কিছু মানুষ সময়ের অংশ হন, আর কিছু মানুষ সময়কেই বদলে দেন। মাইকেল জ্যাকসন ছিলেন ‘সময়কে বদলে দেওয়া’ বিরল মানুষদের একজন। পৃথিবীতে খুব কম সংগীতশিল্পী আছেন, যাদের নাম উচ্চারণ করলেই চোখের সামনে শুধু একজন গায়ক নন, ভেসে ওঠে একটি যুগ, একটি অধ্যায়। মাইকেল জ্যাকসন তেমনই এক কিংবদন্তি—যিনি সংগীত, নাচ, ফ্যাশন, মিউজিক ভিডিও এমনকি বিশ্ব পপসংস্কৃতির সংজ্ঞাই বদলে দিয়েছিলেন।
পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষের কৈশোর-তারুণ্যের বিস্ময়, উন্মাদনা আর স্বপ্নের সঙ্গে মিলেমিশে এক হয়ে আছে ‘জাদুকরী মাইকেল’। তাঁর মুনওয়াক শুধু একটি মঞ্চ মাতানো পারফর্মিং নয়, অনবদ্য এক ইতিহাস। তাঁর গানের লয়ে একযোগে মানুষ উচ্ছ্বসিত হয়েছে, কেঁদেছে, ভেবেছে, এমনকি জাতি-বর্ণের ভেদ ভুলে ঐক্যের বন্ধনে যুক্ত হয়েছে। ‘হিল দ্য ওয়ার্ল্ড’, ‘ম্যান ইন দ্য মিরর’ অথবা ‘আর্থ সং’-এর মতো গান যেন মানবতার পক্ষ থেকে উচ্চারিত একেকটি আর্তনাদ।
এমন এক কিংবদন্তিকে সেলুলয়েডে তুলে আনা এককথায় অকল্পনীয়। আর তাই তাঁকে নিয়ে বায়োপিক ‘মাইকেল’ মুক্তি পাওয়ার অনেক আগে থেকেই চলছিল আলোচনা। আর গত ২৪ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্রে মুক্তি পাওয়ার পর থেকে শুধুই বিশ্বজয়ের গল্প।
মুক্তির এক মাসের কিছু বেশি সময়ের মধ্যে ‘মাইকেল’ আয় করেছে প্রায় ৮৪ কোটি ৬৩ লাখ ডলার। চলচ্চিত্রটি পৌঁছে গেছে রেকর্ড গড়ার দ্বারপ্রান্তে। বিশ্ব চলচ্চিত্রের ইতিহাসে মিউজিক বায়োপিক হিসেবে এখন পর্যন্ত এর চেয়ে বেশি আয় করেছে ‘বোহেমিয়ান র্যাপসোডি’। তবে কুইন ব্যান্ড ও ফ্রেডি মার্কারিকে ঘিরে ২০১৮ সালে নির্মিত সেই চলচ্চিত্রের এখন পর্যন্ত আয় প্রায় ৯১ কোটি ১০ লাখ ডলার। ফলে মোটামুটি নিশ্চিত করেই বলা যায়, আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ‘মাইকেল’ সেই রেকর্ড ভাঙতে যাচ্ছে।

এ তো গেল ‘মাইকেল’-এর ব্যবসা সাফল্যের কথা, কী আছে এই চলচ্চিত্রে যা সারা বিশ্বে কোটি কোটি মানুষকে আবার ফিরিয়ে নিয়ে গেছে সেই ১৯৮০-এর দশকের মহামন্দ্রে, যেখানে সুপ্তি হয়ে যায় লীন?
