• ই-পেপার

শায়খ ড. আবদুল্লাহ বিন আওয়াদ আল-জুহানি

মসজিদুল হারামের জুমার খুতবার সারসংক্ষেপ

আইসিটি উন্নয়নে মুসলিম বিশ্বে এগিয়ে সৌদি আরব

ইসলামী জীবন ডেস্ক
আইসিটি উন্নয়নে মুসলিম বিশ্বে এগিয়ে সৌদি আরব
সংগৃহীত ছবি

ডিজিটাল রূপান্তর ও তথ্য-প্রযুক্তি উন্নয়নে নতুন এক মাইলফলক স্পর্শ করেছে সৌদি আরব। ‘আইটিইউ’ প্রকাশিত ২০২৬ সালের আইসিটি উন্নয়নসূচক বিশ্বের ১৫৯টি দেশের মধ্যে প্রথম স্থান অর্জন করেছে দেশটি। আইটিইউর এই সূচকে বিভিন্ন দেশের ডিজিটাল অগ্রগতি, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির (আইসিটি) ব্যবহার এবং সেবার মান মূল্যায়ন করা হয়। মূল্যায়নের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে অন্তর্ভুক্তিমূলক সংযোগ ও কার্যকর সংযোগ—এ দুটি প্রধান সূচককে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে সৌদি যোগাযোগ ও তথ্য-প্রযুক্তি কমিশন (সিআইটিসি) জানিয়েছে, এই অসাধারণ অর্জন দেশের প্রযুক্তি খাতের ধারাবাহিক আধুনিকায়ন, দূরদর্শী নেতৃত্বের নীতিগত সহায়তা এবং শক্তিশালী ডিজিটাল অবকাঠামোরই বাস্তব প্রতিফলন। একই সঙ্গে এটি বৈশ্বিক প্রযুক্তি খাতে সৌদি আরবের নেতৃত্বের অবস্থানকে আরো সুসংহত করেছে। সিআইটিসির মতে, উন্নত নিয়ন্ত্রক কাঠামো, আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর অবকাঠামো ও ডিজিটাল অর্থনীতিকে কেন্দ্র করে নেওয়া কার্যকর উদ্যোগগুলো সৌদি আরবকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আরো প্রতিযোগিতামূলক করে তুলেছে।

সংস্থাটির প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ সৌদি আরবের যোগাযোগ ও প্রযুক্তি বাজারের আকার বেড়ে ১৯৯ বিলিয়ন সৌদি রিয়ালে পৌঁছেছে। গত পাঁচ বছরে এই খাতের চক্রবৃদ্ধি বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৮ শতাংশ, যার ফলে মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা (মেনা) অঞ্চলের সবচেয়ে বড় এবং দ্রুত বর্ধনশীল প্রযুক্তি বাজার হিসেবে নিজেদের অবস্থান আরো শক্তিশালী করেছে দেশটি।

ডিজিটাল সংযোগের ক্ষেত্রেও ঈর্ষণীয় সাফল্য অর্জন করেছে সৌদি আরব। সিআইটিসির তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে ইন্টারনেট ব্যবহারের হার ১০০ শতাংশ, একই সঙ্গে মোবাইল ফোনের মালিকানার হারও ১০০ শতাংশে পৌঁছেছে। এ ছাড়া ফিক্সড ব্রডব্যান্ডের গড় গতি ১৫১ এমবিপিএস এবং মোবাইল ব্রডব্যান্ডের গড় গতি ২১৬ এমবিপিএস, যা বিশ্বের অন্যতম উন্নত ডিজিটাল অবকাঠামোর পরিচয় বহন করে। সৌদি আরবের এই অর্জন দীর্ঘমেয়াদি ডিজিটাল রূপান্তর কর্মসূচি ও প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তোলার কৌশলের সফল বাস্তবায়নের প্রতিফলন।
 

যুবকদের উদ্দেশে যা বললেন মসজিদে নববির ইমাম শায়খ আল-হুজাইফি

ইসলামী জীবন ডেস্ক
যুবকদের উদ্দেশে যা বললেন মসজিদে নববির ইমাম শায়খ আল-হুজাইফি
সংগৃহীত ছবি

