গত বছর কোরবানির ঈদে রাজকুমার ঋষির পুঁজি ছিল ৯ লাখ টাকা ছিল। ওই টাকা পুরোটাই বিনিয়োগ করেন ময়মনসিংহের শম্ভুগঞ্জ এলাকার এই চামড়া ব্যবসায়ী। কিন্তু মৌসুম শেষে তিনি টাকা তুলতে পারেন মাত্র সাড়ে সাত লাখ। বাকিটা লোকসান। এ বছর কোরবানির ঈদে ওই টাকা বিনিয়োগ করেন চামড়ার ব্যবসায়। তবে লাভের মুখ দেখেননি এবারও।
পারিবারিকভাবে চামড়ার ব্যবসায়ী রাজকুমার জানান, চামড়ার ব্যবসার জন্য কিছু টাকা তার নির্ধারিত থাকে। এ টাকা অন্য কোনো কাজে ব্যয় বা বিনিয়োগ করেন না। তবে লাভ না হওয়ায় ক্রমে কমে আসছে পুঁজি।
কোরবানি ঈদ শেষে হয়েছে প্রায় দেড় মাস হয়েছে। এখনো বিক্রি করতে পারেননি লাভের উদ্দেশ্যে কেনা সব পশুর চামড়া। গত কয়েক বছরের ধারাবাহিকতায় এবারও লোকসানের শঙ্কা রয়েছে। তবে শুধু রাজকুমার নয়, টানা লোকসানে পুঁজি হারানোর শঙ্কার মধ্যে পড়েছেন ময়মনসিংহের শম্ভুগঞ্জের চামড়া ব্যবসায়ীরা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শম্ভুগঞ্জে রয়েছে জেলার সবচেয়ে বড় পশুর চামড়ার হাট। রেওয়াজ অনুযায়ী কোরবানি ঈদের পর দ্বিতীয় শনিবার বসে পশুর চামড়ার বড় হাট। সেখানে ঢাকা থেকে ট্যানারি মালিকরা ট্রাক নিয়ে যান পাইকারি দামে চামড়া কিনতে। তবে এবার ঈদের পর একদিন ট্যানারি মালিকদের প্রতিনিধিরা এলেও বিক্রি হয়নি সব চামড়া। দাম ওঠে সরকার নির্ধারিত দামের অর্ধেক।
আজ শনিবার (১১ জুলাই) শম্ভুগঞ্জ পাইকারি পশুর চামড়ার হাটে গিয়ে কথা হয়ে স্থানীয় পাইকারদের সঙ্গে। তারা জানান, ২০০৫ সাল থেকে চামড়া ব্যবসায় মন্দা দেখা দিয়েছে। শেষ পাঁচ বছরে এ মন্দা আরো বেড়েছে। আর বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় এ মন্দা চরম আকার ধারণ করেছে। এতে স্থানীয় পাইকাররা কয়েক বছর ধরে ক্রমাগত লোকসানের মধ্যে রয়েছেন। এতে অনেকেই চামড়ার ব্যবসা ছেড়ে দিচ্ছেন।
গুরুদয়াল রবিদাস জানান, তিনি ২০ বছরের বেশি সময় ধরে চাড়মার ব্যবসা করে আসছেন। কয়েক বছর ধরে টানা লোকসানের পর এবারও লোকসান হয়েছে। নিজের ব্যবসা নিয়ে তিনি বলেন, প্রতিবছর লোকসান তো আছেই। তার ওপর অনেক টাকা বকেয়া পড়েছে ঢাকার ব্যবসায়ীদের কাছে। এক ব্যবসায়ী চার বছর আগে চেক দিয়ে পাঁচ লাখ টাকার চামড়া বাকিতে কেনেন। ব্যাংকে গিয়ে ওই একাউন্টে টাকা পাওয়া যায়নি। এখনো সেই পাঁচ লাখ টাকা বকেয়া।
শম্ভুগঞ্জ বাজারের অন্যতম ইজারাদার ও মৌসুমী চামড়া ব্যবসায়ী আসাদুর রহমান বলেন, ‘ঈদের পর শনিবারের হাটে ট্যানারি মালিকরা তাদের প্রতিনিধি পাঠিয়েছেন। কিন্তু সরকার নির্ধারিত দামের অর্ধেক দামে চামড়া বেচতে হয়েছে আমাদের। এভাবে চলতে থাকলে ব্যবসীয়া পুঁজি হারিয়ে পথে বসবে।’
শহীদ মিয়া নামের একজন পাইকার বলেন, ‘আগে শুধু রবিদাস আর ঋষি সম্প্রদায়ের লোকেরা পশুর চামড়ার ব্যবসা করতেন। ব্যবসা ভালো থাকায় গত ২০ বছর ধরে শম্ভুগঞ্জ এলাকার স্থানীয় অনেকেই চমড়ার ব্যবসার সঙ্গে জড়িত হয়েছেন। কিন্তু শেষ পাঁচ থেকে সাত বছর ধরে ক্রমাগত লোকসানের কারণে এখন অনেকেই এ ব্যবসা থেকে সরে দাঁড়াচ্ছেন। লোকসানের কারণে অনেকেই এ ব্যবসা ছেড়ে দেওয়ায় দুই বছর আগে শম্ভুগঞ্জ চামড়া ব্যবসায়ী সমিতি ভেঙে গেছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে আরো জানা যায়, প্রতিবছর কোরবানির পশুর চামড়ার দর নির্ধারণ করে দেয় সরকার। এবার প্রতি বর্গফুট চামড়ার দর ৫৭ টাকা নির্ধারণ করা হয়। সে হিসাবে পাইকাররা মৌসুমী ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে সর্বোচ্চ ৩৫ টাকা বর্গফুট দরে কিনেছেন। প্রতি বর্গফুট চামড়া প্রকিয়াজাত করতে লবণ কেনা ও শ্রমিকদের পেছনে ব্যয় করতে হয় অন্তত আরো ১০ টাকা। খরচের পর এবার ঢাকার ব্যবসায়ীরা বর্গফুট সর্বোচ্চ ৩৫ টাকা দরে কিনেছেন।
চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য সরকারিভাবে দেওয়া লবণ নিয়ে ব্যবসায়ীরা জানান, সরকার বিনামূল্যে লবণ দিলেও তা প্রকৃত ব্যবসায়ীরা পাচ্ছেন না। তাদের দাবি, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অনেক মাদরাসা চামড়া কিনে অথবা দান হিসেবে পেয়ে সংরক্ষণ করে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে মাদরাসা কর্তৃপক্ষ (লিল্লাহ বোর্ডিং) সরকারি লবণ পায়। তারা চামড়া সংরক্ষণের সঠিক প্রক্রিয়া জানেন না। এতে চামড়ার ক্ষতি হয়।
এ ব্যাপারে ময়মনসিংহের জেলা প্রকাশক মো. সাইফুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পশুর চামড়া জাতীয় সম্পদ। সরকারের নির্দেশনা মেনে আমরা সে সম্পদ সঠিক সংরক্ষণের সব ধরনের উদ্যোগ নিয়েছি।’