হলিউডের বিখ্যাত পরিচালক অ্যান্টোইন ফুকো নির্মিত ‘মাইকেল’-এর বৈশ্বিক আয়ের প্রায় ৬০ শতাংশই এসেছে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার বাইরের বাজার থেকে। অর্থাৎ এর মধ্যে দিয়ে প্রমাণিত এই সিনেমা আবার বিশ্বব্যাপী উসকে দিয়েছে মাইকেল জ্যাকসনের প্রতি ভালোবাসা। এটি কেবল একটি সিনেমা নয়; এক কিংবদন্তিকে পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা, যাকে গোটা পৃথিবী একসঙ্গে ভালোবেসেছে, অবাক বিস্ময়ে অনুসরণ করেছে, আবার একই সঙ্গে বহু বিতর্ক নিয়ে প্রশ্নও তুলেছে।
সিনেমাটির সবচেয়ে বড় শক্তি নিঃসন্দেহে জাফার জ্যাকসন। মাইকেলের নিজের ভাতিজা হওয়ায় তার ওপর প্রত্যাশার চাপ ছিল ভয়ংকর। যারা চলচ্চিত্রটি দেখেছেন তাঁরা এক বাক্যে স্বীকার করবেন জারমেইন জ্যাকসনের ছেলে ২৯ বছর বয়সী জাফার সেই প্রত্যাশা বেশ ভালোভাবেই পূরণ করেছেন। বিস্ময়করভাবে জাফার সিনেমার পর্দায় শুধু মাইকেলের মতো দেখতে নন, মনে হয় তিনিই যেন মাইকেলের আত্মিক উপস্থাপন।
অবাক করা তথ্য হচ্ছে—জাফার এর আগে কখনোও অভিনয় করেননি। প্রযোজক গ্রাহাম কিং প্রথম যখন ফোন করেন, তখন তিনি নিজেও নিশ্চিত ছিলেন কিভাবে কী করবেন। এরপর শুরু অসাধ্য সাধনের অভিযাত্রা। প্রথম এক বছর শুধু ডুবেছিলেন মাইকেলের জগতে। আত্মীয়তার স্মৃতি পাশে ঠেলে দিয়ে নতুন চোখে আবিষ্কার করতে শুরু করেন নিজের চাচাকে। মাইকেল জ্যাকসনের ভিডিও, সাক্ষাৎকার দেখা থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত ডায়েরি, অপ্রকাশিত ফুটেজ, এমনকি ক্যামেরার বাইরের আচরণ বিশ্লেষণ এবং রপ্ত করতে রাতদিন এককার হয়ে গিয়েছিল জাফারের।
এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, মাইকেলকে ‘নকল’ করতে চাননি; বরং তাঁর ‘সত্তাকে’ আত্মস্থ করতে চেয়েছেন। অভিনয় শেখা থেকে শুরু করে চূড়ান্তভাবে চলচ্চিত্রের সেটে দাঁড়ানোর মাঝখানের সময়টির ব্যবধান ছিল দুই বছরেরও বেশি।
জাফার জ্যাকসনের ভাষায়, “প্রথম বছর আমি মূলত কোচ অ্যাঞ্জেলা গিবসের সঙ্গে বিভিন্ন চলচ্চিত্র ও নাটকের দৃশ্য নিয়ে কাজ করছি। তার আট মাস পর আমরা ‘মাইকেল’ স্ক্রিপ্টের নির্দিষ্ট দৃশ্য নিয়ে কাজ শুরু করি। সবকিছু রেকর্ড করা হতো, যাতে গ্রাহাম আমার অগ্রগতি দেখতে পারেন। এরপর রিচ এবং টোনের সঙ্গে কাজ শুরু করি। তারা ছিলেন মাইকেলের হিস্ট্রি ট্যুরের সেই দুই কোরিওগ্রাফার। ফলে এটা ছিল অনেক মুহূর্তের ধারাবাহিকতা। অসংখ্য ঘটনা ছিল, যেখানে আমাকে সত্যিই নিজেকে প্রমাণ করতে হয়েছে—হোক সেটা নাচ, গান গাওয়া বা অভিনয়ের কোনো দৃশ্য।’’
