শীর্ষ আবাসন ব্যবসায়ীদের সংগঠন রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (রিহ্যাব) সভাপতি ড. মো. আলী আফজাল বলেছেন, প্রস্তাবিত বাজেটে ৫ কাঠা জমিতে ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত প্রায় দেড় কোটি টাকা কর এবং ডেভেলপারদের নির্মিত ফ্ল্যাটের ওপর ১৫ শতাংশ কর আরোপ দেশের জন্য একটি আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত।
গতকাল বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ প্রতিদিনের ইউটিউবে প্রকাশিত এক আলোচনায় তিনি এ কথা বলেন।
রিহ্যাব সভাপতি বলেন, ধরুন, একজন মানুষ সারা জীবনের সঞ্চয় দিয়ে ৫ কাঠা জমি কিনেছেন। ভবন নির্মাণের পর যদি তাকে অতিরিক্ত দেড় কোটি টাকা কর দিতে হয়, তাহলে তিনি হয়তো ভবন নির্মাণের সিদ্ধান্তই নেবেন না। জমিটি অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে থাকবে। এতে আবাসন খাতে নতুন বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হবে এবং উন্নয়ন কর্মকাণ্ডও কমে যাবে।
আরো পড়ুন
ইরানের সঙ্গে নতুন আলোচনার নেতৃত্বে ভ্যান্স, পেছাল সুইজারল্যান্ড সফর
তিনি বলেন, আরেকটি বিষয় হলো, এই অতিরিক্ত করের প্রভাব শেষ পর্যন্ত ক্রেতাদের ওপরই গিয়ে পড়বে। কারণ কোনো ডেভেলপার কোম্পানি লোকসান দিয়ে ব্যবসা করবে না। অন্যদিকে জমির মালিকরাও চেষ্টা করবেন অতিরিক্ত করের দায় ডেভেলপারদের ওপর চাপিয়ে দিতে। ফলে প্রকল্প বাস্তবায়নের ব্যয় বাড়বে এবং সেই ব্যয় ফ্ল্যাটের বিক্রয়মূল্যের সঙ্গে সমন্বয় করা হবে।
‘অর্থাৎ অতিরিক্ত কর আরোপের ফলে ফ্ল্যাটের দাম বাড়বে এবং এর চূড়ান্ত বোঝা বহন করতে হবে সাধারণ ক্রেতাদের। তাই আমি মনে করি, এই সিদ্ধান্ত শুধু আবাসন খাত নয়, সামগ্রিক অর্থনীতির জন্যও নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।’
আরো পড়ুন
রেফারিদের বগলে বিজ্ঞাপন, ফিফার অবিশ্বাস্য বাণিজ্য-কৌশল
ড. মো. আলী আফজাল বলেন, জমির মালিকরা স্বাভাবিকভাবেই ডেভেলপারদের কাছে জানতে চাইবেন, অতিরিক্ত করের চাপের মধ্যে তারা কত শতাংশ সুবিধা পাবেন। ফলে প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় ডেভেলপারদের নির্মাণ ব্যয় আরো বেড়ে যাবে।
তিনি বলেন, একদিকে নির্মাণসামগ্রীর দাম বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি এবং কাঁচামালের উচ্চমূল্য; অন্যদিকে নতুন করের বোঝা—সব মিলিয়ে আবাসন প্রকল্পের ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে যাবে। এর ফলে যে ফ্ল্যাট আজ একটি নির্দিষ্ট মূল্যে বিক্রি করা সম্ভব, অতিরিক্ত ব্যয়ের কারণে সেটি আরো বেশি দামে বিক্রি করতে হবে।
আরো পড়ুন
অবশেষে মার্কিন মুলুকের পথে ভোজিনহার মা
রিহ্যাব সভাপতি বলেন, এই অতিরিক্ত ব্যয়ের বোঝা শেষ পর্যন্ত বহন করবে দেশের সাধারণ মানুষ। কারণ ডেভেলপাররা বাড়তি খরচ ফ্ল্যাটের মূল্যের সঙ্গে সমন্বয় করতে বাধ্য হবে। ফলে ফ্ল্যাটের দাম বাড়বে, যা সরাসরি ক্রেতাদের ওপর প্রভাব ফেলবে।
ড. আলী আফজাল বলেন, এ ধরনের কর বৃদ্ধি দেশের অর্থনীতি ও সাধারণ জনগণ—উভয়ের জন্যই ক্ষতিকর। তাই প্রস্তাবিত এই কর অবিলম্বে প্রত্যাহার করা উচিত।
তিনি আরো বলেন, আবাসন খাত দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণে অবহেলিত। অনেকের মধ্যে এমন ধারণা রয়েছে যে, এই খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাই ধনী এবং তাদের কর দেওয়ার সক্ষমতা অনেক বেশি। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন।
