দেবীদ্বার সুজাত আলী সরকারি কলেজ ছাত্রীনিবাসের জায়গা দখল করে সড়ক ও সীমানা প্রাচীর এবং গেইট নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে প্রতিবেশী বাড়ির মালিকদের বিরুদ্ধে।জলাবদ্ধতা দূরীকরণের ড্রেন নির্মাণের অনুমতি দিলেও সড়ক নির্মাণের বিষয়ে কলেজ কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছিলনা বলে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন।
পরে বিষয়টি জানতে পেরে গত মঙ্গলবার (১৬ জুন) প্রতিবেশী বাড়ির মালিকদের ডাকেন কলেজ কর্তৃপক্ষ। বাড়ির মালিকরা না আসায় থানা পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনকে বিষয়টি জানিয়ে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহনে লিখিত অভিযোগ করেন। কলেজের পক্ষ থেকে এবং থানা পুলিশ ও উপজেলা প্রশাসন এসে বাঁধা দিলেও রাতের অন্ধকারে কলেজ হোস্টেলের দেয়াল ভেঙ্গে, ৯টি নারিকেল গাছসহ বেশ কিছু গাছ কেটে, ছাত্রীনিবাসের প্রাচীর ভেঙ্গে সড়ক, ৭ ফুট প্রস্ত জায়গায় সড়ক, সীমানা প্রাচীর এ গেইট নির্মাণ কাজ অব্যাহত রাখেন।
কলেজ কর্তৃপক্ষের বাঁধার মুখেও সড়ক ও সীমানা প্রাচীর এবং গেইট নির্মাণ অব্যাহত রাখায় বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) দুপুরে বিক্ষুব্ধ কলেজ শিক্ষার্থীরা বিএনসিসির সদস্যদের নেতৃত্বে বিক্ষোভ মিছিলসহ হাতুরি দিয়ে পিটিয়ে সীমানা প্রাচীর ভেঙ্গে ও সড়কের ইট উপরে ফেলে।
এ ব্যাপারে কুমিল্লা শিক্ষাবোর্ডের চেয়ারম্যান ও দেবীদ্বার সুজাত আলী সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ প্রফেসর মো. আহসান পারভেজ জানান, আমার কাছে ড্রেন নির্মানের জন্য কলেজ হোস্টেলের পূর্বপাশের কয়েকটি নারিকেল গাছ কাটার বিষয়ে ইউএনও ও বন কর্মকর্তার স্বাক্ষরিত একটি চিঠি নিয়ে আসলে শর্ত সাপেক্ষে আমি অনুমতি দেই। কারণ জলাবদ্ধতার কারণে কলেজ হোস্টেলের ভবনের ক্ষতি হচ্ছে, ড্রেন নির্মাণ করার সময় কলেজ হোস্টেলের জলাবদ্ধতার যেন নিরসন হয়। খতিয়ানে চলাচলের জন্য হোস্টেলের পূর্ব পাশে ৩ ফুট জায়গা উল্লেখ আছে। পরবর্তীতে জানতে পারি ৭ ফুট প্রশস্ত সড়ক নির্মাণ করা হচ্ছে। যাতে হোস্টেলের সীমানা প্রাচীর ভেঙ্গে তারা নিজেরা সীমানা প্রাচীর নির্মাণ, সড়ক নির্মাণসহ গেইট নির্মাণ করছেন।আমরা নিজেদের পক্ষথেকে এবং প্রশাসনের পক্ষ থেকে বাঁধা দেওয়ার ব্যবস্থা করি।’
এ ব্যাপারে কলেজ শিক্ষার্থী সায়মন জানান, একটি মহল কলেজ হোস্টেলের পেছনের জায়গা দখল করে সড়ক ও সীমানা প্রাচীর নির্মাণ করে আসছে। হোস্টেলের উত্তর পাশের কয়েকজন বাসার মালিক ড্রেন নির্মাণের কথা বলে রাস্তা ও সীমানা প্রাচীর নির্মাণ করে যাচ্ছেন। কলেজ কর্তৃপক্ষের বাঁধার পরও কাজ অব্যাহত রাখায় আমরা আমাদের দায়বদ্ধতা থেকে কলেজের জায়গা থেকে অবৈধ স্থাপনা ভেঙ্গে দেই।
কয়েকজন শিক্ষার্থী জানান, তাদের চোখের সামনে কলেজের কোটি টাকার সম্পত্তি দখল হয়ে যাবে– মেনে নেওয়া যায় না। পানি নিষ্কাশনের মিথ্যা অজুহাতে হোস্টেলের ১৫টি গাছ কেটে ফেলা হয়েছে এবং এক রাতের মধ্যে দেয়াল তুলে জায়গা দখল করা হয়েছে। ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা ও সম্পত্তি রক্ষায় সব ধরনের ত্যাগ স্বীকার করতে তারা প্রস্তুত।
