মসজিদ পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ স্থান। এটি শুধু একটি স্থাপনা নয়; বরং আল্লাহর ইবাদত, জিকির, কোরআন তিলাওয়াত, ইলম শিক্ষা এবং মুসলিম সমাজের আধ্যাত্মিক কেন্দ্র। তাই একজন মুমিনের স্বপ্ন থাকে, নিজের সাধ্য অনুযায়ী এমন একটি মসজিদ নির্মাণ করা, যা হবে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যম।
মসজিদ নির্মাণ ও আবাদ অত্যন্ত ফজিলতের কাজ। পবিত্র কোরআনে এই কাজে নিয়োজিত ব্যক্তির মধ্যে থাকা আবশ্যক গুণগুলোও বলে দেওয়া হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে, ‘একমাত্র তারাই আল্লাহর মসজিদসমূহ আবাদ করবে, যারা আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি ঈমান রাখে, সালাত কায়েম করে, জাকাত প্রদান করে এবং আল্লাহ ছাড়া কাউকে ভয় করে না। আশা করা যায়, ওরা হিদায়াতপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে।’ (সুরা : তাওবা, আয়াত : ১৮)
রাসুল (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির আশায় মসজিদ নির্মাণ করবে, আল্লাহ তাআলা তার জন্য জান্নাতে ঘর নির্মাণ করবেন। (বুখারি, হাদিস : ৪৫০)
এই ফজিলত অর্জন করতে সবাই চেষ্টা করেন তাদের মসজিদটি নান্দনিক ও মুসল্লিবান্ধব হয়। নিয়ত বিশুদ্ধ থাকার শর্তে মসজিদ নান্দনিক করা দোষনীয়ও নয়।
হাদিস শরিফে এসেছে, আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, মহানবী (সা.) বলেছেন, যার অন্তরে অণু পরিমাণ অহংকার থাকবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না। এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করল, মানুষ চায় যে তার পোশাক সুন্দর হোক, তার জুতা সুন্দর হোক, এ-ও কি অহংকার? রাসুল (সা.) বললেন, ‘আল্লাহ সুন্দর, তিনি সুন্দরকে ভালোবাসেন। প্রকৃতপক্ষে অহংকার হচ্ছে দম্ভভরে সত্য ও ন্যায় অস্বীকার করা এবং মানুষকে ঘৃণা করা।’ (মুসলিম, হাদিস : ১৬৬)
তাই মহান আল্লাহকে খুশি করার আশায় একটি মসজিদ পরিচ্ছন্ন, সুপরিকল্পিত, দৃষ্টিনন্দন ও আরামদায়ক হওয়া দোষের নয়। বরং এমন পরিবেশ মুসল্লিদের ইবাদতে মনোযোগ বাড়াতে সহায়ক হতে পারে। তবে এই সৌন্দর্য যেন কখনো অহংকার, অপচয় বা লোক-দেখানো প্রতিযোগিতায় পরিণত না হয়, সে ব্যাপারে সতর্ক থাকা আবশ্যক। কারণ লোক-দেখানো প্রতিযোগিতা ও অহংকারের উদ্দেশ্যে মসজিদ নির্মাণ করা বা অলংকরণ করা নিন্দনীয়। এ ব্যাপারে সতর্ক করে মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘যতক্ষণ পর্যন্ত লোকেরা মসজিদের সৌন্দর্য ও সুসজ্জিতকরণ নিয়ে পরস্পর গর্ব না করবে ততক্ষণ কিয়ামত সংঘটিত হবে না।’ (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৭৩৯)
বর্তমান সময়ে একটি উদ্বেগজনক প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। তা হলো, এখনকার যুগের মুসল্লিরাও ইবাদতের জন্য ‘ফটোজেনিক’ মসজিদ খুঁজে বেড়ান, যেখানে ইবাদতের চেয়ে মসজিদের ফটোজেনিক লুকটা বেশি প্রাধান্য পায়। কোথায় ছবি সবচেয়ে সুন্দর আসবে, কোথায় ভিডিও বা রিল বেশি আকর্ষণীয় হবে, এ বিষয়গুলোর প্রতি বেশি গুরুত্বারোপ করা হয়।
এই প্রবণতা মানুষের ইবাদতের মাহাত্ম্য নষ্ট করে। কারণ যেখানে উদ্দেশ্য হওয়ার কথা ছিল একমাত্র মহান আল্লাহর ইবাদত, সেখানে ফটো সেশন, ভিডিও ভ্লগিং ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তার প্রচারটা বেশি গুরুত্ব পেয়ে যায়। (নাউজুবিল্লাহ!)
