• ই-পেপার

আজকের নামাজের সময়সূচি, ১৬ জুন ২০২৬

শরিয়তের বিধান নিয়ে হাসি-ঠাট্টা নিষিদ্ধ

মুফতি আবদুল্লাহ নুর
শরিয়তের বিধান নিয়ে হাসি-ঠাট্টা নিষিদ্ধ
সংগৃহীত ছবি

মহান আল্লাহ মানুষের কল্যাণে যুগে যুগে দ্বিন ও শরিয়তের বিধান দিয়েছেন। একজন মুমিনের দায়িত্ব হলো শরিয়তের বিধানগুলোকে মান্য করা এবং তাকে সম্মান করা। এটা তার ঈমানের দাবি ও নিদর্শন। পক্ষান্তরে ইসলামের কোনো বিধান, নিদর্শন বা শরিয়তের কোনো অংশ নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রুপ করা অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ, যা মানুষের ঈমান পর্যন্ত বিনষ্ট করে দিতে পারে। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আর তুমি তাদেরকে প্রশ্ন করলে তারা নিশ্চয়ই বলবে, আমরা তো আলাপ-আলোচনা ও ক্রীড়া-কৌতুক করছিলাম। বোলো, তোমরা কি আল্লাহ, তাঁর নিদর্শন ও তাঁর রাসুলকে বিদ্রুপ করছিলে? ঈমান আনার পর তোমরা দোষ ঢাকার চেষ্টা কোরো না।’ (সুরা : তাওবা, আয়াত : ৬৫-৬৬)

তাফসিরবিদরা বলেন, তাবুক অভিযানের সময় কিছু লোক সাহাবায়ে কেরাম ও দ্বিনের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ করেছিল, তখন এই আয়াত নাজিল হয়। আয়াতে আল্লাহ তাআলা স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেন যে দ্বিনকে নিয়ে উপহাস করা কুফরির নামান্তর।

কোরআনের অন্যত্র আল্লাহ বলেন, ‘এটাই বিধান; আর যে ব্যক্তি আল্লাহর নিদর্শনগুলোর সম্মান রক্ষা করে, তা অন্তরের তাকওয়ার পরিচায়ক।’ (সুরা : হজ, আয়াত : ৩২)

এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, শরিয়তের বিধি-বিধান ও দ্বিনের প্রতীক বিষয়গুলোকে সম্মান করা আল্লাহভীতির লক্ষণ, বিপরীতে তা নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ ও বাঁকা মন্তব্য করা তাকওয়া পরহেজগারির পরিপন্থী কাজ।

মহানবী (সা.)-ও এ বিষয়ে উম্মতকে সতর্ক করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘বান্দা কখনো এমন একটি কথা বলে, যা আল্লাহর অসন্তুষ্টির কারণ হয়। কিন্তু সে বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয় না, অথচ এর কারণে সে জাহান্নামে পতিত হয়।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬৪৭৭)

বর্তমান যুগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে, পারস্পরিক কথাবার্তা, আলাপ-আলোচনা ও বিতর্কে অনেকেই ইসলামের বিধান, দাড়ি, হিজাব, নামাজ, কোরবানি কিংবা অন্য কোনো বিধান নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ করে থাকে। অনেকের দৃষ্টিতে এটাকে বাকস্বাধীনতার অংশ বা তুচ্ছ বিষয় মনে হলেও শরিয়তে এটি অত্যন্ত ভয়াবহ অপরাধ। কারণ এতে দ্বিনের মর্যাদা ক্ষুণ্ন হয় এবং মানুষের অন্তরে দ্বিনের প্রতি অবজ্ঞা সৃষ্টি হয়।

ফিকহের কিতাবগুলোতে শরিয়তের বিধি-বিধান নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ করাকে কুফরির কারণ বলা হয়েছে। ফাতাওয়ায়ে আলমগিরিতে বলা হয়েছে, ‘যে ব্যক্তি শরিয়তের কোনো বিষয় নিয়ে বিদ্রুপ করে, সে কাফির হয়ে যায়।’ (ফাতাওয়ায়ে আলমগিরি : ২/২৫৯)

