পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে রংপুর অঞ্চলের পশুর হাটগুলোতে বেচাকেনা শুরু হয়েছে। তবে এখনও জমে ওঠেনি। বরং আগের বছরের তুলনায় হাটে ক্রেতা ও পশুর উপস্থিতি-দুটোই কম বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে, দালালের উৎপাত, অতিরিক্ত খাজনা ও হাটের নানা ঝক্কি-ঝামেলা এড়িয়ে এখন অনেক ক্রেতা সরাসরি খামার থেকে গরু কেনার দিকে ঝুঁকছেন। ফলে খামারে ওজন দরে গরু বিক্রির নতুন প্রবণতা দেখা যাচ্ছে রংপুরজুড়ে।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এবার ঈদুল আজহা উপলক্ষে রংপুর বিভাগে পশুর চাহিদা রয়েছে ১৩ লাখ ১৮ হাজার ১১৭টি। বিপরীতে প্রস্তুত রাখা হয়েছে ২১ লাখ ৫২ হাজার ৩১৯টি পশু। ফলে চাহিদা মিটিয়ে উদ্বৃত্ত থাকবে আট লাখের বেশি পশু।
দুই বছর আগেও বিভাগে কোরবানিযোগ্য গবাদি পশুর সংখ্যা ছিল প্রায় ১৫ লাখ। বর্তমানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২০ লাখ ২৩ হাজার ৬৭টিতে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, স্থানীয় খামারিদের পরিশ্রম, পরিকল্পিত খামার ব্যবস্থাপনা এবং দেশি ও শংকর জাতের পশু পালনের কারণে এই উৎপাদন বৃদ্ধি সম্ভব হয়েছে।
বর্তমানে বিভাগে এক লাখ ৯৭ হাজার ৪১৪ জন খামারি সক্রিয় রয়েছেন। তাদের খামারে বাণিজ্যিকভাবে প্রায় সাড়ে আট লাখ গরু প্রস্তুত করা হয়েছে। পাশাপাশি গৃহস্থ খামারিরা প্রায় ১০ লাখ গরু ও খাসি হাটে তোলার প্রস্তুতি নিয়েছেন।
সবচেয়ে বেশি খামারি রয়েছেন রংপুর জেলায়। জেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, প্রায় ৩৩ হাজার খামারে চার লাখের মতো গবাদি পশু পালন করা হচ্ছে। জেলায় কোরবানির চাহিদা যেখানে সোয়া দুই লাখের কিছু বেশি, সেখানে প্রস্তুত রয়েছে তিন লাখ ৬৩ হাজারের বেশি।
তবে উৎপাদন বাড়লেও বাজারে সেই প্রাণচাঞ্চল্য নেই। রংপুর নগরীর সবচেয়ে বড় পশুর হাট লালবাগ হাট ঘুরে দেখা গেছে, ঈদ ঘনিয়ে এলেও বেচাকেনা অনেকটাই ধীরগতির। হাতে গোনা কিছু গরু উঠলেও কাঙ্খিত ক্রেতা নেই।
ধর্মদাস এলাকার গরু বিক্রেতা আরমান হোসেন বলেন, ‘আমার গরুর দাম প্রায় দেড় লাখ টাকা হতে পারে। কিন্তু দুপুর পর্যন্ত কেউ দামই করেনি। মানুষ আসে, দেখে চলে যায়।’
ক্রেতাদের ভাষ্য, এখন অনেকে সরাসরি খামার থেকেই গরু কিনতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছেন। নগরীর এরশাদ মোড় সেনপাড়া এলাকার বাবলু ও জয়লান বলেন, ‘হাটে আগে দাম যাচাই করছি। পরে সিদ্ধান্ত নেব। এখন বেশিরভাগ মানুষ খামার থেকেই গরু কিনছে।’
মাহিগঞ্জের দেওয়ানটুলি এলাকার জমজম ক্যাটল ফার্মে গত চার বছর ধরে ওজন দরে গরু বিক্রি হচ্ছে। খামার কর্তৃপক্ষ জানায়, প্রতিদিনই ক্রেতারা এসে গরু দেখছেন, ওজন স্কেলে মেপে দাম নির্ধারণ করছেন এবং ঈদের আগে বুকিং দিয়ে যাচ্ছেন।
ক্রেতাদের দাবি, ওজন দরে গরু কেনাবেচায় প্রতারণার আশঙ্কা কম থাকে। এতে বাজেট অনুযায়ী সুস্থ ও ভালো গরু কেনা সহজ হয়। তবে খামারকেন্দ্রিক বিক্রি বাড়ায় সরকার রাজস্ব হারাচ্ছে বলেও মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
রংপুরের অন্যতম বড় পশুর হাট গঙ্গাচড়ার বেতগাড়ি হাটেও একই চিত্র দেখা গেছে। সপ্তাহে দুই দিন বসা এই হাটে এবার গরুর আমদানি কম এবং দাম তুলনামূলক বেশি।
ঢাকা থেকে গরু কিনতে আসা পাইকার কালাম ব্যাপারী বলেন, ‘আগে ঈদের ১৫ থেকে ২০ দিন আগে উত্তরাঞ্চলের হাটগুলোতে ব্যাপক ভিড় থাকতো। এবার সেই পরিবেশ নেই। পরিবহন খরচ বেড়েছে, দালালের উৎপাতও বেশি।’
খামারিরাও রয়েছেন দুশ্চিন্তায়। খামারি মিঠু ইসলাম বলেন, ‘পাঁচটি গরু প্রস্তুত করেছি। খরচ অনেক বেড়েছে। বাজার ভালো না হলে বড় লোকসানে পড়তে হবে।’
রংপুর জেলা ও বিভাগীয় ডেইরি ফার্মার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার লতিফুর রহমান মিলন বলেন, ‘ভারতীয় গরু প্রবেশ না করলে দেশি খামারিরা ভালো দাম পাবেন। রংপুর অঞ্চলে পর্যাপ্ত পশু রয়েছে। স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে দেশের অন্যান্য অঞ্চলেও সরবরাহ করা সম্ভব হবে।’
বিভাগীয় প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের পরিচালক ডা. মোহাম্মদ আব্দুল হাই সরকার বলেন, ‘রংপুর অঞ্চলে বর্তমানে ২০ লাখের বেশি গবাদিপশু প্রস্তুত রয়েছে। চাহিদা মিটিয়ে বিপুল সংখ্যক পশু উদ্বৃত্ত থাকবে। আশা করছি, এবার খামারিরা ন্যায্যমূল্য পাবেন।’