বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবন শুধু একটি বন নয়, দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের প্রাকৃতিক নিরাপত্তাবলয় ও তাদের জীবিকার অন্যতম উৎস। খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরার প্রায় ৩৫ লাখ মানুষের জীবন-জীবিকা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নির্ভরশীল এই বন ঘিরে।
প্রতিবছর ১ জুন থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত সুন্দরবনে প্রবেশ নিষিদ্ধ থাকে, যাতে মাছ, বন্যপ্রাণীর প্রজনন নির্বিঘ্ন হয়। কিন্তু নিষিদ্ধ সময়েও থেমে নেই অপরাধ কর্মকাণ্ড। বরং বনদস্যুদের পুনরুত্থান, অবৈধ অনুপ্রবেশ, বিষ দিয়ে মাছ শিকার এবং অভয়ারণ্যে শুঁটকি উৎপাদনের মতো কর্মকাণ্ড নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালে সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত ঘোষণা করা হয়েছিল। ধারাবাহিক আত্মসমর্পণের মাধ্যমে ৩২টি বাহিনীর ৩২৮ জন সদস্য অস্ত্র জমা দিয়েছিলেন সরকারের কাছে। কিন্তু সেই ঘোষণার আট বছর পার না হতেই আবারও দস্যুবাহিনীর তৎপরতায় উদ্বেগ বাড়ছে। সম্প্রতি ছোট সুমন বাহিনীর সাত সদস্য কোস্ট গার্ডের কাছে আত্মসমর্পণ করলেও সুন্দরবনে এখনো ১৫ থেকে ২০টি বাহিনী সক্রিয় রয়েছে বলে দাবি বনজীবী ও স্থানীয়দের।
নিষিদ্ধ সময়েও চলছে অবৈধ বাণিজ্য
স্থানীয় সূত্র বলছে, বৈধভাবে বনে প্রবেশ বন্ধ থাকায় নিষিদ্ধ সময়কে কাজে লাগাচ্ছে সংঘবদ্ধ চক্র। অনুপ্রবেশকারীরা সুন্দরবনের অভয়ারণ্য ও নিষিদ্ধ এলাকায় বিষ প্রয়োগ করে মাছ শিকার করছে। পরে বনের ভেতরই অস্থায়ী ঘাঁটিতে মাছ শুকিয়ে শুঁটকি তৈরি করে তা বাইরে পাচার করা হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, বন বিভাগের এক শ্রেণির অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং বনদস্যুদের সহযোগিতায় এই কর্মকাণ্ড পরিচালিত হচ্ছে।
বনসংলগ্ন এলাকার জেলে-বাওয়ালীদের দাবি, বনের বাইরে অবস্থান করা কিছু ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তিও এই চক্রের সঙ্গে জড়িত। তাদের মতে, মোবাইল ব্যাংকিং লেনদেন এবং অবৈধভাবে প্রবেশকারী ব্যক্তিদের তালিকা বিশ্লেষণ করলেই দস্যুদের নেটওয়ার্ক চিহ্নিত করা সম্ভব।
যে কারণে ফিরল দস্যুতা
স্থানীয়দের একটি বড় অংশ মনে করেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সুন্দরবনে দস্যুতার পুনরুত্থান শুরু হয়। তাদের মতে, চারটি প্রধান কারণ এ পরিস্থিতির জন্য দায়ী। এগুলো হচ্ছে, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার অবসান, আত্মসমর্পণকারীদের সামাজিক অবজ্ঞা, একের পর এক মামলার চাপ এবং পুনর্বাসন ব্যবস্থার ব্যর্থতা, যা দমন করতে ৫ আগস্ট পরবর্তী অন্তর্বর্তীকালীন পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে।
গোয়েন্দা ও স্থানীয় সূত্রের দাবি, ২০১২ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে আত্মসমর্পণ করা অনেক সাবেক দস্যুকে পরবর্তীতে স্থানীয় রাজনৈতিক বলয়ে ব্যবহার করা হতো। অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্ন এলাকায় প্রভাব বিস্তার, ঘের দখল এবং শক্তি প্রদর্শনের কাজে তাদের কাজে লাগানো হতো। এর বিনিময়ে তারা রাজনৈতিক আশ্রয় ও প্রশাসনিক সুবিধা পেত। কিন্তু রাজনৈতিক বাস্তবতা বদলে গেলে সেই আশ্রয়ও হারিয়ে যায়। একই সঙ্গে সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্যতা না পাওয়া, কর্মসংস্থানের অভাব এবং আইনি হয়রানির অভিযোগে অনেক সাবেক দস্যু আবার পুরনো পথে ফিরে যায়।
টোকেনের দাপটে বনজীবীদের জীবন
সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকায় এখনো দস্যুদের নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বহাল রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বনজীবীদের ভাষ্য, বনে প্রবেশের আগে নির্দিষ্ট বাহিনীর কাছে চাঁদা বা মুক্তিপণের অর্থ পরিশোধ করলে একটি বিশেষ টোকেন দেওয়া হয়। অনেক ক্ষেত্রে এক, দুই বা পাঁচ টাকার নোটের সিরিয়াল নম্বরই সেই টোকেন হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
কিন্তু এক বাহিনীর টোকেন অন্য বাহিনীর এলাকায় কার্যকর নয়। ফলে একই যাত্রায় একাধিকবার চাঁদা দিতে হয় জেলে, মৌয়াল ও বাওয়ালীদের। টাকা না দিলে অপহরণ, জিম্মি বা নির্যাতনের শিকার হওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, দস্যুদের অর্থ আদায়ে ‘মহাজন’ নামে পরিচিত কিছু ব্যক্তি মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করেন। তাদের মাধ্যমেই চাঁদা আদায়, মুক্তিপণ সংগ্রহ এবং বনভিত্তিক অপরাধ চক্রের সরবরাহ ব্যবস্থা পরিচালিত হয়।
সক্রিয় ১৫টি বাহিনী
বনজীবীদের তথ্যমতে, বর্তমানে সুন্দরবনে আলিফ (দয়াল) বা মজনু বাহিনী, ছোট জাহাঙ্গীর বাহিনী, বড় জাহাঙ্গীর বাহিনী, দুলাভাই বাহিনী, নানা ভাই বাহিনী ও জোনাব বাহিনীসহ একাধিক দল সক্রিয়। এছাড়া বিভিন্ন সময় জাহাঙ্গীর, দাদাভাই, আসাবুর, রবি, রাঙ্গা, আনারুল, হান্নান, ভাই-ভাই এবং মামা-ভাগ্নে বাহিনীর নামেও চাঁদাবাজি ও অপহরণের অভিযোগ পাওয়া যায়।
আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, এসব বাহিনীর কাছে রাইফেল, পিস্তল, একনালা বন্দুক ও দেশি অস্ত্রসহ বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ রয়েছে। সাম্প্রতিক সময় জেলে ও কাঁকড়া শিকারীদের অপহরণের ঘটনাও উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
পুনর্বাসনে ঘাটতি যেখানে
আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বনদস্যুদের আত্মসমর্পণে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করা সাংবাদিক মহসীনুল হাকিম মনে করেন, পুনর্বাসন কার্যক্রমের ধারাবাহিক তদারকির অভাবই বড় সমস্যা। তার মতে, আত্মসমর্পণকারীরা কর্মসংস্থানে টিকে রয়েছে কিনা, পুনর্বাসন সহায়তা কার্যকর হয়েছে কিনা—এসব বিষয় দীর্ঘমেয়াদে পর্যবেক্ষণ করা হয়নি। ফলে অনেকেই আর্থিক ও সামাজিক সংকটে পড়ে পুনরায় অপরাধে জড়িয়ে পড়ার সুযোগ পেয়েছে।
যা বলছে প্রশাসন
বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের পশ্চিম জোনের জোনাল কমান্ডার ক্যাপ্টেন মেজবাউল ইসলাম বলেন, সুন্দরবনে যৌথ বাহিনীর অভিযান জোরদার করা হয়েছে। তার দাবি, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর চাপের মুখে দস্যুরা আত্মসমর্পণে বাধ্য হবে এবং স্বাভাবিক জীবনে ফেরার সুযোগ এখনো উন্মুক্ত রয়েছে।
খুলনার আঞ্চলিক বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদ বলেন, নিষিদ্ধ সময় অনুপ্রবেশ, বিষ দিয়ে মাছ ধরা এবং বনদস্যুদের তৎপরতার অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। ড্রোন প্রযুক্তিসহ আধুনিক নজরদারি ব্যবস্থার মাধ্যমে অপরাধীদের শনাক্ত করে তাদের আইনের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বন বিভাগের কোনো কর্মকর্তা জড়িত থাকলে তার বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, দস্যুমুক্ত সুন্দরবন গড়তে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। মোবাইল ব্যাংকিং লেনদেন বিশ্লেষণ করে এরইমধ্যে কিছু অপরাধীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পাশাপাশি সুন্দরবনে প্রবেশে ফিঙ্গারপ্রিন্টভিত্তিক ব্যবস্থাও চালু করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, সুন্দরবনে দস্যুতার পুনরুত্থান কেবল আইন-শৃঙ্খলার বিষয় নয়; এটি পুনর্বাসন, সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা, রাজনৈতিক প্রভাব এবং বনসম্পদ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। তাই শুধু অভিযান নয়, অপরাধের মূল কারণগুলো চিহ্নিত করে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।