বলিউডের পরিচিত প্রযোজক এবং প্রাক্তন সেন্ট্রাল বোর্ড অব ফিল্ম সার্টিফিকেশন (সিবিএফসি) চেয়ারম্যান পহলাজ নিহালানি আর নেই। ৭৬ বছর বয়সে বৃহস্পতিবার তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর মৃত্যুতে চলচ্চিত্র মহলে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে লিভারের সমস্যায় ভুগছিলেন নিহালানি। চিকিৎসাধীন ছিলেন মুম্বইয়ের নানাবতী হাসপাতালে। বৃহস্পতিবার তাঁর মৃত্যুর খবর প্রথম নিশ্চিত করেন ঘনিষ্ঠ বন্ধু শশী রঞ্জন। পরে বিভিন্ন চলচ্চিত্র সংগঠন ও সংশ্লিষ্ট মহলও বিষয়টি নিশ্চিত করে। পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ৪ জুন ২০২৬ তারিখে তিনি মারা যান এবং সেদিন বিকেল ৩টেয় মুম্বইয়ের সান্তাক্রুজ হিন্দু শ্মশানে তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে।
১৯৫০ সালের ১০ জানুয়ারি মুম্বাইয়ের একটি সিন্ধি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন নিহালানি। ছোটবেলা থেকেই চলচ্চিত্র ব্যবসা ও দর্শকের রুচি সম্পর্কে তাঁর স্পষ্ট ধারণা ছিল। এই বাণিজ্যিক বোধই পরবর্তীতে তাঁকে হিন্দি চলচ্চিত্র প্রযোজনার জগতে প্রতিষ্ঠিত করে।
১৯৮২ সালে শত্রুঘ্ন সিনহা অভিনীত ছবি 'হাথকড়ি' দিয়ে প্রযোজক হিসেবে তাঁর যাত্রা শুরু হয়। এরপর দ্রুতই তিনি বাণিজ্যিক হিন্দি সিনেমার পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন।
১৯৮৬ সালে নির্মিত 'ইলজাম' ছবির মাধ্যমে অভিনেতা গোবিন্দা-কে প্রথম বড় সুযোগ দেন তিনি। পরবর্তী সময়ে এই ছবিই গোবিন্দার কর্মজীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। একইভাবে ১৯৮৭ সালের 'আগ হি আগ'-এর মাধ্যমে চাঙ্কি পান্ডে-কেও বলিউডে পরিচিত করে তোলেন তিনি।
এরপর একের পর এক বাণিজ্যিক সফল ছবির মাধ্যমে নিজের অবস্থান আরও শক্ত করেন নিহালানি। 'শোলা অউর শবনম', 'আঁখে', 'দিল তেরা দিওয়ানা, 'তলাশ' এবং 'রঙ্গিলা রাজা'- সহ তাঁর প্রযোজিত ছবির তালিকায় রয়েছে বহু জনপ্রিয় নাম। বলিউডের একাধিক বড় তারকার সঙ্গে কাজ করেছেন তিনি।
চলচ্চিত্র প্রযোজনার পাশাপাশি তিনি দীর্ঘদিন সংগঠনিক দায়িত্বও সামলেছেন। প্রায় তিন দশক ধরে তিনি অ্যাসোসিয়েশন অব মোশন পিকচারস অ্যান্ড টিভি প্রোগ্রাম প্রডিউসার্স-এর সভাপতিও ছিলেন।
তবে তাঁর জীবনের সবচেয়ে বিতর্কিত অধ্যায় শুরু হয় ২০১৫ সালে, যখন কেন্দ্রীয় তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রক তাঁকে সিবিএফসি- এর চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ করে। ২০১৭ সালের আগস্ট পর্যন্ত তিনি এই পদে ছিলেন। এই সময়কালে একাধিক সিদ্ধান্ত নিয়ে তিনি ব্যাপক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন।
চেয়ারম্যান হিসেবে তাঁর সময়ে বিভিন্ন চলচ্চিত্রে কাটের সংখ্যা, সংলাপ পরিবর্তন এবং দৃশ্য নিয়ন্ত্রণ নিয়ে একাধিক বিতর্ক তৈরি হয়। বিশেষ করে 'উড়তা পাঞ্জাব' ছবিতে ৮৯টি কাটের প্রস্তাব ঘিরে সবচেয়ে বড় বিতর্ক তৈরি হয়, যা পরে আদালত পর্যন্ত গড়ায়।
এছাড়া 'লিপস্টিক আন্ডার মাই বোরখা', 'আলিগড়', 'স্পেক্টর' এবং 'আনফ্রিডম'-এর মতো ছবির সার্টিফিকেশন নিয়েও তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছিল।
চলচ্চিত্র মহলের একাংশ তাঁর সিদ্ধান্তের সমালোচনা করলেও, তিনি বারবার দাবি করেছেন যে তিনি বোর্ডের নিয়ম অনুযায়ীই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
২০১৭ সালে তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন গীতিকার প্রসুন জোশী। তবে সিবিএফসি থেকে বিদায় নেওয়ার পরও তিনি চলচ্চিত্র প্রযোজনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
তাঁর মৃত্যুতে বর্তমান সিবিএফসি চেয়ারম্যান শশী শেখর ভেম্পতি শোক প্রকাশ করেছেন। চলচ্চিত্র জগৎজুড়ে বিভিন্ন মহল থেকেও শোকবার্তা আসছে।
স্ত্রী নীতা নিহালানি ও তিন পুত্রকে রেখে পহলাজ নিহালানির প্রয়াণে বলিউড হারাল এমন এক ব্যক্তিত্বকে, যিনি একদিকে সফল প্রযোজক, অন্যদিকে ছিলেন তীব্র বিতর্কের কেন্দ্র। তাঁর কাজ ও সিদ্ধান্ত নিয়ে মতভেদ থাকলেও, হিন্দি চলচ্চিত্র ইতিহাসে তাঁর উপস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী ছাপ রয়ে যাবে।





