পৃথিবীর পঞ্চম উচ্চতম শৃঙ্গ মাউন্ট মাকালু (৮ হাজার ৪৮৫ মিটার) জয়ের রোমাঞ্চকর ও মিশ্র অনুভূতির গল্প শোনালেন দেশের অন্যতম শীর্ষ পর্বতারোহী ডা. বাবর আলী। গত ২ মে বাংলাদেশ সময় ভোর ৫টা ৪৫ মিনিটে নেপালের মহালাঙ্গুর হিমালয়ে অবস্থিত এই টেকনিক্যালি দুর্গম পর্বত চূড়ায় প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে লাল-সবুজ পতাকা ওড়ান তিনি। এর মাধ্যমে বিশ্বের ১৪টি আট হাজার মিটারের অধিক উচ্চতার পর্বতের মধ্যে ৫টি সফলভাবে আরোহণের অনন্য রেকর্ড গড়লেন বাবর, যা আর কোনো বাংলাদেশির নেই।
দেশে ফিরে ১৭ মে (রবিবার) সকাল ১১টায় চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে অভিযানের আয়োজক পর্বতারোহণ ক্লাব ‘ভার্টিক্যাল ড্রিমার্স’। ‘এক্সপিডিশন মাকালু : দ্য ফিফথ ফ্রন্টিয়ার’ শীর্ষক এই অভিযান-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলন ও পতাকা প্রত্যর্পণ অনুষ্ঠানে বাবর আলী তার অভিযানের নানা রোমাঞ্চকর, প্রতিকূল ও বেদনাবিধুর অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন।
টাকার স্বল্পতায় লক্ষ্য বদল, অতঃপর মাকালু জয়সংবাদ সম্মেলনে বাবর আলী জানান, চলতি বছর তার মূল পরিকল্পনা ছিল কারাকোরাম হিমালয়ে অবস্থিত বিশ্বের নবম উচ্চতম শৃঙ্গ ‘নাঙ্গা পর্বত’ আরোহণ করা। কিন্তু প্রয়োজনীয় স্পন্সর বা টাকার স্বল্পতার কারণে শেষ মুহূর্তে তিনি নিজের লক্ষ্য পরিবর্তন করে ‘মাউন্ট মাকালু’ বেছে নেন।
‘মহা-কালো’ খ্যাত মাকালুর বৈরী আবহাওয়ার বর্ণনা দিয়ে বাবর বলেন, ‘পূর্বে বেশ কয়েকটি আটহাজারি পর্বত আরোহণ করলেও মাকালুর মতো হাড় কাঁপানো ঠাণ্ডা আর তীব্র বাতাসের মুখোমুখি কোথাও হতে হয়নি। এই পর্বতে কাটানো প্রতিটি মিনিটই ছিল এক একটি যুদ্ধ। এখানকার আবহাওয়া ভীষণ রহস্যময়, চোখের পলকে বদলে যায়।’
মাকালু জয়ের আনন্দ থাকলেও বাবরের কণ্ঠে ছিল সহযোদ্ধাদের হারানোর গভীর ক্ষত। মিশ্র অনুভূতি ব্যক্ত করে তিনি বলেন, ‘এই অভিযানে আমি আমার আমেরিকান বন্ধু শেলি জোহানসেনকে হারিয়েছি। চূড়া আরোহণ শেষে নেমে আসার সময় তুষারধসে পড়ে শেলি মারা যান। এ ছাড়া আমার আরেক বন্ধু, রাশিয়ার কন্সট্যান্টিন তীব্র তুষারক্ষতের (ফ্রস্টবাইট) শিকার হয়ে হাত-পায়ের বেশ কয়েকটি আঙুল হারিয়েছে। পর্বত মাঝে মাঝে খুবই অন্যায্য আচরণ করে। তাই লাল-সবুজ পতাকা ওড়ানোর আনন্দের পাশাপাশি এই দুর্ঘটনাগুলোর কষ্টও আমাকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে।’
