• ই-পেপার

হিজরি সনের ইতিহাস

মুসলিম উম্মাহর স্বকীয় পরিচয়ের গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়

বাবা দিবসে সন্তানের পঠিতব্য কিছু দোয়া

মুফতি ওমর বিন নাছির
বাবা দিবসে সন্তানের পঠিতব্য কিছু দোয়া
সংগৃহীত ছবি

মানুষের জীবনে বাবার স্থান অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ। তিনি সন্তানের জন্য নিরাপত্তার ছায়া, ভালোবাসার আশ্রয় এবং ত্যাগের এক উজ্জ্বল প্রতীক। একজন বাবা নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়ে সন্তানের সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার জন্য নিরলস পরিশ্রম করেন। তাই ইসলামে পিতা-মাতার মর্যাদা এতটাই উচ্চ যে আল্লাহ তাআলা তাঁর ইবাদতের নির্দেশের পরপরই তাদের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করার নির্দেশ দিয়েছেন।

বর্তমান সময়ে ‘বাবা দিবস’ উপলক্ষে অনেকেই বাবার প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করেন। একজন মুসলিম সন্তানের জন্য সবচেয়ে সুন্দর উপহার হলো—বাবার জন্য আন্তরিক দোয়া করা। কারণ দোয়া এমন এক আমল, যা জীবিত ও মৃত উভয় অবস্থায় পিতা-মাতার জন্য উপকারী হয়। তাই আসুন, আমরা বাবা দিবসকে উপলক্ষ করে বাবার জন্য কোরআন-সুন্নাহ থেকে শেখা দোয়াগুলো জানি এবং আমল করি।


১. বাবার জন্য রহমত ও নিরাপত্তা কামনায় দোয়া

رَبِّ ارْحَمْهُمَا كَمَا رَبَّيَانِي صَغِيرًا

উচ্চারণ : রব্বির হামহুমা কামা রব্বাইয়ানি সাগিরা।
অর্থ : ‘হে আমার প্রতিপালক! আমার পিতা-মাতার প্রতি দয়া করুন, যেমন তারা শৈশবে আমাকে স্নেহ-মমতায় লালন-পালন করেছেন।’ (সুরা : ইসরা, আয়াত : ২৪)

২. ক্ষমা ও জান্নাতের দোয়া

رَبَّنَا اغْفِرْ لِي وَلِوَالِدَيَّ وَلِلْمُؤْمِنِينَ يَوْمَ يَقُومُ الْحِسَابُ

উচ্চারণ : রব্বানাগফির লি ওয়া লিওয়ালিদাইয়া ওয়ালিল মুমিনীনা ইয়াওমা ইয়াকুমুল হিসাব।
অর্থ : ‘হে আমাদের প্রতিপালক! আমাকে, আমার পিতা-মাতাকে এবং সব মুমিনকে ক্ষমা করুন, যেদিন হিসাব কায়েম হবে।’ (সুরা : ইবরাহিম, আয়াত : ৪১)

৩. মৃত বাবার জন্য দোয়া
যাদের বাবা ইন্তেকাল করেছেন, তারা বেশি বেশি এ দোয়া করতে পারেন—

اللَّهُمَّ اغْفِرْ لَهُ وَارْحَمْهُ وَعَافِهِ وَاعْفُ عَنْهُ

উচ্চারণ : আল্লাহুম্মাগফির লাহু ওয়ারহামহু ওয়া আফিহি ওয়াফু আনহু।
অর্থ : ‘হে আল্লাহ! তাঁকে ক্ষমা করুন, তাঁর প্রতি দয়া করুন, তাঁকে নিরাপত্তা দিন এবং তাঁর ত্রুটিগুলো মার্জনা করুন।’ (সহিহ মুসলিম)

সন্তানের দোয়া মাতা-পিতার জন্য সদকায়ে জারিয়া
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মানুষ মৃত্যুবরণ করলে তার সব আমল বন্ধ হয়ে যায়; তবে তিনটি আমল চলতে থাকে—সদকায়ে জারিয়া, উপকারী জ্ঞান এবং নেক সন্তান, যে তার জন্য দোয়া করে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১৬৩১)
এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, সন্তানের আন্তরিক দোয়া পিতা-মাতার জন্য মৃত্যুর পরও উপকার বয়ে আনে।

