দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের সংকটকালে কাণ্ডারীর ভূমিকায় থাকার কথা যার, সেই শীর্ষ সংগঠন ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এফবিসিসিআই) এখন নিজেই গভীর সংকটে। গত ২০ মাস ধরে কোনো নির্বাচিত নেতৃত্ব নেই সংগঠনটিতে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বসানো প্রশাসকের চাদরে ঢেকে কেবল দাপ্তরিক কাজ চললেও, নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে ব্যবসায়ীদের পক্ষে কথা বলার মতো কেউ নেই। ফলে সরকারের সঙ্গে দর-কষাকষির মূল প্ল্যাটফর্মটি হারিয়ে দেশের ছোট-বড় ব্যবসায়ীরা এখন কার্যত দিশেহারা।
৯ শতাংশের ঘরে আটকে থাকা মূল্যস্ফীতি, ১৪-১৫ শতাংশের চড়া ব্যাংকঋণের সুদ, গ্যাস-বিদ্যুতের তীব্র ঘাটতিতে ব্যাহত উৎপাদন আর কাঁচামাল আমদানিতে এলসি খোলার জটিলতা—সব মিলিয়ে দেশের অর্থনীতি এখন বেশ নড়বড়ে। এর ওপর প্রতি বছর বাড়ছে কর ও ভ্যাটের বোঝা। এমন এক ক্রান্তিকালে, যেখানে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাবে বৈশ্বিক বাজারও অস্থির, সেখানে সরকারের কাছে ব্যবসায়ীদের দাবিদাওয়া বা বাজেট-সংক্রান্ত প্রস্তাবনা তুলে ধরার কোনো অভিভাবক নেই। নির্বাচিত কমিটি না থাকায় ফেডারেশন ভবনে এখন আর আগের মতো ব্যবসায়ীদের আনাগোনাও চোখে পড়ে না।
মূলত নতুন বাণিজ্য সংগঠন বিধিমালা সংশোধন নিয়ে তৈরি হওয়া ধোঁয়াশাই এই অচলাবস্থার মূল কারণ। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তৎকালীন সভাপতি মাহবুবুল আলম পদত্যাগ করেন। এরপর ১১ সেপ্টেম্বর পর্ষদ বাতিল করে প্রশাসক নিয়োগ দেয় মন্ত্রণালয়।
পরবর্তীতে 'এফবিসিসিআই বৈষম্যবিরোধী সংস্কার পরিষদ'-এর দাবির মুখে বিধিমালা সংশোধন করে পরিচালনা পর্ষদের আকার ৮০ থেকে কমিয়ে ৪৬ জনে আনা হয় এবং মনোনীত পরিচালকের সংখ্যা কমানো হয়। তবে বিধিমালায় একটি নতুন শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়—কোনো সদস্য টানা দুই মেয়াদের বেশি পর্ষদে থাকতে পারবেন না, যা পেছনের মেয়াদের জন্যও প্রযোজ্য করা হয়। এই নিয়মের ফাঁদে পড়ে অনেক প্রভাবশালী সাবেক নেতা নির্বাচনের যোগ্যতা হারান। ক্ষুব্ধ ব্যবসায়ীরা আদালতের দ্বারস্থ হলে আইনি জটিলতায় মাঝপথেই থমকে যায় নির্বাচনী প্রক্রিয়া।
বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকার বিধিমালা সংশোধনের উদ্যোগ নিলেও তা শেষ করে যেতে পারেনি। গত ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি সরকার গঠন করার পর ব্যবসায়ী মহলে আশার আলো দেখা দিলেও কাজের গতিতে তেমন গতি আসেনি। প্রথম দফায় এক বছর এবং দ্বিতীয় দফায় গত নভেম্বরে অতিরিক্ত সচিব মো. আবদুর রহিম খানকে চার মাসের জন্য প্রশাসক করা হলেও ইতিমধ্যে ৬ মাস পেরিয়ে গেছে।
সাবেক সভাপতি মীর নাসির হোসেন এবং রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির মহাসচিব ইমরান হাসানের মতো শীর্ষ ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, এফবিসিসিআই না থাকায় দেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা সবচেয়ে বেশি ভুগছেন। স্বৈরাচার দূর হলেও সংগঠনটি এখন পুরোপুরি নেতৃত্বহীন। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় চাইলে এক দিনেই এই বিধিমালা সংশোধন করতে পারে, কিন্তু অজ্ঞাত কারণে কাজটিতে ধীরগতি দেখা যাচ্ছে।