জায়গা দখলের বিষয়ে জানতে চাইলে প্রতিবেশী বাবুল ভূঁইয়া জানান, আমরা বেশ কয়েকটি পরিবার দির্ঘদিন যাবত জিম্মি হয়ে আছি। আমাদের বাসা থেকে বেরহওয়ার কোন রাস্তা নাই। এদিকে কলেজ হোস্টেল এবং কালা চাঁন মার্কেট নির্মাণ করায় তারা কোন জায়গা রাখেনি। আমাদের চলাচলের ৩ ফুট জায়গা খতিয়ানে উল্লেখ থাকা সত্ত্বেও ওই জায়গা বেদখল হয়ে যায়। ফলে আমরা চলাচলের সুবিধার্থে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের দেয়াল টপকে, বালির বস্তা ফেলে এবং মই ব্যবহার করে যাতায়ত করে আসছিলাম। এরই মধ্যে প্রায় ২০/২৫ বছর পূর্বে প্রতিবেশী মান্নান সাহেব হাসপাতালের রাস্তা ব্যবহারের জন্য আদালত থেকে অনুমতি এনে ব্যবহার করছিলেন। সেই রাস্তাও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বন্ধ করে দেন। আমরা স্থানীয় এমপি হাসনাত আব্দুল্লাহর স্মরণাপন্ন হই।তিনি একটি বরাদ্ধ অনুমোদন দেন। কলেজ হোস্টেলের পাশে খতিয়ান মূলে ৩ ফুট জায়গায় ড্রেন ও রাস্তা নির্মাণের বরাদ্ধ এনে কাজ শুরু করলে আবারো বাঁধার সম্মূখীন হই। আমাদের এখন রাস্তা ও ড্রেনের অভাবে মানবেতর জীবন যাপন করতে হচ্ছে।
প্রতিবেশী হাজী মান্নান সাহেবের ছেলে সফিউল্লাহ মানিকও একই অভিযোগ করে বলেন, আমাদের দূর্ভোগ দেখার কেউ নেই।
বনবিভাগের ডেপুটি রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. আব্দুল মতিন বলেন, ‘কলেজ কর্তৃপক্ষ গাছ কাটার অনুমতি দিলে আমরা ৯টি নারিকেল গাছ ও কিছু কাঠের গাছ কেটে নিলামে বিক্রি করেছি। ৯টি নারিকেল গাছ ৩ শত টাকা করে ২ হাজার ৭ শত টাকা এবং কাঠের গাছগুলো ৫০ টাকা মন দরে ৩ মন ১৫০ টাকাসহ মোট ২ হাজার ৮৫০ টাকা আদালতের মাধ্যমে কলেজ ফান্ডে জমা দিয়েছি।’
এ ব্যাপারে দেবীদ্বার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মনিরুজ্জামান বলেন, ‘কলেজ কর্তৃপক্ষের অভিযোগ পেয়ে কাজ বন্ধ করে দিয়ে এসেছি।
কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ জহিরুল ইসলাম বলেন, ‘একটি পক্ষ ড্রেন নির্মানের কথা বলে অবৈধভাবে রাস্তা ও সীমানা প্রাচীর নির্মাণ করে ফেলে। কলেজের স্বার্থ রক্ষায় আমরা এগিয়ে আসি।’
দেবীদ্বার উপজেলা সহকারি কমিশনার (ভূমি) ও দেবীদ্বার পৌর প্রশাসক মোহাম্মদ ফয়সাল উদ্দিন বলেন, ‘জায়গাটি কলেজের নামে খতিয়ানভূক্ত তবে মন্তব্যের কলামে ড্রেনের জন্য ৩ ফুট জায়গা রয়েছে। কলেজ হোস্টেলের পেছনের বাসিন্দাদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে কলেজ কর্তৃপক্ষ এবং তৎকালীন ইউএনও জলাবদ্ধতা নিরসনে ড্রেন নির্মাণের অনুমোদন দিয়েছিলেন। তবে সীমানা প্রাচীর নির্মাণের কোনো অনুমতি দেওয়া হয়নি। সীমানা প্রাচীর নির্মাণ করায় কলেজ কর্তৃপক্ষ আপত্তি তুলেছেন। আগামী সোম মঙ্গলবারের মধ্যে উভয় পক্ষকে নিয়ে বসে সমাধানের চেষ্টা করব।’
এ ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আশোক বিক্রম চাকমা বলেন, ‘এ বিষয়টা নিয়ে আগামী মঙ্গলবার (২৩ জুন) উভয় পক্ষকে নিয়ে বসব। বসলে একটা সমাধান খুঁজে পাওয়া যাবে। কলেজের স্বার্থ রক্ষা করে এবং রাস্তার অভাবে মানবেতর জীবন যাপন করা বাসার মানুষগুলোকে মানবিক সহায়তা করা যায় সেটা বিবেচনা করে ব্যবস্থা নেব।’