অথচ পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘আর নিশ্চয় মসজিদগুলো আল্লাহরই জন্য। কাজেই তোমরা আল্লাহর সঙ্গে অন্য কাউকে ডেকো না।’ (সুরা : জিন, আয়াত : ১৮)
এই আয়াতের মূল শিক্ষা হলো, মসজিদের প্রতিটি কার্যক্রম হতে হবে একমাত্র মহান আল্লাহকে কেন্দ্র করে। সেখানে ব্যক্তিস্বার্থ ও প্রচারপ্রিয়তা ইত্যাদির অনুপ্রবেশ ঘটানো মূল উদ্দেশ্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করার প্রবলর আশঙ্কা থাকে। কারণ বিশুদ্ধ নিয়ত ও ইখলাস হলো ইবাদতের প্রাণ। ইখলাস পরিপন্থী ও নিয়তের গরমিল ইবাদতকে মূল্যহীন করে দেয়। আলক্বামাহ ইবনে ওয়াক্কাস আল-লায়সি (রহ.) থেকে বর্ণিত, আমি উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-কে মিম্বরের ওপর দাঁড়িয়ে বলতে শুনেছি, আমি আল্লাহর রাসুল (সা.)-কে বলতে শুনেছি, আমল (এর প্রাপ্য হবে) নিয়ত অনুযায়ী। আর মানুষ তার নিয়ত অনুযায়ী প্রতিফল পাবে। (বুখারি, হাদিস : ১)
অতএব (নাউজুবিল্লাহ!) যদি কারো মসজিদে যাওয়ার উদ্দেশ্য আল্লাহর সন্তুষ্টির পরিবর্তে নিজের উপস্থিতি প্রদর্শন করা কিংবা ফটো সেশন করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আপলোড করা হয়ে যায়, তবে ইখলাস ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। আর ইখলাস নষ্ট হলে আমলের মর্যাদাও কমে যায়।
তাই মসজিদে গেলে মসজিদের আদব রক্ষার ব্যাপারে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে। মসজিদে উচ্চৈঃস্বরে কথা বলা, অপ্রয়োজনীয় কোলাহল সৃষ্টি করা, অন্য মুসল্লির ইবাদতে বিঘ্ন ঘটানো কিংবা ছবি, ভিডিও বা এমন কোনো কাজ করা, যাতে মানুষের মনোযোগ নষ্ট হয়—ইসলামের আদবের পরিপন্থী।
ইসলাম প্রযুক্তির বিরোধী নয়। কখনো কখনো শিক্ষামূলক, ঐতিহাসিক বা স্থাপত্যসংক্রান্ত তথ্য সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে মসজিদের ছবি বা ভিডিও ধারণ করা জায়েজ হতে পারে, যদি তা মসজিদের মর্যাদা নষ্ট না করে, অন্য মুসল্লির ইবাদতে বিঘ্ন সৃষ্টি না করে এবং রিয়া বা আত্মপ্রদর্শনের মাধ্যম না হয়।
কিন্তু নামাজরত মানুষের সামনে ক্যামেরা ধরানো, সেলফি তোলার জন্য কাতার ব্যাহত করা, উচ্চৈঃস্বরে ভিডিও ধারণ করা কিংবা মসজিদকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ‘কনটেন্ট স্টুডিও’ বানিয়ে ফেলা অবশ্যই পরিহারযোগ্য। আল্লাহর কাছে দুনিয়ার সবচেয়ে প্রিয় স্থান মসজিদে দাঁড়িয়ে কবিরা গুনাহে লিপ্ত হওয়া মারাত্মক গুনাহ। এর মানে আবার এও নয় যে কোনো মসজিদ অনেক সুন্দর হলেই সেখানে নামাজ পড়া নিষেধ। বরং ইবাদতের মাহাত্ম্য নষ্টকারী প্রদর্শনমূলক কাজের উদ্দেশ্যে নান্দনিক মসজিদ খোঁজা নিষেধ। উদ্দেশ্য যদি হয় প্রশান্তচিত্তে মহান আল্লাহর ইবাদত করা, তাহলে এমন মসজিদে যেতে কোনো সমস্যা নেই। বরং তার স্থিরচিত্তে ইবাদতে মগ্ন হতে সহায়তা করবে ইনশাআল্লাহ।
একজন মুমিনের কাছে মসজিদের সৌন্দর্যের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ তার সিজদার সৌন্দর্য। স্থাপত্যের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ইখলাস। ক্যামেরার ফ্রেম ঠিক রাখার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ আল্লাহর দরবারে ইবাদতগুলো কবুল হওয়া।
তাই মসজিদে প্রবেশের সময় প্রতিটি মুমিনের উচিত, তার হৃদয়কে বিনয়ে পূর্ণ রাখা, পরিপূর্ণ শ্রদ্ধা রাখা, আর অন্তরকে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আকাঙ্ক্ষায় উদগ্রীব রাখা। যাঁরা মসজিদ নির্মাণ কিংবা মসজিদের সেবায় থাকেন, তাঁদেরও উচিত প্রতিটি পদক্ষেপে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টিকে প্রাধান্য দেওয়া। শয়তানের ধোঁকা থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাওয়া।
মহান আল্লাহ সবাইকে বিশুদ্ধ নিয়ত ও পরিপূর্ণ তাকওয়া দান করুন। সবার ইবাদত ও শ্রমকে কবুল করুন।




এ প্রীতি অনুষ্ঠানে কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আল হাদিস ও ইসলামি শিক্ষা বিভাগের সাবেক শিক্ষক শায়খ ড. খন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর (রহ.)-কে মরণোত্তর সম্মাননা পদক দেওয়া হয়েছে। তা ছাড়া সম্মাননা পদক পাওয়া উল্লেখযোগ্য গ্রাজুয়েটদের মধ্যে ছিলেন, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষক ড. মোহাম্মদ মানজুরে ইলাহী, আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রাম (আইআইইউসি)-এর সাবেক শিক্ষক ড. মাওলানা আব্দুস সালাম রিয়াদি প্রমুখ।
তিনি আরো বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকার যেকোনো দূরদর্শী ও অগ্রগামী চিন্তাভাবনাকে গ্রহণ করতে অত্যন্ত আন্তরিক। এই দৃষ্টিকোণ থেকে, সৌদি আরবের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সাবেক শিক্ষার্থীদের উচিত, উদ্ভাবন ও বৈজ্ঞানিক গবেষণার ক্ষেত্রে—যার যার নিজস্ব অঙ্গনে—নেতৃত্ব দেওয়া এবং সমাজে মধ্যপন্থা, পরমতসহিষ্ণুতা ও আলোকিত চিন্তাধারার প্রসারে নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়া।’