বাবা দিবস শুধু একটি আনুষ্ঠানিক দিবস নয়; এটি বাবার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের একটি উপলক্ষ। একজন মুসলিম সন্তানের উচিত শুধু একটি দিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে সারা জীবন বাবার সম্মান করা, তাঁর খোঁজখবর নেওয়া, তাঁর সেবা করা এবং তাঁর জন্য নিয়মিত দোয়া করা। পৃথিবীর কোনো উপহারই একজন বাবার জন্য সন্তানের আন্তরিক দোয়ার সমতুল্য নয়। তাই আসুন, আমরা আজ বাবা দিবসে এবং জীবনের প্রতিটি দিনে আমাদের বাবার জন্য আল্লাহর দরবারে হাত উঠাই, হে আল্লাহ! আমাদের বাবাদের ক্ষমা করুন, তাঁদের প্রতি রহম করুন, তাঁদের জীবনকে বরকতময় করুন এবং তাঁদেরকে দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ দান করুন। আমিন।

আজ ‘বাবা দিবসে’ প্রতিটি সন্তানের করনীয়

মুফতি ওমর বিন নাছির
আজ ‘বাবা দিবসে’ প্রতিটি সন্তানের করনীয়
সংগৃহীত ছবি

বাবা—ছোট্ট একটি শব্দ, কিন্তু এর গভীরতা আকাশসম বিস্তৃত। একজন সন্তানের জীবনে বাবাই হলেন নিরাপত্তার আশ্রয়, সাহসের উৎস, জীবনের প্রথম শিক্ষক এবং পরিবারের নীরব অভিভাবক। তিনি নিজের স্বপ্ন, আরাম-আয়েশ ও ব্যক্তিগত চাওয়া-পাওয়াকে বিসর্জন দিয়ে সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়ার জন্য নিরলস পরিশ্রম করেন। অনেক সময় মায়ের ভালোবাসা প্রকাশ্য হলেও বাবার ভালোবাসা থাকে নীরব, গভীর এবং আত্মত্যাগে পরিপূর্ণ।

বিশ্বজুড়ে আজ ‘বাবা দিবস’ পালিত হচ্ছে। যদিও ইসলামে পিতা-মাতার প্রতি সম্মান প্রদর্শনের জন্য কোনো নির্দিষ্ট দিনের প্রয়োজন নেই; বরং বছরের প্রতিটি দিন, জীবনের প্রতিটি মুহূর্তই তাদের প্রতি ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও সেবার জন্য নির্ধারিত। তবুও এই দিনটি আমাদেরকে পিতার অবদান স্মরণ করার, তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার এবং নিজেদের দায়িত্ব সম্পর্কে নতুন করে ভাবার সুযোগ করে দেয়।

কোরআনের আলোকে পিতার মর্যাদা
আল্লাহ তাআলা পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহারকে নিজের ইবাদতের পরপরই উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, ‘তোমার প্রতিপালক নির্দেশ দিয়েছেন যে, তোমরা একমাত্র তাঁরই ইবাদত করবে এবং পিতা-মাতার সঙ্গে সদ্ব্যবহার করবে।’ (সুরা : ইসরা, আয়াত : ২৩)
এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, আল্লাহর হক আদায়ের পর মানবজীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হক হলো পিতা-মাতার হক।

আরেক স্থানে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আমার প্রতি এবং তোমার পিতা-মাতার প্রতি কৃতজ্ঞ হও।’ (সুরা : লুকমান, আয়াত : ১৪)
পিতা-মাতার প্রতি কৃতজ্ঞতাকে আল্লাহ নিজের কৃতজ্ঞতার সঙ্গে উল্লেখ করেছেন, যা তাদের মর্যাদার সুস্পষ্ট প্রমাণ।

হাদিসে পিতার মর্যাদা
এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আমার উত্তম আচরণের সবচেয়ে বেশি হকদার কে?’ তিনি বললেন, ‘তোমার মা।’ লোকটি তিনবার একই প্রশ্ন করলে তিনবারই তিনি বললেন, ‘তোমার মা।’
চতুর্থবার তিনি বললেন, ‘অতঃপর তোমার বাবা।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৫৪৮)
এ হাদিসে মায়ের মর্যাদা বিশেষভাবে বর্ণিত হলেও বাবার অধিকার ও সম্মানও সুস্পষ্টভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