ধীরে ধীরে ‘মাইকেল’ হয়ে ওঠার বিবরণ দিয়ে জাফার বলেন, ‘আমি জ্যাকসন ফাইভকে অনেক অধ্যয়ন করেছি। বিশেষ করে ছোট্ট মাইকেলের দিকে মনোযোগ দিয়েছি। বুঝতে চেয়েছি সেই মুহূর্তগুলোতে তিনি কী অনুভব করছিলেন এবং সৃজনশীলভাবে কিভাবে নিজেকে প্রকাশের তাড়না অনুভব করছিলেন। স্বাধীনতার জন্য তাঁর আকাঙ্ক্ষা বোঝার চেষ্টা করেছি। তবে বিশেষভাবে আমার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল মাইকেলের মানবিক দিকটি বোঝা এবং তাঁর সেই ব্যক্তিগত দিকটিকে জানা, যার সঙ্গে অনেক মানুষেরই পরিচয় নেই। এটা আমার কাছে ছিল একজন কিংবদন্তিকে গভীরভাবে অনুসন্ধান করার মতো রোমাঞ্চকর।’

মাইকেল জ্যাকসনের সংগীত জাদুর সঙ্গে তার স্টাইল এবং নাচের মোহনীয় মুদ্রা তৈরি করেছিল ইন্দ্রজাল। সেই ‘ঐশ্বরিক মাইকেল’ হয়ে ওঠার গল্প জানিয়ে জাফার বলেন, ‘আমাদের প্রায় ২০ দিনের একটি বুট ক্যাম্প ছিল। সেই ২০ দিনে আমরা মোটাউন ২৫-এর বিলি জিন পারফরম্যান্স ভেঙে ভেঙে শিখছিলাম। আমার মনে হচ্ছিল, এত অল্প সময়ে পুরোটা আয়ত্ত করতে পারব না। আমার আরও সময় দরকার। ২০ দিনের পর হেভেনহার্স্টে ফিরে গিয়ে ঘরে আয়না বসিয়ে সেই একই ডান্স রুমে অনুশীলন শুরু করি। মাইকেলও ঠিক ওখানেই অনুশীলন করতেন। ফলে এটা আমার জন্য এক ধরনের আধ্যাত্মিক যাত্রায় পরিণত হয়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা নাচের অনুশীলন আমার জীবন বদলে দিয়েছিল।’
তিনি বলেন, ‘বিলি জিন-এর ওপর প্রায় এক বছর পুরোপুরি মনোযোগ দিয়েছি। কারণ এটা আমার জন্য সবচেয়ে কঠিন ছিল। তারপর অন্য গানগুলোর নাচও শুরু করি। ছোটবেলায় সবসময় মুনওয়াক—এর চেষ্টা করতাম। কিন্তু ছোটবেলার সেই চেষ্টা আর একদম মাইকেলের মতো করা সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়। মুনওয়াক সত্যিই খুব কঠিন। এর পেছনে অনেক কারণ আছে। মেঝে গুরুত্বপূর্ণ, জুতাও গুরুত্বপূর্ণ। আমার জন্য নতুন ছিল লোফার পরে নাচ শেখা।’
মুনওয়াক এখনো পুরোপরি আয়ত্তে আসেনি স্বীকার করে জাফার বলেন, ‘আমি বলব, স্পিন এবং মুনওয়াক সবচেয়ে কঠিন। মাইকেল যেভাবে ঘুরতেন—আমি ভাবিনি বিষয়ট এতটা কঠিন। আমি সাধারণত ডান দিকে ঘুরি, কিন্তু মাইকেল বাঁ দিকে ঘুরতেন। তাই ভারসাম্য খুঁজে পাওয়া এবং উল্টো দিকে ঘুরতে অভ্যস্ত হওয়া ছিল খুব কঠিন এক কাজ। একই সঙ্গে তাঁর মতো গতি এবং ঘূর্ণি তৈরি করা, হঠাৎ থেমে যাওয়া, স্নেয়ার বাজতেই থামা, ভারসাম্য ধরে রাখা, আর সঙ্গে সঙ্গে আরেকটি মুভে চলে যাওয়া—এসব ছিল বিশাল চ্যালেঞ্জ।’