ইমাম ইবনু নুজাইম (রহ.) বলেছেন, ‘দ্বিন বা দ্বিনের কোনো বিধান নিয়ে উপহাস করা কুফরি।’ (আল বাহরুর রায়িক : ৫/১৩৪)

তবে মনে রাখতে হবে, শরিয়তের কোনো বিধানের দলিল, প্রয়োগ পদ্ধতি বা ফিকহি ব্যাখ্যা নিয়ে জ্ঞানার্জনের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন করা আর বিদ্রুপ করা এক বিষয় নয়। ইসলাম চিন্তা, গবেষণা ও প্রশ্নকে উৎসাহিত করে; কিন্তু উপহাস ও অবজ্ঞাকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে। একজন মুমিনের কর্তব্য হলো আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (সা.)-এর নির্দেশনার প্রতি বিনয় ও শ্রদ্ধা প্রদর্শন করা। কোনো বিধানের হিকমত বা প্রজ্ঞা তার বোধগম্য না হলেও এই বিশ্বাস অন্তরে ধারণ করা যে আল্লাহর প্রতিটি বিধানই কল্যাণকর। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আল্লাহ ও তাঁর রাসুল কোনো বিষয়ে ফয়সালা করে দিলে কোনো মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীর সেই বিষয়ে ভিন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার থাকে না।’ (সুরা : আহজাব, আয়াত : ৩৬)

পরিশেষে বলতে চাই, ইসলামের বিধি-বিধান নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রুপ করা শুধু একটি নৈতিক অপরাধ নয়; বরং তা ঈমানের জন্যও মারাত্মক হুমকি। দেশের প্রচলিত আইনও তা অনুমোদন করে না। একজন মুসলমানের উচিত দ্বিনের প্রতিটি বিধানকে সম্মান করা, অন্যদেরও এর প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে উৎসাহিত করা এবং কথাবার্তা ও আচরণে এমন সব বিষয় থেকে দূরে থাকা, যা আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (সা.)-এর অসন্তুষ্টির কারণ হতে পারে। আল্লাহ সবাইকে দ্বিনের সঠিক জ্ঞান ও বুঝ দান করুন। আমিন।

ভেজাল খাদ্যে যেভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয় মানবসমাজ

মাওলানা আব্দুর রহমান
ভেজাল খাদ্যে যেভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয় মানবসমাজ
সংগৃহীত ছবি

খাদ্যে ভেজাল কোটি কোটি মানুষকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়। শিশুখাদ্যে ভেজাল সর্বনাশ করে গোটা একটি প্রজন্মের শরীর, জীবনীশক্তি, মেধা ও আয়ুর। স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞরা বলেন, ভেজাল এবং এক বা একাধিক রাসায়নিক দ্রব্য মেশানো খাবার খেলে মানুষের বুদ্ধি, চিন্তাশক্তি ও স্মরণশক্তি হ্রাস পায়। মানুষ মেধাহীন হয়ে পড়ে। শরীরের জিনজাত স্নায়ুকোষগুলোর আয়ুও এসব ভেজাল ও রাসায়নিক দ্রব্য মেশানো খাবার খাওয়ার ফলে কমে যায়। দৃষ্টিশক্তি, শ্রবণশক্তি, স্বাদ গ্রহণের শক্তি, ঘ্রাণ নেওয়ার ক্ষমতা হ্রাস পায়।

শরীরে বাসা বাঁধে মরণব্যাধি ক্যান্সারসহ নানা রোগ-ব্যাধি। ইসলামে পণ্যে ভেজাল প্রদান সম্পূর্ণরূপে হারাম। এ মর্মে কোরআনের দলিল নিম্নে আলোচিত হলো—

১. মহান আল্লাহ বলেন, ‘শৃঙ্খলা স্থাপনের পর তোমরা পৃথিবীতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি কোরো না।’ (সুরা : আরাফ, আয়াত : ৫৬)