অন্য এক হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘পিতা হলো জান্নাতের মধ্যবর্তী উত্তম দরজাগুলোর একটি।’ (জামে তিরমিজি, হাদিস : ১৯০০)
অর্থাৎ, পিতার সন্তুষ্টি অর্জন জান্নাতে প্রবেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।

পিতার আত্মত্যাগ: এক নীরব সংগ্রামের গল্প
একজন বাবা সন্তানের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য নিজের অগণিত কষ্ট গোপন করেন। সন্তানের শিক্ষার জন্য, চিকিৎসার জন্য, সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য তিনি দিন-রাত পরিশ্রম করেন। সন্তান যখন নিশ্চিন্তে ঘুমায়, তখনও বাবার মনে ঘুরপাক খায় পরিবারের দায়িত্বের চিন্তা। অনেক সময় সন্তান বড় হয়ে বাবার এই আত্মত্যাগ ভুলে যায়। অথচ আজ যে অবস্থানে দাঁড়িয়ে সে পৃথিবীকে দেখছে, তার পেছনে রয়েছে বাবার ঘাম, পরিশ্রম ও ত্যাগের দীর্ঘ ইতিহাস।

সন্তানের করণীয়
ইসলাম সন্তানের ওপর পিতার প্রতি কিছু গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব অর্পণ করেছে। সেগুলো হলো-
১. পিতার সঙ্গে সম্মানজনক ভাষায় কথা বলা।
২. তাঁর আনুগত্য করা (শরিয়তবিরোধী বিষয় ব্যতীত)।
৩. তাঁর ভরণপোষণ ও সেবাযত্ন করা।
৪. তাঁর জন্য দোয়া করা।
৫. তাঁর বন্ধু-বান্ধব ও আত্মীয়দের সম্মান করা।
৬. মৃত্যুর পরও তাঁর জন্য সদকা ও ইস্তিগফার করা।


মাতা-পিতার জন্য পঠিতব্য কোরআনে বর্ণিত দোয়া হলো-

   رَبِّ ارْحَمْهُمَا كَمَا رَبَّيَانِي صَغِيرًا 

উচ্চারণ : ‘রাব্বির হামহুমা কামা রাব্বায়ানি সাগিরা।’
অর্থ : ‘হে আমার প্রতিপালক! তাদের প্রতি রহম করুন, যেমন তারা শৈশবে আমাকে লালন-পালন করেছেন।’ (সুরা : ইসরা, আয়াত : ২৪)

বাবা দিবসে আমাদের শিক্ষা
বাবা দিবস শুধু সামাজিক আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং এটি আত্মসমালোচনার একটি উপলক্ষ। আমরা কি আমাদের বাবার খোঁজ রাখি? আমরা কি তাঁর কষ্ট বুঝি? আমরা কি তাঁর জন্য দোয়া করি? আমরা কি তাঁর জীবদ্দশায় তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা করছি? যদি উত্তর ইতিবাচক হয়, তাহলে তো আলহামদুলিল্লাহ। আর যদি উত্তর হয় ‘না’ তাহলে আজই পরিবর্তনের সময়। কেননা বাবা শুধু একজন অভিভাবক নন; তিনি সন্তানের জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নিয়ামত। তাঁর ভালোবাসা অনেক সময় শব্দে প্রকাশ পায় না, কিন্তু প্রতিটি ত্যাগ, প্রতিটি দায়িত্ব পালন এবং প্রতিটি দুশ্চিন্তার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে সন্তানের প্রতি গভীর মমতা।

তাই বাবা দিবসে আমাদের অঙ্গীকার হোক—শুধু একটি দিনের শুভেচ্ছায় নয়, বরং জীবনের প্রতিটি দিনে বাবার প্রতি সম্মান, ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করব। তাঁর সেবাকে ইবাদত মনে করব, তাঁর সন্তুষ্টিকে জান্নাতের পথ হিসেবে গ্রহণ করব এবং তাঁর জন্য সর্বদা দোয়া করব। আল্লাহ তাআলা আমাদের সকল পিতা-মাতাকে সুস্থতা, বরকত ও দীর্ঘ নেক হায়াত দান করুন এবং যারা ইন্তেকাল করেছেন তাদেরকে জান্নাতুল ফিরদাউস নসিব করুন। আমিন।