মানুষের জীবনে এমন কিছু বাণী আছে, যা জীবন পরিচালনার জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ নীতিমালা। মহানবী (সা.)-এর এমনই এক অনন্য উপদেশ-বাণীকে কেন্দ্র করে যুবকদের উদ্দেশে পবিত্র মসজিদে নববির জুমার খুতবায় হৃদয়স্পর্শী আলোচনা করেছেন মসজিদে নববির সম্মানিত ইমাম ও খতিব শায়খ ড. আলী বিন আব্দুর রহমান আল-হুজাইফি। 

তিনি খুতবার শুরুতেই সাহাবি আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.)-কে উদ্দেশ করে মহানবী (সা.)-এর সেই অমূল্য উপদেশটি স্মরণ করিয়ে দেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘হে যুবক! আমি তোমাকে কয়েকটি কথা শিক্ষা দিচ্ছি। আল্লাহকে রক্ষা করো (অর্থাৎ তাঁর আদেশ-নিষেধ মেনে চলো), তাহলে আল্লাহ তোমাকে রক্ষা করবেন। তুমি তাঁকে তোমার সামনে পাবে। যখন কিছু চাইবে, আল্লাহর কাছেই চাইবে। যখন সাহায্য প্রার্থনা করবে, আল্লাহর কাছেই সাহায্য প্রার্থনা করবে। জেনে রাখো, যদি সমগ্র উম্মত তোমার কোনো উপকার করতে একত্রিত হয়, তবে তারা আল্লাহ তোমার জন্য যা নির্ধারণ করেছেন, তার বাইরে কোনো উপকার করতে পারবে না। আর যদি তারা তোমার ক্ষতি করতে একত্রিত হয়, তবে আল্লাহ যা নির্ধারণ করেছেন, তার বাইরে কোনো ক্ষতিও করতে পারবে না। কলম তুলে নেওয়া হয়েছে এবং তাকদিরের পৃষ্ঠাগুলো শুকিয়ে গেছে।’

এই সংক্ষিপ্ত অথচ গভীর অর্থবহ হাদিসে একজন মুসলিমের জীবনের সব মৌলিক নীতিমালা স্থান পেয়েছে। তিনি ব্যাখ্যা করে বলেন, ‘আল্লাহকে রক্ষা করো’—এর অর্থ আল্লাহর আদেশ নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করা, তাঁর নিষেধ থেকে দূরে থাকা এবং তাঁর নির্ধারিত সীমারেখাকে সম্মান করা। যে ব্যক্তি এভাবে জীবন পরিচালনা করে, আল্লাহ তাকে দুনিয়া ও আখিরাতে নিরাপত্তা, কল্যাণ ও সফলতা দান করেন।

তিনি পবিত্র কোরআনের সেই সুসংবাদ স্মরণ করিয়ে দেন, ‘যে ব্যক্তি ঈমানদার অবস্থায় সৎকর্ম করবে—সে পুরুষ হোক কিংবা নারী—আমি অবশ্যই তাকে পবিত্র ও সুন্দর জীবন দান করব এবং তাদের কর্মের সর্বোত্তম প্রতিদান প্রদান করব।’
তারপর তিনি আল্লাহর সেই অঙ্গীকার তুলে ধরেন, যেখানে আল্লাহ বলেন, ‘আর যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য উত্তরণের পথ বের করে দেন এবং তাকে এমন উৎস থেকে রিজিক দান করেন, যা সে কল্পনাও করতে পারে না।’

শায়খ আল-হুজাইফি আরো বলেন, তাকওয়ার বরকত শুধু ব্যক্তির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং তার পরিবার ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপরও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। তিনি সুরা কাহফ-এ বর্ণিত দুই এতিম শিশুর ঘটনার কথা স্মরণ করিয়ে দেন, যেখানে তাদের নেককার পিতার কারণে আল্লাহ তাদের সম্পদ সংরক্ষণ করেছিলেন। এ থেকেই বোঝা যায়, একজন পিতার নেক আমল সন্তানের জন্যও রহমত ও নিরাপত্তার কারণ হতে পারে। এ কারণেই সলফে সালেহিন নিজেদের আমল বৃদ্ধি করতেন এই আশায় যে আল্লাহ তাঁদের সন্তানদেরও হেফাজত করবেন।

