• ই-পেপার

ফেনীতে বিদ্যুৎস্পৃষ্টে ২ যুবকের মৃত্যু

সাশ্রয়ী মূল্যের ক্যান্টিন চালু হলো নীলফামারী সরকারি কলেজে

নীলফামারী সংবাদদাতা
সাশ্রয়ী মূল্যের ক্যান্টিন চালু হলো নীলফামারী সরকারি কলেজে
সংগৃহীত ছবি

শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশার অবসান ঘটিয়ে চালু হলো নীলফামারী সরকারি কলেজ ক্যান্টিন। শিক্ষার্থীদের জন্য স্বাস্থ্যসম্মত, মানসম্মত ও সাশ্রয়ী মূল্যে খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ক্যান্টিনটি চালু করা হয়েছে। 

বুধবার (১০ জুন) দুপুরে কলেজ ক্যাম্পাসে ক্যান্টিনের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন নীলফামারী জেলা পরিষদের প্রশাসক অ্যাড. মিজানুর রহমান চৌধুরী। 

জেলা পরিষদের প্রশাসক অ্যাডভোকেট মিজানুর রহমান চৌধুরী বলেন, ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একটি পরিচ্ছন্ন ও সুপরিচালিত ক্যান্টিন শিক্ষার্থীদের সুস্থ পরিবেশ নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্য সরবরাহের পাশাপাশি ক্যান্টিনের সেবার মান বজায় রাখতে হবে।’

অধ্যক্ষ এ কে এম সিদ্দিকুর রহমান বলেন, ‘ক্যান্টিন চালুর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের একটি দীর্ঘদিনের চাহিদা পূরণ হয়েছে। এটি শুধু খাদ্য গ্রহণের স্থান নয়, বরং শিক্ষার্থীদের পারস্পরিক যোগাযোগ ও সৌহার্দ্য বৃদ্ধিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে কাজ করবে।’

ক্যান্টিন পরিচালনা কমিটির আহ্বায়ক মো. ওমর ফারুক বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের চাহিদা ও সামর্থ্যের বিষয়টি বিবেচনায় রেখে স্বাস্থ্যসম্মত ও মানসম্পন্ন খাবার সরবরাহ করা হবে। ক্যান্টিনের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন ও সেবার মান বজায় রাখতে নিয়মিত তদারকি করা হবে।’

কলেজের অধ্যক্ষ এ কে এম সিদ্দিকুর রহমানের সভাপতিত্বে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক সোহেল পারভেজ, কলেজের উপাধ্যক্ষ গোলাম মোস্তফা চৌধুরী, শিক্ষক পরিষদের সম্পাদক বাবুল হোসাইন, দর্শন বিভাগের বিভাগীয় প্রধান মো. সামসুল আলম এবং ক্যান্টিন পরিচালনা কমিটির আহ্বায়ক মো. ওমর ফারুক, জেলা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক মো. মোজাম্মেল হক মোজাম, নীলফামারী সরকারি কলেজ শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক মো. পায়েলুজ্জামান রকসি, সদস্য সচিব মো. রইসুল ইসলাম রানা, সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক ফিরোজ আহমেদ সৈকত আরও অনেকে উপস্থিত ছিলেন।

৩৮ কোটি টাকা ব্যয়ে সংযোগ সড়ক প্রকল্প

কুলাউড়ায় কাজ শেষ হওয়ার আগেই সড়কে বড় ভাঙ্গন

মাহফুজ শাকিল, কুলাউড়া (মৌলভীবাজার)
কুলাউড়ায় কাজ শেষ হওয়ার আগেই সড়কে বড় ভাঙ্গন
কুলাউড়ার রাজাপুর সেতুর সংযোগ সড়কের গজভাগ এলাকায় নির্মাণাধীন সড়কে বড় বড় ভাঙ্গন দেখা দিয়েছে। ছবিটি বুধবার বিকেলে তোলা। কালের কণ্ঠ।

মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলায় মনু নদীর ওপর ৩৪ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ‘রাজাপুর সেতু’ নির্মাণের কাজ প্রায় ৫ বছর আগে শেষ হয়েছে। কিন্তু সেতুর দুই পাশের সাড়ে সাত কিলোমিটার সংযোগ সড়কের কাজ এখনো শেষ হয়নি। ফলে নির্মাণ শেষ হওয়ার দীর্ঘ সময় ধরে নির্মিত সেতুটি অবহেলায় পড়ে আছে। সেতু দিয়ে বড় যানবাহন না চললেও স্থানীয় লোকজন চলাচল করছেন। এদিকে কচ্ছপ গতিতে সংযোগ সড়কের কাজ চললেও কাজ নির্ধারিত সময়ের মধ্য শেষ করা নিয়ে বেশ শঙ্কা তৈরি হয়েছে। সংযোগ সড়কের কাজ দ্রুত শেষ করে সেতু চালু করার দাবি স্থানীয় এলাকাবাসীর।