খতমে খাজেগানের ফজিলত, নিয়ম ও দোয়াসমূহ

মুফতি ওমর বিন নাছির
খতমে খাজেগানের ফজিলত, নিয়ম ও দোয়াসমূহ
সংগৃহীত ছবি

মানুষের জীবনে এমন অনেক সময় আসে, যখন চারদিকের পথ যেন বন্ধ হয়ে যায়। দুশ্চিন্তা, বিপদ-মুসিবত, মানসিক অস্থিরতা কিংবা অপূর্ণ চাওয়া-পাওয়ার ভারে হৃদয় ক্লান্ত হয়ে পড়ে। ঠিক এমন মুহূর্তে একজন মুমিন তার রবের দরবারে ফিরে আসে—দোয়া, যিকির ও ইস্তিগফারের মাধ্যমে। আল্লাহর স্মরণেই যে অন্তরের প্রশান্তি, তা পবিত্র কোরআনেই ঘোষণা করা হয়েছে, ‘জেনে রাখো, আল্লাহর স্মরণেই অন্তরসমূহ প্রশান্তি লাভ করে।’ (সুরা : রাদ, আয়াত : ২৮)

আল্লাহমুখী জীবনচর্চারই একটি বরকতময় রূপ হলো খতমে খাজেগান। যুগে যুগে বুযুর্গানে দ্বিন, অলিয়ায়ে কেরাম এবং তাসাউফের পথিকগণ নিজেদের আত্মশুদ্ধি, রূহানি উন্নতি এবং আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ লাভের আশায় এই খতমের আমল করে আসছেন। বিশেষত নকশবন্দিয়া, চিশতিয়া ও অন্যান্য প্রসিদ্ধ তরিকায় এটি একটি পরিচিত ও সম্মানিত আমল হিসেবে বিবেচিত।

খতমে খাজেগান মূলত কোরআনের নির্দিষ্ট আয়াত, দরূদ শরিফ, ইস্তিগফার, তাসবিহ ও আল্লাহ তাআলার গুণবাচক নামসমূহ পাঠের সমষ্টি। এটি কোনো ফরজ বা ওয়াজিব ইবাদত নয়; বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন, অন্তরের পরিশুদ্ধি এবং দোয়া কবুলের আশায় পরিচালিত একটি নফল ও রূহানিয়াতপূর্ণ আমল।

আধ্যাত্মিক সাধকদের অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, একাগ্রতা, ইখলাস ও আল্লাহর প্রতি পূর্ণ বিশ্বাসের সঙ্গে খতমে খাজেগান আদায় করলে হৃদয়ে প্রশান্তি নেমে আসে, পেরেশানি দূর হয়, বিপদ-মুসিবত থেকে মুক্তির পথ সুগম হয় এবং বান্দা আল্লাহর বিশেষ রহমত ও বরকতের আশা করতে পারে। এ কারণেই যুগে যুগে অসংখ্য নেককার মানুষ নিজেদের ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক কল্যাণের উদ্দেশ্যে এই খতমের আয়োজন করে আসছেন। খতমে খাজেগানের নির্দিষ্ট ও সর্বজনস্বীকৃত কোনো একক পদ্ধতি নেই। 

এই খতমের একটি সংক্ষিপ্ত নিয়ম হলো—

১. ইস্তেগফার—১১ বার
২. সুরা ফাতিহা—৭ বার
৩. দরুদ শরিফ—১১ বার
৪. সুরা আলাম নাশরাহ—৭ বার
৫. সুরা ইখলাছ—১১ বার
৬. পুনরায় সুরা ফাতিহা—৭বার
৭. পুনরায় দরুদ শরিফ—১১ বার

তারপর
৮.  فَسَهِّلْ يَا اِلٰهِىْ كُلَّ صَعْبٍ بِحُرْ مَتِ سَيِّدِ الْاَ بْرَارِ سَهِّلْ سَهِّلْ بِفَضْلِكَ يَاعَزِيْزُ‎
 ফাসাহ্হিল ইয়া ইলাহি কুল্লা সাবিন বিহুরমাতি সায়্যেদিল আবরারি সাহ্হিল,
সাহ্হিল বিফাদ্বলিকা ইয়া আজিজ১১ বার।

