৮ বিঘার জমির উপর ২০০ লিচু গাছের বাগান। জৈষ্ঠ্য মাসের রসালো ফল লিচু। গাছে নানা জাতের থোকায় থোকায় ঝুলছে লিচুর। এটি এমন একটি বাগান, যে বাগানের লিচু খেতে লাগেনা একটি টাকাও। ইচ্ছেমতো লিচু খাওয়া যাবে। এটি পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার আলোকদিয়ার গ্রামের কৃষিবীদ মোস্তফা জামাল শামীমের লিচু বাগানের গল্প। যে গল্প রূপকথার গল্পের মতো।
এলাকাবাসী, হতদরিদ্র, দর্শণার্থী ও বন্ধু-স্বজনদের কথা চিন্তা করেই এই উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন বাগান মালিক পাবনা শহরের ব্যবসায়ী ও কিমিয়া সেন্টারের স্বত্তাধিকারী কৃষিবীদ মোস্তফা জামাল শামীম। চিকিৎসা সেবা, শিক্ষাবৃত্তি, মেধাবৃত্তি, বৃক্ষরোপণ, কিডনী ও হার্টের চিকিৎসা সেবা, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে তিনি এক নামে খ্যাতি কুড়িয়েছেন। ব্যবসার পাশাপাশি তিনি শহরের প্রাণ কেন্দ্র আব্দুল হামিদ সড়কে পাবনা কলেজ নামে একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কৃষি বিষয়ে শিক্ষকতা করছেন।
বাগান পরিচর্যাকারীরা বলছেন, প্রায় দেড় যুগ আগে তিনি পৈত্রিক ও নিজস্ব অর্থে কেনা জমিতে এই লিচুর বাগান করেন। লিচু বাগানের ২০০ এর অধিক গাছে থোকায় থোকায় নানা জাতের লিচুতে পরিপূর্ণতা পায় লিচু বাগান। খাবার উপযোগী হলেই স্থানীয় গ্রামবাসী, আশপাশের লোকজন, দরিদ্র, হতদরিদ্র, বন্ধু-বান্ধব স্বজনেরা এসে ইচ্ছে মতো বিনা পয়সায় এই লিচু খেতে পারেন। নিজ হাতে লিচু ভেঙ্গে খাওয়া এ যেন এক বিনোদনের আয়োজন। এই বাগানের লিচু কোনদিন বিক্রি করা হয়নি। মানুষের পাশাপাশি পশুপাখি যেন এই লিচু খেতে পারে এ জন্য বাগান করা হয়েছে উন্মুক্ত। নেই কোন বাউন্ডারি ওয়াল, সীমানা প্রাচীর বা কাটা তারের বেড়া। খাচা বা নেট ব্যবহার একেবারেই নেই।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন এই কৃষি উদ্যোক্তা। গ্রামের একপাশে বয়ে যাওয়া ইছামতি নদী। নদীর পাড়ের বিপরীতের খোলা মাঠ। নানা ফসলের সমারোহের মাঝেই গড়ে তুলেছেন এই লিচুর বাগান। সারিবদ্ধ গাছগুলো টসটসে লিচুতে ছেয়ে গেছে। নানা শ্রেণি পেশার নারী পুরুষ ও শিশুরা আসছেন বিনা পয়সার বাগানে লিচু খেতে। ইচ্ছেমতো লিচু খেয়ে পরিবারের জন্য নিয়েও যাচ্ছেন অনেকে।
বাগান দর্শনে আসা গনমাধ্যম কর্মি ইয়াদ আলী মৃধা পাভেল বলেন, ‘খবর পেয়ে ছুটে এসেছি স্বচক্ষে এমন উদ্যোগ দেখার জন্য। এসে খুব ভাল লাগছে এমন উদ্যোগ গ্রহণ করায়। মানুষ ইচ্ছে করলেই অসম্ভবকে সম্ভব করতে পারে। যার জলন্ত উদাহরণ কিমিয়া সেন্টারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোস্তফা জামাল শামীম।’
আরেক দর্শণার্থী আলমগীর হোসেন বলেন, ‘সম্মান আর সম্পদ দেওয়ার মালিক আল্লাহ। আর এই বান্দা ইচ্ছে করলেই মানবিক, উদার আর জনবান্ধব হতে পারেন। বর্তমানে কেউ কাউকে ছাড় দেন না। সেখানে কমাশিয়াল যুগে নিজ খরচে ২০০ গাছের লিচু বিনা পয়সায় খাওয়ার জন্য উন্মুক্ত করা এটা কি ভাষায় প্রকাশ করবো ভেবে পাচ্ছি না।’
স্থানীয় স্কুল শিক্ষক রাজু আহমেদ জানান, ‘ভালো কাজে গ্রামকে আলোচিত করতে একজনই যথেষ্ঠ। যার প্রমাণ আমাদের গ্রামের কৃতি সন্তান শামীম। তার এই মহতি উদ্যোগের কারণে গ্রামের অনেক মানুষকে বাজার থেকে লিচু কিনে খেতে হয় না। যাদের লিচু খাওয়ার ইচ্ছে হয় তারা যে কোন সময়ে লিচু খেতে বাগানে চলে আসেন। বাগানে আসতে কোন দরজা পেরুতে হয় না। কারও অনুমতি লাগে না।’
লিচু বাগানের মালিক, কিমিয়া সেন্টারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কৃষিবিদ মোস্তফা জামাল শামীম বলেন, ‘রাসায়নিক সার বা কীটনাশক ব্যবহার করা হয় না এই লিচু বাগানে। বাগানে দেয়া হয় না কোন নেট বা বন্ধনী। মানুষের পাশাপাশি পশুপাখির জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে এই লিচু বাগান। গ্রামের মানুষের পাশাপাশি ছোট্ট বাচ্চাদের খুশি করতেই এই উদ্যোগ। যেন বাচ্চারা আনন্দের সাথে নিজে হাতে লিচু পেড়ে খেতে পারে। আমি সব সময় বাগানে বা গ্রামে থাকিনা। কিন্তু যখন শুনি বাগানে নানা শ্রেণির মানুষ দল বেধে এসে লিচু ভেঙ্গে খাচ্ছেন শুনেই তৃপ্তি পাই, ভালো লাগে।’
পাবনা খামার বাড়ির অতিরিক্ত উপপরিচালক কৃষিবিদ মোহাম্মদ নুরে আলম উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, ‘দেশের আরো যারা লিচু বাগান মালিক আছেন, তারা যদি এমন উদারতা দেখান তাহলে সাধারণ মানুষ বিনা পয়সায় লিচু খেতে পারবেন। অনেকের ইচ্ছে থাকলেও কেনার সামর্থ্য না থাকায় লিচু খাওয়া থেকে বঞ্চিত হন।’
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, মানুষের জন্য মানবিক, মানবতা আর মমত্ববোধের জায়গায় এক অনন্য উদাহরণ কৃষিবিদ তথা কৃষি উদ্যোক্তা মোস্তফা জামাল শামীম। কৃষি উদ্যোক্তা শামীমের মতোই সমাজের আনাচে-কানাচে এমন উদ্যোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে এমনটাই প্রত্যাশা করেন তারা।