শায়খ আল-হুজাইফি ইসলামের সর্বশ্রেষ্ঠ ইবাদত—নামাজের গুরুত্বও বিশেষভাবে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, যে ব্যক্তি নামাজ যথাযথভাবে আদায় করে, নামাজের রুকন, শর্ত ও খুশু-খুজু রক্ষা করে, তার জন্য ইসলামের অন্যান্য ইবাদত ও আনুগত্যের কাজ সংরক্ষণ করা সহজ হয়ে যায়। একই সঙ্গে তিনি দৃষ্টি সংযত রাখা, লজ্জাস্থানের হেফাজত করা, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে গুনাহ থেকে বিরত রাখা এবং ইসলামী শিষ্টাচার অনুসরণের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন। 

তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর এই বাণীর ব্যাখ্যা করেন, ‘আল্লাহকে রক্ষা করো, তুমি তাঁকে তোমার সামনে পাবে।’ এর অর্থ হলো, যে ব্যক্তি আল্লাহর আনুগত্যে জীবন পরিচালনা করে, আল্লাহ তার প্রতি বিশেষ অনুগ্রহ করেন। তিনি তাকে সঠিক পথের দিশা দেন, বিপদে সাহায্য করেন, শত্রুর বিরুদ্ধে বিজয় দান করেন এবং সর্বাবস্থায় তাঁর রহমত ও তত্ত্বাবধানে রাখেন। তাই একজন মুমিনের জীবনে যত বিপদ-মুসিবতই আসুক না কেন, যদি সে ধৈর্য ধারণ করে এবং আল্লাহর কাছে সওয়াবের আশা রাখে, তবে সেই কষ্টই তার মর্যাদা বৃদ্ধি এবং গুনাহ মাফের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

খুতবায় তাওয়াক্কুল বা আল্লাহর ওপর পূর্ণ নির্ভরতার বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা করা হয়। শায়খ আল-হুজাইফি বলেন, প্রকৃত মুসলমান শুধু আল্লাহর কাছেই প্রার্থনা করে এবং একমাত্র তাঁর ওপরই নির্ভর করে। কারণ উপকার ও ক্ষতির প্রকৃত মালিক একমাত্র আল্লাহ। আসমান ও জমিনের সব ভাণ্ডারের চাবিকাঠি তাঁরই হাতে। তাই এমন বিষয়ে কোনো সৃষ্টির সাহায্য চাওয়া, যা একমাত্র আল্লাহই করতে সক্ষম, তা শিরকের অন্তর্ভুক্ত।

তিনি হাদিসের শেষ অংশ—‘কলম তুলে নেওয়া হয়েছে এবং পৃষ্ঠাগুলো শুকিয়ে গেছে’—এর ব্যাখ্যায় বলেন, এর মাধ্যমে তাকদিরের প্রতি দৃঢ় ঈমানের শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ যা নির্ধারণ করেছেন, তা অবশ্যই ঘটবে। তবে এর অর্থ এই নয় যে, মানুষ চেষ্টা-প্রচেষ্টা ছেড়ে দেবে। বরং একজন মুমিন সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে, বৈধ উপায় অবলম্বন করবে এবং ফলাফলের ব্যাপারে আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা রাখবে। এটাই প্রকৃত তাওয়াক্কুল।

যেভাবে একটি দিন বরকতময় করে কাটাবেন

মুফতি ওমর বিন নাছির
যেভাবে একটি দিন বরকতময় করে কাটাবেন
সংগৃহীত ছবি

মানুষের জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো সময়। হারিয়ে যাওয়া অর্থ ফিরে পাওয়া সম্ভব, কিন্তু চলে যাওয়া একটি মুহূর্তও আর ফিরে আসে না। তাই একজন মুমিনের প্রতিটি দিন হওয়া উচিত আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের এক নতুন সুযোগ। যেদিন আল্লাহর স্মরণে শুরু হয়, হালাল উপার্জনে অতিবাহিত হয় এবং ইবাদত ও সৎকর্মের মাধ্যমে শেষ হয়—সেই দিনই প্রকৃত অর্থে বরকতময় দিন।

আজকের ব্যস্ত জীবনে আমরা প্রায়ই বরকতের অভাব অনুভব করি। সময় আছে, কিন্তু কাজ শেষ হয় না; উপার্জন আছে, কিন্তু তৃপ্তি নেই; সুযোগ আছে, কিন্তু প্রশান্তি নেই। এর মূল কারণ অনেক সময় আল্লাহর দেওয়া বরকত থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে নেওয়া। অথচ কোরআন ও সহিহ হাদিস আমাদের এমন কিছু আমল শিখিয়েছে, যেগুলো নিয়মিত পালন করলে একটি দিন বরকত, প্রশান্তি ও কল্যাণে পরিপূর্ণ হতে পারে।