৯. يَا قَاضِىَ الْحَاجَاتْ   ইয়া ক্বাদ্বিয়াল হাজাত৭ বার
১০. يَا كَفِىَ الْمُهِمَّاتْ   ইয়া কাফিয়াল মুহিম্মাত৭ বার
১১. يَا دَافِعَ الْبَلِيَّاتْ    ইয়া দাফিয়াল বালিয়্যাত৭ বার
১২. يَا مُجِيْبَ الدَّعْوَاتْ  ইয়া মুজিবাদ দাওয়াত৭ বার
১৩. يَا رَافِعَ الدَّرَجَاتْ   ইয়া রাফিয়াদ্ দারাজাত৭ বার
১৪. يَا حَلَّالَ الْمُشْكِلَاتْ  ইয়া হাল্লালাল্ মুশ্কিলাত্৭ বার
১৫. يَا مُسَبِّبَ الْاَسْبَابْ  ইয়া মুসাব্বিবাল আসবাব৭ বার
১৬. يَا شَافِي الْاَمْرَاضْ  ইয়া শাফিয়াল আমরাজ৭ বার
১৭. يَا مُفَتِّحَ الْاَبْوَابْ   ইয়া মুফাত্তিহাল্ আব্ওয়াব৭ বার

১৮. رَبِّ اِنِّىْ مَغْلُوْبٌ فَانْتَصِرْ  রাব্বি ইন্নি মাগ্লুবুন ফানতাছির৭ বার
১৯. يَا غَوْثُ اَغِثْنِىْ وَاَمْدُدْنِىْ  ইয়া গাউছু আগিছ্নী ওয়া আম্দুদ্নী৭ বার
২০. اِنَّالِلّٰهِ وَاِنَّااِلَيْهِ رَاجِعُوْنْ   ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রজিউন৭ বার

২১. لَااِلٰهَ اِلَّاۤ اَنْتَ سُبْحَانَكَ اِنِّىْ كُنْتُ مِنَ الظّٰلِمِيْنْ
লা-ইলাহা ইল্লা আনতা সুব্হানাকা ইন্নি কুনতু মিনাজ জালিমিন১১ বার।‎

২২. فَاسْتَجَبْنَا لَهٗ وَنَجَّيْنٰهُ مِنَ الْغَمِّ وَكَذٰ لِكَ نُنْجِى الْمُؤْمِنِيْنْ
ফাসতাজাবনা লাহু ওয়ানাজ্জাইনাহু মিনাল গাম্মি ওয়া কাজালিকা নুনজিল মুমিনিন১১ বার।‎

২৩. لَا حَوْلَ وَلَا قُوَّةَ إِلَّا بِاللّٰهِ وَلَا مَلْجَأَ مِنَ اللَّهِ إِلَّا إِلَيْهِ
লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহি, ওয়ালা মালজা'আ মিনাল্লাহি ইল্লা ইলাইহি১১ বার।

২৪. اللَّهُمَّ إِنَّا نَجْعَلُكَ فِي نُحُورِهِمْ، وَنَعُوذُ بِكَ مِنْ شُرُورِهِمْ
আল্লাহুম্মা ইন্না নাজ ‘আলুকা ফি নুহুরিহিম, ওয়া নাউজু বিকা মিন শুরুরিহিম১১ বার।

২৫. يَا اَرْ حَمَ الرَّحِمِيْنْ ইয়া আরহামার রহিমিন১১ বার।‎

সর্বশেষ ১০০ বা ১১  বার দরুদ শরিফ পাঠ করে খতম শেষ করে খালেছ দিলে মুনাজাত করলে
আল্লাহ তাআলা সকল দোয়া কবুল করবেন এবং এর ফলাফল প্রত্যক্ষ হতে থাকবে। ইনশাআল্লাহ।
 

সুদ নিষিদ্ধ হওয়ার প্রেক্ষাপট ও সামাজিক পরিবর্তন

মুফতি ওমর বিন নাছির
সুদ নিষিদ্ধ হওয়ার প্রেক্ষাপট ও সামাজিক পরিবর্তন
সংগৃহীত ছবি

মানবসমাজে অর্থনৈতিক শোষণের ইতিহাস যত পুরনো, সুদের (রিবা) ইতিহাসও ততটাই প্রাচীন। যুগে যুগে ক্ষমতাবান ও ধনীরা সুদের মাধ্যমে দরিদ্র ও অসহায় মানুষের সম্পদ আত্মসাৎ করেছে। ঋণের বোঝা মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে, সমাজে সৃষ্টি করেছে বৈষম্য, শত্রুতা ও অবিচার। ইসলাম যখন পৃথিবীতে আবির্ভূত হয়, তখন আরব সমাজেও সুদের ভয়াবহ প্রথা ব্যাপকভাবে প্রচলিত ছিল। এমনকি ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলে তার সম্পদ, পরিবার এমনকি ব্যক্তিগত স্বাধীনতাও হুমকির মুখে পড়ত।

