ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ পৌর শহরের দত্তপাড়ার ১ নম্বর মোড়ে গেলেই চোখে পড়ে আকাশি-সাদা রঙের এক অন্য রকম দৃশ্য। সারি সারি উড়ছে আর্জেন্টিনার পতাকা। পাশেই দাঁড়িয়ে আছে আর্জেন্টিনার পতাকার আদলে সাজানো একটি ভ্যানগাড়ি। আর সেই ভ্যানের চালক সুমন গৌড়। তবে এলাকায় এই নামে তাকে খুব কম মানুষই চেনে। সবার কাছে তিনি ‘সুমন মেসি’।
জীবনের সঙ্গে তার প্রতিদিনের লড়াই। ভ্যান চালিয়ে যা আয় হয়, তা দিয়েই চলে সংসার। অনেক সময় নুন আনতে পান্তা ফুরানোর অবস্থা। তবু প্রিয় দল আর্জেন্টিনার প্রতি ভালোবাসার কাছে যেন সব হিসাব-নিকাশ হার মেনে যায়।
বিশ্বকাপ এলেই বদলে যায় সুমনের চারপাশ। তার ভাষায়, আর্জেন্টিনা শুধু একটি ফুটবল দল নয়, এটি তার আবেগ, তার ভালোবাসা। সেই ভালোবাসার টানেই নিজের একমাত্র উপার্জনের বাহন ভ্যানগাড়িটিকে সাজিয়েছেন আর্জেন্টিনার পতাকার রঙে। শুধু তা-ই নয়, এলাকার ১ নম্বর মোড়ে টানিয়েছেন ২০ থেকে ২৫টি বড় আকারের আর্জেন্টিনার পতাকা।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এ দৃশ্য নতুন নয়। বহু বছর ধরেই আর্জেন্টিনার খেলা এলেই এমন উন্মাদনায় মেতে ওঠেন সুমন। তার এই অদম্য সমর্থন আর পাগলামির কারণেই এলাকাবাসী অনেক আগেই তার নামের সঙ্গে জুড়ে দিয়েছেন ‘মেসি’। এখন আশপাশের কয়েকটি এলাকাতেও তিনি ‘মেসি’ নামেই পরিচিত।
পরিবারের সদস্যরা জানান, অভাব-অনটনের সংসারেও আর্জেন্টিনার প্রতি ভালোবাসা থেকে কখনো সরে আসেননি সুমন। বিশ্বকাপের সময় যতই তাকে বোঝানো হোক, নিজের সিদ্ধান্ত থেকে একচুলও নড়েন না।
সুমনের স্ত্রী আড়তী গৌড় কণ্ঠে অভিমান আর অসহায়ত্ব নিয়ে বলেন, ‘খেলা এলেই তিনি এমন পাগলামি শুরু করেন। শত বুঝিয়েও কোনো লাভ হয়নি। অভাবের সংসারে নুন আনতে পান্তা ফুরালেও তিনি ঋণের টাকায় এসব করেছেন। এতে আমি বেকায়দায় পড়েছি, অনেক রাগও করেছি। কিন্তু কে শোনে কার কথা! এখন আর কিছু বলি না।’
কত টাকা খরচ হয়েছে জানতে চাইলে সুমন জানান, পতাকা কেনা, সাজসজ্জা আর ভ্যান রং করতে মিলিয়ে প্রায় ৫০ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে। আর এই অর্থের একটি বড় অংশ এসেছে একটি এনজিও থেকে নেওয়া ঋণের মাধ্যমে।
তবে এত কষ্টের মাঝেও তার কণ্ঠে কোনো আক্ষেপ নেই। বরং প্রিয় দলের কথা বলতে গিয়ে চোখে-মুখে ফুটে ওঠে অন্য রকম উচ্ছ্বাস।
সুমন বলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই আমি আর্জেন্টিনা দলকে ভালোবাসি। আর্জেন্টিনা আর মেসি আমার আবেগ। আমার ভালোবাসা। সেই ভালোবাসার জায়গা থেকেই সব করেছি।’
একজন দরিদ্র ভ্যানচালকের জন্য ৫০ হাজার টাকা অনেক বড় অঙ্ক। তবু কেন এমন ব্যয়—এ প্রশ্ন শুনে কিছুটা বিস্মিত হন তিনি।
হাসতে হাসতে তার জবাব, ‘এইডা কী রকম কথা। কাউকে ভালোবাসলে কি টাকা দিয়া হয়? দোয়া করেন, এইবার বিশ্বকাপ পাইলে এলাকার সবাইরে বিরিয়ানি খাওয়াইবাম।’
বিশ্বকাপকে ঘিরে বাংলাদেশে এমন ফুটবল উন্মাদনা নতুন কিছু নয়। হাজার মাইল দূরের কোনো দেশের পতাকা, জার্সি কিংবা প্রিয় খেলোয়াড়কে ঘিরে তৈরি হয় আবেগের বন্ধন। তবে সেই আবেগ কখনো কখনো ঈশ্বরগঞ্জের ভ্যানচালক সুমন গৌড়ের মতো গল্পও তৈরি করে, যা ফুটবলের সীমানা ছাড়িয়ে মানুষের ভালোবাসার শক্তিকেই সামনে নিয়ে আসে। তার অভাব আছে, ঋণ আছে, সংসারের চাপ আছে; কিন্তু সবকিছুর ওপরে আছে এক টুকরো আকাশি-সাদা ভালোবাসা। সেই ভালোবাসার রঙেই তিনি রাঙিয়ে তুলেছেন নিজের ভ্যান, এমনকি নিজের এলাকাও।