উক্ত আয়াতে সাধারণভাবে সব ফ্যাসাদ থেকে নিষেধ করা হয়েছে।(তাফসিরে কুরতুবি : ৭/২২৬)
তন্মধ্যে খাদ্যদ্রব্য বা পণ্যে ভেজাল প্রদান অন্যতম।

২. আল্লাহ বলেন, ‘যখন সে ফিরে যায় (অথবা নেতৃত্বে আসীন হয়), তখন সে পৃথিবীতে অশান্তি সৃষ্টির এবং শস্য ও প্রাণী বিনাশের চেষ্টা করে। অথচ আল্লাহ অশান্তি পছন্দ করেন না।’ (সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ২০৫)

উক্ত আয়াতে বর্ণনা করা হয়েছে যে পৃথিবীতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অন্যতম রূপ হলো, মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় ব্যাঘাত সৃষ্টি করা। যার প্রভাব তাদের জীবন, সন্তান-সন্ততি, ফল-ফসল ও গবাদি পশুর ওপর গিয়ে পড়ে। এসব খাদ্যদ্রব্যে ভেজাল প্রদানের ফলে ঘটে থাকে।

৩. মহান আল্লাহ বলেন, ‘ন্যায্য কারণ ছাড়া কাউকে হত্যা করবে না, যা আল্লাহ হারাম করেছেন।’ (সুরা : আনআম, আয়াত : ১৫১)

এ আয়াতে অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করার পদক্ষেপ গ্রহণ করা থেকে নিষেধ করা হয়েছে, যেভাবেই তা হোক না কেন। আর খাদ্যদ্রব্যে ভেজাল প্রদান ধীরে ধীরে মানুষকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয় বিধায় তা হারাম।

৪. মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর তোমরা অন্যায়ভাবে পরস্পরের সম্পদ ভক্ষণ কোরো না এবং অন্যের সম্পদ গর্হিত পন্থায় গ্রাস করার উদ্দেশ্যে তোমরা জেনেশুনে তা বিচারকদের কাছে পেশ কোরো না।’ (সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ১৮৮)
আয়াতটি দুদিক থেকে খাদ্যে ভেজাল প্রদান হারাম হওয়ার প্রতি নির্দেশ করে—

ক. অন্যায়ভাবে যেকোনো পন্থায় মানুষের সম্পদ ভক্ষণ করতে আয়াতে নিষেধ করা হয়েছে। তন্মধ্যে খাদ্যে ভেজাল অন্যতম।

খ. ক্রেতা নির্ভেজাল ও নিরাপদ পণ্য ক্রয় এবং এর দ্বারা পরিপূর্ণরূপে উপকৃত হওয়ার জন্য বিক্রেতাকে সম্পূর্ণ মূল্য প্রদান করে। যদি পণ্যে ভেজাল থাকে তাহলে কখনো কখনো তা মূল্য কমে যাওয়ার কারণ হতে পারে। এভাবে ভেজাল প্রদানের ফলে পণ্যের মূল্য যতটুকু কম হবে ততটুকু বিক্রেতা ক্রেতার মাল অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করেছে বলে গণ্য হবে।

৫. মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে বিশ্বাসীরা! তোমরা একে অপরের মাল অন্যায়ভাবে ভক্ষণ কোরো না, তোমাদের পারস্পরিক সম্মতিতে ব্যবসা ছাড়া।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ২৯)

এ আয়াতও দুদিক থেকে উক্ত আয়াতটি ভেজাল হারাম হওয়ার দলিল বহন করে—

ক. যেকোনো পন্থায় অন্যায়ভাবে সম্পদ ভক্ষণ করা। পণ্যে ভেজাল প্রদান এর অন্যতম মাধ্যম।