১. ফজরের আগে জেগে তাহাজ্জুদ ও দোয়ার মাধ্যমে দিন শুরু করা
দিনের সর্বোত্তম সূচনা হলো শেষ রাতে আল্লাহর সামনে দাঁড়ানো। এই সময় আল্লাহ তাআলা বান্দার দোয়া কবুল করেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর রাতের কিছু অংশে তাহাজ্জুদ আদায় করুন। এটি আপনার জন্য অতিরিক্ত ইবাদত। আশা করা যায়, আপনার প্রতিপালক আপনাকে প্রশংসিত স্থানে প্রতিষ্ঠিত করবেন।’ (সুরা : ইসরা, আয়াত : ৭৯)

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আমাদের রব প্রতি রাতের শেষ তৃতীয়াংশে নিকটবর্তী আসমানে অবতরণ করেন এবং বলেন, কে আমাকে ডাকবে, আমি তার ডাকে সাড়া দেব? কে আমার কাছে চাইবে, আমি তাকে দান করব? কে আমার কাছে ক্ষমা চাইবে, আমি তাকে ক্ষমা করব?’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১১৪৫)

২. সময়মতো ফজরের সালাত আদায় করা
ফজরের সালাত দিনের সবচেয়ে বরকতময় সূচনা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি ফজরের সালাত আদায় করল, সে আল্লাহর নিরাপত্তার মধ্যে রইল।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৬৫৭)
আরও বলেছেন, ‘হে আল্লাহ! আমার উম্মতের জন্য দিনের প্রথম ভাগে বরকত দান করুন।’ (সুনান আবু দাউদ, হাদিস: ২৬০৬)
এ কারণে সকালকে অলসতা বা ঘুমে নষ্ট না করে উৎপাদনশীল কাজে ব্যয় করা সুন্নত।

৩. সকাল-সন্ধ্যার নিয়মিত জিকির করা
সকাল ও সন্ধ্যার মাসনুন জিকির মানুষকে শয়তানের কুমন্ত্রণা, বিপদ-আপদ ও অকল্যাণ থেকে রক্ষা করে। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা আমাকে স্মরণ করো, আমিও তোমাদের স্মরণ করব।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১৫২)
রাসুলুল্লাহ (সা.) প্রতিদিন সকাল ও সন্ধ্যায় বিভিন্ন দোয়া ও যিকির পাঠ করতেন এবং সাহাবিদেরও তা শিক্ষা দিতেন। (হিসনুল মুসলিম)

৪. কোরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে অন্তরকে আলোকিত করা
যে দিন কোরআনের তিলাওয়াত দিয়ে শুরু হয়, সে দিন আল্লাহর রহমত দ্বারা পরিবেষ্টিত হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই এই কোরআন এমন পথ প্রদর্শন করে যা সর্বাধিক সরল।’ (সুরা : ইসরা, আয়াত : ৯)
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম ব্যক্তি সে, যে কোরআন শিক্ষা করে এবং অন্যকে শিক্ষা দেয়।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৫০২৭)

৫. পাঁচ ওয়াক্ত সালাত যথাসময়ে আদায় করা
সালাত মুমিনের জীবনের মূল ভিত্তি। এটি দিনের প্রতিটি অংশকে বরকতময় করে। আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই সালাত অশ্লীলতা ও মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে।’ (সুরা : আনকাবুত, আয়াত : ৪৫)

৬. হালাল উপার্জন ও সততার সঙ্গে কাজ করা
বরকতের অন্যতম প্রধান উৎস হলো হালাল রিজিক। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা পৃথিবীর হালাল ও পবিত্র বস্তু থেকে আহার করো।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১৬৮)

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘সত্যবাদী ও বিশ্বস্ত ব্যবসায়ী কিয়ামতের দিন নবী, সিদ্দীক ও শহিদদের সঙ্গে থাকবে।’ (তিরমিজি, হাদিস: ১২০৯)

৭. মানুষের উপকার করা
একটি বরকতময় দিন সেই দিন, যেদিন অন্তত একজন মানুষের উপকার করা যায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মানুষের মধ্যে আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় সেই ব্যক্তি, যে মানুষের সবচেয়ে বেশি উপকার করে।’ (তাবারানি, হাদিস : ৫৭৮৭)