এই অমানবিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে ইসলাম ধাপে ধাপে এক অর্থনৈতিক বিপ্লব ঘটায়। কোরআনুল কারিম সুদকে শুধু একটি আর্থিক অপরাধই বলেনি; বরং এটিকে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করার সমতুল্য ভয়াবহ গুনাহ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। ফলে সুদ নিষিদ্ধ হওয়ার ঘটনা শুধু একটি ধর্মীয় বিধান নয়, বরং মানবকল্যাণ, সামাজিক ন্যায়বিচার ও অর্থনৈতিক ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার এক ঐতিহাসিক মাইলফলক।

জাহেলি যুগে সুদের প্রচলন
ইসলাম-পূর্ব আরব সমাজে সবচেয়ে প্রচলিত সুদের ধরন ছিল ‘রিবা আন-নাসিয়াহ’। ঋণগ্রহীতা নির্ধারিত সময়ে ঋণ পরিশোধ করতে না পারলে ঋণের পরিমাণ বাড়িয়ে দেওয়া হতো এবং সময় বাড়ানো হতো। তারা বলত, ‘ঋণ পরিশোধ কর, নতুবা ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধি কর।’ ফলে একজন দরিদ্র ব্যক্তি অল্প ঋণ নিয়ে শেষ পর্যন্ত বহুগুণ ঋণের বোঝা বহন করতে বাধ্য হতো। এতে ধনীরা আরো ধনী এবং গরিবরা আরো দরিদ্র হয়ে পড়ত।

সুদ নিষিদ্ধ হওয়ার ধাপসমূহ
ইসলাম মানুষের স্বভাব ও সামাজিক বাস্তবতাকে বিবেচনায় নিয়ে ধাপে ধাপে সুদ নিষিদ্ধ করেছে।

প্রথম ধাপ : সুদের অনৈতিকতা তুলে ধরা
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা মানুষের সম্পদে বৃদ্ধি পাওয়ার উদ্দেশ্যে যে সুদ দিয়ে থাক, তা আল্লাহর কাছে বৃদ্ধি পায় না।’ (সুরা : রূম, আয়াত : ৩৯)
এ আয়াতে সুদের নৈতিক অসারতা তুলে ধরা হয়েছে।

দ্বিতীয় ধাপ : পূর্ববর্তী জাতির ওপর সুদের কারণে শাস্তির কথা উল্লেখ
আল্লাহ বলেন, ‘তাদের সুদ গ্রহণের কারণে (তাদের শাস্তি দেওয়া হয়েছিল), অথচ তাদেরকে তা থেকে নিষেধ করা হয়েছিল।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ১৬১)
এখানে ইহুদিদের সুদখোরির কারণে আল্লাহর শাস্তির কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

তৃতীয় ধাপ : সুদের কঠোর নিন্দা
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে ঈমানদাররা! তোমরা চক্রবৃদ্ধি হারে সুদ ভক্ষণ কর না।’ (সুরা : ইমরান, আয়াত : ১৩০)
এ আয়াতে সুদের ভয়াবহতা সম্পর্কে মুমিনদের সতর্ক করা হয়েছে।

চতুর্থ ধাপ : চূড়ান্ত ও পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা
সুরা বাকারার শেষাংশে সুদ সম্পূর্ণভাবে হারাম ঘোষণা করা হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ২৭৫)

আল্লাহ তাআলা আরো বলেন, ‘হে মুমিনরা! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং সুদের যা অবশিষ্ট আছে তা পরিত্যাগ কর, যদি তোমরা সত্যিকার মুমিন হও।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ২৭৮)
এরপর আল্লাহ তাআলা অত্যন্ত কঠোর ভাষায় বলেন, ‘যদি তোমরা তা না কর, তবে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পক্ষ থেকে যুদ্ধের ঘোষণা শুনে নাও।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ২৭৯)

