প্রেমে ব্যর্থতা, সম্পর্ক ভাঙন, মানসিক চাপ বা গভীর মনখারাপের সময় অনেকেরই খাবারের প্রতি আচরণ বদলে যায়। কেউ খাওয়ার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন, আবার কেউ অতিরিক্ত খাওয়া শুরু করেন। বিশেষ করে পিৎজা, বার্গার, চিপস, পেস্ট্রি বা ভাজাপোড়ার মতো মুখরোচক খাবারের প্রতি ঝোঁক বেড়ে যায়। মন খারাপের মুহূর্তে এসব খাবার সাময়িক স্বস্তি দিলেও দীর্ঘমেয়াদে তা শারীরিক ও মানসিক—দুই ধরনের ক্ষতির কারণ হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আবেগের বশে অতিরিক্ত খাওয়ার অভ্যাস বা ‘ইমোশনাল ইটিং’ বর্তমানে বেশ সাধারণ একটি সমস্যা। গবেষণায় দেখা গেছে, খাবারের সঙ্গে মানুষের মানসিক অবস্থার গভীর সম্পর্ক রয়েছে। শরীরে প্রয়োজনীয় ভিটামিন ও খনিজের ঘাটতি যেমন মানসিক সুস্থতায় প্রভাব ফেলে, তেমনি অতিরিক্ত চিনি, প্রক্রিয়াজাত খাবার ও তেল-চর্বিযুক্ত খাবার উদ্বেগ, অবসাদ এবং মানসিক অস্থিরতা আরো বাড়িয়ে দিতে পারে।
খাওয়ার আগে একটু থামুন
মন খারাপের কারণে হঠাৎ করে চিপস, চানাচুর বা মিষ্টি জাতীয় খাবার খেতে ইচ্ছা হলে সঙ্গে সঙ্গে খেতে শুরু না করাই ভালো। কয়েক সেকেন্ড সময় নিয়ে নিজেকে প্রশ্ন করুন- সত্যিই কি ক্ষুধা পেয়েছে, নাকি শুধু আবেগের কারণে খেতে ইচ্ছা করছে? অনেক সময় এই ছোট্ট বিরতিই অপ্রয়োজনীয় খাওয়া থেকে বিরত রাখতে সাহায্য করে।
নিয়মিত খাবারের অভ্যাস বজায় রাখুন
মন খারাপ থাকলেও সকালের নাশতা, দুপুরের খাবার ও রাতের খাবার এড়িয়ে যাওয়া ঠিক নয়। ক্ষুধা কম থাকলেও নির্দিষ্ট সময়ে অল্প করে হলেও খাবার খাওয়ার চেষ্টা করা উচিত। খাদ্যতালিকায় ফল, শাকসবজি, ডাল, মাছ, ডিম এবং অন্যান্য প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার রাখলে শরীর যেমন পুষ্টি পায়, তেমনি মানসিক স্বাস্থ্যেরও উপকার হয়। বিশেষ করে ভিটামিন সি, ভিটামিন ডি, জিঙ্ক ও ফোলেট মানসিক সুস্থতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
জাংক ফুড হাতের নাগালের বাইরে রাখুন
ঘরে যদি সবসময় চিপস, কোল্ড ড্রিংকস, পেস্ট্রি বা ভাজাপোড়া খাবার মজুদ থাকে, তাহলে সেগুলো খাওয়ার প্রবণতাও বাড়ে। তাই এসব খাবার কম কিনুন এবং সহজে হাতের কাছে না রাখাই ভালো। এর পরিবর্তে বাদাম, মাখানা, শুকনো ফল, ডার্ক চকলেট, ঘরে তৈরি হালকা নাশতা বা ফলমূল কাছে রাখুন। ক্ষুধা লাগলে এগুলো খেলে শরীরও ভালো থাকবে, অতিরিক্ত ক্যালরিও জমবে না।
শরীরচর্চাকে গুরুত্ব দিন
মানসিক চাপ কমাতে ব্যায়াম অত্যন্ত কার্যকর। নিয়মিত হাঁটা, দৌড়ানো, যোগব্যায়াম বা প্রাণায়াম করলে শরীরে এন্ডোরফিনসহ বিভিন্ন ‘ফিল-গুড’ হরমোন নিঃসৃত হয়, যা মন ভালো রাখতে সাহায্য করে। প্রতিদিন অন্তত ২০ থেকে ৩০ মিনিট শরীরচর্চার অভ্যাস মানসিক অস্থিরতা কমাতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
খাওয়ার ইচ্ছা হলে অন্যদিকে মনোযোগ দিন
অনেক সময় খাবারের প্রতি আকর্ষণ আসলে ক্ষুধার কারণে নয়, বরং আবেগের কারণে তৈরি হয়। এমন পরিস্থিতিতে প্রথমে এক গ্লাস পানি পান করতে পারেন। এরপর নিজেকে কিছুটা সময় দিন। পছন্দের বই পড়া, গান শোনা, বন্ধু বা পরিবারের কারও সঙ্গে কথা বলা কিংবা অন্য কোনো কাজে মনোযোগ দিলে অতিরিক্ত খাওয়ার তাগিদ অনেকটাই কমে যেতে পারে।
সাময়িক স্বস্তির বদলে দীর্ঘমেয়াদি সুস্থতা
মন খারাপের সময়ে জাংক ফুড হয়তো কয়েক মুহূর্তের জন্য ভালো লাগা এনে দিতে পারে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে এই অভ্যাস চলতে থাকলে তা ওজন বৃদ্ধি, হজমের সমস্যা, ক্লান্তি এবং মানসিক স্বাস্থ্যের আরও অবনতির কারণ হতে পারে। তাই আবেগ নিয়ন্ত্রণের জন্য খাবারের ওপর নির্ভর না করে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন ও সচেতন খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলাই সবচেয়ে কার্যকর উপায়।