এফবিসিসিআইয়ের নির্বাচন আটকে থাকায় এর চেইন রিঅ্যাকশন হিসেবে ঢাকা চেম্বার (ডিসিসিআই) ও মেট্রোপলিটন চেম্বারসহ দেশের ৪০১টি পণ্যভিত্তিক সংগঠন এবং ৮৩টি জেলা চেম্বারের নির্বাচনও ঝুলে গেছে।
এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি মীর নাসির হোসেন বলেন, ফেডারেশন হচ্ছে ক্ষুদ্র ও বড় ব্যবসায়ীদের সংগঠন। তাঁদের স্বার্থ সংরক্ষণে দর–কষাকষি করে থাকে ফেডারেশন। দীর্ঘদিন ধরে কমিটি না থাকায় ব্যবসায়ীরা কথা বলার জন্য কোনো ফোরাম পাচ্ছেন না। ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠনে ২০ মাস ধরে পর্ষদ না থাকাটা দুঃখজনক। দেশের বৃহত্তর স্বার্থে দ্রুততম সময়ের মধ্যে বাণিজ্য সংগঠন বিধিমালা সংশোধন করে নির্বাচন দেওয়া জরুরি।
এফবিসিসিআইয়ের সংস্কার
ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন হলেও বহু বছর ধরেই এফবিসিসিআইয়ের শীর্ষ নেতৃত্ব নির্বাচন ব্যবসায়ীদের হাতে নেই। যখন যে দল ক্ষমতায় থাকে, তখন তারা তাদের ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ীকে সভাপতির জন্য মনোনীত করে। এ প্রক্রিয়ায় প্রধানমন্ত্রীর সম্পৃক্ততাও থাকে।
ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় জাতীয় নির্বাচনের পাশাপাশি এফবিসিসিআই থেকেও নির্বাচন উধাও হয়ে গিয়েছিল। ২০১৯ ও ২০২১ সালে কোনো ভোট ছাড়াই সভাপতি হন যথাক্রমে শেখ ফজলে ফাহিম ও মো. জসিম উদ্দিন। সর্বশেষ ২০২৩ সালে পণ্যভিত্তিক সংগঠন বা অ্যাসোসিয়েশন অংশে ভোট হয়েছিল। তবে সেবারও ভোট ছাড়াই সভাপতি হয়েছিলেন মাহবুবুল আলম।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এফবিসিসিআইয়ের সাধারণ পরিষদের সদস্য—এই ব্যানারে যাঁরা পর্ষদের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন করেছিলেন, পরে তাঁরাই এফবিসিসিআইয়ের বৈষম্যবিরোধী সংস্কার পরিষদ গঠন করেন। তাঁরা মনোনীত পরিচালক প্রথা বাতিল, পর্ষদের সদস্যসংখ্যা কমানোসহ কয়েকটি সংস্কার প্রস্তাব দেন। সেসব প্রস্তাব রেখে গত বছরের মে মাসে বাণিজ্য সংগঠন বিধিমালা চূড়ান্ত করা হয়।
নতুন বিধিমালায় এফবিসিসিআইয়ের পরিচালনা পর্ষদের আকার ছোট ও মনোনীত পরিচালকের সংখ্যা কমানো হয়। ফেডারেশনের সর্বশেষ পর্ষদ ছিল ৮০ জনের। এর মধ্যে মনোনীত পরিচালক ছিলেন ৩৪ জন। বিধিমালা সংশোধন করে পর্ষদের আকার কমিয়ে ৪৬ জনে নামিয়ে আনা হয়। তার মধ্যে চেম্বার ও অ্যাসোসিয়েশন গ্রুপ থেকে ৫ জন করে ১০ জন মনোনীত পরিচালক থাকবেন। এর বাইরে নারী চেম্বার ও অ্যাসোসিয়েশন গ্রুপ থেকে ১ জন করে ২ জন মনোনীত পরিচালক পর্ষদে যুক্ত হবেন।
বিধিমালা কার্যকর হওয়ার পর ফেডারেশনের প্রথম নির্বাচনে অ্যাসোসিয়েশন গ্রুপ থেকে সভাপতি এবং চেম্বার গ্রুপ থেকে জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি নির্বাচিত হবেন। অন্যদিকে পর্ষদে ১২ জন মনোনীত পরিচালকদের ফেডারেশনের সাধারণ পরিষদের সদস্য হতে হবে। দুই বছরের মেয়াদের জন্য গঠিত সাধারণ পরিষদের প্রত্যেক সদস্যকে এককালীন ২০ হাজার টাকা নিবন্ধন ফি দিতে হবে।
বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির মহাসচিব ইমরান হাসান বলেন, ‘এফবিসিসিআইয়ের কাজ হচ্ছে সরকারের সঙ্গে দেনদরবার করা, ব্যবসায়ীদের সুবিধা–অসুবিধা দেখা। দীর্ঘদিন ধরে পরিচালনা পর্ষদ না থাকায় ব্যবসায়ী নেতৃত্বে শূন্যতা তৈরি হয়েছে। এ অবস্থায় আমরা চাই, সংস্কার শেষে দ্রুত ভোটের মাধ্যমে প্রকৃত ব্যবসায়ী প্রতিনিধি নির্বাচিত হোক।’
