kalerkantho

শনিবার । ১৩ আগস্ট ২০২২ । ২৯ শ্রাবণ ১৪২৯ । ১৪ মহররম ১৪৪৪  

সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের রেকর্ড পরিমাণ অর্থ জমা

মাসুদ রুমী   

১৭ জুন, ২০২২ ০৯:০২ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের রেকর্ড পরিমাণ অর্থ জমা

সুইজারল্যান্ডের বিভিন্ন ব্যাংকে বাংলাদেশিদের রাখা অর্থ রেকর্ড পরিমাণ বেড়েছে। গত এক বছরে বাংলাদেশিরা প্রায় তিন হাজার কোটি টাকার সমপরিমাণ অর্থ সুইজারল্যান্ডের বিভিন্ন ব্যাংকে জমা করেছেন। সব মিলিয়ে সুইস ব্যাংকগুলোতে এখন বাংলাদেশিদের টাকার পরিমাণ আট হাজার ৩৪৫ কোটি, যা এযাবৎকালের সর্বোচ্চ।

বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার আলোচনার মধ্যেই গতকাল বৃহস্পতিবার এ তথ্য জানাল সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুইস ন্যাশনাল ব্যাংক (এসএনবি)।

বিজ্ঞাপন

তাদের ‘ব্যাংকস ইন সুইজারল্যান্ড-২০২২’ শীর্ষক বার্ষিক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

এসএনবির প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ২০২১ সাল শেষে দেশটির ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশিদের জমা অর্থের পরিমাণ আগের বছরের ৫৬ কোটি ৩০ লাখ সুইস ফ্রাঁ থেকে বেড়ে ৮৭ কোটি ১১ লাখ সুইস ফ্রাঁ হয়েছে। অর্থাৎ গত এক বছরে সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকে বাংলাদেশিদের জমা অর্থের পরিমাণ প্রায় ৫৫ শতাংশ বেড়েছে, বর্তমান বিনিময় হার (১ সুইস ফ্রাঁ সমান বাংলাদেশি ৯৫ টাকা ৮০ পয়সা) হিসাবে বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ আট হাজার ৩৪৫ কোটি টাকা। টাকার হিসাবে ২০২০ সালে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের পাঁচ হাজার ২০৩ কোটি জমা ছিল। ২০১৮ থেকে ২০২০ সাল—পর পর তিন বছর সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের অর্থের পরিমাণ কমার পর ২০২১ সালে বড় ধরনের উল্লম্ফন হয়েছে।

বিশ্বের ধনীদের বৈধ-অবৈধ অর্থ রাখার নিরাপদ জায়গা হিসেবে সুইজারল্যান্ডের খ্যাতি দীর্ঘদিনের। গ্রাহকদের নাম-পরিচয় গোপন রাখার ক্ষেত্রে কঠোর নীতির কারণে ধনীসহ অর্থপাচারকারীদের প্রথম পছন্দ দেশটির ব্যাংকগুলো। নির্দিষ্ট গ্রাহকের তথ্য না দিলেও এক দশক ধরে এ বিষয়ে বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ করছে সুইস ন্যাশনাল ব্যাংক।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বাংলাদেশ থেকে নানাভাবে অবৈধ উপায়ে পাচার হওয়া অর্থ যেমন সুইজারল্যান্ডের বিভিন্ন ব্যাংকে জমা হয়, তেমনি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসকারী বাংলাদেশিরাও দেশটিতে অর্থ জমা রাখেন। তাই সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকে থাকা বাংলাদেশিদের অর্থের মধ্যে বৈধ-অবৈধের পরিমাণ কত তা নিরূপণ করা কঠিন।

জানতে চাইলে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশিদের অর্থ জমার পরিমাণ ক্রমাগত বাড়ছে। তবে সব অর্থ অবৈধ তা বলা যাবে না। প্রবাসী বাংলাদেশিরাও সেখানে অর্থ রাখতে পারেন। তবে নানাভাবে দেশ থেকে অর্থপাচার বাড়ছে, এটা সত্য। পারস্পরিক আইনি সহায়তা চুক্তির মাধ্যমে পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনার ব্যবস্থা করতে হবে। ’

গতকাল প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০০২ সালে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের আমানত ছিল মাত্র তিন কোটি ১০ লাখ ফ্রাঁ। দুই দশকে তা বেড়েছে প্রায় ৩০ গুণ। বৃদ্ধির হারও সবচেয়ে বেশি ছিল ২০২১ সালে।

দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশের নামে থাকা অর্থ বেড়েছে সবচেয়ে বেশি হারে। সুইস ব্যাংকে ভারত ও পাকিস্তানের অর্থও আগের বছরের চেয়ে ২০২১ সালে বেড়েছে। ভারতের নাগরিকদের রয়েছে ৩৮৩ কোটি ফ্রাঁ, যা ২০২০ সালে ছিল ২৫৫ কোটি ফ্রাঁ। পাকিস্তানের আছে ৭১ কোটি ফ্রাঁ, আগের বছর যা ছিল ৬৪ কোটি ফ্রাঁ। তবে শ্রীলঙ্কা ও নেপালের অর্থের পরিমাণ কমেছে।