৮. দান-সদকা করা
সদকা কখনো সম্পদ কমায় না; বরং বরকত বৃদ্ধি করে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘দান-সদকা সম্পদ কমায় না।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৫৮৮)

৯. গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা ও বেশি বেশি ইস্তিগফার করা
পাপ বরকতকে নষ্ট করে, আর ইস্তিগফার বরকতের দরজা খুলে দেয়। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো... তিনি তোমাদের জন্য আকাশ থেকে প্রচুর বৃষ্টি বর্ষণ করবেন, সম্পদ ও সন্তান বৃদ্ধি করবেন এবং তোমাদের জন্য উদ্যান ও নদী সৃষ্টি করবেন।’ (সুরা : নুহ, আয়াত : ১০–১২)

১০. দিন শেষে আত্মসমালোচনা ও আল্লাহর কাছে তাওবা করা
একজন সফল মুমিন প্রতিদিন নিজের হিসাব নেয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘সকল আদম সন্তানই ভুলকারী, আর ভুলকারীদের মধ্যে সর্বোত্তম তারা, যারা বেশি বেশি তাওবা করে।’ (তিরমিজি, হাদিস: ২৪৯৯)

দিনের শেষে তাওবা, ইস্তিগফার এবং ঘুমানোর পূর্বের মাসনুন আমলগুলো পালন করলে পরবর্তী দিনের জন্যও বরকতের ভিত্তি তৈরি হয়।

শেষকথা, বরকত শুধু সম্পদের প্রাচুর্যের নাম নয়; বরং অল্প সময়ে অধিক কল্যাণ, অল্প সম্পদে তৃপ্তি, অল্প আমলে অধিক সওয়াব এবং জীবনে আল্লাহর রহমত লাভের নামই বরকত। একজন মুসলিম যদি প্রতিটি দিন আল্লাহর নামে শুরু করে, সালাত, কোরআন, জিকির, হালাল উপার্জন, মানুষের সেবা ও আন্তরিক তাওবার মাধ্যমে দিন অতিবাহিত করে, তবে তার জীবনে আল্লাহ তাআলা দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ দান করবেন। আসুন, আমরা প্রত্যেকে আজ থেকেই প্রতিটি দিনকে বরকতময় করার এই কোরআন-সুন্নাহভিত্তিক আমলগুলো নিজেদের জীবনে বাস্তবায়নের দৃঢ় সংকল্প করি। আল্লাহ তাআলা আমাদের প্রতিটি দিনকে ঈমান, আমল, শান্তি, রহমত ও বরকতে পরিপূর্ণ করে দিন। আমিন।

ইসলামী অর্থব্যবস্থায় সমবায়ের ধারণা

মো. আবদুল মজিদ মোল্লা
ইসলামী অর্থব্যবস্থায় সমবায়ের ধারণা
সংগৃহীত ছবি

মানুষ সামাজিক জীব। তার পক্ষে একা জীবনের সব চাহিদা পূরণ করা সম্ভব নয়। পারস্পরিক সহযোগিতা, অংশীদারি ও সম্মিলিত উদ্যোগ মানুষের পথচলাকে সহজ করে। ইসলাম এই প্রয়োজনকে শুধু স্বীকৃতিই দেয়নি, বরং তা ন্যায়, আল্লাহভীতি ও জনকল্যাণের ভিত্তিতে পরিচালিত হওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। ইসলামী পরিভাষায় প্রচলিত ‘সমবায় সমিতি’ (Cooperative Society) শব্দটি না থাকলেও এর মৌলিক দর্শন তথা পারস্পরিক সহযোগিতা, ন্যায়ভিত্তিক অংশীদারি, সম্পদের সুষম ব্যবহার ও সামাজিক কল্যাণ কোরআন-সুন্নাহ দ্বারা সুপ্রমাণিত। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা সৎকর্ম ও তাকওয়ার কাজে একে অপরকে সহযোগিতা কোরো, কিন্তু পাপ ও সীমা লঙ্ঘনের কাজে সহযোগিতা কোরো না।’ (সুরা : মায়িদা, আয়াত : ২)