এদিকে সড়কের কাজে ড্রেনেজ ব্যবস্থা না রাখায় এবং সঠিকভাবে কাজ না করায় সামান্য বৃষ্টি দিলেই সড়কের বিভিন্ন স্থানে দেখা দিয়েছে বড় বড় ভাঙ্গন। সরেজমিনে বুধবার (১০ জুন) বিকেলে পৃথিমপাশা ইউনিয়নের গজভাগ আহমদ আলী উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ সংলগ্ন এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, সংযোগ সড়কে প্রায় ৮-১০টি স্থানে ছোট বড় ভাঙ্গন দেখা দিয়েছে। এরমধ্যে ২টি স্থানে প্রায় ১৫-২০ ফুট জায়গা জুড়ে বড় বড় ভাঙ্গন দেখা দেয়। ওই স্থানে সড়কে ভরাট করা বালু ও ইটের খোয়া সরে গিয়ে বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হওয়ায় চলাচল নিয়ে ভোগান্তিতে পড়েছেন স্থানীয় লোকজন। যেকোন সময় দুর্ঘটনারও আশঙ্কা করছেন তারা।

স্থানীয় লোকদের অভিযোগ, ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের চরম গাফিলতি ও অবহেলার কারণে বৃহৎ এই প্রকল্পের কাজে নয়ছয় হচ্ছে। সঠিকভাবে কাজ করলে সড়কে এত ভাঙ্গন দেখা দিতনা। এ প্রকল্পের মেয়াদে কাজ প্রায় পাঁচ বছরে এখন পর্যন্ত হয়েছে মাত্র ৫০ শতাংশ। প্রায় এক শত কোটি টাকা প্রকল্পের সংযোগ সড়কের কাজ কবে শেষ হবে, কবে চালু করা হবে স্বপ্নের রাজাপুর সেতু জানেন না এতদ অঞ্চলের লক্ষাধিক মানুষ। ধীরগতিতে কাজ নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে চরম হতাশা ও ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।

সওজ অধিদপ্তর ও স্থানীয় এলাকাবাসী সূত্রে জানা গেছে, কুলাউড়ার দক্ষিণাঞ্চলে পৃথিমপাশা, হাজীপুর ও শরীফপুর ইউনিয়নের মানুষ লাগাতার কয়েক বছর মনু নদের তীরে মানববন্ধন ও আন্দোলন শুরু করে। দীর্ঘদিনের দাবির প্রেক্ষিতে এবং কুলাউড়া চাতলাপুর চেকপোস্ট ব্যবহারের মাধ্যমে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের সঙ্গে আমদানি-রফতানির লক্ষ্যে ২০১৮ সালে রাজাপুর সেতু নির্মাণ প্রকল্পটি একনেক সভায় অনুমোদন হলে সওজ অধিদপ্তর মনু নদের ওপর সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেয়। প্রকল্পে ‘কুলাউড়া-পৃথিমপাশা-হাজীপুর-শরীফপুর সড়কের ১৪তম কিলোমিটারে ২ শত ৩২ দশমিক ৯৪ মিটার পিসি গার্ডার সেতু, সাড়ে সাত কিলোমিটার সংযোগ সড়ক ও জমি অধিগ্রহণ নির্মাণ প্রকল্প অনুমোদন করে তৎকালীন আওয়ামীলীগ সরকার। কাজের ব্যয় ধরা হয় ৯৯ কোটি ১৭ লাখ ৩৮ হাজার টাকা। ৩৪ কোটি টাকা ব্যয়ে ‘জন্মভূমি-ওয়াহিদুজ্জামান-নির্মিতি’নামের সিলেটের যৌথ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ২০২১ সালের জুন মাসের দিকে সেতুর নির্মাণকাজ শেষ করে। এদিকে ২০২০ সালে কার্যাদেশ পাওয়া প্রায় ৩৮ কোটি টাকা ব্যয়ে সেতুর দুই পাশে সাড়ে সাত কিলোমিটার সংযোগ সড়ক নির্মাণের কাজ পায় ‘জামিল-ইকবাল’ নামে সিলেটের আরেকটি যৌথ ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান। ২০২২ সালের এপ্রিল মাসের মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও ভূমি অধিগ্রহণে নানা জটিলতা থাকায় পরবর্তীতে তিন দফায় কাজের মেয়াদ ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত বাড়ানা হয়। বর্তমানে কাজের মেয়াদ চলতি বছরের ১৮ জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।

