কার্যকরী। চলুন, জেনে নিই ত্বকের সুরক্ষায় নিমপাতা ব্যবহারের সহজ উপায়।

নিম পানিতে গোসল
এক মুঠো তাজা নিমপাতা দুই গ্লাস পানিতে ভালো করে ফুটিয়ে নিন। এরপর পানিটি ছেঁকে নিয়ে গোসলের বালতির পানির সাথে মিশিয়ে নিন। এই পানি দিয়ে গোসল করলে ঘামাচি দূর হয় এবং শরীর ঠাণ্ডা থাকে। যাদের পিঠে ও বুকে ব্রণ হয়, তাদের জন্য এই পদ্ধতি বেশ উপকারী।

নিম ও হলুদের মাস্ক
গরম ও আর্দ্রতার কারণে ত্বকে তেলের ভাব বেড়ে যায়। এই তেল ও ব্রণ দূর করতে তাজা নিমপাতা বাটার সাথে এক চিমটি হলুদ এবং সামান্য গোলাপ জল মিশিয়ে প্যাক তৈরি করুন। এটি ত্বকে লাগিয়ে ১৫ মিনিট পর ধুয়ে ফেলুন। এতে ত্বকের আর্দ্রতা ঠিক থাকবে এবং ত্বক সতেজ দেখাবে।

সানবার্নে অ্যালোভেরা ও নিম
রোদে ত্বক পুড়ে লাল হয়ে গেলে বা জ্বালাপোড়া করলে নিমপাতা থেঁতো করে তার সাথে ঠাণ্ডা অ্যালোভেরা জেল মিশিয়ে ত্বকে লাগান। এই মিশ্রণটি ত্বকের ক্ষত সারিয়ে তোলে এবং দ্রুত আরাম দেয়।

নিম চা
শরীরের ভেতর টক্সিন বা বর্জ্য জমা হলে ত্বকে ব্রণ ও র‍্যাশ বেশি দেখা দেয়। রক্ত পরিষ্কার করতে এবং লিভার ভালো রাখতে তাজা নিমপাতা ফোটানো পানি বা নিম চা পান করতে পারেন। স্বাদ কিছুটা তেতো হলেও শরীরকে ভেতর থেকে সুস্থ রাখতে এটি দারুণ কাজ করে।

ত্বকের যত্নে নিম তেল
মশার কামড় থেকে বাঁচতে এবং ত্বকের চুলকানি ও প্রদাহ কমাতে নিম তেল ব্যবহার করতে পারেন। তবে সরাসরি না মেখে, নারিকেল তেল বা আমন্ড অয়েলের সাথে কয়েক ফোঁটা কোল্ড-প্রেসড নিম তেল মিশিয়ে ত্বকে ম্যাসাজ করলে ভালো ফল পাওয়া যায়। এটি খুশকি ও উকুন দূর করতেও সাহায্য করে।

সূত্র : এই সময়

অফিসে কাজের মাঝে প্রতিদিন ঘুম পাচ্ছে? যা করবেন | কালের কণ্ঠ