খ. ক্রয়-বিক্রয় শুদ্ধ হওয়ার অন্যতম শর্ত হলো সম্মতি। এমনকি কিছুসংখ্যক মালেকি বিদ্বান একে প্রথম রুকন হিসাবে গণ্য করেছেন। আর এটা স্বতঃসিদ্ধ যে পণ্য ক্রয়কারী ভেজাল ছাড়াই তা ক্রয় করতে সম্মত হয়। কেননা ভেজালে প্রতারণা ও ক্ষতি রয়েছে। তাই কোনো পণ্যে ভেজাল পরিদৃষ্ট হলে তা সম্মতিকে নষ্ট করে দেয়। অতএব প্রমাণিত হলো যে পণ্যে ভেজাল প্রদান হারাম।

৬. আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনরা! তোমরা (অবাধ্যতার মাধ্যমে) আল্লাহ ও রাসুলের সঙ্গে খিয়ানত কোরো না এবং (এর অনিষ্টকারিতা) জেনেশুনে তোমাদের পরস্পরের আমানতসমূহে খিয়ানত কোরো না।’ (সুরা : আনফাল, আয়াত : ২৭)

যা কিছু মানুষ অন্যকে আদায় করে সে বিষয়ে আমানতের খিয়ানত হারাম হওয়ার ব্যাপারে আয়াতটি আম বা ব্যাপক। (তাফসিরে কুরতুবি)

তন্মধ্যে খাদ্যদ্রব্যও রয়েছে। আর মানুষ পণ্যের গুণাগুণ, কার্যকারিতা, মাপ ও ওজন প্রভৃতি বিষয়ে কাউকে বিশ্বস্ত মনে না করলে তার কাছ থেকে তা ক্রয় করে তার দ্বারা উপকৃত হতে চাইবে না। পণ্যে ভেজাল প্রদান এর বিপরীত। কাজেই প্রমাণিত হলো যে পণ্যে ভেজাল প্রদান হারাম।

৭. মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনরা! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং সত্যবাদীদের সঙ্গে থাকো।’ (সুরা : তাওবা, আয়াত : ১১৯)

আল্লাহ তাআলা সর্বাবস্থায় এবং সব কথা ও কাজে সত্যবাদিতা অবলম্বন করাকে আবশ্যক করেছেন। এটি এসব বিষয়ে মিথ্যা হারাম হওয়ার প্রমাণ বহন করে। পণ্যে ভেজাল প্রদানও এর অন্তর্ভুক্ত। কারণ মিথ্যা তথ্য প্রদানের মাধ্যমে ভেজাল জিনিস বাজারজাত করা হয়। এতে ক্রেতাকে ধোঁকা দিয়ে চড়ামূল্য হাতিয়ে নেওয়া হয়।

৮. আল্লাহ বলেন, ‘দুর্ভোগ মাপে কম দানকারীদের জন্য। যারা লোকদের কাছ থেকে মেপে নেওয়ার সময় পূর্ণ মাত্রায় নেয় এবং যখন লোকদের মেপে দেয় বা ওজন করে দেয়, তখন কম দেয়।’ (সুরা : মুতাফফিফিন, আয়াত : ১-৩)

উক্ত আয়াতগুলো পণ্য আদান-প্রদানের সময় সঠিকভাবে তা মাপা ও ওজন করা আবশ্যক হওয়া এবং মাপে ও ওজনে কম দেওয়া হারাম হওয়ার প্রতি নির্দেশ করে। কারণ তা প্রতারণা।

 

মহররম মাসের অপরিসীম গুরুত্ব

এম এ মান্নান
মহররম মাসের অপরিসীম গুরুত্ব
সংগৃহীত ছবি

নফল ইবাদতের মাস সমাগত। ঐতিহাসিক দিক থেকেও এ মাসের গুরুত্ব অপরিসীম। ১০ মহররম বা আশুরার দিন রোজা রাখা এ মাসের অন্যতম আমল। রসুলুল্লাহ (সা.) মহররমে আমল করার কথা বলেছেন। আশুরায় রোজা রাখার পাশাপাশি তওবা-ইসতিগফার ও দানসদকার কথাও বলেছেন। মহররমজুড়ে বেশি বেশি নফল রোজা ও তওবা-ইসতিগফারের প্রতি সবাইকে উৎসাহিত করেছেন। তাই মাসব্যাপী আল্লাহর কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা করা মোমিন মুসলমানের জন্য একান্ত আবশ্যক।

রসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যদি রমজানের পর আর কোনো মাসে রোজা রাখতে চাও তবে মহররমে রোজা রাখ। কেননা সেটি আল্লাহর মাস। এ মাসে এমন একটি দিন রয়েছে যে দিন আল্লাহ অনেকের তওবা কবুল করেন। ভবিষ্যতেও আরও অনেক মানুষের তওবা কবুল করবেন (তিরমিজি, মুসনাদে আহমদ)।’

মহররমে সবচেয়ে উত্তম হলো কোরআন-হাদিসে বর্ণিত ইসতিগফারবিষয়ক দোয়াগুলো বুঝে বুঝে পড়া। এ দোয়াগুলোর মাধ্যমে ক্ষমা চাইলে আল্লাহ বান্দাকে ক্ষমা করে দেবেন বলে আশা করা যায়। রমজানের ফরজ রোজার পর মহররমের নফল রোজার গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি। রসুল (সা.) হিজরতের পর হজরত মুসা (আ.)-এর সুন্নত হিসেবে আশুরার দিন এবং আগের অথবা পরের দিন রোজা পালনের হুকুম দেন। তিনি মদিনায় হিজরতের পর ইহুদিদের আশুরার দিন রোজা পালন করতে দেখেন।

বুখারি ও মুসলিমের হাদিস অনুযায়ী ইহুদিরা রসুল (সা.)-কে জানান, এই দিনে হজরত মুসা (আ.) ও তাঁর উম্মতকে আল্লাহ নাজাত দান করেন এবং ফেরাউন ও তার বাহিনীকে পানিতে ডুবিয়ে দেন। হজরত মুসা (আ.) আল্লাহর এই কৃপায় কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে এদিন রোজা পালন করেন। তাই ইহুদিরাও আশুরার দিন রোজা পালন করে। রসুল (সা.) ইহুদিদের বলেন, মুসা (আ.)-এর নাজাতে কৃতজ্ঞতা আদায়ের ক্ষেত্রে আমরা তোমাদের চেয়ে বেশি হকদার। তিনি এর পর থেকে আশুরায় নিজে রোজা রাখেন এবং মুসলমানদের রোজা রাখার হুকুম দেন। আশুরার রোজা পালনের মাধ্যমে বেশি বেশি সওয়াব পাওয়া যায়।

হজরত আদম (আ.) থেকে রসুল (সা.) পর্যন্ত সব নবী মহররমকে বিশেষ সম্মান দিয়েছেন। বিশেষত আশুরার দিনে রোজা ও ইবাদত-বন্দেগি করেছেন তাঁরা। ১০ মহররম আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে কারবালার প্রান্তরে রসুল (সা.)-এর প্রিয় নাতি, হজরত আলী (রা.) ও ফাতিমা (রা.)-এর ছেলে ইমাম হোসাইন (রা.)সহ নবীবংশের শাহাদাতবরণের ঘটনায়। হজরত ইমাম হোসাইন (রা.) ইসলামি ইমান-আকিদা পরিপন্থি কার্যকলাপে লিপ্ত থাকার জন্য ইয়াজিদকে খলিফা হিসেবে মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানান। এজন্য তাঁর ওপর অন্যায় যুদ্ধ চাপিয়ে দেওয়া হয়। কারবালার প্রান্তরে ইয়াজিদ বাহিনী ইমাম হোসাইন (রা.) এবং তাঁর পরিবারের সদস্য ও সঙ্গীদের অবরুদ্ধ করে রাখে। তিনি ইয়াজিদ বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণের বদলে সত্য ও ন্যায়ের জন্য শাহাদাতবরণকে বেছে নেন।