শরীফপুর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি হারুন আহমেদ বলেন, ‘উপজেলা শহরে প্রয়োজনীয় কাজে যেতে গেলে অনেক পথ ঘুরে যেতে হয়। আবার কাজ শেষে বাড়ি ফিরতে পথেই অনেক সময় রাত হয়। আর একাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের ক্ষেত্রেও রয়েছে চরম বিড়ম্বনা। মানুষের দুর্ভোগ লাগবে রাজাপুর সেতু নির্মাণ হয়েছে ঠিক কিন্তু এই সেতু আনুষ্ঠানিকভাবে এখনো উদ্বোধন করা হয়নি সেতুর দুইপাশের সংযোগ সড়কের কাজ শেষ না হওয়ার কারণে। সীমান্তবর্তী এলাকা শরীফপুরসহ হাজীপুর ও পৃথিমপাশা ইউনিয়নের লোকদের বৃহৎ সুবিধার কথা চিন্তা করে অচিরেই যেন এই সড়কের কাজ শেষ করা হয় সেই দাবি আমাদের।

পৃথিমপাশা ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান কমরেড আব্দুল লতিফ, সাবেক ইউপি সদস্য আব্বাছ আলী, সমাজকর্র্মী ফয়জুল হক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘রাজাপুর সেতুর সংযোগ সড়কের কাজ কচ্ছপ গতিতে চলছে। এভাবে চলতে থাকলে কাজ শেষ করতে আরো অনেক সময় লাগবে। তিন ইউনিয়নের জনগণের স্বার্থে দ্রুত সংযোগ সড়কের কাজ শেষ করতে হবে।’

হাজীপুর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান সাংবাদিক আব্দুল বাছিত বাচ্চু বলেন, ‘সংযোগ সড়কের কাজ শেষ হওয়ার পর রাজাপুর সেতুটি চালু হলে ভারতের কৈলাশহর থেকে চাতলাপুর চেকপোস্ট হয়ে আমদানি পণ্য দ্রুত চলে আসবে কুলাউড়া, জুড়ী, বিয়ানীবাজার, বড়লেখাসহ সিলেট অঞ্চলের বিভিন্ন বাজারে। আবার হাকালুকি হাওরের মাছ ও স্থানীয় ভাটাগুলোর ইট দ্রুত রপ্তানি হবে ভারতে। দূরত্ব কমে আসবে প্রায় সাড়ে ১১ কিলোমিটার। কমবে খরচ ও পণ্যের বাজার দর। চাতলাপুর স্থলবন্দরে বাড়বে আমদানি-রপ্তানি ব্যস্ততা, হবে কর্মসংস্থান। রাজাপুর সেতুটি উদ্বোধনের অপেক্ষার প্রহর গুনছে কুলাউড়াসহ আশপাশের কয়েকটি উপজেলার কয়েক লক্ষাধিক মানুষ।’

ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান জামিল ইকবালের সাইট ম্যানেজার রাহাত ইসলাম বলেন, ‘লাগাতার বৃষ্টি দেয়ায় সড়কের কিছু জায়গায় ভাঙ্গন দেখা দিয়েছে। সেটি আমরা দ্রুত মেরামত করে দিব। প্রজেক্ট ম্যানেজার আকাইদ হোসাইন বলেন, সংযোগ সড়কের কার্পেটিং ও দুইপাশে প্রটেক্টিভ ওয়ার্ক শেষ না হওয়া পর্যন্ত বৃষ্টি দিলে সড়কে ভাঙ্গন দেখা দিবে এটা কোন সমস্যা না। সড়কে পানি নিষ্কাষণের ব্যবস্থা করা হয়নি এজন্য বৃষ্টির পানি জমাট হওয়ার কারণে সড়কে ভাঙ্গন দেখা দিয়েছে। সেটি মেরামত করা হবে।’

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সানজিদা আক্তার বলেন, ‘রাজাপুর সেতুর সংযোগ সড়কে ভাঙ্গনের বিষয়টি সওজের নির্বাহী প্রকৌশলীকে অবহিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