এই আয়াত ইসলামী সমবায়ের মূলনীতি নির্ধারণ করে দিয়েছে। তা হলো যেকোনো যৌথ উদ্যোগের উদ্দেশ্য হতে হবে কল্যাণ, ন্যায় ও আল্লাহভীতি; অন্যায়, সুদ, প্রতারণা বা মানুষের অধিকার ক্ষুণ্ণ হয় এমন কোনো কাজে সহযোগিতা বৈধ নয়।

রাসুলুল্লাহ (সা.) মুসলিম জাতিকে একটি ঐক্যবদ্ধ ও সহযোগিতামূলক সমাজ গড়ে তুলতে উদ্বুদ্ধ করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘একজন মুমিন অপর মুমিনের জন্য একটি সুদৃঢ় অট্টালিকার মতো, যার এক অংশ অন্য অংশকে শক্তিশালী করে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৪৮১)
অন্য হাদিসে তিনি বলেছেন, ‘বান্দা যতক্ষণ তার ভাইয়ের সহযোগিতায় থাকে, আল্লাহ ততক্ষণ তার সহযোগিতায় থাকেন।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৬৯৯)

এসব হাদিস থেকে বোঝা যায়, পারস্পরিক সহযোগিতা ইসলামের একটি মৌলিক শিক্ষা। রাসুলুল্লাহ (সা.) মদিনায় হিজরত করার পর সেখানে সহযোগিতানির্ভর একটি সমাজ বিনির্মাণ করেছিলেন। মদিনার আনসার ও মুহাজির সাহাবিরা পরস্পরকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করতেন। পারস্পরিক সহযোগিতায় মদিনার মুসলিম সমাজ অল্প দিনেই হিজরতের ফলে সৃষ্ট অর্থনৈতিক ও সামাজিক চাপ সামলে স্বনির্ভর সমাজে পরিণত হয়েছিল।

ইসলামী অর্থব্যবস্থায় সমবায়ের ধারণার সঙ্গে ‘শিরকত’ (অংশীদারি), ‘মুশারাকা’ ও ‘মুদারাবা’র ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। ইসলামী ফিকহের দৃষ্টিতে একাধিক ব্যক্তি বৈধ পুঁজিতে অংশীদার হয়ে যৌথ উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারে এবং তারা নিজেদের ভেতর ন্যায়সংগতভাবে লাভ-লোকসান ভাগাভাগি করতে পারে। এসব পদ্ধতির মাধ্যমে ইসলাম সুদনির্ভর অর্থনীতির পরিবর্তে শ্রম ও সহযোগিতানির্ভর অর্থনীতির দিকে পথনির্দেশ করেছে। ইসলাম এমন একটি অর্থনৈতিক কাঠামোর কথা বলে, যেখানে সুদভিত্তিক শোষণের পরিবর্তে অংশীদারি ও ঝুঁকি ভাগাভাগির নীতি প্রতিষ্ঠিত।

ইসলামী সমবায়ের বৈশিষ্ট্য
ইসলামের দৃষ্টিতে একটি আদর্শ সমবায় সমিতির কয়েকটি বৈশিষ্ট্য থাকা প্রয়োজন। তা হলো—
১. কল্যাণ চিন্তা : ইসলামী সমবায়ের উদ্দেশ্য হবে সদস্যদের আর্থ-সামাজিক কল্যাণ, শুধু মুনাফা অর্জন নয়। কেননা কোরআনের নির্দেশনা অনুসারে মুসলিম সমাজের সব সহযোগিতা হবে কল্যাণনির্ভর। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা সৎকর্ম ও তাকওয়ার কাজে একে অপরকে সহযোগিতা কোরো; কিন্তু পাপ ও সীমা লঙ্ঘনের কাজে সহযোগিতা কোরো না।’ (সুরা : মায়িদা, আয়াত : ২)

২. হালাল উৎস ও বিনিয়োগ : ইসলামী সমবায়ের অর্থের উৎস হবে হালাল এবং তা বিনিয়োগও হবে সম্পূর্ণ হালাল খাতে। সুদ, ঘুষ, জুয়া, প্রতারণা বা হারাম ব্যবসার সঙ্গে কোনো সম্পৃক্ততা থাকা যাবে না। মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘হে মানবজাতি! পৃথিবীতে যা কিছু বৈধ ও পবিত্র খাদ্যবস্তু রয়েছে তা থেকে তোমরা আহার কোরো এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ কোরো না। নিশ্চয়ই সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু।’ (সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ১৬৮)