রিহ্যাব সভাপতি বলেন, যদি মনে করা হয় আবাসন খাত একটি ‘ট্যাক্স আদায়ের মেশিন’, যেখানে চাপ দিলেই রাজস্ব পাওয়া যাবে, তাহলে সেটি একটি ভুল ধারণা। রাষ্ট্রের এমন ধারণা হয়েছে, এই খাতে অতিরিক্ত কর আরোপ করলেই সহজে রাজস্ব আদায় করা সম্ভব। কিন্তু বাস্তবে অতিরিক্ত কর আরোপের ফলে বিনিয়োগ কমবে, নির্মাণ ব্যয় বাড়বে এবং শেষ পর্যন্ত রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যও ব্যাহত হতে পারে।
আরো পড়ুন
অবশেষে মার্কিন মুলুকের পথে ভোজিনহার মা
তিনি বলেন, বাস্তবতা হলো—বাংলাদেশে ফ্ল্যাট ক্রেতাদের বড় অংশ ধনী বা উচ্চবিত্ত শ্রেণির মানুষ নন। বরং মধ্যবিত্ত, নিম্ন-মধ্যবিত্ত এবং বিভিন্ন পেশাজীবী, বিশেষ করে সরকারি চাকরিজীবীরাই আবাসন খাতের প্রধান ক্রেতা। তাদের অধিকাংশেরই ৫ কোটি, ১০ কোটি বা ২০ কোটি টাকার ফ্ল্যাট কেনার সামর্থ্য নেই। তারা নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী ছোট আকারের ফ্ল্যাট কিনে আবাসনের চাহিদা পূরণের চেষ্টা করেন।
তিনি বলেন, নতুন কর আরোপ ও ব্যয় বৃদ্ধি হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন এই মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ। কারণ অতিরিক্ত ব্যয়ের প্রভাব শেষ পর্যন্ত ফ্ল্যাটের মূল্যের ওপর পড়বে।
রিহ্যাব সভাপতি আরো বলেন, আবাসন মানুষের মৌলিক চাহিদাগুলোর অন্যতম। মাথা গোঁজার একটি স্থায়ী ঠিকানা প্রত্যেক মানুষের প্রয়োজন। বাংলাদেশে সামাজিক বাস্তবতায়ও নিজের বাড়ি বা ফ্ল্যাটের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এমনকি ছেলে-মেয়ের বিয়ের ক্ষেত্রেও প্রায়শই প্রথম প্রশ্ন আসে—নিজস্ব বাড়ি আছে কি না।
আরো পড়ুন
অস্ট্রেলিয়ায় বিপুল পরিমাণ মাদকসহ ব্রিটিশ অভিনেত্রী গ্রেপ্তার
তিনি বলেন, বিশ্বের অনেক দেশ আবাসনকে মৌলিক প্রয়োজন হিসেবে বিবেচনা করে প্রথমবার বাড়ি নির্মাণ বা ক্রয়ের ক্ষেত্রে বিশেষ প্রণোদনা দিয়ে থাকে। অনেক দেশে সরকার সরাসরি আর্থিক সহায়তা দেয়, আবার কোথাও স্বল্প সুদে ঋণের ব্যবস্থা করা হয়।
উদাহরণ হিসেবে অস্ট্রেলিয়ার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, সেখানে প্রথমবার বাড়ি কিনলে সরকার নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ সহায়তা হিসেবে প্রদান করে।
রিহ্যাব সভাপতি বলেন, বিশ্বের অনেক দেশে প্রথমবার বাড়ি নির্মাণ বা কেনার ক্ষেত্রে সরকার সরাসরি সহায়তা প্রদান করে। প্রথম বাড়ি নির্মাণকারীদের অনুদান দেওয়া হয়, আবার অনেক দেশে অত্যন্ত স্বল্প সুদে ঋণের সুবিধাও রয়েছে।
আরো পড়ুন
জি-৭ সম্মেলনে মেলোনির ঠোঁটে চুম্বনের চেষ্টা জেলেনস্কির, ভিডিও ভাইরাল
‘আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, একটি দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অনেকাংশেই আবাসন খাতের গতিশীলতার ওপর নির্ভর করে। এর বহু উদাহরণ বিশ্বে রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে একসময় বড় ধরনের অর্থনৈতিক সংকট দেখা দিলে সরকার একটি বিশেষ তহবিল গঠন করে মাত্র ১ শতাংশ সুদে আবাসন ঋণ প্রদান করে। এর ফলে আবাসন খাত চাঙ্গা হয় এবং অর্থনীতিও ঘুরে দাঁড়ায়।’
শুধু যুক্তরাষ্ট্রই নয়, ইউরোপ, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া এবং বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশও আবাসন খাতকে গুরুত্ব দিয়ে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে বাংলাদেশে এই খাতটি দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত।
‘এ ছাড়া বর্তমানে ব্যাংক ঋণের সুদের হার ১৩ থেকে ১৫ শতাংশে পৌঁছেছে। এত উচ্চ সুদে ব্যবসা পরিচালনা করা অত্যন্ত কঠিন। একদিকে নির্মাণসামগ্রী ও অন্যান্য উপকরণের দাম বেড়েছে, অন্যদিকে মূল্যস্ফীতির প্রভাব রয়েছে। হিসাব অনুযায়ী, নির্মাণ ব্যয় এরই মধ্যে ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে বলেও উল্লেখ করেন রিহ্যাব সভাপতি ড. মো. আলী আফজাল।