সুইস কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানায়, যদি কোনো বাংলাদেশি তাঁর নাগরিকত্ব গোপন করে অর্থ জমা রেখে থাকেন, তবে ওই টাকা এই হিসাবে অন্তর্ভুক্ত হয়নি। গচ্ছিত রাখা সোনা বা মূল্যবান সামগ্রীর আর্থিক মূল্যমানও হিসাব করা হয়নি প্রতিবেদনে।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংস্থা গ্লোবাল ফিন্যানশিয়াল ইন্টিগ্রিটির (জিএফআই) তথ্য অনুসারে, প্রতিবছর বাংলাদেশ থেকে পাচার হয়ে থাকে ৭১ হাজার কোটি টাকা। ১০ বছরে বাংলাদেশ থেকে প্রায় পাঁচ লাখ কোটি টাকা পাচার হয়েছে। এর আগে প্রকাশিত পানামা ও প্যারাডাইস পেপারসে ৮৪ জন বাংলাদেশির টাকা পাচারের তথ্য উঠে আসে। এর বাইরে সেকেন্ড হোমসহ নানা মাধ্যমে মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে দেদার পাচার হয়ে যাচ্ছে অর্থ।

পাচার হওয়া অর্থ ফেরাতে যেসব উদ্যোগ

দেশ থেকে বিভিন্ন উপায়ে পাচার হয়ে যাওয়া অর্থ বাজেটে বৈধ করার প্রস্তাব দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। কর দিয়ে এসব অর্থ বৈধ হয়ে গেলে এর বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারবে না আয়কর কর্তৃপক্ষসহ যেকোনো কর্তৃপক্ষ। ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেট বত্তৃদ্ধতায় তিনি এই প্রস্তাব দিয়েছেন।

বিদেশে অর্জিত স্থাবর সম্পত্তি বাংলাদেশে আনা না হলে এর ওপর ১৫ শতাংশ, বিদেশে থাকা অস্থাবর সম্পত্তি বাংলাদেশে আনা না হলে ১০ শতাংশ ও বাংলাদেশে পাঠানো (রেমিটকৃত) নগদ অর্থের ওপর ৭ শতাংশ হারে করারোপের প্রস্তাব করেন তিনি। এই সুবিধা ২০২২ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৩ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত বলবৎ থাকবে। তবে এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করে আসছে টিআইবিসহ বিভিন্ন সংস্থা।

যেসব জটিলতা

বাংলাদেশ থেকে ১০টি দেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনতে অন্তত ২৩টির বেশি মামলা এখনো চলছে। এগুলো শেষ হলে হাজার কোটি টাকার বেশি ফেরত আনা সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তবে কিছু দেশ থেকে অর্থ ফেরত আনতে বিদ্যমান আইন এবং আন্তর্জাতিক চুক্তির পাশাপাশি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরসহ উভয় সরকারের মধ্যে চুক্তির প্রয়োজন হবে।

দেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মধ্যে পারস্পরিক আইনি সহায়তা চুক্তির মাধ্যমে অর্থ-সম্পদ ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি যারা পাচারে লিপ্ত তাদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা সম্ভব বলে মনে করেন ইফতেখারুজ্জামান। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘অন্তত একটি ক্ষেত্রে তা করেছে বাংলাদেশ। অল্প হলেও সিঙ্গাপুর থেকে আরাফাত রহমান কোকোর পাচার করা অর্থ ফেরত আনা হয়েছিল। ’

সুইজারল্যান্ডের ব্যাংক থেকে বাংলাদেশিদের অবৈধ অর্থ ফেরত আনতে গেলে কী ধরনের আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে, তা জানিয়েছেন বিএফআইইউয়ের সাবেক পরামর্শক দেব প্রসাদ দেবনাথ। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সুইস ব্যাংক থেকে অর্থ ফেরত আনতে কোনো চুক্তি লাগবে না। যেহেতু তারাও জাতিসংঘের সদস্য, তাই এই কনভেনশনের আওতায় এটি ফেরত আনা সম্ভব। আমরা ফিলিপাইন থেকে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি ছাড়াই ১৫ মিলিয়ন ডলার ফেরত আনতে পেরেছি। ’

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর সালেহউদ্দিন আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বাংলাদেশ এগমন্ট গ্রুপের (বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ফিন্যানশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের সমন্বয়ে গঠিত একটি আন্তর্জাতিক ফোরাম) সদস্য। এমএলএর মাধ্যমে সুইজারল্যান্ডে যোগাযোগ করে অর্থ ফেরত আনার চেষ্টা করা যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে দক্ষতা উন্নয়নের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।  



সাতদিনের সেরা