মাত্র পাঁচ বছরের নিষ্পাপ শিশু মো. জায়ান। বাড়ির সামনে খেলতে খেলতেই হঠাৎ নিখোঁজ। পরিবারের সদস্যরা যখন পুকুর, খাল-বিল ও আশপাশের এলাকায় ছুটে বেড়াচ্ছেন সন্তানের খোঁজে, ঠিক তখনই তাদের ঘরে এসে পৌঁছে এক রহস্যময় মুক্তিপণের চিরকুট। সেখানে দাবি করা হয় তিন লাখ টাকা এবং একটি আনলক মোবাইল ফোন।
কিন্তু শিশু জায়ানকে চিরকুট লেখার আগেই নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল বলে পুলিশের তদন্তে বেরিয়ে এসেছে। এ ছাড়া চট্টগ্রামের পটিয়া পৌরসভার আলোচিত এই হত্যাকাণ্ডে উঠে এসেছে পূর্বপরিকল্পিত অপহরণ, মুক্তিপণের নাটক এবং হত্যার পর ঘটনাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার ভয়ংকর কৌশলের চাঞ্চল্যকর তথ্য।
অপহরণকারীরা হাতে লেখা চিরকুটে লিখেছিল- তোর ছেলে আমাদের কাছে আছে। ছেলেকে পেতে চাইলে যেটা বলছি সেটা শুন। যদি কোনো চালাকি করার চেষ্টা করস তাহলে ছেলেকে আর খুঁজলেও পাবি না। পুলিশের কাছে না গেলে ভালো হয়। যদি যাস ছেলের লাশ পাবি। বাইরের মানুষ না জানার মতো, তোর পরিবারের ওপর নজর আছে সব সময়। আধা ঘণ্টার ভেতর ৩ লাখ টাকা আর তোর ফ্যামিলির যেকোনো একজনের মোবাইল আনলক করে একটা ব্যাগে করে তোর বাড়ির সামনের রাস্তার পাশে ভাঙা দোকানের ভেতর রেখে দিবি...।
চিঠির শেষ লাইনে লেখা ছিল একটি রহস্যময় বাক্য ‘মানুষের গায়ে হাত তোলা বন্ধ করে দিবি’।
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই শেষ বাক্যটিই ছিল বিভ্রান্তি তৈরির অন্যতম কৌশল, যাতে ঘটনাটি ব্যক্তিগত শত্রুতা বা পূর্ববিরোধের দিকে মোড় নেয়।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, শিশু জায়ানকে অপহরণের পর হাতুড়ি দিয়ে মাথায় আঘাত করে হত্যা করা হয়। মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর অভিযুক্তরা নিজেদের বাঁচাতে এবং পরিবারকে বিভ্রান্ত করতে মুক্তিপণের নাটক সাজায়। হাতে লেখা চিরকুটটি জায়ানের বাড়ির জানালা দিয়ে ভেতরে ফেলে দেওয়া হয়। এরপর পরিবার ও এলাকাবাসীকে বিশ্বাস করানোর চেষ্টা করা হয় যে শিশুটি জীবিত রয়েছে এবং মুক্তিপণ দিলে তাকে ফিরিয়ে দেওয়া হবে। কিন্তু বাস্তবে তখন শিশুটির নিথর দেহ বস্তাবন্দি অবস্থায় লুকিয়ে রাখা হয়েছিল বাড়ির পেছনের একটি পরিত্যক্ত ডোবায়।
জায়ানের বাড়ির সামনের রাস্তার পাশে একটি ভাঙাচোরা পরিত্যক্ত দোকানঘরকে মুক্তিপণের টাকা ও মোবাইল ফোন রাখার স্থান হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছিল। তদন্ত সংশ্লিষ্টদের ধারণা, ওই স্থানটি বেছে নেওয়া হয়েছিল দূর থেকে নজরদারি এবং প্রয়োজন হলে দ্রুত পালিয়ে যাওয়ার সুবিধার কারণে। তবে শেষ পর্যন্ত টাকা সংগ্রহের আগেই পুলিশের তদন্তে ধরা পড়ে যায় পুরো পরিকল্পনা।
হাতের লেখাই বেরিয়ে এলো রহস্য
পুলিশের তদন্তে চিরকুটের হাতের লেখা, সন্দেহভাজনদের চলাফেরা, প্রযুক্তিগত তথ্য এবং স্থানীয় সূত্র থেকে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে অভিযুক্তদের শনাক্ত করা হয়। চিরকুটে ব্যবহৃত ভাষা, লেখার ধরন এবং বিভিন্ন আলামত মিলিয়ে হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি আসে। পরবর্তীতে গ্রেপ্তার হওয়া আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদেও বেরিয়ে আসে হত্যার ভয়াবহ বর্ণনা।
পটিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জিয়াউল হক বলেন, ‘এটি অত্যন্ত পরিকল্পিত ও নির্মম হত্যাকাণ্ড। অপহরণের পর শিশুটিকে হত্যা করে ঘটনাকে ভিন্ন খাতে নেওয়ার জন্য মুক্তিপণের চিরকুট ব্যবহার করা হয়েছে। প্রযুক্তিগত তথ্য, আলামত ও জিজ্ঞাসাবাদের ভিত্তিতে আমরা ঘটনার রহস্য উদঘাটন করতে সক্ষম হয়েছি। মামলার তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।’
শোকে স্তব্ধ পরিবার, ক্ষোভে ফুঁসছে জনপদ
শিশু জায়ানের মরদেহ উদ্ধারের পর পুরো পটিয়াজুড়ে নেমে আসে শোকের ছায়া। স্বজনদের আহাজারি আর এলাকাবাসীর ক্ষোভে উত্তাল হয়ে ওঠে জনপদ।
নিহতের এক স্বজন কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আমরা ভেবেছিলাম আমাদের সন্তান বেঁচে আছে। টাকা জোগাড় করার চেষ্টা করেছি। কিন্তু যারা চিঠি লিখেছে, তারা তো এর আগেই আমার সন্তানকে মেরে ফেলেছে। এর চেয়ে নিষ্ঠুরতা আর কী হতে পারে।’
স্থানীয় বাসিন্দা জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘একটি নিষ্পাপ শিশুকে হত্যা করে আবার মুক্তিপণের নাটক সাজানো হয়েছে। এ ঘটনার দৃষ্টান্তমূলক বিচার না হলে সমাজে ভয়াবহ বার্তা যাবে।’
বিচার দাবিতে বিক্ষোভ
জায়ান হত্যার ঘটনায় ইতোমধ্যে পটিয়ার বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ মিছিল, মানববন্ধন ও প্রতিবাদ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়েছে। হাজারো মানুষ রাস্তায় নেমে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে মামলার বিচার এবং দোষীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। নিষ্পাপ শিশু জায়ানের রক্তে রঞ্জিত এই হত্যাকাণ্ড শুধু একটি পরিবারের নয়, পুরো পটিয়ার বিবেককে নাড়া দিয়েছে। এখন সবার একটাই প্রশ্ন যারা একটি শিশুকে হত্যা করেও মুক্তিপণের অভিনয় করতে পারে, তাদের জন্য কী শাস্তি অপেক্ষা করছে।