ইসলামি শরিয়তের আহকামের ক্ষেত্রে চান্দ্রমাসের গুরুত্ব অপরিসীম। চান্দ্রমাসের হিসাবমতেই হজ, রোজা প্রভৃতি আদায় করা হয়। তবে কোরআন মজিদ চন্দ্রকে যেমন, তেমনি সূর্যকেও সাল তারিখ ঠিক করার মানদণ্ডরূপে অভিহিত করেছে। যে হিসেবে চন্দ্র ও সূর্য উভয়টির মাধ্যমেই সন-তারিখ নির্দিষ্ট করা জায়েজ হলেও। চন্দ্রের হিসাব আল্লাহর কাছে অধিকতর পছন্দনীয় হওয়ায় শরিয়তের বিধিবিধানকে চন্দ্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট রাখা হয়েছে। এজন্য চান্দ্রবছরের হিসাব সংরক্ষণ করা ফরজে কেফায়া।

সব উম্মত এটা ভুলে গেলে সবাই গুনাহগার হবে। হিজরি সনের উদ্ভব ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হজরত ওমর (রা.)-এর খেলাফতকালে। ওই সময় খলিফার কাছে একটি চুক্তিপত্র আনা হয়। সেখানে শাবান মাসের কথা উল্লেখ ছিল। তখন ওমর (রা.) বললেন, এটা কি গত শাবান না আগামী শাবান? তিনি এ-সংক্রান্ত বিভ্রান্তি নিরসনে তারিখ গণনার নির্দেশ দিলেন এবং রসুল (সা.)-এর মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতকে কেন্দ্র করে হিজরি সন গণনার সূচনা করেন। এ সময় মহররমকে প্রথম মাস হিসেবে গণ্য করা হয়।

মহাগ্রন্থ আল কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয় আল্লাহর বিধান ও গণনার মাস বারোটি, আসমানগুলো ও পৃথিবীর সৃষ্টির দিন থেকে।  এর মধ্যে চারটি মাস সম্মানিত এটিই সুপ্রতিষ্ঠিত বিধান। কাজেই এর মধ্যে তোমরা নিজেদের প্রতি অত্যাচার কোরো না।’ (সুরা তওবা, আয়াত ৩৬) এ আয়াতের চারটি সম্মানিত মাসকে চিহ্নিত করতে গিয়ে নবী করিম (সা.) বিদায় হজের সময় মিনা প্রান্তরে দাঁড়িয়ে বলেন, ‘তিনটি মাস হলো জিলকদ, জিলহজ ও মহররম এবং অন্যটি হলো রজব।

লেখক : ইসলামি গবেষক

ঈমানের সুরক্ষায় ইসলামের নির্দেশনা

মুফতি উবায়দুল হক খান
ঈমানের সুরক্ষায় ইসলামের নির্দেশনা

ঈমান মানবজীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ সম্পদ। দুনিয়ার সব ধন-সম্পদ, ক্ষমতা ও সম্মান একদিকে আর ঈমান অন্যদিকে- তুলনায় ঈমানই অমূল্য। ঈমান ছাড়া মানুষের সব আমল নিষ্ফল, সব কৃতিত্ব অর্থহীন। একজন মুমিনের পরিচয়, মর্যাদা ও পরকালীন মুক্তির মূল চাবিকাঠি হলো ঈমান।

কিন্তু এই ঈমান অতি সংবেদনশীল ও পরিবর্তনশীল; কখনো তা বৃদ্ধি পায়, আবার কখনো দুর্বল হয়ে যায়। তাই ইসলাম শুধু ঈমান অর্জনের নির্দেশ দেয়নি, বরং ঈমান সংরক্ষণ, রক্ষা ও সুদৃঢ় করার জন্য সুস্পষ্ট ও পূর্ণাঙ্গ নির্দেশনাও প্রদান করেছে।