জাফারের ভাষায়, তিনি যত বেশি তার মুভমেন্ট অনুশীলন করেছে এবং ভিডিও ফুটেজ দেখেছেন, ততই মনে হয়েছে এর মধ্যে এক ধরনের জাদু আছে। কিছু মুভমেন্ট এবং ট্রানজিশন এমন লাগত যেন কোনো ইলিউশন বা ম্যাজিক ট্রিক। জাফার জ্যাকসন বলেন, ‘আমার মনে হয়, মাইকেল ইচ্ছাকৃতভাবেই পারফরম্যান্সে সেই বিস্ময়ের উপাদান রাখতে চাইতেন। তাই আমি বারবার ফুটেজ দেখতাম—তার শরীর কোথায়, ওজন কোন পায়ে যাচ্ছে—এসব বিশ্লেষণ করতাম, যাতে সেই ইলিউশনের অনুভূতিটা তৈরি করা যায়। আমার মনে হয় মাইকেলের কাছে একটি গ্লাভস ছিল তার বর্মের মতো। কিছু নির্দিষ্ট উপকরণ ছাড়া তিনি যেন পুরোপুরি প্রস্তুত বোধ করতেন না। আমিও রিহার্সালের সময় একই অনুভূতি পেয়েছি। যখন আসল পোশাক, গ্লাভস, জ্যাকেট বা ফেডোরা পরে অনুশীলন শুরু করলাম, তখন পারফরম্যান্সের শক্তিই বদলে গেল।’

জাফারের ‘মাইকেল’ হয়ে ওঠার এই অনবদ্য অভিযাত্রাই শেষপর্যন্ত সিনেমাটিকে দিয়েছে জাদুকরী মাত্রা। আন্তর্জাতিক বহু সমালোচকও স্বীকার করছেন—চলচ্চিত্রটির সবচেয়ে বড় শক্তি জাফারের পারফরম্যান্স। কেউ কেউ লিখেছেন, তিনি শুধু অভিনয় করেনি, বরং মাইকেলের শক্তি ও উপস্থিতিকে পুনরুজ্জীবিত করেছেন।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ভ্যারাইটি ম্যাগাজিনে ওয়েন গ্লেইবারম্যান লিখেছেন, জাফার জ্যাকসন অসাধারণ নৈপূণ্যে হাজির করেছেন মাইকেলের চেহারা, কণ্ঠ, বিদ্যুৎময় নৃত্যভঙ্গি। তার চেয়েও বেশি মাত্রায় ফুটিয়ে তুলেছেন সেই কোমলতা ও দৃঢ়তার মিশ্রণ, যা মাইকেলকে মাইকেল বানিয়ে তুলেছিল। চলচ্চিত্রটি পরিচিত ধাঁচেই মাইকেল জ্যাকসনের বিদ্যুৎময় শক্তিকে ধারণ করতে পেরেছে। এটি দেখায়, কীভাবে ব্রায়ান উইলসন বা লিটল রিচার্ডের মতো তিনিও ছিলেন এমন একজন মহিমান্বিত শিল্পী, যাঁর শিল্পীসত্তা গড়ে উঠেছিল নিজেরই জীবনের ক্ষত থেকে।
চলচ্চিত্রটি শুরু হয় ১৯৬৬ সালে ইন্ডিয়ানার গ্যারিতে জ্যাকসন পরিবারের বাড়ির বসার ঘর থেকে। বাবা জো জ্যাকসন তার পাঁচ ছেলেকে কোনো সামরিক প্রশিক্ষণের নির্মম আচার মেনে যেন সংগীতের মহড়া করাচ্ছেন। জো এমন একজন কোচ ও ম্যানেজার—যিনি বিশ্বাস করেন তাঁর ছেলেরা জ্যাকসন পরিবারকে নিম্ন-মধ্যবিত্তের কৃষ্ণাঙ্গ জীবন থেকে উত্তোরণ ঘটাতে পারবে। জোর স্বপ্ন—আমেরিকান ড্রিম। আরেকভাবে বললে, মাইকেলকে সামনে রেখে জ্যাকসন ফাইভ— তাঁর অর্থ উপার্জনের হাতিয়ার। জো সবচেয়ে কঠোর মাইকেলের প্রতি, যাকে তিনি বেল্ট দিয়ে মারতেও কুণ্ঠিত নন। ছোট্ট মাইকেলের চরিত্রে অভিনয় করা জুলিয়ানো ভালদি এমন এক মিষ্টি শিশুকে তুলে ধরেছে, যে অতি সংবেদনশীলতার কারণে অন্য শিশুদের সঙ্গে মিশতে পারে না।
জ্যাকসন ফাইভের উত্থান দেখানোর পর ‘মাইকেল’ চলে যান ১৯৭৮ সালে। শুরু হয় প্রযোজক কুইন্সি জোন্সের (ক্লেনড্রিক স্যামসন) সঙ্গে ‘অফ দ্য ওয়াল’ রেকর্ডের কাজ। এই তরুণ মাইকেলই হলেন জাফার জ্যাকসন। মাইকেলের দ্বিধাগ্রস্ত, মিষ্টি উচ্চকণ্ঠকে এনেছেন নিখুঁতভাবে, সেইসঙ্গে দেখিয়েছেন বিখ্যাত ব্যক্তিত্বে পরিণত হওয়ার অনবদ্য টানাপোড়েনের গল্প।