নির্বাচন আটকে আছে যে কারণে
নতুন বিধিমালা জারি হওয়ার দুই সপ্তাহের মধ্যে এফবিসিসিআইয়ের নির্বাচনী বোর্ড গঠন করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। গত ১৮ জুন ঘোষিত তফসিলে উল্লেখ করা হয়, ওই বছরের ৭ সেপ্টেম্বর সরাসরি ভোটে সভাপতি, জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি, ২ জন সহসভাপতি ও ৩০ জন পরিচালক নির্বাচিত হবে। পরে বাণিজ্য সংগঠনের দাবির মুখে নির্বাচনের সময় ৪৫ দিন পিছিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
নতুন বিধিমালায় বলা হয়, ফেডারেশনের পরিচালনা পর্ষদে টানা সর্বোচ্চ দুবার থাকা যাবে। তারপর একবার বিরতি দিয়ে আবার নির্বাচন করা যাবে। এই নিয়ম ভবিষ্যতের পাশাপাশি বিগত সময়ের জন্যও প্রযোজ্য করা হয়। বাণিজ্য সংগঠন বিধিমালায় থাকা এই বিধান নির্বাচনের তফসিলেও রাখা হয়েছিল। তাতে সর্বশেষ গত দুই পর্ষদে যাঁরা ছিলেন, তাঁরা নির্বাচনে অযোগ্য হয়ে পড়েন। তাতে ব্যবসায়ীদের একটি পক্ষ ক্ষুব্ধ হয়। ক্ষুব্ধ একাধিক ব্যবসায়ী এ নিয়ে উচ্চ আদালতে রিট মামলা করেন। তারপর নির্বাচনপ্রক্রিয়া থমকে যায়। যাঁরা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য প্রচার–প্রচারণা চালাচ্ছিলেন, তাঁরাও আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন।
জানতে চাইলে এফবিসিসিআইয়ের সহায়ক কমিটির সাবেক সদস্য আবুল কাশেম হায়দার বলেন, ‘ভালোর জন্য আমরা ফেডারেশন থেকে স্বৈরাচার দূর করলাম; কিন্তু এখন ফেডারেশন হয়ে পড়েছে নেতৃত্বহীন। বাণিজ্য সংগঠন বিধিমালা সংশোধনের কাজটি এক দিনেই করা সম্ভব। অর্থমন্ত্রী ও বাণিজ্যমন্ত্রীও বিষয়টি সম্পর্কে ভালোভাবে অবহিত। তারপরও বিধিমালা সংশোধনের কাজটি কেন ধীর গতিতে চলছে, সেটি আমাদের কাছে বোধগম্য নয়।’
এফবিসিসিআইয়ের পাশাপাশি ঢাকা চেম্বার, মেট্রোপলিটন চেম্বারসহ বেশ কয়েকটি বাণিজ্য সংগঠনের আপত্তির মুখে বাণিজ্য সংগঠন বিধিমালা সংশোধনের উদ্যোগ নেয় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। গত সেপ্টেম্বরে বিধিমালা সংশোধনে বিষয়ে একটি বৈঠক করার পর প্রক্রিয়াটি শ্লথ হয়ে যায়। বাণিজ্য বিধিমালা সংশোধন না হওয়ার কারণে এফবিসিসিআইয়ের পাশাপাশি অনেক চেম্বারের নির্বাচনও আটকে আছে। যেমন ঢাকা চেম্বারের বর্তমান কমিটির মেয়াদ দুই দফায় এক বছর বাড়ানো হয়েছে।
সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব (চলতি দায়িত্ব) ও এফবিসিসিআইয়ের বর্তমান প্রশাসক আবদুর রহিম খান জানান, সংশোধিত বাণিজ্য সংগঠন বিধিমালাটি অংশীজনদের মতামতের জন্য চলতি সপ্তাহেই ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হবে। এরপর ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করে এটি চূড়ান্ত করা হবে। বিধিমালা চূড়ান্ত হয়ে গেলেই নির্বাচনের আর কোনো বাধা থাকবে না।
ব্যবসায়ীরা আশা করছেন, সমস্ত আমলাতান্ত্রিক ও আইনি জটিলতা কাটিয়ে দ্রুতই ভোটের মাধ্যমে একটি সত্যিকারের প্রতিনিধিত্বশীল পর্ষদ ফিরে পাবে এফবিসিসিআই, যা দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতিকে সচল করতে সরকারের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করবে।
সূত্র : নিউজ টুয়েন্টি ফোর





