দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময় ধরে সমীক্ষা, পরিকল্পনা, প্রতিশ্রুতি আর ফাইলবন্দি প্রকল্পের পর অবশেষে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ককে ৪ লেন থেকে ৬ লেনে উন্নীত করার ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গত ১৩ জুন কক্সবাজারের চকরিয়ায় এক বিশাল জনসভায় দেওয়া এ ঘোষণায় নতুন করে আশার আলো দেখছেন দক্ষিণ চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের লাখো মানুষ।
জনসমাবেশে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ‘গত ২৫ বছরে কক্সবাজারের গুরুত্ব অনেক বেড়েছে। কয়েকদিনের মধ্যে মাতারবাড়ী বন্দর চালু হবে। এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার সড়ক অন্তত ছয় লেন হওয়া প্রয়োজন।
এদিকে প্রধানমন্ত্রীর এই ঘোষণার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে শুরু করে ব্যবসায়ী, পর্যটন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে প্রশ্নও উঠেছে এবার কি সত্যিই বাস্তবায়ন হবে প্রকল্পটি, নাকি আগের মতোই সমীক্ষার ফাইলে আটকে থাকবে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০১৩ সাল থেকে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক সম্প্রসারণ নিয়ে একাধিক সমীক্ষা পরিচালিত হয়েছে। ২০১৩ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে সুইডিশ কনসালট্যান্ট প্রতিষ্ঠান মহাসড়কটি চার লেনে উন্নীত করার সম্ভাব্যতা যাচাই করে। তাদের প্রতিবেদনে প্রায় ১০ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়েছিল।
পরে জাপানি প্রতিষ্ঠান মারুবেনি এবং সর্বশেষ ২০২১ সালে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) সম্ভাব্যতা সমীক্ষা সম্পন্ন করে। একাধিকবার উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) তৈরি হলেও তা বাস্তবায়নের মুখ দেখেনি। এরপর ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার একটি প্রকল্প অনুমোদিত হয়। প্রকল্পের আওতায় গুরুত্বপূর্ণ অংশ চার লেনে উন্নীতকরণ, একটি ছয় লেনের ফ্লাইওভার এবং চারটি বাইপাস নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়। কিন্তু প্রায় চার বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো দরপত্র প্রক্রিয়া শুরু হয়নি। বর্তমানে দুই লেনের এই মহাসড়কটি বর্তমানে দেশের অন্যতম ব্যস্ত ও দুর্ঘটনাপ্রবণ সড়ক হিসেবে পরিচিত। বিশেষ করে লোহাগাড়ার চুনতি-জাঙ্গালিয়া, সাতকানিয়া, দোহাজারী, চকরিয়া ও রামু এলাকায় প্রায়ই ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটছে।
পুলিশ, স্থানীয় প্রশাসন এবং সড়ক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরু রাস্তা, বিপজ্জনক বাঁক, অতিরিক্ত যানবাহন, লবণবাহী ট্রাক থেকে সড়কে পানি পড়ে পিচ্ছিল হওয়া এবং বেপরোয়া ওভারটেকিং দুর্ঘটনার প্রধান কারণ।
মাতারবাড়ী বন্দর ও অর্থনীতির নতুন বাস্তবতা :
বিশ্লেষকরা বলছেন, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর চালু হওয়ার পর চট্টগ্রাম-কক্সবাজার করিডরের গুরুত্ব কয়েকগুণ বৃদ্ধি পাবে। বর্তমানে পর্যটন, লবণ শিল্প, মৎস্য খাত, কৃষি, রপ্তানি বাণিজ্য এবং কক্সবাজারের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের চাপ বহন করছে এই মহাসড়ক।
দক্ষিণ চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী হেলাল উদ্দিন বলেন, বর্তমান সড়ক দিয়ে এত যানবাহন চলাচল করা খুবই কঠিন। মাতারবাড়ী বন্দর পুরোপুরি চালু হলে এই সড়ক দিয়ে হাজার হাজার কন্টেইনার পরিবহন হবে। তখন ছয় লেন ছাড়া বিকল্প থাকবে না।
পটিয়ার নাছির উদ্দীন বলেন, ‘চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার যেতে আগে তিন ঘণ্টা লাগত, এখন পাঁচ-ছয় ঘণ্টা লাগে। যানজট আর দুর্ঘটনার কারণে মানুষ ভোগান্তিতে আছে। প্রধানমন্ত্রী ছয় লেনের ঘোষণা দিয়েছেন, আমরা দ্রুত বাস্তবায়ন চাই।’
দক্ষিণ চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীরা বলেন, ‘পটিয়া, দোহাজারী, কেরানীহাট, সাতকানিয়া ও লোহাগাড়া এখন দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনৈতিক কেন্দ্র। মহাসড়ক ছয় লেনে উন্নীত হলে শিল্পায়ন ও বিনিয়োগ বাড়বে।’
সড়ক ও জনপথ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, প্রথম ধাপে পটিয়া অংশসহ গুরুত্বপূর্ণ করিডর চার লেনে উন্নীত করা হবে। দোহাজারী, পদুয়া, আমিরাবাদ ও চকরিয়ায় বাইপাস নির্মাণ হবে। কেরানীহাট এলাকায় প্রায় আড়াই কিলোমিটার দীর্ঘ ছয় লেনের ফ্লাইওভার নির্মাণ হবে।
দোহাজারীতে শঙ্খ নদীর ওপর নতুন ছয় লেনের সেতু নির্মাণ করা হবে। মাতামুহুরী নদীর ওপর নতুন সেতু নির্মাণ করে মাতারবাড়ী বন্দরের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ স্থাপন করা হবে। পরবর্তী ধাপে পুরো করিডর চার লেনে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে প্রধানমন্ত্রীর সর্বশেষ ঘোষণার ফলে প্রকল্পটি ছয় লেনের নতুন নকশায় বাস্তবায়িত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
সড়ক মহাসড়ক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, গত এক দশকে সমীক্ষা ও পরিকল্পনার অভাব ছিল না। অভাব ছিল রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও দ্রুত বাস্তবায়নের। প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি ঘোষণার ফলে প্রকল্পটির অগ্রাধিকার বেড়েছে। এখন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে অর্থায়ন নিশ্চিত করা, ভূমি অধিগ্রহণ সম্পন্ন করা এবং দ্রুত নির্মাণকাজ শুরু করা।
অপরদিকে দক্ষিণ চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের মানুষের প্রত্যাশা, আর যেন নতুন কোনো সমীক্ষা নয়, বাস্তবায়নের কাজ শুরু হোক দ্রুত। কারণ প্রতিদিনের দুর্ঘটনা, যানজট ও অর্থনৈতিক ক্ষতির বোঝা বহন করতে করতে ক্লান্ত এই জনপদের মানুষ। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কটি দেশের পর্যটন, বন্দর অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের উন্নয়নের প্রধান লাইফলাইন। তাই প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার পর এখন সবার একটাই প্রশ্ন আশার আলো কি এবার বাস্তবে রূপ নেবে। তাই এখন দক্ষিণ চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারবাসীর একটাই প্রত্যাশা আর কোনো সমীক্ষা নয়, এবার শুরু হোক বাস্তব কাজ। দীর্ঘদিন ধরে দক্ষিণ চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের মানুষ শুধু প্রতিশ্রুতি শুনেছেন। সমীক্ষা হয়েছে, নকশা হয়েছে, প্রকল্প অনুমোদনও হয়েছে। কিন্তু বাস্তবায়ন হয়নি। প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি ঘোষণায় নতুন করে আশাবাদী হয়ে উঠেছেন সবাই।