মাইকেল তার বাড়িটিকে এ সময় অনেকটা প্রাণী উদ্যান বানাতে শুরু করেন। লামা, জিরাফ এবং বাবলস নামের শিম্পাঞ্জি দিয়ে ভরিয়ে তোলেন ঘর। এই প্রাণীগুলো শুধু তার বন্ধু নয়, তাঁর ভেতরের সংবেদনশীল অনুভূতিরও প্রকাশ।
একটি আইন অফিসে মাইকেলের সঙ্গে জন ব্রাঙ্কার (মাইলস টেলার) পরিচয় হয়। এলোমেলো চুলের এই বিনোদন আইনজীবী আগে বিচ বয়েজ এবং নিল ডায়মন্ডের প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন। মাইকেল সঙ্গে সঙ্গেই তাঁকে নিজের ম্যানেজারের পদ থেকে জোকে বরখাস্ত করতে বলেন। শুরু হয় পারিবারিক অর্গল ভাঙার শক্ত পদক্ষেপ। মাইকেলের এই মানসিক শক্তি অর্জনের জায়গা থেকেই ‘থ্রিলার’—এর কল্পনা ও বাস্তবায়নের শুরু।

তবে নিজের জীবন ও ইমেজের নিয়ন্ত্রণ নিতে শুরু করার পরেও কর্তৃত্বপরায়ণ বাবার ছায়া মাইকেলকে তাড়া করে ফিরেছে। ‘থ্রিলার’ মুক্তি পাওয়া পর শুরু হয় মাইকেল উন্মাদনা—যুগের। এরপরেও জো গোপনে ডন কিংয়ের (ডিওন কোল) সঙ্গে চুক্তি করেন, যার অধীনে মাইকেল আবার জ্যাকসন ফাইভের সঙ্গে ট্যুরে যান। পেপসির সঙ্গে মাইকেলের চুক্তিও এর অংশ ছিল। এই পেপসির বিজ্ঞাপনের শুটিংয়ের সময় ভয়াবহ দুর্ঘটনায় তাঁর চুল ও মাথার ত্বকে আগুন ধরে যায়। তবে চলচ্চিত্রে বিষয়টিকে জো’র কর্মফলের প্রভাব হিসেবে দেখানো হয়েছে।
অনেকেই মনে করেন ১৯৮৪ সালে ভিক্টরি ট্যুরে ভাইদের সঙ্গে মাইকেলের আবার যোগ দেওয়া ছিল ভুল সিদ্ধান্ত। তবে চলচ্চিত্রে ‘হিউম্যান নেচার’ গানের সময় তাঁর দীপ্তিময় মঞ্চ পারফরম্যান্সের মাধ্যমে দেখানো হয় সেখানেও তিনি নিজের মহিমান্বিত শিল্পীসত্তাকে প্রকাশ করতে পেরেছিলেন। আর তারপর… তিনি জোকে উপেক্ষা করেন। চিরতরে।
কোনো কোনো বিশ্লেষকের মতে ‘মাইকেল’ মূলত এক ভিজ্যুয়াল কনসার্টের বিস্তৃত অভিজ্ঞতা। ‘বিলি জিন’, ‘থ্রিলার’, ‘বিট ইট’, ‘ম্যান ইন দ্য মিরর’—প্রতিটি পারফরম্যান্স এমনভাবে নির্মাণ করা হয়েছে, যেন দর্শক সিনেমা হলে নয়, বরং ১৯৮০–এর দশকের কোনো স্টেডিয়ামে বসে আছেন। বিশেষ করে মোটাউন ২৫–এর ঐতিহাসিক ‘বিলি জিন’ পারফরম্যান্স এবং প্রথম মুনওয়াকের দৃশ্য আলোড়িত করে প্রতিটি দর্শককে।
কস্টিউম ডিজাইনেও দেখা যায় অবিশ্বাস্য খুঁটিনাটি মনোযোগ। নির্মাতার দাবি, শুধু মাইকেলের পোশাক, গ্লাভস, মোজা, রাইনস্টোন এবং স্টাইল পুনর্নির্মাণের জন্য ৮০০ পৃষ্ঠার গবেষণাপত্র তৈরি করা হয়েছিল। ফলে বড় পর্দায় যখন জাফার যখন ‘মাইকেল’ চরিত্রে লোফার পরে ঘুরে দাঁড়ান, ফেডোরা টেনে নামান বা স্পিন করেন—তখন বাস্তবতা আর পুনর্নির্মাণের সীমারেখা প্রায় মুছে যায়।