সড়ক ও জনপদ বিভাগ (মৌলভীবাজার) এর নির্বাহী প্রকৌশলী কায়ছার হামিদ বলেন, ‘চলমান কাজে সড়কে ভাঙ্গনকৃতস্থানগুলো ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান দ্রুত মেরামত করে দিবে। সাড়ে সাত কিলোমিটার সংযোগ সড়কে ২০টি কালভার্টের মধ্যে ১৬টির কাজ শেষ হয়েছে। সব মিলিয়ে কাজের অগ্রগতি ৬০ শতাংশ। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান কেন কাজ শেষ করতে পারেনি এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিষয়টি উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হলে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশনা পেয়েছি। সেটা প্রক্রিয়াধীন।’ 

নারায়ণগঞ্জে শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে যুবক গ্রেপ্তার

নারায়ণগঞ্জ সিটি প্রতিনিধি
নারায়ণগঞ্জে শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে যুবক গ্রেপ্তার

নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় এক শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে সোহেল সরকার (২৫) নামের এক যুবককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। বুধবার (১০ জুন) ভোরে ফতুল্লার রামারবাগ এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।

গ্রেপ্তার সোহেল সরকার সুনামগঞ্জ জেলার দিরাই থানার নয়াগাঁও গ্রামের সুমেন সরকারের ছেলে। তিনি রামারবাগ এলাকার একটি বাড়িতে ভাড়া থাকতেন।

ফতুল্লা মডেল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আব্দুল আজিজ শেখ জানান, মঙ্গলবার বিকেলে রামারবাগ এলাকার ওই ভাড়া বাড়ির ছাদে পাঁচ বছরের শিশুটি খেলাধুলা করছিল। এ সময় একই বাড়ির ভাড়াটিয়া সোহেল সরকার কৌশলে শিশুটিকে ছাদ থেকে সিঁড়িতে নিয়ে ধর্ষণের চেষ্টা করেন। শিশুটি চিৎকার শুরু করলে সোহেল ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যান।

আরো পড়ুন
র‌্যাংকিংয়ে বিশাল লাফ নাহিদ রানার

র‌্যাংকিংয়ে বিশাল লাফ নাহিদ রানার

 

তিনি আরো জানান, রাতে শিশুটি তার মাকে বিষয়টি জানায়। এরপর গভীর রাতে শিশুর মা বাদী হয়ে ফতুল্লা মডেল থানায় একটি অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে বুধবার ভোরে সোহেল সরকারকে গ্রেপ্তার করেন পুলিশ। আগামীকাল ভুক্তভোগী শিশুটিকে ডাক্তারি পরীক্ষার জন্য হাসপাতালে পাঠানো হবে।

ফতুল্লা থানা পুলিশ পরিদর্শক (ওসি) মো. মাহবুবুল আলম বলেন, ‘শিশু ধর্ষণ চেষ্টার বিষয়ে একটি মামলা হয়েছে এবং গ্রেপ্তারকৃত আসামির বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।’

দস্যুমুক্ত সুন্দরবন ঘোষণার আট বছর : থামেনি অপরাধ কর্মকাণ্ড

দস্যুদের হাতে ফের অস্ত্র নিষিদ্ধ সময়েও দস্যুতা সক্রিয় ১৫টি বাহিনী

এইচ এম আলাউদ্দিন, খুলনা
দস্যুমুক্ত সুন্দরবন ঘোষণার আট বছর : থামেনি অপরাধ কর্মকাণ্ড
সম্প্রতি কোস্ট গার্ডের কাছে আত্মসমর্পণ করে ছোট সুমন বাহিনীর প্রধানসহ দলের সাত সদস্য। ছবি: সংগৃহীত

বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবন শুধু একটি বন নয়, দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের প্রাকৃতিক নিরাপত্তাবলয় ও তাদের জীবিকার অন্যতম উৎস। খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরার প্রায় ৩৫ লাখ মানুষের জীবন-জীবিকা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নির্ভরশীল এই বন ঘিরে। 

