বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় নতুন করে মূল্যস্ফীতির উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সুদের হারের ভবিষ্যৎ নিয়ে দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা। এই দুইয়ের প্রভাবে বিশ্ববাজারে নিরাপদ বিনিয়োগের মাধ্যম হিসেবে পরিচিত সোনার বড় দরপতন হয়েছে।
বুধবার (১৫ জুলাই) বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, আন্তর্জাতিক বাজারে লেনদেন শুরুর পর সোনার দাম কমেছে। অথচ এর আগের কার্যদিবসেই মূল্যবান এই ধাতুর দাম দুই শতাংশের বেশি বেড়েছিল।
বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, সুদের হার বেশি থাকলে সাধারণত বিনিয়োগকারীরা সোনার দিকে কম ঝুঁকেন। কারণ, সোনা বিনিয়োগ করলে সরাসরি কোনো লভ্যাংশ বা সুদ পাওয়া যায় না। ফলে সুদের হার বাড়ার আশঙ্কায় অবধারিতভাবেই সোনার দাম কমেছে।
বুধবার স্পট গোল্ডের দাম আউন্সপ্রতি শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ কমে ৪ হাজার ২৫ দশমিক ১২ ডলারে নেমে আসে। পাশাপাশি আমেরিকার গোল্ড ফিউচার্সের (আগস্ট মাসে সরবরাহের চুক্তি) দাম ১ শতাংশ কমে দাঁড়ায় ৪ হাজার ৩০ দশমিক ৪০ ডলারে।
এর আগে মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) সোনার বাজারে বড় ধরনের সুসংবাদ এসেছিল। জুনে আমেরিকার ভোক্তা মূল্যস্ফীতি প্রত্যাশার চেয়ে বেশি কমেছে—এমন তথ্য প্রকাশের পর মঙ্গলবার সোনার দাম আউন্সপ্রতি ৪ হাজার ১০০ দশমিক ৪৯ ডলারে উঠেছিল। এটি ছিল গত দুই সপ্তাহের মধ্যে মূলবান ধাতুটির সর্বোচ্চ দাম।
তবে এই সুসংবাদ বেশি সময় স্থায়ী হতে দেয়নি তেলের বাজার। ইরান ইস্যুতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কঠোর অবস্থান বিশ্বজুড়ে তেলের বাজারকে অস্থিতিশীল করে তুলেছে। ট্রাম্প ইরানের সব বন্দরে নৌ-অবরোধ আরোপ করেছেন। একই সঙ্গে তেহরান যদি পুনরায় আলোচনায় না বসে, তবে আগামী সপ্তাহে তাদের বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সেতুগুলোতে আঘাত হানার হুমকি দিয়েছেন। এর ফলে টানা তিন কার্যদিবস ধরে তেলের দাম বেড়েই চলেছে।
বিশ্ববাজার বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান ওআন্ডা’র জ্যেষ্ঠ বাজার বিশ্লেষক কেলভিন অং বলেন, ‘বাজার এখন মূল্যস্ফীতির (সিপিআই) ইতিবাচক তথ্যের প্রভাব পেরিয়ে সামনের দিকে তাকাচ্ছে। কারণ, ট্রাম্প হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের ওপর অবরোধ বজায় রেখেছেন। এতে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়ছে এবং এর প্রত্যক্ষ নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে সোনার ওপর।’
সাধারণত মূল্যস্ফীতি থেকে আর্থিক সুরক্ষা পাওয়ার জন্য মানুষ সোনা কিনে রাখেন। তবে সুদের হার বেশি থাকলে এই ধাতুর আকর্ষণ কমে যায়।
আমেরিকার কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের (ফেড) শীর্ষ কর্মকর্তারা জুনের কম মূল্যস্ফীতির তথ্যকে স্বাগত জানিয়েছেন। তবে তারা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, এখনই সুদের হার কমানোর কোনো সম্ভাবনা নেই। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে এসেছে—এ বিষয়ে নিশ্চিত হতে তাদের আরও কিছুদিনের তথ্য পর্যবেক্ষণ করতে হবে।
বুধবার রাতের দিকে আমেরিকার প্রডিউসার প্রাইস ইনডেক্স (পিপিআই) বা উৎপাদনকারী মূল্যসূচক প্রকাশিত হওয়ার কথা রয়েছে। এই সূচক থেকে দেশটির আগামী দিনের ঋণনীতি ও সুদের হারের বিষয়ে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
সিএমই ফেডওয়াচ টুলের তথ্য অনুযায়ী, বিনিয়োগকারীরা মনে করছেন আগামী সেপ্টেম্বর মাসের বৈঠকে ফেডারেল রিজার্ভের সুদের হার বাড়ানোর সম্ভাবনা ৫৮ শতাংশ। তেলের দাম বাড়ার আগে এই সম্ভাবনা ছিল ৭৬ শতাংশ। তবে ডিসেম্বরের বৈঠকে সুদের হার বাড়ার সম্ভাবনা এখনো প্রায় ৮০ শতাংশে রয়ে গেছে।
বিশ্ববাজারে অন্যান্য মূল্যবান ধাতুর মধ্যে আজ রুপার (স্পট সিলভার) দাম শূন্য দশমিক ৮ শতাংশ কমে আউন্সপ্রতি ৫৮ দশমিক ১৮ ডলারে নেমেছে। প্লাটিনামের দাম শূন্য দশমিক ২ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৬২৮ দশমিক ০৬ ডলারে। তবে কিছুটা ব্যতিক্রম ছিল প্যালাডিয়াম, এই ধাতুর দাম শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৩১১ দশমিক ৮৪ ডলারে।





