জন্ম থেকেই দুই হাতের আঙুল নেই। ছোট ও বাঁকা হাত দিয়ে কলম ধরা সম্ভব হয়নি কোনো দিন। কিন্তু তাই বলে থেমে থাকেনি রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার পলি রানী (১৮)। শৈশবেই ডান পা'কে বানিয়ে নিয়েছেন নিজের হাত। সেই পা দিয়েই লিখে এবার এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছেন তিনি। জীবন যুদ্ধে বেড়ে উঠা পলি,অসম্ভবকে জয় করায় এখন অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছেন অনেকের কাছে।
পলি রানী কাউনিয়া উপজেলার গদাই গ্রামের মৃত মনোরঞ্জন রায়ের কন্যা। তিন ভাই-বোনের মধ্যে সবার ছোট পলি। বড় দুই ভাই বেসরকারি চাকরি করেন। মা রুপালী রাণী গৃহীনি। পলি কাউনিয়া সরকারি কলেজের মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থী। পাশের কাউনিয়া মহিলা কলেজ কেন্দ্রে এইচএসসি পরীক্ষা দিচ্ছেন।
পলির মা রুপালি রানী বলেন, ‘জন্ম থেকেই মেয়ের হাতের আঙুল নেই। হাত ছোট ও বাঁকা হওয়ায় কলম ধরতে পারতো না। ছোটবেলায় তার বাবা মারা যান, খুব কষ্টে খেয়ে না খেয়ে তাকে এবং তার দুই ভাইকে পড়াশোনা করাইছি। অনেকে বলেছে, পলির পড়া লেখা বন্ধ করে দিতে। আমি তার পড়া লেখা বন্ধ করি নাই, পলিও চাইছিল সে পড়া লেখা করবে।’
তিনি আরো বলেন, ‘হাতের আঙ্গুল না থাকায় ছোটবেলা থেকেই পলি ডান পা দিয়ে লেখার চেষ্টা শুরু করে। আস্তে আস্তে সে সব কিছুই লিখতে পারতো। অনেক দিন চেষ্টা করতে করতে সে সফল হয়। এখন সে স্বাভাবিকভাবেই পা দিয়ে লিখতে পারে। তার হাতের লেখা অনেক সুন্দর। কেউ বুঝতেই পারবে না যে পলি পা দিয়ে লেখছে।’
পলির মা আরো জানান, স্কুলজীবনের শুরুটা খুব কষ্ট আর বেদনার ছিল। গ্রামের মানুষ তার লেখা পড়া নিয়ে ভালো চোখে দেখেনি। নানা জনে নানা কথা বলেছে। অনেক কষ্ট সহ্য করতে হয়েছে। দুই হাত না থাকার কারণে সহপাঠীদের উপহাসও সহ্য করতে হয়েছে পলিকে। মাঝে মধ্যে বাড়িতে এসে কান্না কাটি করতো, আমি তাকে বুঝাইতাম, সেও বুঝতো। মানুষ তাকে নিয়ে অনেক মন্তব্য করলেও শিক্ষকরা তাকে সহযোগিতা করেছে।
রুপালী রানি বলেন, ‘আমার মেয়ে বলে বলছি না, ভগবান তাকে অনেক মেধা শক্তি দিয়েছে। পঞ্চম শ্রেণিতে এ-গ্রেড এবং এসএসসিতেও কাউনিয়া বালিকা বিদ্যালয় থেকে এ-গ্রেড পেয়ে পাশ করেছে। আমার আশা, পলি এবারের পরীক্ষাতেও ভালো করবে।’
আজ সোমবার পরীক্ষা শেষে পলি রানী বলেন, ‘পরীক্ষা ভালো হচ্ছে। রেজাল্ট ভালো হলে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বো। পড়াশুনা শেষ করে সরকারি চাকরি করার ইচ্ছা আছে।’
তিনি বলেন, ‘আমি কখনো নিজেকে অন্যদের চেয়ে পিছিয়ে ভাবিনি। আমার স্বপ্ন একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তা হওয়ার। জানি না জীবনে কী হবে? যদি সরকারি কর্মকর্তা হতে পারি তাহলে মানুষের জন্য কাজ কবরো, সেই সুযোগ ও সহযোগিতা চাই। আমি বিশ্বাস করি, আমার স্বপ্ন পূরণ হবে।
কাউনিয়া সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘পলি অনেক মেধাবী। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন পরীক্ষার্থী হিসেবে তার জন্য প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহযোগিতা নিশ্চিত করা হয়েছে। পরীক্ষায় তাকে অতিরিক্ত ৩০ মিনিট সময় দেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, পলি অনেকের জন্য অনুপ্রেরণা। সমাজ বদলে দেয়ার মতো ইতিহাস হতে পারে। মেধাবী ও পরিশ্রমী পলি কখনো নিজের প্রতিবন্ধকতাকে দুর্বলতা হিসেবে দেখেনি। বরং নিজের চেষ্টা আর অধ্যবসায়ের মাধ্যমে অন্য শিক্ষার্থীদের জন্যও অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে।
কাউনিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পাপিয়া সুলতানা বলেন, ‘স্বপ্ন আর অদম্য ইচ্ছাশক্তিই যে মানুষকে এগিয়ে নিয়ে যায়, পলি তার উজ্জ্বল উদাহরণ। আমরা শিক্ষা বোর্ডের নির্দেশনা মেনেই তার পরীক্ষা নিচ্ছি। তার উত্তরপত্র আলাদাভাবে সংরক্ষণ করে বোর্ডে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে।’