প্রতিবছর ১ জুন থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত সুন্দরবনে প্রবেশ নিষিদ্ধ থাকে, যাতে মাছ, বন্যপ্রাণীর প্রজনন নির্বিঘ্ন হয়। কিন্তু নিষিদ্ধ সময়েও থেমে নেই অপরাধ কর্মকাণ্ড। বরং বনদস্যুদের পুনরুত্থান, অবৈধ অনুপ্রবেশ, বিষ দিয়ে মাছ শিকার এবং অভয়ারণ্যে শুঁটকি উৎপাদনের মতো কর্মকাণ্ড নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালে সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত ঘোষণা করা হয়েছিল। ধারাবাহিক আত্মসমর্পণের মাধ্যমে ৩২টি বাহিনীর ৩২৮ জন সদস্য অস্ত্র জমা দিয়েছিলেন সরকারের কাছে। কিন্তু সেই ঘোষণার আট বছর পার না হতেই  আবারও দস্যুবাহিনীর তৎপরতায় উদ্বেগ বাড়ছে। সম্প্রতি ছোট সুমন বাহিনীর সাত সদস্য কোস্ট গার্ডের কাছে আত্মসমর্পণ করলেও সুন্দরবনে এখনো ১৫ থেকে ২০টি বাহিনী সক্রিয় রয়েছে বলে দাবি বনজীবী ও স্থানীয়দের।

নিষিদ্ধ সময়েও চলছে অবৈধ বাণিজ্য

স্থানীয় সূত্র বলছে, বৈধভাবে বনে প্রবেশ বন্ধ থাকায় নিষিদ্ধ সময়কে কাজে লাগাচ্ছে সংঘবদ্ধ চক্র। অনুপ্রবেশকারীরা সুন্দরবনের অভয়ারণ্য ও নিষিদ্ধ এলাকায় বিষ প্রয়োগ করে মাছ শিকার করছে। পরে বনের ভেতরই অস্থায়ী ঘাঁটিতে মাছ শুকিয়ে শুঁটকি তৈরি করে তা বাইরে পাচার করা হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, বন বিভাগের এক শ্রেণির অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং বনদস্যুদের সহযোগিতায় এই কর্মকাণ্ড পরিচালিত হচ্ছে।

বনসংলগ্ন এলাকার জেলে-বাওয়ালীদের দাবি, বনের বাইরে অবস্থান করা কিছু ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তিও এই চক্রের সঙ্গে জড়িত। তাদের মতে, মোবাইল ব্যাংকিং লেনদেন এবং অবৈধভাবে প্রবেশকারী ব্যক্তিদের তালিকা বিশ্লেষণ করলেই দস্যুদের নেটওয়ার্ক চিহ্নিত করা সম্ভব।

যে কারণে ফিরল দস্যুতা 

স্থানীয়দের একটি বড় অংশ মনে করেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সুন্দরবনে দস্যুতার পুনরুত্থান শুরু হয়। তাদের মতে, চারটি প্রধান কারণ এ পরিস্থিতির জন্য দায়ী। এগুলো হচ্ছে, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার অবসান, আত্মসমর্পণকারীদের সামাজিক অবজ্ঞা, একের পর এক মামলার চাপ এবং পুনর্বাসন ব্যবস্থার ব্যর্থতা, যা দমন করতে ৫ আগস্ট পরবর্তী অন্তর্বর্তীকালীন পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে।

গোয়েন্দা ও স্থানীয় সূত্রের দাবি, ২০১২ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে আত্মসমর্পণ করা অনেক সাবেক দস্যুকে পরবর্তীতে স্থানীয় রাজনৈতিক বলয়ে ব্যবহার করা হতো। অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্ন এলাকায় প্রভাব বিস্তার, ঘের দখল এবং শক্তি প্রদর্শনের কাজে তাদের কাজে লাগানো হতো। এর বিনিময়ে তারা রাজনৈতিক আশ্রয় ও প্রশাসনিক সুবিধা পেত। কিন্তু রাজনৈতিক বাস্তবতা বদলে গেলে সেই আশ্রয়ও হারিয়ে যায়। একই সঙ্গে সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্যতা না পাওয়া, কর্মসংস্থানের অভাব এবং আইনি হয়রানির অভিযোগে অনেক সাবেক দস্যু আবার পুরনো পথে ফিরে যায়। 

টোকেনের দাপটে বনজীবীদের জীবন 

সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকায় এখনো দস্যুদের নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বহাল রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বনজীবীদের ভাষ্য, বনে প্রবেশের আগে নির্দিষ্ট বাহিনীর কাছে চাঁদা বা মুক্তিপণের অর্থ পরিশোধ করলে একটি বিশেষ টোকেন দেওয়া হয়। অনেক ক্ষেত্রে এক, দুই বা পাঁচ টাকার নোটের সিরিয়াল নম্বরই সেই টোকেন হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

