২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রায় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট নির্ধারণ করা হয়েছে। ১৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নিয়ে আগের যে চলতি বাজেটটি আছে তার ১৯ শতাংশ বেশি প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে এই বাজেটে। দেশের অর্থনীতি সংকটকালীন সময় পার করছে। বিশেষ করে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, উচ্চ সুদের হার, উচ্চ রাজস্ব ঘাটতি, বিনিয়োগ নেই এবং কর্মসংস্থানের নানান সংকট নিয়ে এই সরকারের যাত্রা শুরু হয়েছে। চলমান এসব সংকট নিয়ে কালের কণ্ঠ মাল্টিমিডিয়ার নিয়মিত আয়োজন দ্যা বিজনেস রিভিউ শোতে কথা বলেছেন সিপিডি নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন।
ব্যবসাবান্ধব বাজেট হতে যাচ্ছে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘বাজেট তো এখনো আমরা দেখিনি, যতটুকু গণমাধ্যমে এসেছে এবং মাননীয় অর্থমন্ত্রীর মুখ থেকে যতটুকু শুনতে পাচ্ছি। তারা বলছেন, বাজেটটা ব্যবসাবান্ধব হবে। শুধু ব্যবসা বান্ধব না, শুধুমাত্র যে ব্যক্তি খাতের উন্নয়নের জন্য না, তারা এটাও বলছেন যে, এটা একটা ইনক্লুসিভ বাজেট হবে অর্থাৎ সকলের জন্য কিছু না কিছু থাকবে। তবে মূল বিষয়টা হচ্ছে, ব্যক্তি বিনিয়োগ যদি না হয় তাহলে কিন্তু আবার ইনক্লুসিভও করা যাবে না কারণ এখানে কর্মসংস্থানের কথা উনি বারবার যেটা জোর দিচ্ছেন যে চাকরি কোথা থেকে আসবে।
আমাদের অর্থনীতির প্রায় ৯৫ শতাংশ কিন্তু ব্যক্তি খাতের ওপর নির্ভর করে। তো এখন দেখেন ধারাবাহিকভাবেই ব্যক্তিখাতের বিনিয়োগ তো কম স্থবির। এটা আজকে থেকে না, বহু বছর থেকেই। দশকের মতো হয়ে যাবে যে, জিডিপির ২৩-২৪ শতাংশের মধ্যে আটকে আছে। প্রয়োজন ৩০ শতাংশ মিনিমাম একটা উদীয়মান অর্থনীতির জন্য। তবে আরো একটা বিষয় যে ২৫ অর্থবছরে এটা ২২ শতাংশ নেমে গিয়েছে অর্থাৎ এটা নিম্নগামী হচ্ছে। আমাদের মতো উদয়মান দেশে ৩০ শতাংশ। চায়নার ৩৫ শতাংশ, আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতের দিকে তাকান।’
তিনি আরো বলেন, ‘আমরা তো ক্লেইম করছি যে আমরা এলডিসি থেকে বের হয়ে যাচ্ছি। আর কিছুদিন পরে হয়তো ইভেন এক্সটেনশন না হলেও তিন বছর পরে তো আমরা গ্রেস পিরিয়ড পার হওয়ার পরেই কিন্তু আর এই সমস্ত সুযোগ-সুবিধা থাকবে না। অর্থাৎ এটা বলার অর্থ এই যে, ব্যক্তিখাত আরো অনেক প্রতিযোগিতার মধ্যে পড়ে যাবে। এখন আছে নিজেদের একটা অস্তিত্বের মধ্যে ডোমেস্টিক মার্কেটে টিকে থাকার জন্য। কিন্তু আমরা তো শুধু ডোমেস্টিক মার্কেট নিয়েই না, আমাদের প্রোডাক্ট বাইরে যেতে হয়।’