আধুনিক যুগে শিরক, কুফর, বিদআত, নাস্তিকতা, ভোগবাদ, নৈতিক অবক্ষয় ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিভ্রান্তির যে স্রোত, তাতে ঈমান রক্ষা করা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে কঠিন। এ প্রেক্ষাপটে ইসলামের নির্দেশনাগুলো জানা ও বাস্তবায়ন করা অত্যন্ত জরুরি।

বিশুদ্ধ আকিদা ঈমান রক্ষার প্রথম শর্ত

ঈমানের ভিত্তি হলো সঠিক আকিদা। আকিদা যদি বিশুদ্ধ না হয়, তবে আমলের কোনো মূল্য নেই। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর সঙ্গে শিরক করে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাত হারাম করে দিয়েছেন।’ (সুরা : মায়িদা, আয়াত : ৭২)।

ইসলাম তাওহিদের আকিদাকে ঈমানের কেন্দ্রবিন্দু করেছে। আল্লাহর সত্তা, গুণাবলি, ইবাদত ও কর্তৃত্বে কাউকে শরিক না করা- এটাই ঈমানের মূল কথা। কবর পূজা, তাবিজ-কবচে বিশ্বাস, জ্যোতিষী বিদ্যা, ভাগ্য গণনা- এসব ঈমান ধ্বংসকারী বা দুর্বলকারী বিষয়। তাই ঈমান রক্ষায় প্রথম নির্দেশনা হলো শিরক থেকে পূর্ণ বিরত থাকা এবং সহিহ আকিদা শেখা ও ধারণ করা।

কোরআন ও সুন্নাহর সঙ্গে গভীর সম্পর্ক

কোরআন হলো ঈমানের প্রাণ, সুন্নাহ হলো তার বাস্তব রূপ। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই এই কোরআন এমন পথ নির্দেশ করে, যা সর্বাধিক সঠিক।’ (সুরা : ইসরা/বনি ইসরাঈল, আয়াত : ৯)।

যে ব্যক্তি নিয়মিত কোরআন তিলাওয়াত করে, অর্থ বুঝে পড়ে, চিন্তা-গবেষণা করে এবং জীবনে বাস্তবায়ন করে- তার ঈমান দৃঢ় হয়। একইভাবে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ অনুসরণ ঈমান রক্ষার ঢালস্বরূপ। বিদআত ও মনগড়া আমল থেকে দূরে থাকাও ঈমান সুরক্ষার অন্যতম উপায়।

ফরজ ইবাদতে যত্নশীলতা

ইবাদত ঈমানকে শক্তিশালী করে আর গুনাহ ঈমানকে দুর্বল করে। নামাজ, রোজা, জাকাত, হজ- এসব ফরজ ইবাদত ঈমানের প্রহরী। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘বান্দা ও কুফরের মধ্যে পার্থক্য হলো নামাজ।’ (সহিহ মুসলিম)।

নামাজ ত্যাগ করলে ঈমান মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়ে। নিয়মিত নামাজ, বিশেষ করে জামাতে নামাজ ঈমানকে জীবন্ত রাখে। রোজা আত্মসংযম শেখায়, জাকাত সম্পদের মোহ কাটায়, হজ তাওহিদের বাস্তব প্রশিক্ষণ দেয়- সব মিলিয়ে ফরজ ইবাদত ঈমান রক্ষার অপরিহার্য উপাদান।

গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা

গুনাহ ঈমানের বিষ। ছোট গুনাহ জমে বড় গুনাহে পরিণত হয় আর বড় গুনাহ ঈমান নিভিয়ে দেয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘মুমিন গুনাহ করলে তার অন্তরে একটি কালো দাগ পড়ে।’ (তিরমিজি)।

চোখের গুনাহ, জিহ্বার গুনাহ, হারাম উপার্জন, সুদ, ঘুষ, ব্যভিচার, মিথ্যা- এসব ঈমান ধ্বংসের পথে নিয়ে যায়। তাই ইসলাম ঈমান রক্ষার জন্য হারাম থেকে কঠোরভাবে বেঁচে থাকার নির্দেশ দিয়েছে।