৩. আমানতদারিতা : সমবায় পরিচালনায় আমানত রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি। এ ক্ষেত্রে উদ্যোক্তা ও গ্রাহক উভয়ের আমানত রক্ষা করা জরুরি। ইসলাম যেকোনো আর্থিক লেনদেনে আমানতদারিতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি শিক্ষা দেয়। কোরআনে বলা হয়েছে, ‘আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দেন, আমানত যথাযথভাবে তার হকদারের কাছে পৌঁছে দিতে।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ৫৮)

৪. শুরা নীতি অনুসরণ : ইসলাম সম্মিলিত কাজে শুরা নীতি অনুসরণের নির্দেশ দেয়। এতে সমবায়ের বিনিয়োগ ঝুঁকি কমে যায়, তেমনি স্বেচ্ছাচারিতার অবসান ঘটে। আল্লাহ তাআলা মুমিনদের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করে বলেছেন, ‘তাদের কাজ পারস্পরিক পরামর্শের মাধ্যমে পরিচালিত হয়।’ (সুরা : আশ-শুরা, আয়াত : ৩৮)

৫. হিসাব সংরক্ষণ : লিখিতভাবে হিসাব সংরক্ষণ করা না হলে সমবায়ের স্বচ্ছতা রক্ষা করা যায় না। ইসলাম আর্থিক লেনদেনের ক্ষেত্রে লিখিতভাবে হিসাব সংরক্ষণের নির্দেশ দেয়; শুধু তাই নয়, ন্যায়সংগতভাবে তা লেখার নির্দেশ দেয়। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘হে মুমিনরা! তোমরা যখন একে অন্যের সঙ্গে নির্ধারিত সময়ের জন্য ঋণের কারবার করো তখন তা লিখে রাখো। তোমাদের মধ্যে কোনো লেখক যেন ন্যায্যভাবে লিখে দেয়।’ (সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ২৮২)

বর্তমান সময়ে দারিদ্র্য বিমোচন, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা সৃষ্টি, কৃষি উন্নয়ন, ক্ষুদ্র সঞ্চয় গড়ে তোলা এবং বেকারত্ব কমাতে ইসলামী নীতিনিষ্ঠ সমবায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে, বিশেষ করে গ্রামীণ অর্থনীতিতে সুদমুক্ত সমবায়ভিত্তিক অর্থায়ন মানুষের আত্মনির্ভরশীলতা বৃদ্ধি করতে পারে। একই সঙ্গে সদস্যদের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা, ভ্রাতৃত্ব ও সামাজিক সংহতি শক্তিশালী হয়, যা ইসলামের সামগ্রিক সামাজিক দর্শনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। প্রকৃতপক্ষে ইসলামী আদর্শের সমবায় শুধু একটি অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান নয়; বরং ন্যায়, আমানতদারিতা, জবাবদিহি ও সদস্যদের পারস্পরিক আস্থার ওপর প্রতিষ্ঠিত একটি কল্যাণমুখী ব্যবস্থা। ইসলাম সমবায়ের এমন একটি মডেল উপস্থাপন করে, যার ভিত্তি প্রতিযোগিতা নয়; বরং সহযোগিতা। এর লক্ষ্য ব্যক্তি ও সমাজ উভয়ের কল্যাণ নিশ্চিত করা।

অন্যদিকে ইসলামের নীতি, আদর্শ ও শিক্ষা বিসর্জন দেওয়ায় বর্তমান সমাজের অনেক সমবায় উদ্যোগে সফল হচ্ছে না এবং তা সমাজের উপকার করার পরিবর্তে তাতে ক্ষত তৈরি করছে, বিশেষত সুদনির্ভর সমবায় সদস্যদের ঋণের বোঝা বাড়িয়ে দেয় এবং তারা দীর্ঘ মেয়াদে আর্থিক সংকটে পড়ে। এ ছাড়া পরিচালনা পর্ষদের দুর্নীতি, অর্থ আত্মসাৎ, ভুয়া হিসাব, প্রতারণা কিংবা সদস্যদের আমানতের অপব্যবহারের অভিযোগও কম নয়। ইসলামী অর্থনীতিতে সুদ, অসততা ও প্রতারণা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।

আল্লাহ সবাইকে দ্বিনের সঠিক বুঝ দান করুন। আমিন।