গ্লোবালি ইন্টিগ্রেটেড হয়ে আছে আমাদের ইকোনমি উল্লেখ করে ফাহমিদা বলেন, ‘ইকোনমির প্রায় ৪০ শতাংশ কিন্তু বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে রপ্তানি-আমদানি তারপরে বিনিয়োগ রেমিটেন্স ইত্যাদির মাধ্যমে জড়িত আছে। এখন এই ইয়েটা গতিময়তাটা আনার জন্য একটা বিষয় হচ্ছে, আপনাকে অর্থ যোগান দিতে হবে। উনি যেটা বললেন যে অনেক ফ্যাক্টরি বন্ধ হয়ে যাচ্ছে অনেক কলকারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এবং সম্প্রতি যে কেন্দ্রীয় ব্যাংক তারা ৬০ হাজার কোটি টাকার একটা সাপোর্ট ঘোষণা করেছে। যেটা আর কিনা ১৯ হাজার কোটি বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে দিবে, ৪১ হাজার কোটি টাকা বিভিন্ন ব্যাংক থেকে তার রিফাইনান্সিং করে দেবে। সেখানে স্পেসিফিকালি কোন কোন খাতে কত টাকা দেওয়া হবে এটা বলা আছে।’
তিনি বলেন, ‘এটা একটা ভালো উদ্যোগ মনে হচ্ছে ও আশা করি যে এটা যদি ভালোভাবে ব্যবহার হয় এবং যাদের দরকার তাদের কাছে গেলে এটা একটা এইযে ড্রাই আউট হয়ে গেছে। এখানে কিছুটা সাপোর্ট পাবে। তবে মনে রাখতে হবে যে আমাদের অতীতের মতো যে যাদের আসলে প্রয়োজন এবং যারা নিয়ে ওই টাকাটা আসলে কাজে ব্যবহার করতে পারছে সেরকম একটা ক্লোজ মনিটরিং-এর বিষয় রয়েছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘বাজেটারি সাপোর্টে আরো কয়েকটা বিষয় রয়েছে। যখন আমরা রপ্তানি কিংবা আমদানি করি তখন এখানে একটা ফিসকাল মেজার থাকে ফিসকাল পলিসির। তো আমাদের এক্সপোর্ট খাতের মধ্যে আরএমজি সেক্টরটা অনেকদিন থেকে অনেক ধরনের কিন্তু সুযোগ-সুবিধা পেয়েছে। ফর এক্সাম্পল আপনের এক্সপোর্ট ইনসেন্টিভ যেগুলো কিংবা ইম্পোর্টের ক্ষেত্রে যদি বলে আমাদের যে ট্যারিফের ক্ষেত্রে ট্যারিফ প্রটেকশন এগুলো ছিল। কিন্তু এই সিনারিওটা বন্ধ হয়ে যাবে কিছুদিন পরে। তো তাহলে তার মানেটা হচ্ছে কি? আমাদেরকে নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে। এই দাঁড়ানোর জন্য যতখানি সহায়তা, রাস্তাঘাট অবকাঠামো, বিদ্যু, জ্বালানি, তারপরে হচ্ছে যে পোর্ট ফ্যাসিলিটি এটা মানে এটাকে বেগবান করা, প্রযুক্তি, দুর্নীতি, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, এই সমস্ত যদি ঠিক না করি এগুলো স্ট্রাকচারাল ইস্যু একটা হয়ে আছে। এগুলো ঠিক না করলে আপনি শুধুমাত্র একটা ফ্যাক্টরি একটা আপনি এক জায়গায় দিলেনকে অনুষঙ্গ তাহলে কিন্তু ঠিক হলো না।’
ঘাটতি বাজেটের বিষয়ে সিপিডির নির্বাহী পরিচালক বলেন, ‘এটা একটা ভীষণ একটা চিন্তার বিষয় যে আসলে অর্থায়ন যেহেতু নাই আমাদের বাজেট ঘাটতি পূরণ করার জন্য, বাজেটের বাজেট পূরণ করার জন্য কিংবা বাজেট বাস্তবায়নের জন্য আমাদের একমাত্র মানে অন্যতম একটা উৎস হচ্ছে রাজস্ব। তা এখন আমাদের রাজস্ব ঘাটতি তো একটা এটাও একটা পেরিনিয়াল। যেমন আপনার ব্যক্তিঘাতের বিনিয়োগের কথা বললাম। এরকম রাজস্ব ঘাটতিটাও গত ১০ বছর থেকে ২০১৭ থেকে ক্রমান্বয়ে এটা টার্গেট ফুলফিল করতে পারছে না। কিন্তু তার বিপরীতে তাকে একটা বিরাট একটা টার্গেট কিন্তু চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এখন সক্ষমতা নাই কিন্তু ওই টার্গেটটা আছে। তো কখনোই এটা কিন্তু পূরণ করতে পারবে না। এবং যেহেতু এখন বাজেটের আকার বেশি, রাজস্ব আহরণের মাত্রাটাও বেশি। কিন্তু তার বাইরেও একটা ঘাটতি রয়ে গেছে। প্রতিবছর আপনি যেটি বললেন যে এই চলতি অর্থবছরেও কিন্তু এক লক্ষ কোটি টাকার উপরে এক লক্ষ দুই হাজার কোটি টাকার মতো কিন্তু ইতিমধ্যে ব্যাংক থেকে নিয়ে গেছে।’