তাওবা ও ইস্তিগফারের গুরুত্ব

মানুষ ভুল করে, গুনাহ হয়- এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তাওবা না করা মারাত্মক বিপদ। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনরা! তোমরা সবাই আল্লাহর কাছে তাওবা করো।’ (সুরা : নুর, আয়াত : ৩১)।

নিয়মিত ইস্তিগফার ঈমানকে ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার করে। তাওবা ঈমানকে পুনরুজ্জীবিত করে, হৃদয়কে নরম করে এবং আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় করে।

সৎ সঙ্গ বেছে নেওয়া

মানুষ তার বন্ধুর দ্বিনের ওপর থাকে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তোমাদের প্রত্যেকের উচিত দেখা- সে কাকে বন্ধু বানাচ্ছে।’ (আবু দাউদ)।

দ্বিনদার, তাকওয়াবান, আলেম ও সৎ লোকদের সঙ্গ ঈমান বাড়ায়। আর নাস্তিক, গুনাহগার ও ভ্রান্ত লোকদের সঙ্গ ঈমান ধ্বংস করে। তাই ঈমান রক্ষায় সৎ সঙ্গ বেছে নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।

দুনিয়াপ্রীতি ও ভোগবাদ থেকে সতর্কতা

অতিরিক্ত দুনিয়াপ্রীতি ঈমানের সবচেয়ে বড় শত্রু। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘দুনিয়ার জীবন ধোঁকার সামগ্রী ছাড়া কিছুই নয়।’ (সুরা : হাদিদ, আয়াত : ২০)।

সম্পদ, পদ, খ্যাতি যদি অন্তরে আসন গেড়ে বসে- তবে ঈমান দুর্বল হয়। ইসলাম দুনিয়া ত্যাগ করতে বলেনি, কিন্তু দুনিয়াকে অন্তরে জায়গা দিতে নিষেধ করেছে।

ইলম অর্জন ও অজ্ঞতা দূর করা

অজ্ঞতা ঈমানের শত্রু। সহিহ ইলম ছাড়া মানুষ শিরক, বিদআত ও বিভ্রান্তিতে পড়ে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘ইলম অর্জন করা প্রত্যেক মুসলমানের ওপর ফরজ।’ (ইবনে মাজাহ)। কোরআন-হাদিসের সহিহ জ্ঞান ঈমান রক্ষার শক্ত ভিত তৈরি করে।

আল্লাহর ওপর ভরসা ও দোয়ার গুরুত্ব

তাওয়াক্কুল ঈমানের অংশ। দোয়া মুমিনের অস্ত্র। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব।’ (সুরা : গাফির, আয়াত : ৬০)।

রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজেও দোয়া করতেন, ‘হে অন্তরসমূহের পরিবর্তনকারী! আমার অন্তরকে তোমার দ্বিনের ওপর স্থির রাখ।’ (তিরমিজি)।

ঈমানের নিরাপত্তা

ঈমান একবার অর্জন করলেই নিরাপদ- এমন নয়। ঈমান আজীবন পাহারা দিতে হয়। ইসলামের নির্দেশনাগুলো মূলত ঈমানকে রক্ষা করার জন্যই। বিশুদ্ধ আকিদা, ইবাদত, গুনাহ থেকে বাঁচা, তাওবা, ইলম, সৎ সঙ্গ ও আল্লাহর স্মরণ- এসবের সমন্বয়েই ঈমান সুরক্ষিত থাকে। আজকের ফিতনাপূর্ণ যুগে ঈমান রক্ষা করা কঠিন হলেও অসম্ভব নয়। প্রয়োজন শুধু আন্তরিকতা, সচেতনতা ও আল্লাহর সাহায্য কামনা। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে ঈমানের সঙ্গে জীবন ও ঈমানের সঙ্গে মৃত্যু দান করুন। আমিন।

লেখক : মুহতামিম, জহিরুল উলুম মহিলা মাদরাসা, গাজীপুর।