বাংলাদেশে সামাজিক বিজ্ঞান গবেষণার অতীত ইতিহাস, সাম্প্রতিক প্রবণতা ও ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেমিনারে বক্তারা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বিগ ডেটা, জলবায়ু পরিবর্তন, নগরায়ণ ও সামাজিক রূপান্তরের প্রেক্ষাপটে সামাজিক বিজ্ঞান গবেষণাকে নতুনভাবে এগিয়ে নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন। পাশাপাশি গবেষণার মানোন্নয়ন, পর্যাপ্ত অর্থায়ন, আন্তঃবিষয়ক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং গবেষণালব্ধ ফল নীতিনির্ধারণে কাজে লাগানোর ওপর জোর দেন তারা।
সোমবার (২৯ জুন) দুপুর সাড়ে ১২টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের লেকচার থিয়েটার ভবনের চতুর্থ তলায় উচ্চতর সামাজিক বিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্রের সেমিনার কক্ষে 'স্টেট অব সোশ্যাল সায়েন্স রিসার্চ ইন বাংলাদেশ: পাস্ট হিস্টোরিজ, কনটেম্পোরারি ট্রেন্ডস অ্যান্ড ফিউচার ডিরেকশনস' শীর্ষক এই সেমিনারটি অনুষ্ঠিত হয়।
সেমিনারে বিশেষ অতিথি ছিলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. মো. শামছুল আলম এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ভারপ্রাপ্ত ডিন অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মইনুল ইসলাম। সভাপতিত্ব করেন উচ্চতর সামাজিক বিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্রের পরিচালক ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে অধ্যাপক ড. মো. শামছুল আলম বলেন, ‘সামাজিক বিজ্ঞান গবেষণায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার নতুন সম্ভাবনা তৈরির পাশাপাশি মৌলিকত্ব ও গবেষণা নৈতিকতার প্রশ্নও সামনে এনেছে। এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় গবেষণার নতুন পদ্ধতি ও মানদণ্ড তৈরির প্রয়োজন রয়েছে বলে তিনি মত দেন। তিনি আরও বলেন, গত এক যুগে সমাজ ও রাষ্ট্রে যে পরিবর্তন এসেছে এবং শিক্ষার্থী ও তরুণদের মানসিকতায় যে রূপান্তর ঘটেছে, তা নিয়ে গভীর গবেষণা দরকার। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের সমন্বিত উদ্যোগে সামাজিক বিজ্ঞান গবেষণা আরও সমৃদ্ধ হবে বলেও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।’
ভারপ্রাপ্ত ডিন অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মইনুল ইসলাম বলেন, ‘শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, নগরায়ণ, জলবায়ু পরিবর্তন, ডিজিটাল অর্থনীতি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও মানসিক স্বাস্থ্যের মতো বিষয়গুলো এখন সামাজিক বিজ্ঞান গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। তবে আন্তঃবিষয়ক গবেষণা, অর্থায়ন, আন্তর্জাতিক মানের অবকাঠামো এবং গবেষণার ফল নীতিনির্ধারণে ব্যবহারের ক্ষেত্রে এখনো বড় সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তিনি প্রতিযোগিতাভিত্তিক অর্থায়ন, জাতীয় ডেটা আর্কাইভ, আন্তর্জাতিক গবেষণা নেটওয়ার্ক এবং তরুণ গবেষকদের জন্য ফেলোশিপ ও আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণের সুযোগ বাড়ানোর আহ্বান জানান।’
সভাপতির বক্তব্যে অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘বাংলাদেশে সামাজিক বিজ্ঞান গবেষণাকে শুধু ফলাফল উপস্থাপনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে এর জ্ঞানতাত্ত্বিক ভিত্তি, ঐতিহাসিক শিকড় ও পদ্ধতিগত কাঠামো নিয়ে গভীর আত্মসমালোচনা প্রয়োজন। ঔপনিবেশিক জ্ঞানতত্ত্ব ও পশ্চিমা তত্ত্বের ওপর নির্ভরশীলতা কাটিয়ে বাংলাদেশের নিজস্ব সমাজ বাস্তবতা থেকে স্থানীয় তত্ত্ব ও ধারণাগত কাঠামো গড়ে তুলতে হবে বলেও তিনি মত দেন। তিনি সামাজিক বিজ্ঞানকে সমাজের নিষ্ক্রিয় আয়না নয়, বরং যৌথ ভবিষ্যৎ বিনির্মাণের সক্রিয় চালিকাশক্তি হিসেবে অভিহিত করেন।’
আলোচক হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. কাজী মারুফুল ইসলাম বলেন, ‘বাংলাদেশকে শুধু জ্ঞানের ভোক্তা নয়, জ্ঞানের উৎপাদক হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত হতে হবে।’ বাংলাদেশ লোক-প্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের সাবেক রেক্টর ড. এম আসলাম আলম বিশ্ববিদ্যালয় ও সরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে গবেষণাভিত্তিক সহযোগিতা বাড়ানোর তাগিদ দেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. নিলয় রঞ্জন বিশ্বাস গবেষণাকে বাস্তব সমস্যা বিশ্লেষণ ও নীতিনির্ধারণে কার্যকরভাবে ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. তারিকুল ইসলাম গবেষণায় মেন্টরশিপ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে যৌথ গবেষণা উদ্যোগ বাড়ানোর আহ্বান জানান।
সেমিনারের শেষ পর্বে শিক্ষক, গবেষক ও শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে প্রশ্নোত্তর ও মুক্ত আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।





