এক সময় রাজা ছিল, রাজ্য ছিল। পাইক, বরকন্দাজ, প্রাসাদ ছিল। আজ রাজা, রাজ্য সৈন্য বাহিনী নেই। সময়ের স্রোতে হারিয়ে গেছে প্রাসাদ। তবে ইতিহাসের নীরব সাক্ষী হয়ে আজো দাঁড়িয়ে রয়েছে রাজবাড়ির সাত প্রাচীন মন্দির।
ঝিনাইদহ সদর থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দক্ষিণে এবং কালীগঞ্জ উপজেলা শহর থেকে মাত্র ৫ কিলোমিটার উত্তরে নলডাঙ্গা গ্রাম। গ্রামের বেগবতী নদীর তীরে দাঁড়িয়ে এই প্রাচীন স্থাপনা। কালীমাতা, লক্ষ্মী, গণেশ, দুর্গা, তারা, বিষ্ণু ও রাজেশ্বরী—এই সাত মন্দির এখনো বহন করে চলেছে হারিয়ে যাওয়া নলডাঙ্গা রাজবংশের স্মৃতিচিহ্ন।
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, ২০০৭ সাল থেকে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ, জেলা প্রশাসন এবং স্থানীয় দানশীল ব্যক্তিদের সহায়তায় প্রায় দেড় কোটি টাকা ব্যয়ে চারটি মন্দির সংস্কার করা হয়। একটি মন্দিরের কাজ আংশিক হয়, আর দুটি এখনো সংস্কারের অপেক্ষায় রয়েছে। প্রতিদিন দেশ-বিদেশ থেকে অসংখ্য পর্যটক এখানে আসেন বলে সূত্র জানায়।
জেলা তথ্য অফিস প্রকাশিত ইতিহাস গ্রন্থ ‘ঝিনাইদহ জেলার ইতিকথা’ বিবরণ অনুযায়ী, প্রায় পাঁচ শ বছর আগে বিষ্ণুদাস হাজরার হাত ধরেই নলডাঙ্গা রাজবংশের সূচনা। ১৫৯০ সালে মোঘল সুবেদার মানসিংহ তার আতিথেয়তায় সন্তুষ্ট হয়ে পাঁচটি গ্রাম দান করেন। সেই জমিদারি থেকেই গড়ে ওঠে নলডাঙ্গা রাজবাড়ি।
পরে বিভিন্ন রাজা সময়ের পরিক্রমায় নির্মাণ করেন মন্দিরগুলো। তবে রাজা বাহাদুর প্রথম ভূষণ দেবরায়ের আমলেই এগুলো পূর্ণতা পায়।
১৮৭৯ সালে জমিদারির দায়িত্ব নেন রাজা বাহাদুর প্রথম ভূষণ দেব রায়। ১৯১৩ সালে তিনি রাজা বাহাদুর উপাধি লাভ করেন। শিক্ষার প্রসারে তিনি চালু করেন ইন্দু ভূষণ ও মধুমতি বৃত্তি। ১৮৮২ সালে প্রতিষ্ঠা করেন বর্তমান সরকারি নলডাঙ্গা ভূষণ বিদ্যালয়। ১৯৫৫ সালে জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হলে শেষ হয় নলডাঙ্গা রাজবংশের অধ্যায়।
গ্রামবাসী সুভাষ দাস বলেন, ‘এটি আমাদের এলাকার গর্ব। এখানে আরো সংস্কার ও পর্যটন সুবিধা বাড়ানো হলে দেশ-বিদেশ থেকে পর্যটকরা আসবেন এবং ইতিহাস সম্পর্কে জানতে পারবেন।’
স্থানীয় বাসিন্দা প্রশান্ত কুমারের ভাষ্য, ‘দ্রুত সংরক্ষণ ও পর্যটন সুবিধা বাড়ানো হলে নলডাঙ্গা রাজবাড়ির এই সাত মন্দির দেশের গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন কেন্দ্র হয়ে উঠবে।’
নলডাঙ্গা রাজবাড়ি মন্দিরের পুরোহিত প্রান্ত কুমার বলেন, ‘আমি নিয়মিত এই মন্দিরের দেখভাল করে থাকি। মন্দিরের যথাযথ সংরক্ষণ দরকার।
ঝিনাইদহ জেলা প্রশাসক নোমান হোসেন বলেন, ‘নদীর ধারে অবস্থিত মন্দিরগুলো যাতে আরো সুন্দর করা যায়, তা নিয়ে শিগগির কাজ শুরু করব।’