সুদ নিষিদ্ধ হওয়ার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
তাফসিরবিদদের মতে, বনু সাকীফ ও বনু মুগিরা গোত্রের মধ্যে সুদের লেনদেন ছিল। ইসলাম গ্রহণের পরও পূর্বের কিছু সুদের দাবি অবশিষ্ট ছিল। তখন এই আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয় এবং সকল প্রকার বকেয়া সুদ বাতিল ঘোষণা করা হয়। পরবর্তীতে বিদায় হজের ভাষণে রাসুলুল্লাহ (সা.) ঘোষণা করেন, ‘সাবধান! জাহেলি যুগের সমস্ত সুদ বাতিল করা হলো।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১২১৮)
এরপর তিনি সর্বপ্রথম তাঁর চাচা আব্বাস ইবনে আব্দুল মুত্তালিব (রা.)-এর সমস্ত সুদ বাতিল ঘোষণা করেন, যাতে কেউ মনে না করে যে ইসলাম শুধু অন্যদের জন্য আইন প্রণয়ন করেছে।

সুদ সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কঠোর সতর্কবাণী

১. সুদ সাতটি ধ্বংসাত্মক গুনাহের একটি
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘...সাতটি ধ্বংসাত্মক গুনাহ থেকে বেঁচে থাক।’ সাহাবারা জিজ্ঞেস করলে তিনি সুদ ভক্ষণকেও তার মধ্যে উল্লেখ করেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ২৭৬৬)

২. সুদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাই অভিশপ্ত
জাবির (রা.) থেকে বর্ণিত, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) সুদগ্রহীতা, সুদদাতা, সুদের লেখক এবং এর দুই সাক্ষীর ওপর অভিশাপ করেছেন।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১৫৯৮)


সুদ নিষিদ্ধ হওয়ার পর সামাজিক পরিবর্তন

১. অর্থনৈতিক শোষণের অবসান : দরিদ্রদের ওপর ধনীদের অন্যায় আধিপত্য কমে যায় এবং ঋণের ফাঁদ থেকে মানুষ মুক্তি পেতে শুরু করে।

২. দান ও সদকার সংস্কৃতি বৃদ্ধি : সুদের পরিবর্তে ইসলাম ক্বারযে হাসানা (সুদমুক্ত ঋণ), যাকাত, সদকা ও ওয়াকফের ব্যবস্থা চালু করে। আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহ সুদকে ধ্বংস করেন এবং সদকাকে বৃদ্ধি করেন।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ২৭৬)

৩. সামাজিক ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠা : সুদ মানুষকে স্বার্থপর করে, কিন্তু দান ও সহযোগিতা সমাজে ভালোবাসা ও ভ্রাতৃত্ব সৃষ্টি করে।

৪. সম্পদের সুষম বণ্টন : সুদের মাধ্যমে সম্পদ ধনীদের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়; ইসলাম ব্যবসা, বিনিয়োগ ও অংশীদারিত্বভিত্তিক অর্থনীতিকে উৎসাহিত করে।

৫. ন্যায়ভিত্তিক অর্থনীতি প্রতিষ্ঠা : ইসলাম লাভের অধিকারকে ঝুঁকি ও পরিশ্রমের সঙ্গে যুক্ত করেছে। তাই ব্যবসা হালাল এবং সুদ হারাম।
সুতরাং সুদ নিষিদ্ধ হওয়ার ঘটনা ইসলামের অর্থনৈতিক ইতিহাসে এক যুগান্তকারী বিপ্লব। এটি শুধু একটি আর্থিক বিধান নয়; বরং মানবমর্যাদা, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং অর্থনৈতিক ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার মহান ঘোষণা। ইসলাম এমন একটি অর্থনীতি গড়ে তুলতে চায়, যেখানে ধনী-গরিবের মধ্যে শোষণ নয়, বরং সহযোগিতা থাকবে; স্বার্থপরতা নয়, বরং মানবকল্যাণ হবে মূলনীতি।

আজও বিশ্বের বহু অর্থনৈতিক সংকট, ঋণদাসত্ব ও বৈষম্যের মূল কারণ সুদভিত্তিক ব্যবস্থা। তাই কোরআনের নির্দেশনা অনুসারে সুদমুক্ত অর্থনীতি প্রতিষ্ঠা শুধু ধর্মীয় দায়িত্বই নয়, বরং একটি ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও কল্যাণকর সমাজ গঠনের অন্যতম পূর্বশর্ত। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে সুদের সকল প্রকার লেনদেন থেকে বেঁচে থাকার এবং হালাল উপার্জনের পথে অবিচল থাকার তাওফিক দান করুন। আমিন।