কিন্তু এক বাহিনীর টোকেন অন্য বাহিনীর এলাকায় কার্যকর নয়। ফলে একই যাত্রায় একাধিকবার চাঁদা দিতে হয় জেলে, মৌয়াল ও বাওয়ালীদের। টাকা না দিলে অপহরণ, জিম্মি বা নির্যাতনের শিকার হওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

স্থানীয়দের দাবি, দস্যুদের অর্থ আদায়ে ‘মহাজন’ নামে পরিচিত কিছু ব্যক্তি মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করেন। তাদের মাধ্যমেই চাঁদা আদায়, মুক্তিপণ সংগ্রহ এবং বনভিত্তিক অপরাধ চক্রের সরবরাহ ব্যবস্থা পরিচালিত হয়।

সক্রিয় ১৫টি বাহিনী 

বনজীবীদের তথ্যমতে, বর্তমানে সুন্দরবনে আলিফ (দয়াল) বা মজনু বাহিনী, ছোট জাহাঙ্গীর বাহিনী, বড় জাহাঙ্গীর বাহিনী, দুলাভাই বাহিনী, নানা ভাই বাহিনী ও জোনাব বাহিনীসহ একাধিক দল সক্রিয়। এছাড়া বিভিন্ন সময় জাহাঙ্গীর, দাদাভাই, আসাবুর, রবি, রাঙ্গা, আনারুল, হান্নান, ভাই-ভাই এবং মামা-ভাগ্নে বাহিনীর নামেও চাঁদাবাজি ও অপহরণের অভিযোগ পাওয়া যায়।

আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, এসব বাহিনীর কাছে রাইফেল, পিস্তল, একনালা বন্দুক ও দেশি অস্ত্রসহ বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ রয়েছে। সাম্প্রতিক সময় জেলে ও কাঁকড়া শিকারীদের অপহরণের ঘটনাও উদ্বেগ বাড়িয়েছে।

পুনর্বাসনে ঘাটতি যেখানে 

আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বনদস্যুদের আত্মসমর্পণে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করা সাংবাদিক মহসীনুল হাকিম মনে করেন, পুনর্বাসন কার্যক্রমের ধারাবাহিক তদারকির অভাবই বড় সমস্যা। তার মতে, আত্মসমর্পণকারীরা কর্মসংস্থানে টিকে রয়েছে কিনা, পুনর্বাসন সহায়তা কার্যকর হয়েছে কিনা—এসব বিষয় দীর্ঘমেয়াদে পর্যবেক্ষণ করা হয়নি। ফলে অনেকেই আর্থিক ও সামাজিক সংকটে পড়ে পুনরায় অপরাধে জড়িয়ে পড়ার সুযোগ পেয়েছে।

যা বলছে প্রশাসন 

বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের পশ্চিম জোনের জোনাল কমান্ডার ক্যাপ্টেন মেজবাউল ইসলাম বলেন, সুন্দরবনে যৌথ বাহিনীর অভিযান জোরদার করা হয়েছে। তার দাবি, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর চাপের মুখে দস্যুরা আত্মসমর্পণে বাধ্য হবে এবং স্বাভাবিক জীবনে ফেরার সুযোগ এখনো উন্মুক্ত রয়েছে।

খুলনার আঞ্চলিক বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদ বলেন, নিষিদ্ধ সময় অনুপ্রবেশ, বিষ দিয়ে মাছ ধরা এবং বনদস্যুদের তৎপরতার অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। ড্রোন প্রযুক্তিসহ আধুনিক নজরদারি ব্যবস্থার মাধ্যমে অপরাধীদের শনাক্ত করে তাদের আইনের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বন বিভাগের কোনো কর্মকর্তা জড়িত থাকলে তার বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, দস্যুমুক্ত সুন্দরবন গড়তে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। মোবাইল ব্যাংকিং লেনদেন বিশ্লেষণ করে এরইমধ্যে কিছু অপরাধীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পাশাপাশি সুন্দরবনে প্রবেশে ফিঙ্গারপ্রিন্টভিত্তিক ব্যবস্থাও চালু করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, সুন্দরবনে দস্যুতার পুনরুত্থান কেবল আইন-শৃঙ্খলার বিষয় নয়; এটি পুনর্বাসন, সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা, রাজনৈতিক প্রভাব এবং বনসম্পদ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। তাই শুধু অভিযান নয়, অপরাধের মূল কারণগুলো চিহ্নিত করে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।