এরশাদ সরকারের আমলে মাত্র এক টাকায় প্রায় ৭০০ শতাংশ (সাত একর) জমি স্থায়ী বন্দোবস্ত দেওয়া হয়েছিল আম্বার পেপার মিলসকে। বর্তমানে ওই এলাকার প্রতি শতাংশ জমির মূল্য ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকা হিসাব করলে সম্পত্তিটির বাজারমূল্য দাঁড়ায় শত কোটি টাকারও বেশি।
এই স্থায়ী বন্দোবস্তের বৈধতা, জমির প্রকৃত মালিকানা এবং প্রায় ২০০ বছরের পুরনো একটি শ্মশান ও মন্দিরের অস্তিত্ব নিয়ে চলমান আইনি লড়াইয়ের মধ্যে এক টাকায় স্থায়ী বন্দোবস্ত- এসব বিষয় নিয়ে মামলাটি নতুন মোড় নিয়েছে।
এ ঘটনায় শিল্প প্রতিষ্ঠানটি নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মধ্যে আইনি লড়াইয়ে আদালত চূড়ান্ত রায়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) নারায়ণগঞ্জের প্রথম যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ আদালতে ইনজাংশন ও স্থিতাবস্থা আদেশ বাতিলের আবেদন নিয়ে শুনানি হয়। শুনানি শেষে আদালত রায়ের সিদ্ধান্ত নেন।
শ্মশান কর্তৃপক্ষ জানায়, সিদ্ধিরগঞ্জের আজিবপুর এলাকায় অবস্থিত প্রায় ২০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী শ্মশান ও মন্দিরটি ১৭৯৩ সাল থেকে স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের ধর্মীয় ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। শুধু সিদ্ধিরগঞ্জ নয়, নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ১ থেকে ১০ নম্বর ওয়ার্ড এবং পাশের সোনারগাঁয়ের কাঁচপুর ও মদনগঞ্জ এলাকার হাজার হাজার হিন্দু ধর্মাবলম্বীর শেষকৃত্য সম্পন্ন করার জন্য একমাত্র শ্মশান এটি।
বিরোধের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে প্রায় সাত একর জমির মধ্যে শ্মশান ও মন্দিরের জন্য ব্যবহৃত ৩১ শতাংশ জায়গা।
স্থানীয়দের দাবি, এই জমিতে দীর্ঘদিন ধরে শ্মশান ও মন্দির থাকলেও শিল্প প্রতিষ্ঠানটি পুরো জমির মালিকানা দাবি করছে। এর মধ্যে প্রায় চার থেকে পাঁচ মাস বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের তত্ত্বাবধানে প্রায় তিন কোটি ৫২ লাখ টাকা ব্যয়ে শ্মশানটির আধুনিকায়ন প্রকল্প হাতে নেয়। প্রকল্পের আওতায় অত্যাধুনিক দাহ চুল্লি, গোসলখানা ও কার্যালয় ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল। উন্নয়ন কাজ শুরু হয়ে একাধিক পাইলিং পিলারও বসানো হয়।
এদিকে, পারটেক্স গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান আম্বার পেপার মিলস উচ্চ আদালত থেকে স্থিতাবস্থার আদেশ নিয়ে এলে হঠাৎ করেই উন্নয়ন কাজ বন্ধ হয়ে যায়। এতে স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে ক্ষোভ ও উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে। উচ্চ আদালতের আদেশ নিয়ে নারায়ণগঞ্জের আদালতে সিটি করপোরেশন ও শিল্প প্রতিষ্ঠানটির মধ্যে আইনি লড়াই শুরু হয়।
শ্মশান কমিটির অভিযোগ, ১৯৮৯ সালে পারটেক্স গ্রুপের লিজ নেওয়ার সময় শ্মশানের ৩১ শতাংশ জমির বিষয়টি গোপন করা হয়েছিল। তাদের দাবি, বর্তমানে শত কোটি টাকা মূল্যের এই সম্পদ মাত্র এক টাকায় স্থায়ী বন্দোবস্ত দেওয়া হয়েছিল, যা তদন্তের দাবি রাখে।
