মহান আল্লাহ মানুষের কল্যাণে যুগে যুগে দ্বিন ও শরিয়তের বিধান দিয়েছেন। একজন মুমিনের দায়িত্ব হলো শরিয়তের বিধানগুলোকে মান্য করা এবং তাকে সম্মান করা। এটা তার ঈমানের দাবি ও নিদর্শন। পক্ষান্তরে ইসলামের কোনো বিধান, নিদর্শন বা শরিয়তের কোনো অংশ নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রুপ করা অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ, যা মানুষের ঈমান পর্যন্ত বিনষ্ট করে দিতে পারে। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আর তুমি তাদেরকে প্রশ্ন করলে তারা নিশ্চয়ই বলবে, আমরা তো আলাপ-আলোচনা ও ক্রীড়া-কৌতুক করছিলাম। বোলো, তোমরা কি আল্লাহ, তাঁর নিদর্শন ও তাঁর রাসুলকে বিদ্রুপ করছিলে? ঈমান আনার পর তোমরা দোষ ঢাকার চেষ্টা কোরো না।’ (সুরা : তাওবা, আয়াত : ৬৫-৬৬)
তাফসিরবিদরা বলেন, তাবুক অভিযানের সময় কিছু লোক সাহাবায়ে কেরাম ও দ্বিনের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ করেছিল, তখন এই আয়াত নাজিল হয়। আয়াতে আল্লাহ তাআলা স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেন যে দ্বিনকে নিয়ে উপহাস করা কুফরির নামান্তর।
কোরআনের অন্যত্র আল্লাহ বলেন, ‘এটাই বিধান; আর যে ব্যক্তি আল্লাহর নিদর্শনগুলোর সম্মান রক্ষা করে, তা অন্তরের তাকওয়ার পরিচায়ক।’ (সুরা : হজ, আয়াত : ৩২)
এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, শরিয়তের বিধি-বিধান ও দ্বিনের প্রতীক বিষয়গুলোকে সম্মান করা আল্লাহভীতির লক্ষণ, বিপরীতে তা নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ ও বাঁকা মন্তব্য করা তাকওয়া পরহেজগারির পরিপন্থী কাজ।
মহানবী (সা.)-ও এ বিষয়ে উম্মতকে সতর্ক করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘বান্দা কখনো এমন একটি কথা বলে, যা আল্লাহর অসন্তুষ্টির কারণ হয়। কিন্তু সে বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয় না, অথচ এর কারণে সে জাহান্নামে পতিত হয়।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬৪৭৭)
বর্তমান যুগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে, পারস্পরিক কথাবার্তা, আলাপ-আলোচনা ও বিতর্কে অনেকেই ইসলামের বিধান, দাড়ি, হিজাব, নামাজ, কোরবানি কিংবা অন্য কোনো বিধান নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ করে থাকে। অনেকের দৃষ্টিতে এটাকে বাকস্বাধীনতার অংশ বা তুচ্ছ বিষয় মনে হলেও শরিয়তে এটি অত্যন্ত ভয়াবহ অপরাধ। কারণ এতে দ্বিনের মর্যাদা ক্ষুণ্ন হয় এবং মানুষের অন্তরে দ্বিনের প্রতি অবজ্ঞা সৃষ্টি হয়।
ফিকহের কিতাবগুলোতে শরিয়তের বিধি-বিধান নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ করাকে কুফরির কারণ বলা হয়েছে। ফাতাওয়ায়ে আলমগিরিতে বলা হয়েছে, ‘যে ব্যক্তি শরিয়তের কোনো বিষয় নিয়ে বিদ্রুপ করে, সে কাফির হয়ে যায়।’ (ফাতাওয়ায়ে আলমগিরি : ২/২৫৯)
ইমাম ইবনু নুজাইম (রহ.) বলেছেন, ‘দ্বিন বা দ্বিনের কোনো বিধান নিয়ে উপহাস করা কুফরি।’ (আল বাহরুর রায়িক : ৫/১৩৪)
তবে মনে রাখতে হবে, শরিয়তের কোনো বিধানের দলিল, প্রয়োগ পদ্ধতি বা ফিকহি ব্যাখ্যা নিয়ে জ্ঞানার্জনের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন করা আর বিদ্রুপ করা এক বিষয় নয়। ইসলাম চিন্তা, গবেষণা ও প্রশ্নকে উৎসাহিত করে; কিন্তু উপহাস ও অবজ্ঞাকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে। একজন মুমিনের কর্তব্য হলো আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (সা.)-এর নির্দেশনার প্রতি বিনয় ও শ্রদ্ধা প্রদর্শন করা। কোনো বিধানের হিকমত বা প্রজ্ঞা তার বোধগম্য না হলেও এই বিশ্বাস অন্তরে ধারণ করা যে আল্লাহর প্রতিটি বিধানই কল্যাণকর। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আল্লাহ ও তাঁর রাসুল কোনো বিষয়ে ফয়সালা করে দিলে কোনো মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীর সেই বিষয়ে ভিন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার থাকে না।’ (সুরা : আহজাব, আয়াত : ৩৬)
পরিশেষে বলতে চাই, ইসলামের বিধি-বিধান নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রুপ করা শুধু একটি নৈতিক অপরাধ নয়; বরং তা ঈমানের জন্যও মারাত্মক হুমকি। দেশের প্রচলিত আইনও তা অনুমোদন করে না। একজন মুসলমানের উচিত দ্বিনের প্রতিটি বিধানকে সম্মান করা, অন্যদেরও এর প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে উৎসাহিত করা এবং কথাবার্তা ও আচরণে এমন সব বিষয় থেকে দূরে থাকা, যা আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (সা.)-এর অসন্তুষ্টির কারণ হতে পারে। আল্লাহ সবাইকে দ্বিনের সঠিক জ্ঞান ও বুঝ দান করুন। আমিন।