তরুণদের উদ্দেশে বাবর বলেন, পর্বতারোহণ কোনো খেয়ালি বিষয় বা দিবাস্বপ্ন নয়; এর জন্য প্রয়োজন দীর্ঘ সাধনা ও কঠোর প্রস্তুতি। সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে বিশ্বের বাকি ৯টি আটহাজারি পর্বত চূড়াতেও লাল-সবুজ পতাকা ওড়ানোর প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।
পাশে থাকার প্রত্যয় স্পন্সরদেরঅনুষ্ঠানে প্রধান পৃষ্ঠপোষক প্রতিষ্ঠান ‘ভিজ্যুয়াল নিটওয়্যার লি.’-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক আহমেদ নুর ফয়সাল বাবরের এই ঐতিহাসিক অর্জনে অভিনন্দন জানিয়ে আগামীতেও তার পাশে থাকার আশাবাদ ব্যক্ত করেন। সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে এই অভিযানে যুক্ত হওয়া ‘সামুদা স্পেক-কেম লিমিটেড’-এর ব্র্যান্ড ম্যানেজার ইমতিয়াজ ইবনে ইমাম বাবরের সাহসিকতার প্রশংসা করেন। এই অভিযানে আরো পৃষ্ঠপোষকতা করেছে চন্দ্রবিন্দু প্রকাশন, মাই হেলথ ও রহমান গ্রোসারিজ।
ভার্টিক্যাল ড্রিমার্স-এর সভাপতি ফরহান জামান বলেন, ‘মাকালুর চূড়ায় বাবরের সৌজন্যে আমাদের গর্বের লাল-সবুজ পতাকা উড়েছে। জাতি হিসেবে এটি আমাদের জন্য বিশাল গর্বের। যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতা পেলে বাবর বাংলাদেশের পর্বতারোহণকে বিশ্বমঞ্চে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাবেন।’
পেশায় চিকিৎসক বাবর আলীর পাহাড়ে পথচলা শুরু ২০১০ সালে চট্টগ্রামের পাহাড়ে। ২০১৪ সাল থেকে হিমালয়ের চূড়ায় চোখ তার। ২০১৭ সালে ভারতের উত্তরকাশীর নেহরু ইনস্টিটিউট অব মাউন্টেনিয়ারিং থেকে মৌলিক পর্বতারোহণ প্রশিক্ষণ নেন তিনি। এরপর বছর ২০২২ সালে আমা দাবলাম (২২ হাজার ৩৪৯ ফুট) প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে অত্যন্ত দুর্গম ও টেকনিক্যাল এই চূড়া জয়। ২০২৪ সালে মাউন্ট এভারেস্ট ও মাউন্ট লোৎসে (২৯ হাজার ৩৫ ফুট ও ২৭ হাজার ৯৪০ ফুট) একই অভিযানে দুটি আটহাজারি পর্বত জয়ের একমাত্র বাংলাদেশি রেকর্ড। ২০২৫ (এপ্রিল) অন্নপূর্ণা-১ (২৬ হাজার ৫৪৫ ফুট) প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে বিশ্বের দশম সর্বোচ্চ পর্বত জয়। ২০২৫ (সেপ্টেম্বর) মাউন্ট মানাসলু (২৬ হাজার ৭৮১ ফুট) প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে কৃত্রিম অক্সিজেন ছাড়া আটহাজারি পর্বত জয়। ২০২৬ (মে) মাউন্ট মাকালু (২৭ হাজার ৮৩৮ ফুট) প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে বিশ্বের পঞ্চম সর্বোচ্চ পর্বত জয়।
মাকালু জয়ের মাধ্যমে ১৪টি আটহাজারি শৃঙ্গ ছোঁয়ার স্বপ্নের পথে নিজের পঞ্চম ধাপটি সফলভাবে সম্পন্ন করলেন এই অকুতোভয় বাংলাদেশি লড়াকু।