আর এই জায়গাতেই ‘মাইকেল’ অসাধারণ।
তবে কিছু দুর্বলতা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন কেউ কেউ। বিবিসির সমালোচক নিকোলাস বারবারের চোখে চলচ্চিত্রটিকে ‘একটি নিষ্প্রাণ এবং টেলিভিশনধর্মী জীবনীচিত্র’। তিনি মনে করেন, সিনেমাটি ঘটনাপ্রবাহের তালিকা হাজির করলেও প্রকৃত নাটক বা গভীরতা তৈরি করতে পারেনি।
আবার দ্য গার্ডিয়ান লিখেছে, সিনেমাটি ‘ঘরের ভেতরের হাতিটিকেই এড়িয়ে গেছে।’ রজার এবার্ট ডটকম আরও কঠোর ভাষায় একে ‘গল্প খুঁজতে থাকা একটি প্লেলিস্ট’ বলেছে।

এর কারণ হিসেবে সমালোচকদের অভিযোগ হলো—চলচ্চিত্রটি মাইকেলের জীবনের সবচেয়ে বিতর্কিত অধ্যায়গুলো প্রায় পুরোপুরি এড়িয়ে গেছে। শৈশবের নির্যাতন, মানসিক নিঃসঙ্গতা, পরিচয় সংকট, প্লাস্টিক সার্জারি, মিডিয়ার নির্মমতা—এসবের কিছু ইঙ্গিত থাকলেও চলচ্চিত্রটি শেষ পর্যন্ত বজায় রেখেছে একটি ‘নিরাপদ দূরত্ব’। সবচেয়ে বড় বিষয়, শিশু যৌন নির্যাতনের অভিযোগ নিয়ে সিনেমাটি প্রায় নীরব।
সমালোচকদের একাংশ মনে করেন, চলচ্চিত্রটি জ্যাকসন পরিবারের সক্রিয় সম্পৃক্ততায় নির্মিত বলে এটি শেষ পর্যন্ত ‘এস্টেট-অনুমোদিত’ এক আবেগময় শ্রদ্ধাঞ্জলি হয়ে উঠেছে।
তবে চলচ্চিত্র কখনো বাস্তবতার হুবহু উপস্থাপন নয়, আর সে কারণেই এসব সমালোচনার তেমন কোনো প্রভাব পড়েনি ‘মাইকেল’ ভক্তদের ওপর। সিনেমাটি হয়তো সম্পূর্ণ সত্যিকে হজির করে না, তবে তা প্রতিটি দর্শকের কাছে হারিয়ে যাওয়া মাইকেল জ্যাকসনকে আবারো হাজির করতে সক্ষম।
দর্শক যখন ‘থ্রিলার’-এর পুননির্মাণ দেখেন, ‘বিট ইট’-এর গিটার শোনেন বা হাজারো মানুষের উন্মাদনাময় চিৎকারের মধ্যে মুনওয়াক প্রত্যক্ষ করেন—তারা তখন যুক্তি দিয়ে নয়, চরম আবেগে অনুভব করেন সিনেমাটিক দৃশ্যগুলোকে। আবার তারা যেন ফিরে যান সেই মাইকেল যুগে। এটি এমন এক সিনেমা যা প্রয়াত কিংবদন্তিকে আবার ফিরিয়ে আনে জাদুমঞ্চে, যেই কিংবদন্তি এখনো পৃথিবীর কোটি মানুষের মোহময় স্মৃতির অংশ হয়ে আছেন।
ভ্যারাইটি ম্যাগাজিন লিখেছে, ‘ব্যাড’ গানের মঞ্চ পারফরম্যান্সে এগিয়ে যাওয়ার পর চলচ্চিত্রটি শেষ হয় এই শব্দগুলো দিয়ে : ‘তার গল্প চলমান…।’ অর্থাৎ ‘মাইকেল’ হয়তো প্রথম বায়োপিক, যেটিকে একটি ফ্র্যাঞ্চাইজ হিসেবে তৈরি করা হয়েছে। নির্মাতারা সত্যিই যদি মাইকেল জ্যাকসনের গল্প চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন, তাহলে সেটি শুধু ব্র্যান্ড সম্প্রসারণ হবে না, বরং শেষ পর্যন্ত হয়ত মানুষটির জীবনের অন্ধকার দিকটিতেও প্রবেশ করার একটি সুযোগও তৈরি হবে।