তিনি বলেন, ‘আগামী বছরে আরো বড় টার্গেট। এখন ব্যক্তি খাতের চাহিদা নাই। যদি আমি ধরে নিচ্ছি যে আগামী এক বছরের মধ্যে বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত হলো। তখন তো ব্যক্তি খাতের চাহিদা থাকবে, অর্থ লাগবে। তো এটা একটা ক্রাউডিং আউট ইফেক্ট অবশ্যই আসবে। তার মানে তখন কি হবে? তখন তো সুদের হার আরো বেড়ে যাবে। এখনই কিন্তু বেশি, এখনকার বাস্তবতা হচ্ছে যে মূল্যস্ফীতি বেশি এই কারণে আপনার কন্ট্রাকশনারি মনিটারি পলিসি ফলো করতে হচ্ছে। তো তখন যদি আপনের লিকুইডিটি না থাকে ব্যাংকে, তখন তো সুদের হার আরো বাড়বে। তো এইরকম আসলে একটা হোলিস্টিক চিন্তার প্রয়োজন রয়েছে।’
ঘাটতি মেটানোর প্রথম কথা যে ঘাটতি আস্তে আস্তে আমাদেরকে কমিয়ে আনতে হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘ঘাটতি বাজেট কোনো খারাপ বিষয় না। অনেক দেশেই সেটা করে থাকে কিন্তু আপনি অর্থায়নের জায়গাগুলি কোথায়, আমার আরেকটা জায়গা আছে। এক্সটারনাল সোর্স থেকে বাজেটারি সাপোর্ট আর যেটা বললেন যে যেই টাকাটা আছে সেই টাকাটা আমি যথেষ্ট সুশাসনের সাথে একাউন্টেবিলিটির সাথে ব্যয় করছে কিনা এটাই হচ্ছে। আমাদের এখানে তো অপচয়ের একটা ইতিহাসই আছে। লিকেজ, ওয়েস্টেজ, করাপশন এইগুলোর ওপর যদি নজর না দেওয়া হয় তাহলে আমাদের অর্থনীতির একটা বিরাট অংশ কিন্তু ওই খাতেই চলে যাবে। তখন আপনার এই যে রাজস্বের আদায়ের ওপরে জোর দিচ্ছে। কিন্তু রাজস্বটা যদি আবার ভালোভাবে ব্যবহার না হয় তাহলে আপনার ওখানে কোনো সাশ্রয় হবে না। আরো একটা কথা এই যে বলি যে আমাদের এখানে কর ফাঁকি দেওয়া হয় যত মানুষের এত জনগণ করযোগ্য আয়ের মধ্যে পড়ে কিন্তু তাদের কোনো টিন নম্বর নাই, যাদের আছে তারা কর দিচ্ছে না। একটা মোটিভেশনেরও দরকার আছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘মানুষ যখন দেখে যে তার টাকা দিয়ে কি হচ্ছে, সে কি কোনো সেবা পাচ্ছে কিনা, পাবলিক সার্ভিস জিনিস সেটা পাচ্ছে কিনা, কিংবা তার টাকা দিয়ে যে অবকাঠামো তৈরি হচ্ছে সেখানে কি দুর্নীতি হচ্ছে কিনা, সেটা কি দুর্নীতির মধ্যে টাকাটা চলে যাচ্ছে কিনা, ওগুলো কিন্তু মানুষকে মোটিভেট করার জন্য কিংবা ডিমোটিভেট করার জন্য একটা অন্যতম কারণ। তো ওই বিষয়গুলি কিন্তু দিতে হবে। আপনি হ্যাঁ ড্রাইভ দিবেন অটোমেশন করে মানুষকে নিয়ে আসবেন। কিন্তু ইন রিটার্ন আপনি কি দিচ্ছেন? এমনকি আপনার এই যে ব্যাংকের টাকাগুলি যে চলে গেল ওইগুলো তো মানুষেরই টাকা। আমানতকারীদের টাকা। তো সাধারণ মানুষ কিন্তু আপনার ইকোনমিতে যে পার্টিসিপেট করবে, তারা তো দিচ্ছে কিন্তু রিটার্নটা সেইভাবে পাচ্ছে না।’