হালকা সবুজ রঙের দেয়াল। সেখানে টানানো বিখ্যাত ব্যক্তিদের ছবি। মেঝেতে কয়েকটি টেবিল। পাশে পাঠকদের বসার জন্য আরাম চেয়ার। তিনটি কাঠের আলমারিতে সাজানো বই আর টেবিলে ১০টি জাতীয় পত্রিকা।
চারপাশের দেয়ালজুড়ে নজরুল, রবীন্দ্রনাথ, জসীমউদ্দিন, সুফিয়া কামাল, শামসুর রাহমান, স্বামী বিবেকানন্দ, এস এম সুলতান, মসলেম উদ্দিনসহ বিখ্যাত ব্যক্তিদের ছবি।
এভাবে সাজানো নড়াইল সদর উপজেলার মাইজপাড়া ইউনিয়নের মাইজপাড়া ভবেশচন্দ্র গণপাঠ নিকেতন। জেলা শহর থেকে ১০ কিলোমিটার দূরের এ পাঠাগারটি গড়ে তোলা হয় ১৯৮৮ সালে। সে হিসেবে প্রতিষ্ঠানটির বয়স ৩৮ বছর হতে চলেছে।
শেষ বিকেলে কয়েকজন প্রবীণ পাঠক পাঠে মগ্ন। খবরের কাগজ পড়ছেন তারা। সেলিম শেখ এসব পাঠকের একজন। তিনি বলেন, ‘জীবনের শেষ বেলায় এই জায়গা একটু শান্তি দেয়। নিরিবিলি বসে পেপার পড়ি। মাঝেমাঝে বইও পড়ি। সবচেয়ে বেশি ভালো লাগে বিকেলে যখন একসঙ্গে আমার বয়সী অনেকে এখানে আসেন।’
পাঠাগারে সময় কাটানো প্রসঙ্গে বলেন, ‘আমরা একসঙ্গে সময় কাটাই। মাঝেমাঝে মনে হয় আঠারো বছর বয়স ফিরে পেয়েছি।’ পাঠাগারটির নানা সমস্যা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘দীর্ঘদিনের পুরনো এই পাঠাগারটির এখনো সংস্কার হয়নি। পলেস্তারা খসে পড়েছে অনেক জায়গায়। সবচেয়ে বড় সমস্যা এখানে কোনো শৌচাগার নেই। এ ছাড়া পাঠাগারটিতে যদি বইয়ের সংখ্যা বাড়ানো হতো, তাহলে পাঠক আরো বাড়ত।’
সোমবার (২২ জুন) বিকেলে পাঠাগারটিতে গিয়ে দেখা যায়, একটি টিনশেড ঘরে চলছে কার্যক্রম। একটি কক্ষেই আলমারি, পাঠকদের জন্য চেয়ার-টেবিল। একটি টেলিভিশনও রয়েছে। ভেতরে যারা পাঠ করছেন, তারা অধিকাংশই ষাটোর্ধ্ব। ছায়াঘেরা প্রতিষ্ঠানটিতে পত্রিকা পড়তে নিয়মিত আসেন তারা।
কয়েকজন পাঠক জানান, বিদ্যালয়ের টিফিনের সময় শিক্ষার্থীদের ভিড় জমে।
পাঠাগারটিতে শিশু কিশোরদের জন্য রয়েছে আলাদা বইয়ের সংগ্রহ। এখানে এসে বইপড়া ছাড়াও সদস্যরা সাত থেকে ১০ দিনের জন্য বই বাড়িতে নিয়ে পড়তে পারেন। পাঠাগারের গ্রন্থাগারিকের দায়িত্ব পালন করেন তুহিন মোল্যা। তিনি জানান, সকাল থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত চলে পাঠাগারের কার্যক্রম। অধিকাংশ সময়ই তিনি উপস্থিত থাকেন।
ভবেশচন্দ্র গণপাঠাগার নামকরণের ইতিহাস জানতে চাইলে পাঠাগারটি সাবেক লাইব্রেরিয়ান বিকাশ মল্লিক বলেন, এলাকায় শিক্ষার আলো ছড়ানোর জন্য স্থানীয় শিক্ষানুরাগীরা তখনকার মাইজপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের বারবার নির্বাচিত চেয়ারম্যান ভবেশচন্দ্রের স্মরণে তার নামেই পাঠাগারটি প্রতিষ্ঠা করা হয়।
পাঠাগারটির বর্তমান সদস্য সংখ্যা ৬৫০। প্রতিষ্ঠানটিতে রয়েছে প্রায় ১৩০০ বই। নিয়মিত জাতীয় পত্রিকা রাখা হয় ১০টি। প্রায় চার দশক ধরে বইপড়া ও জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। শুধু তা-ই নয়, শিক্ষার আলো ছড়ানোর পাশাপাশি নানা সেবামূলক কাজ পরিচালনা করছে এখানকার কমিটি।
বিকাশ বলেন, তখনকার সময় সদস্যরা মাসিক দুই টাকা চাঁদা দিয়ে প্রতিষ্ঠান চালাতেন। এখানকার সুধী সমাজ এক হয়ে গণগ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠা করার সিদ্ধান্ত নিলে জমি দান করেন স্থানীয় বাসিন্দা গৌরাঙ্গ সাহা। পাঠাগারটি সাজিয়ে তুলতে নানা উদ্যোগ নেয় প্রতিষ্ঠানটির কমিটি।
কমিটির সাধারণ সম্পাদক আনিচুজ্জামান সোহাগ বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের পাঠাগারমুখী করতে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। তারা যেন মোবাইল ফোনের পর্দা থেকে সরে এসে পাঠাগারমুখী হয়, সে জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গিয়ে প্রচার প্রচারণা চালাচ্ছি। শিক্ষার্থীদের বই, খাতা, কলমসহ শিক্ষাসামগ্রী বিতরণ করার উদ্যোগ নিয়েছি।’
বিকলে বয়স্কদের যে পত্রিকা পড়ার যে আগ্রহ নিয়ে এখানে আসেন। একসঙ্গে তারা সময় কাটায় এটা একটা বড় বিষয়। যা অনেক জায়গা দেখা যায় না।এ সময় তিনি পাঠাগারটি পুরাতন এই ভবনটি পূর্ণ নির্মাণের সরকারি সহযোগিতা কামনা করেন।