অন্যদিকে আম্বার পেপার মিলসের দাবি, সংশ্লিষ্ট জমির সব বৈধ রেকর্ড, বন্দোবস্ত ও মালিকানার কাগজপত্র তাদের প্রতিষ্ঠানের নামে রয়েছে। সরকারি রেকর্ডে শ্মশান বা মন্দিরের দাবির পক্ষে কোনো উল্লেখ নেই বলেও দাবি তাদের। তাদের ভাষ্য, জমির বন্দোবস্ত সংক্রান্ত সব অর্থ পরিশোধ করেই বৈধভাবে লিজ নেওয়া হয়েছে।
স্থানীয়রা জানায়, দুই দশকেরও বেশি সময় আগে একবার শ্মশানের জমি দখলের চেষ্টা হয়েছিল। সে সময় আদালতের রায়ে শ্মশানের অস্তিত্ব স্বীকৃতি পায় এবং সেখানে নিয়মিত দাহকাজ চলতে থাকে। তবে আধুনিকায়ন প্রকল্প শুরু হওয়ার পর নতুন করে আইনি বিরোধ সামনে আসে।
এদিকে, উচ্চ আদালতের স্থিতাবস্থা আদেশ বাতিলের জন্য নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নিম্ন আদালতে আবেদন করে। বিষয়টির গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে সিটি করপোরেশনের প্রশাসক অ্যাড. সাখাওয়াত হোসেন খান নিজেই আদালতে উপস্থিত হয়ে শুনানিতে অংশ নেন।
শুনানি শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে অ্যাড. সাখাওয়াত বলেন, সরকারি তদন্তে জমিটি শ্মশানের জমি হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। আইন অনুযায়ী হাট-বাজার, সড়ক, মসজিদ, মন্দির বা জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট স্থাপনা লিজ দেওয়ার সুযোগ নেই। এভাবে শ্মশানটির উন্নয়ন কাজ নিয়ে অনিশ্চয়তা শুরু হলে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়ন ফিরে যাবে।
অ্যাড. সাখাওয়াত আরো বলেন, ‘এরশাদ সরকারের আমলে মাত্র এক টাকায় বিপুল পরিমাণ এই সম্পদ স্থায়ী বন্দোবস্ত দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি হাস্যকর এবং এর তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।’
তবে আম্বার পেপার মিলসের পক্ষে আইনজীবী অ্যাড. মজিদ খন্দকার বলেন, ‘শ্মশান দাবিদারদের কোনো আইনি ভিত্তিসম্পন্ন কাগজপত্র নেই। আরএস, এসএ, সিএস কিংবা বিডিআরএস- কোনো জরিপেই সংশ্লিষ্ট স্থানে শ্মশান বা মন্দিরের অস্তিত্ব রেকর্ডভুক্ত নয়। বরং আরএস, এসএ ও সিএস রেকর্ডসহ সবশেষ বিডিআরএস জরিপেও ৯৯ বছরের স্থায়ী বন্দোবস্ত শিল্প প্রতিষ্ঠানের নামে রয়েছে। তবে এক টাকায় স্থানীয় বন্দোবস্ত বিষয়টি আমার জানা নেই। কাগজপত্র দেখলে বিষয়টি বোঝা যাবে।’
অ্যাড. মজিদ আরো বলেন, ‘আমরা প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্র আদালতে জমা দিয়েছি। রায় আমাদের বিপক্ষে গেলে উচ্চ আদালতে যাব।’
এদিকে, ২০০ বছরের পুরনো এই শ্মশান ঘিরে এখন মুখোমুখি অবস্থানে স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়, নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন এবং আম্বর পেপার। একপক্ষ এটিকে ঐতিহাসিক ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট ধর্মীয় স্থাপনা হিসেবে দাবি করলেও অন্যপক্ষ জমির বৈধ মালিকানা দাবি করছে।